বিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
রবি সাগরিকাকে বুকে টেনে নিল,সাগরিকা বলে যেতে লাগল,'তারপর ওরা কলেজ অথরিটির কাছে সবটা স্বীকার করে নিল,সেই সিসিটিভি ভাইরাল হয়ে গেল,সবাই সত্যিটা জানল,কিন্তু আমার আরও একটা ইচ্ছা ছিল,কিন্তু রাজনীতির ধামাধরা প্রিন্সিপালের বদান্যতায় আমার সেই ইচ্ছা অপূর্ণই রয়ে গেল।'
— 'কি ইচ্ছা?'
— 'আমি ওদের আসল অপরাধীর নামটাও ফাঁস করতে বলেছিলাম কলেজ অথরিটির কাছে,আর আমার বিশ্বাস ওরা স্বীকার করেওছিল যে অভ্রই এসবকিছুর পেছনে আছে,কিন্তু ওই যে,হাওয়ায় যে কথাটা ওড়ে,যে অভ্রর বাবার সাথে প্রিন্সিপাল স্যারের একদম মাখামাখি সম্পর্ক,তাইজন্যই প্রিন্সিপাল ভিডিওর ওই অংশটা,যেখানে অভ্রর নাম আছে,সেই অংশটা ডিলিট করেছেন।নইলে আজ অভ্র গরাদের ওপারে থাকত!'
— 'তাতে লাভ কিন্তু কিছু হত না সাগর,শয়তানটা বাবার ক্ষমতাবলে ঠিক বেরিয়ে আসত জেল থেকে!আর বেরিয়ে এসেই মেনকাদের সাথে যে কি করত কে জানে?হয়ত খুনও করে ফেলতে পারত ওদের!'
— 'রবি,আমি কেন এত শ্রদ্ধা করি তোমায় জানো?যারা তোমার নামে এত বদনাম দিল,তোমার কেরিয়ার শেষ করে দিতে চেয়েছিল,তাদের খুন করা হবে কিনা সেটা নিয়েও তুমি ভাবো!'
— 'না রে সাগর,ওরা সবাই অমানুষ হতে পারে,আমি তো নই বল?বদনাম যতই করুক,যতই কলঙ্কিত করুক,ওদের মতো পশু তো হতে পারব না বল্!'
— 'হ্যাঁ রবি,এটা তুমি ঠিক বলেছ।তবে তুমি যদি ভেবে থাকো অভ্র ওদের খুন করতে চায়নি তাহলে তুমি ভুল ভাবছ!ভিডিওটা ভাইরাল হওয়ার পরেই মেনকা,লাবণ্যদি,শর্বরীদি,টিয়া,মুস্কানদি এদের সবাইকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল।'
— 'কি বলছিস রে?'
— 'হ্যাঁ গো আমি ঠিক বলছি।আমি অভ্রর সামনে এমন অভিনয় করি সবসময়,যেন আমি প্রচন্ড ঘৃণা করি তোমায়,তোমার নামটা পর্যন্ত শুনতে চাই না আমি!আর ওকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত বিশ্বাস করি।তো ভিডিওটা ভাইরাল হওয়ার পর আমি তো ওর সামনে এমন একটা ভাবমূর্তি ধারণ করলাম যেন আমি প্রচন্ড বীতশ্রদ্ধ হয়েছি তোমার প্রতি!অভ্রকে জড়িয়ে ধরে বললাম,'দেখেছ কি জানোয়ার রবি মিত্র!একে তো ওদের সাথে এত অন্যায় করেছে,তার ওপর ওদের এমন ভয় দেখিয়েছে যে ওরা মিথ্যে কথা বলল কলেজ অথরিটির কাছে!' তার উত্তরে অভ্র বলল,'তুই মেনকা-লাবণ্যর মতো পাবলিকগুলোকে চিনিস না রিকা,আমি তো চিনি,ওরা কাউকে ভয়টয় পাওয়ার মহিলা নয় রে,রবি নিশ্চয়ই ওদের মোটা টাকা ঘুষ দিয়েছে!' আমি কপট ঘৃণার সুরে বললাম,'ঘুষ দিয়েছে?রবিদা এতো নীচ?' অভ্র বলল,'রবির চেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে আমার লাবণ্যদের ওপর।এতদিন ধরে এতকিছু করলাম সবাই ওদের জন্য,আন্দোলন,অবরোধ,প্রতিবাদ!আর ওরা টাকা পেয়েই এভাবে ঘুরে গেল!আমার ইচ্ছে করছে খুন করে মাটিতে পুঁতে দিই ওদের!'
— 'তাই?তুই কি বললি তারপর?'
— 'বলছি তো,শোনোই না।আমি অভ্রকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম,'শোনোনা অভ্র,আমার এক ইচ্ছা আছে,রাখবে গো ডার্লিং?' অভ্র বলল,'রিকা অভ্রর কাছে কিছু চাইবে,আর সেটা অভ্রদীপ শিকদার দেবে না,তাই কি হয় বলো?তুমি শুধু বলো যে কি চাই তোমার?' আমি বললাম,'আজ শুধু মেনকাদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই রবি মিত্রর মতো একটা রেপিস্ট আবার কলেজে আসবে,আবার অনেক মেয়ের সাথে অসভ্যতা করবে,এর জন্য তো মেনকাদের কিছু শাস্তি প্রাপ্য তাই না সোনা?' অভ্র দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলল,'ঠিক বলেছিস রিকা!তুই কি শাস্তি চাস ওদের বল!একদম সরিয়ে দেব দুনিয়া থেকে?নাকি গুম করে রাখব আমার হেফাজতে?তুই যেটা বলবি সেটাই হবে!' আমি তখন দুশ্চিন্তার ভান করে অভ্রর গালে হাত দিয়ে বললাম,'না ডার্লিং,ওসব কিছুই তুমি করবে না!আমি চাইনা ওই রাস্তার মেয়েগুলোর জন্য তুমি ফেঁসে যাও ডিয়ার!তার চেয়ে এক কাজ করো,একটা আননোন নাম্বার থেকে তুমি ওদের ফোন করে হুমকি দাও,যাতে ওরা এই শহর থেকে অনেক দূরে চলে যায়,লাবণ্যদি-টিয়ারা যেন কলেজে ওদের পোড়া মুখ আর না দেখায়,আমি ওদের মুখ আর দেখতে চাই না!' অভ্র বলল,'বেশ রিকা,তাই হবে!আমি ওদের ফোনে এমন হুমকি দেব,যে প্রাণভয়ে সুড়সুড় করে কেটে পড়বে মালগুলো!' আর জানো রবি,এরপরেই হল আসল মজা!'
— 'কি মজা রে সাগর?শুনি শুনি?'
— 'উঁহু,মোটেই বলব না!এসব এমনিতে শোনা যায় না,তার জন্য ঘুষ দিতে হয় বুঝলে?ঘুষ ফেলো,গল্প শোনো!'
— 'আচ্ছা,একটু আগে যে ট্যাক্স দিলাম ওটাই দেব তো ঘুষ হিসেবে?'
— 'মোটেই না!তুমি কি জানো আমরা যেখানে হাঁটছি,এখানে ইয়ামি ঘুগনি পাওয়া যায়,এই শহরের মধ্যে অন্যতম নামকরা ঘুগনি বলতে পারো,আগে খাওয়াও,তারপর বাকি গল্পের ঝাঁপি খুলব,ব্যস!'
— 'আচ্ছা বেশ,শুধু ঘুগনি কেন,আমার হবু বৌয়ের জন্য ঝালমুড়িও নিয়ে আসি,তুই তো ঝালমুড়ি খেতেও বড্ড ভালোবাসিস!'
— 'ওমা,কি মজা!'
এরপর ঝালমুড়ি আর ঘুগনি খেতে খেতে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল ওরা,আর চাপা স্বরে কথা বলতে লাগল,যাতে সেই কথা রাস্তার কারোর কানে না যায়।বলা তো যায় না কোথায় কে ঘাপটি মেরে আছে!ওরা যখন দেখা করে,বোরখা পরে দুজনেই,আর মুখ ঢেকে রাখে,যাতে কেউ চিনতে না পারে তাদের।বাইরে থেকে দেখে মনে হয়,পাশাপাশি দুজন নারী হেঁটে চলেছে।এই বুদ্ধিটা ওরা পেয়েছে হেনার কাছ থেকে।হেনার সাথেও ওদের যোগাযোগ আছে গোপনে,হেনা আপাতত শহরের বাইরে আছে গোপন আস্তানায়,যাতে অভ্র বা ওর চ্যালা চামুণ্ডারা ওকে খুঁজে না পায়।রবি যখন টিউশন পড়াতে যায়,তখন স্টুডেন্টের বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বোরখা পরে নেয়,আর সাগরিকার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারে তাকে ঝুমকো যথেষ্ট সহায়তা করে।
0 মন্তব্যসমূহ