সপ্তদশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
রবি কলেজ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যে প্রতিবাদীরা মুষড়ে পড়েছিল,তারা আবার নতুন উদ্যমে গলা ফাটাতে লাগল,'ধর্ষক নিপাত যাক!' কেউ বলতে লাগল,'সত্যমেব জয়তে!'
কথাগুলো ছুরির ফলার মতো বিঁধছিল রবির বুকে।ও দ্রুতপায়ে হাঁটতে লাগল,যাতে কলেজ থেকে তাড়াতাড়ি অনেকটা দূরে চলে যেতে পারে।
রবি ভাবছিল,গঙ্গার তীরে যাবে সে,যে নিঃসঙ্গ নদী তাকে শান্ত করেছিল ফ্রেসার্সের দিন,আজও তার কাছেই ফিরে যাবে সে।মা-বাবাকে কিছুই জানাতে চায় না রবি,এমনিতেই তাঁদের ওপর দিয়ে কম ঝড় বয়ে যায়নি,আবার নতুন করে তাঁদের দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায়না রবি।হাঁটতে হাঁটতে তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল পীযূষের সেই কথাটা,অভিজিৎবাবুর সাথে প্রিন্সিপাল স্যারের হেব্বি দহরম-মহরম!হেসে ফেলল রবি।এই হাসির সাথে ইদানীং তার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
গঙ্গাতীরটা আজ অনেকটা ফাঁকা ছিল অন্যদিনের তুলনায়।রবি অনেকটা সময় গঙ্গার তীরে কাটিয়ে উঠে পড়ল।হোস্টেলের পথ ধরল সে,আর তখনই ঘটল ঘটনাটা।রবি যে রাস্তাটা ধরেছিল,সেটা এমনিতেই নির্জন,লোকজন এই রাস্তায় আসে না বললেই চলে।শর্টকাট হয় বলেই এই রাস্তাটা ধরে রবি,আজও তার অন্যথা হয়নি।কিন্তু রাস্তায় ঢোকার মুখেই হঠাৎ একটা প্রাইভেট কার এসে দাঁড়াল ওর পাশেই,আর গাড়ির ভেতর থেকে হ্যাঁচকা টানে কে যেন গাড়িতে তুলে নিল ওকে,আর সাথে সাথেই স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল গাড়িটা একরাশ ধোঁয়া উড়িয়ে!
গাড়িতে উঠেই হতবাক রবি।তাকে দিনেদুপুরে কিডন্যাপ করেছে যে,সে আর কেউ নয়,রবির ভালোবাসা,সাগরিকা।
— 'সাগর তুই?' রবি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে সাগরিকার দিকে।
— 'হ্যাঁ রবিদা,অনেক কথা আছে তোমার সাথে,সেইজন্যই কিডন্যাপ করলাম,বুঝলে?'বলেই হাসল সাগরিকা,বলল,'কথাগুলো কলেজ ক্যাম্পাসে বা রাস্তাতেও বলতে পারতাম তোমায়,কিন্তু বলাটা সেফ না!'
— 'আমাকে একটা কথা সত্যি করে বল্ তো সাগর,' রবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,'তুই আর অভ্র কি চাস?আমি কোনো দোষ না করেও লকাপে গেছি,কলেজ থেকেও বিতাড়িত হয়েছি!এমনকি মা-বাবাকেও কম অপমান সহ্য করতে হয়নি!আমি আর পারছি না রে সাগর,তোরা কি চাস আমি একেবারে মরে যাই?তাহলেই কি শান্তি দিবি তোরা আমায়?'
— 'রবিদা আমায় ক্ষমা করো,' সাগরিকা রবির হাতদুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে বলল,'আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি রবিদা,আমি জানি তুমি নির্দোষ।হ্যাঁ একদিন অভ্রর চক্রান্তে তোমায় ভুল বুঝেছিলাম আমি,কিন্তু আজ সেই ভুল আমার ভেঙেছে।'
— 'এসব কি বলছিস তুই সাগর?'
— 'সব বলব রবিদা,বলার জন্যই তো ডেকেছি।তোমার সাথে কথা বলার সেফ প্লেস এই গাড়িটাই,কোনো কফিশপ-রেস্টুরেন্ট নয়,ওই অভ্রদীপ শিকদারের জ্যান্ত সিসিটিভিরা যেকোনো সময় ধরে ফেলতে পারে আমাদের!'
— 'সে আর বলতে সাগর!আমি গিয়েছিলাম অভ্রকে হাতেনাতে ধরতে,ওর আসল রূপ তোর কাছে প্রকাশ করে দিতে,কিন্তু উলটে অভ্রই আমায় ফাঁসিয়ে দিল!' রবি ব্যঙ্গের হাসি হাসল।
— 'সব জানি আমি রবিদা,সব জানি!তুমি যে ওকে ফলো করতে সেটা ও ধরে ফেলেছিল,ধূর্ত কিনা!' সাগরিকা রবির হাতটা শক্ত করে ধরল,'আসলে কি জানো তো রবিদা,সত্যি কোনোদিনও চাপা থাকেনা,সে অপরাধী যতই বুদ্ধিমান বা ক্ষমতাবান যাই হোক,সত্যের হাত থেকে তার নিষ্কৃতি নেই!তাই এত কিছু করেও অভ্র একদিন ধরা পড়ে গেল আমার কাছে।বুঝলে রবিদা,সেদিন অভ্র আমাকে নিয়ে এক রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল ডিনারের জন্য।ডিনার শেষে অভ্র যখন কাউন্টারে গেল বিল মেটাতে,তখন ভুলবশত ফোনটা টেবিলে ফেলে গেল।হঠাৎ দেখি,একটা মেসেজ এল ওর মোবাইলে,মেসেজটা করেছে লাবণ্যদি।নোটিফিকেশনে দেখি লাবণ্যদি লিখেছে,'বেবি,কাল সন্ধ্যেয় ফাঁকা আছিস?' আমি ভীষণ অবাক হয়ে খুললাম মেসেজটা।কি বলব রবিদা,মেসেজগুলো দেখে মনে হচ্ছিল আমি মাথা ঘুরে পড়ে যাব।শুধু লাবণ্যদি ই না,আরও অনেকে আছে যাদের সাথে অভ্রর এরকম ঘনিষ্ঠ সোহাগের মেসেজ আদানপ্রদান চলে।লিস্টে শর্বরীদি,মুস্কানদি,আমার বান্ধবী টিয়া,এছাড়াও বেশ কয়েকটা ক্লাসমেট আছে আমার।প্রায় আট-ন'টা মেয়ের সাথে ওর এরকম নোংরা সম্পর্ক আছে।এ অসভ্যতামির মধ্যে আছে অভ্রর কিছু বন্ধু কাম পা চাটা চ্যালারাও,যেমন প্রীতমদা,রূপদা,জ্যাকদা।ও হ্যাঁ আরেকজনের কথা না বললে তো গল্পটা কমপ্লিটই হয়না,সে হল মেনকা।অভ্র যে কত টাকা দিয়ে ওকে কিনেছে সে ও ই জানে।লোককে বলে মেড,আসলে যে কি তা আর জানতে বাকি নেই আমার!'
এই পর্যন্ত বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সাগরিকা।রবি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,'কষ্ট পাস না রে সাগর,অভ্রর মতো লম্পট তোর মতো মানুষকে ডিসার্ভ করে না!'
— 'কষ্ট?আমি কষ্ট কেন পাব রবিদা?ওই অমানুষটার জন্য?আমি তো বরং আনন্দ পেয়েছি যে কালসাপটার আসল চেহারাটা ধরা পড়ে গেছে আমার সামনে।হ্যাঁ তবে এটা ঠিক যে একসময় যাকে ভালোবেসেছিলাম সবটা দিয়ে,তার আসল চেহারাটা যখন বেরিয়ে এসেছিল,তখন সত্যিই প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছিলাম,চারিদিকে অন্ধকার দেখছিলাম,মনে হচ্ছিল এ পৃথিবীর বুকে কেউ নেই আমার!'
— 'ছি সাগর এইভাবে কেউ ভাবে?তোর মামা-মামীমা আছেন তো তোর পাশে,ওঁরা থাকতেই কেন একা ভাববি তুই নিজেকে?'
— 'মামা,মামীমা?' একগাল হেসে সাগরিকা বলল,'ওঁরা আমায় ঘাড় থেকে নামাতে পারলে বাঁচেন!'
— 'মানে?'
— 'রবিদা,আমি ওঁদের কাছে একটা বোঝা ছাড়া আর কিছুই নই গো।ওঁরা আমাকে বিয়ে দিয়ে বিদেয় করতে চান যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।মামার একটা মেয়ে আছে,ও এখন স্কুলে পড়ে ক্লাস ইলেভেনে।সবসময় মামীমা আমায় খোঁটা দেয়,'আর কতদিন পড়বি রে তুই?তোর খরচা চালাতে চালাতে তো দেখছি আমার মেয়েটার জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট রাখতে পারব না!'
0 মন্তব্যসমূহ