ঊনবিংশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'সাগর এইভাবে কেউ বলে?আর কে বলেছে তোর মা বাবা নেই?আমার মা বাবা তো আছে রে,ওরাই তোরও মা-বাবা।আমি একদিন মা-বাবার কাছে তোকে নিয়ে যাব,আলাপ করিয়ে দেব ওদের সাথে,দেখিস ওরা তোকে নিজের সন্তানের মতোই কাছে টেনে নেবে।'
— 'অবশ্যই আলাপ করিয়ে দিও রবিদা।'সাগরিকা বলল,'তোমাকে এভাবে মুখ কালো করে কলেজ থেকে ফিরতে আমি আর দেব না,এর একটা বিহিত তো আমায় করতেই হবে!'
এরপর কেটে গেল বেশ কয়েকটা দিন।রবি আবার স্বাভাবিকভাবেই কলেজ যাচ্ছে,প্রিন্সিপাল নিজেই তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন,তারপর কলেজে ক্লাস করতে অ্যালাও ও করেছেন তিনি।আসলে একটা ভিডিও কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রী সবার মোবাইল-ল্যাপটপে ঘুরছে,ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে মেনকা,লাবণ্য,শর্বরী আর মুস্কান,যারা রবির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল,তারা এসে প্রিন্সিপালের কাছে স্বীকার করছে,সবটা মিথ্যা।রবি সম্পূর্ণ নির্দোষ,ওরা শুধুমাত্র টাকার লোভে রবিকে ফাঁসিয়েছে।ওদের এই সব কথাগুলো সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে,আর এই ভিডিওটাই সবার হাতে হাতে ঘুরছে।কিন্তু একটা প্রশ্ন সবার মনে আছে,যে মেনকাদের টাকার লোভটা কে দেখিয়েছিল?আর হেনার নিখোঁজ হওয়ার কারণটাই বা কি?কে মেইন কালপ্রিট?
অন্যদিকে সাগরিকা অভ্রর সাথে প্রেমের অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছে পুরোদমে,তাকে একবারের জন্যও জানতে দেয়নি যে অভ্রর আসল চেহারা তার কাছে ফাঁস হয়ে গেছে।আর গোপনে প্রায়ই সাগর আর রবি দেখা করে,সকলের অজান্তে রবির প্রেমের আলোয় মাখামাখি হয়ে লজ্জায় রাঙা হয়ে যায় সাগর,তার মনে প্রেমিক পুরুষের প্রতি পরম ভালোবাসার ঢেউ ওঠে,সেই ঢেউ গায়ে মেখে মনের সমস্ত ব্যথার উপশম হয় রবির,নতুন করে লড়াইয়ের শক্তি পায় সে।
— 'আচ্ছা সাগর,এই অসম্ভবটা সম্ভব করলি কিভাবে?মেনকা,লাবণ্যরা এক মুহূর্তে এসে সব কথা স্বীকার করল প্রিন্সিপালের কাছে?'
— 'উঁহু,এমনি এমনি তো বলব না,ট্যাক্স দাও আগে,তারপর বলব!'
— 'আচ্ছা বেশ!' বলেই সাগরিকার কপালে চুম্বন এঁকে দিল রবি পরম আদরে।
— 'এই তো,এইবার আমি সবটা বলব,শোনো।আসলে কি জানো রবি,মেনকা লাবণ্যরা কাউকে ভালোবেসে তার কাছে যায় না,যায় টাকার কাছে,ক্ষমতার কাছে।সেটা আমার খুব ভালোভাবেই জানা ছিল,আর সেইজন্যই ওদের টাকা-ক্ষমতার ওপর উইকনেসটাকেই দাবার ঘুটি বানিয়ে কিস্তিমাত দিলাম!' বলেই হাসল সাগরিকা।
— 'কিরকম?'
— 'জানো রবি,মামা মামীমা হয়তো আমায় শুধু বার্ডেন ভাবে,কিন্তু ওদের মেয়ে ঝুমকো ভীষণ ভালোবাসে আমায়,সবসময় আমার পাশে থাকে।এই ব্যাপারে ভীষণ সাপোর্ট পেয়েছি ওর।ওকে দিয়েই একটা নাম্বারে কল করালাম প্রথমে মেনকাকে,তারপর একে একে লাবণ্য,মুস্কান আর শর্বরীকে,শেষে আমার অন্যতম প্রিয় বান্ধবী টিয়াকে,সবাই যে টাকার জন্য অনেক নীচে নামতে পারে!ওর গলা কেউ চেনে না,তাই ও ই কথা বলল আমার শেখানো অনুযায়ী।দশ লাখ টাকার লোভ দেখালাম প্রত্যেককে।'
— 'উরিব্বাস!এ তো বিশাল ব্যাপার রে!তা পাঁচজনকে দশ লাখ,পঞ্চাশ লাখ টাকা পেলি কোথায় রে!চুরি ডাকাতি করলি নাকি?'
— 'রবি,আবার ঠাট্টা করছ?আমি আর কিছুই বলব না যাও!তোমার সাথে আড়ি!'
— 'এমা সরি সরি সাগর,সরি রে!আমি আর তোকে রাগাবো না,কথা দিলাম!'
— 'ধুস,আমি আর কিচ্ছু বলব না বলব না বলব না ব্যাস!'
— 'আচ্ছা আমি সরি বললাম তো সাগর,এখনো রাগ পড়ল না?আচ্ছা বেশ আমি এই কান মলছি....'
— 'থাক থাক ঢের হয়েছে,আর কান ধরতে হবে না,দুষ্টু কোথাকার!শোনো এবার!'
— 'হ্যাঁ বলো গো আমার দেবী চৌধুরাণী!'
— এক নম্বরের শয়তান একটা!' সাগর রবির গালদুটো টিপে দিয়ে বলল,'যদিও নিজের মুখে নিজের প্রশংসা করতে নেই,তাও বলি,আমি ভিডিও এডিটিং টা দারুণ করতে পারি সেটা তো তুমি জানোই,সেটাকেই প্রথমে কাজে লাগালাম।শুধুমাত্র মুখের কথায় যে ধূর্ত শেয়ালগুলো বিশ্বাস করবে না তা আমি জানতাম,তাই ওদের প্রত্যেককে একটা ভিডিও সেন্ড করলাম একটা নম্বর থেকে,যে নম্বরটা শুধু তোমার আর ঝুমকোর কাছে ছাড়া আর কারোর কাছে নেই,যেখানে দেখা যাচ্ছে,সন্ধ্যে বা রাতের বেলায় কালো পোশাক পরা এক মেয়ে একটা আমগাছের তলায় দাঁড়িয়ে একটা বাক্স খুলছে,আর সেই বাক্সটা খোলার পর দেখা যাচ্ছে,সেই বাক্সে রাশি রাশি দু হাজার টাকার নোট।আর সেই ভিডিওটা ওদের সবাইকে সেন্ড করে লিখলাম,এই বাক্সে পঞ্চাশ লাখ টাকা আছে,এই টাকাটা ওদের পাঁচজনকে দেব,আর ভিডিওতে যে জায়গাটা দেখা যাচ্ছে সেই জায়গার ঠিকানা ওদের দিলাম,তারপর প্রত্যেককে আলাদা মেসেজে বললাম,'আগে রবি মিত্রর বিরুদ্ধে যা যা অন্যায় রটিয়েছেন আপনি সেগুলো কলেজ অথরিটির কাছে গিয়ে স্বীকার করুন,রবি মিত্রকে কলেজে আবার ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন,রবি মিত্র যেদিন আবার কলেজে ফিরে যেতে পারবে নির্বিঘ্নে,তাকে কেউ রেপিস্ট বলে দাগিয়ে দেবে না,সেদিনই আপনারা প্রত্যেকে দশ লাখ টাকা করে পাবেন।তবে আপাতত প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে দশ হাজার টাকা ট্রান্সফার করে দেওয়া হবে আগামীকাল।' এই মেসেজটা করার পর পরের দিনই প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে দশ হাজার টাকা ট্রান্সফার করেছিলাম আমি,নইলে ওরা বিশ্বাস করত না বিষয়টা।'
— 'তার মানে পঞ্চাশ হাজার টাকা তুই ওদের দিয়ে দিলি শুধুমাত্র আমার জন্য?'
— 'কি যে বলো রবি,' রবির গালে চুম্বন করে সাগরিকা বলল,'তোমার জন্য এটুকু যে করতেই হত রবি।তোমার মতো এমন একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট কলেজে না এসে ঘরে বসে থাকবে,এটা আমার পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব।'
0 মন্তব্যসমূহ