Advertisement

এনকাউন্টার (ষোড়শ পর্ব)

এনকাউন্টার 
ষোড়শ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


রবি কলেজে গিয়েই এমন ঘটনা দেখে স্তম্ভিত।আরও বেশি হতবাক হল ও কলেজের দেওয়ালে সেই স্ক্রিনশটের প্রিন্ট আউটটা সাঁটানো আছে দেখে।নীচে কালো কালিতে লেখা,'ছবি রবি মিত্র ছি!ধিক্কার তোমায়!'
সেই সঙ্গে চলছে স্লোগান,'রবি মিত্র হায় হায়!'গেট অবরোধ করেছে যারা,তাদের দলে রবির ক্লাসমেটরা প্রায় সবাই রয়েছে,প্রীতম,লাবণ্য,মুস্কানসহ যারা রবিকে অপমান করত নানা অছিলায়।সেই সাথে যে ক্লাসমেটরা রবিকে প্রকৃতই ভালোবাসত বন্ধু হিসেবে,তারাও তাকে ভুল বুঝে যোগ দিয়েছে আন্দোলনে।সেই সাথে রবির জুনিয়ররাও,এমনকি জয়দীপ আর টিয়াও।হাসি পায় রবির,রেপিস্ট-মলেস্টররাও যোগ দিয়েছে নারীর প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদের মিছিলে।যদিও অভ্র নেই কোত্থাও,থাকার দরকারও নেই তার,সকলের মনে বিষবৃক্ষ যে বপন করা হয়ে গেছে তার।কিন্তু প্রতিবাদীদের দলে সাগরিকা নেই কোত্থাও!অথচ সেদিন সবচেয়ে বেশি রিয়্যাক্ট করেছিল সাগরিকাই!
 ভাবনার অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল রবি।হঠাৎই এক ডাকে সম্বিৎ ফেরে তার।সে ফিরে দেখে জি.পি স্যার।তিনি বললেন,'আমি এসব কোনো কথাই বিশ্বাস করিনা রবি,সে যতই ওরা প্রমাণ দেওয়ার কথা বলুক না কেন!বয়সটা আমার এমনি হয়নি রবি,মানুষ চিনতে আমি ভুল করিনা।'

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

 রবির চোখে জল এল।এই প্রথম এ শহরের বুকে কেউ তার পাশে দাঁড়াল,তার যন্ত্রণা বুঝল।রবি জলভরা চোখে প্রণাম করল তাঁকে।
 তিনি রবির মাথায় হাত রেখে বললেন,'তোমার মতো জিনিয়াস স্টুডেন্টের কেরিয়ার এভাবে শেষ হতে দেব না আমি।তুমি কলেজে ঢুকবে,ক্লাসও করবে,দেখি কে আটকায় তোমায়!'
 রবির হাত ধরে তিনি এগিয়ে চললেন কলেজের দিকে।জি.পি স্যারকে কলেজের বেশিরভাগ স্টুডেন্টই সমঝে চলে,তাই অনেকেই রাস্তা খালি করে দিল।শুধু কয়েকজন ছাত্রছাত্রী এসেছিল ওঁদের পথ আটকাতে,কিন্তু জি.পি স্যার প্রতিবাদ করলেন,'তোমরা যদি নিজেদের ভালো চাও,কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হতে না চাও,তাহলে সরে যাও,যেতে দাও আমাদের!'
 এরপর বাকি ছাত্রছাত্রীরাও পথ ছেড়ে দিল।জি.পি স্যার রবির হাত ধরে এগিয়ে চললেন কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্য দিয়ে।রবিকে বললেন,'তুমি কোনো অন্যায় করোনি রবি,মাথা উঁচু করে চলবে,নিচু নয়।' 
কিন্তু ওদের পথ আটকালেন স্বয়ং কলেজের প্রিন্সিপাল অভিনন্দন সেন।তিনি বাঁকা হেসে বললেন,'আপনি বয়স্ক মানুষ গিরীশবাবু,ক'দিন পর রিটায়ার করবেন,কি দরকার শুধু শুধু এসব ঝামেলায় জড়ানো?'

_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra's Gaming

_________________________


— 'মানে?কি বলতে চাইছেন স্যার আপনি?'

— 'মানে রবির মতো একটা ক্রিমিনালকে শুধু শুধু কলেজ ক্যাম্পাসের ভিতর এনে ক্যাম্পাসকে অপবিত্র করার কি খুব দরকার ছিল?'

— 'না স্যার আপনি ভুল করছেন,রবি ক্রিমিনাল নয়,ওকে ফাঁসানো হয়েছে!'

— 'তাই নাকি গিরীশবাবু?তা রবিকে যখন ফাঁসানো হয়েছিল তখন আপনি উপস্থিত ছিলেন বুঝি ওখানে?আর যদি ক্রিমিনাল না ই হবে তো পুলিশ অ্যারেস্ট করেছিল কেন ওকে?আর এত প্রতিবাদ,এত প্রমাণ সব মিথ্যে বলতে চাইছেন আপনি?'

— 'স্যার আমি চলে যাচ্ছি,আমি চাই না আমার জন্য আপনাকে অপমানিত হতে হোক!' রবি বলল।

— 'এই চুপ করো তো!দুদিনের ছেলে,সে অভিনন্দন সেনের মুখে মুখে কথা বলছে?এত বড়ো সাহস তোমার?' অভিনন্দনবাবু গর্জে উঠলেন।

— 'না রবি,তুমি কোথাও যাবে না।তুমি আর পাঁচজন ছাত্রের মতোই কলেজে আসবে,ক্লাস করবে।' জি.পি স্যার দৃঢ় কন্ঠে বললেন।

— 'আপনার বয়স হয়েছে গিরীশবাবু!'অভিনন্দনবাবু ক্রূর হেসে বললেন,'এই বয়সে চাকরি খোয়ালে আবার চাকরি জোগাড় করাটা বেশ মুশকিল হয়ে যাবে!তাই আপনার ভালোর জন্যই বলছিলাম,শুধু শুধু আর এসব ব্যাপারে নাই বা ঢুকলেন!'

— 'আর রবি ক্লাসে ঢুকলে আমি ক্লাস নেব না!' পাশ থেকে এসে বললেন রবিদের ডিপার্টমেন্টের অন্য আর একজন শিক্ষিকা রোহিনী মৈত্র।তিনি বললেন,'রবিকে এতদিন আমি একজন মেধাবী ছাত্রই নয়,অত্যন্ত নম্র বিনয়ী এক মানুষ হিসেবেও জানতাম।কিন্তু আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই কিছু মেয়ে যা যা অভিযোগ জানিয়েছে রবির বিরুদ্ধে,তাতে লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেছে।কি বলব গিরীশদা,এতবছর এ কলেজে পড়াচ্ছি,কখনো এমন অভিযোগ ওঠেনি কোনো ছাত্রের বিরুদ্ধে,আর আজ রবির জন্য আমাদের কলেজের মান সম্মান সব ধুলোয় মিশে গেল!'

— 'ম্যাম,কোন্ কোন্ ছাত্রী আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে,তাদের নামটা একটু জানতে পারি?'

— 'হ্যাঁ সেই তো বলো,' রোহিনী বললেন,'আমি তোমায় তাদের নামগুলো বলি,তারপর তাদের আরও বড়ো সর্বনাশ করো তুমি!এমনিতেই অসহায় মেয়েগুলো মুখ বুজে তোমার সব নোংরামি সহ্য করে গেছে এতদিন ধরে,তাদের ব্ল্যাকমেল করে চুপ করিয়ে রেখেছিলে তুমি!তোমার মতো ছেলেদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনি!'

— 'সে তুমি যাই বলো রোহিনী,আমি বিশ্বাস করিনা রবি এরকম কিছু করতে পারে!'

— 'আচ্ছা ম্যাম,লাবণ্য,মুস্কান আর শর্বরী আপনার কাছে অভিযোগ করেছিল,তাই না ম্যাম?'

— 'দেখুন গিরীশদা দেখুন!কাদের সাথে অসভ্যতামি করেছে ছেলেটা নিজের মুখেই স্বীকার করল,এরপরেও ওর পাশে দাঁড়াবেন আপনি?' রোহিনী স্মিত হেসে বলল।

— 'কেমন অসভ্য ফাজিল ছেলে শুধু ভাবো রোহিনী,টিচারদের সামনেই খোলাখুলি বলছে নামগুলো!ছিঃ!' অভিনন্দনবাবু বললেন,'আর আপনাকেও বলছি গিরীশদা,ছেলেটার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনবেন না,এমন কিছু করবেন না যাতে কলেজ অথরিটি আপনার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর স্টেপ নিতে বাধ্য হয়!'

— 'স্যার আমি চলে যাচ্ছি স্যার,আপনি প্লিজ আর আমার পক্ষে দাঁড়াবেন না স্যার,আপনি আমার বাবার মতো।আমি শত অপমান সহ্য করলেও আপনাকে অপমানিত হতে দেখতে পারব না।আপনি যে আমায় বিশ্বাস করেছেন,এটাই অনেক বড়ো পাওয়া আমার কাছে।চলি স্যার।'
রবি কলেজের গেটের দিকে হাঁটতে লাগল।যে ঘটনা কোনোদিনও কেউ ঘটতে দেখেনি,সেই ঘটনাই ঘটল আজ।গম্ভীর রাগী গিরীশবাবুর চোখে বিন্দু বিন্দু জল দেখা গেল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ