চতুর্থ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
অনিচ্ছাসত্ত্বেও অভ্রর সাথে কলেজ গেল রবি।পরীক্ষায় কিছুতেই মন বসছে না তার,একরকম অন্যমনস্ক হয়েই পরীক্ষাটা কোনোরকমে শেষ করল সে,তারপর তাড়াতাড়ি খাতা জমা দিল সে জি.পি স্যারকে।
— 'আজকের টেস্টের কোশ্চেন একটু টাফ করেছিলাম,তোমার এত তাড়াতাড়ি কমপ্লিট হয়ে গেল?বাহ!'
রবি কিছু বলল না,শুধু একটু হাসল স্যারের কথায়,বলল 'আমি এখন আসব স্যার?'
— 'নিশ্চয়ই এসো।'
রবি ক্লাসের বাইরে গিয়ে অভ্রর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল,কিন্তু মিনিটের পর মিনিট কাটে,অভ্র আর আসে না।প্রায় আধঘন্টা পর অভ্র এল।
— 'এসেছিস অভ্র?চল আর দেরি নয় একদম!'
— 'হ্যাঁ চল রে।'
— 'উফ কি করে এত তাড়াতাড়ি কমপ্লিট করলি তুই আজ?আমার তো লিখে লিখে হাত ব্যথা হয়ে গেল!কি কোশ্চেনই করেছিলেন আজ স্যার উফ!'
— 'আমি সব কোশ্চেন অ্যাটেম্ট্ করিনি।'
— 'সে কি রে?'
— 'হ্যাঁ রে আমি পরীক্ষা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম না আজ,হেনাদির জন্য টেন্সড ছিলাম খুব।'
— 'বুঝেছি রে আমি,এখন চল।'
কলেজ থেকে একটা বাস ধরল ওরা,তারপর অটো।অটো থেকে নেমে বেশ কিছুটা হেঁটে ওরা পৌঁছল সেই বস্তিতে,যেখানে হেনার বাড়ি।কিন্তু হেনার বাড়ি গিয়ে তারা দেখে বাড়িতে বাইরে থেকে তালাবন্ধ।
— 'এ কি তালাবন্ধ কেন?হেনাদি কোথায়?'
— 'আমিও তো সেটাই ভাবছি রে রবি!হেনাদি কোথায়?'
— 'কাকে খুঁজছ তোমরা ছোকরা?হেনাকে?' একজন বয়স্ক মহিলার কন্ঠ শুনে পিছনে তাকাল ওরা।
— 'হ্যাঁ,আপনি চেনেন হেনাদিকে?কোথায় উনি?'
— 'হ্যাঁ আমি তো ওই যে সামনে বাড়িটা দেখছ,ওটায় থাকি।হেনা আমার বাড়িতে আসত মাঝে মাঝে, আমিও আসতাম ওর বাড়ি।কিন্তু কাল হঠাৎ রাতে ও আমার বাড়ি এল!'
— 'কাল রাতে?কখন?'
— 'অত সময় তো জানিনা বাপু!ওই হবে সাড়ে ন'টা দশটা!আসল কথাটা শোনোনা বাপু!'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ বলুন!'
— 'ও আমার বাড়িতে এল কাল রাতে,সে ওকে চোখে দেখা যায়না এমন দশা হয়েছিল ওর!গোটা গায়ে কাটাছেঁড়া,শাড়িতে পর্যন্ত রক্তের দাগ!আমি কিছু বলার আগেই ও বলল, 'মাসি,আমার এখানে থাকা জন্মের মতো ঘুচল গো,আমি চলে যাচ্ছি এখান থেকে!'
— 'কি বলছেন টা কি আপনি?হেনাদি চলে গেছে এখান থেকে?কোথায় গেছে?আর কেনই বা গেছে?'
— 'আহ বড্ড পোশ্ন তোমাদের ছোকরা!আগে তো কথাটা শোনো পুরোটা!'
— 'আচ্ছা আচ্ছা বলুন!'
— 'ওর বরটা একটা পাষণ্ড জানো তো!হেনা যখন পোয়াতি,তখনই ওকে রেখে অন্য এক মেয়েমানুষকে বিয়ে করে ভেগেছিল,সেই থেকে আমিই হেনাকে আগলে রেখেছি!মেয়েটার চোখে মুখে বড় মায়া,আর তেমনই মিষ্টি ব্যবহার!ওর বছর দশেকের মেয়ে রাণীটাও একদম ওরই মতো হয়েছে,বাপের ধারা পায়নি একদমই!'
— 'হ্যাঁ এগুলো হেনাদির কাছে আমরা শুনেছি,' রবি বলল, 'হেনাদি পার্বতীমাসি বলে একজনের কথা খুব বলত,বলত পার্বতীমাসি আমার আর একটা মা।'
— 'হ্যাঁ গো ছোকরা,আমিই সেই পার্বতী।তো কাল এসে হেনা বলল,রাণীর বাপ নাকি তার এই দশা করেছে!'
— 'মানে হেনাদির বর?কিন্তু সে তো দ্বিতীয় বিয়ে করার পর আর হেনাদি বা রাণী কারোরই খোঁজ রাখে না জানতাম!'
— 'আমিও তাই জানতাম!কিন্তু কাল নাকি হঠাৎ ফেরার পথে ওর সেই বরটা ওর রাস্তা আটকেছিল,বলল,তার এখনকার বউ নাকি তাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেছে,তাই হেনার কাছেই ফিরতে চায় সে এখন,তা হেনা সেকথা মানবে কেন?দিয়েছে ওই পাষণ্ডটার গালে কষিয়ে এক চড়!তখনই নাকি ওর বর কোন্ এক পোড়ো বাড়িতে ওকে টেনে নিয়ে গিয়ে পশুর মতো মেরেছে ওকে!বলেছে ও না ফিরে এলে নাকি রাণীকে তুলে নিয়ে যাবে!শুধু ভাবো কি বেইমান!'
— 'সে কি!কাল রাতের মধ্যে এতকিছু হয়ে গেল!' রবি অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল পার্বতীর দিকে।
— 'হ্যাঁ গো নয়ত আর বলছি কি!তাই তো হেনা মেয়েকে নিয়ে এখান থেকে চলে গেছে আজই!বলেছে এখানে থাকলে মেয়েকে সে বাপের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না!আমি বললাম বেশ ত আমিও যাই তবে তোদের সাথে!সে আমায় সাথে নিল না,বলল, 'মাসি তোমার বয়েস হয়েছে,এই বুড়োবয়সে আর বিপদে ফেলতে চাইনা তোমায়!' তারপর বলল, 'রাতে আর রাস্তায় বেরুব না,দুটো মেয়েমানুষ দেখলে ছিঁড়ে খাবার শেয়ালের তো অভাব নেই,তাই কাল সকালেই এ তল্লাট ছেড়ে জীবনের মতো চলে যাব!' বলে আজ সকালেই চলে গেল বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে,কোথায় যাবে কি করবে কিচ্ছুটি আমায় বলে গেল না!আবার এও বলে গেল আমি যেন পুলিশে খবর না দিই,তাহলে নাকি আরও বিপদে পড়তে হবে ওকে!'
— 'এখন কি হবে তাহলে?হেনাদির সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে না?কেমন আছে সেটাও জানতে পারব না?' রবি বলল।
— 'সেটাই তো রবি!আবার কোনো ঠিকানাও দিয়ে যায়নি,পুলিশে খবর দিতেও বারণ করেছে!'
— 'আমি আর কিচ্ছু বুঝতে পারছি না রে অভ্র!সবকিছু ঘুলিয়ে যাচ্ছে কেমন!'
— 'হেনাদি তো আবার এমাসের মাইনেটাও নিয়ে গেল না রে রবি!'
— 'যদি ওই পাষণ্ডটাকে পেতাম না,যার জন্য একজন মানুষকে এতটা অসহায় হয়ে নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হল,আমি তাকে ছাড়তামই না,' রবির চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল,'জেলে পচিয়ে মারতাম!'
কেটে গেল সপ্তাহখানেক।হেনার যে ফোন নম্বরটা ছিল রবির কাছে,ওটায় বারবার ফোন করেছে রবি,কিন্তু বারবারই সুইচ অফ পেয়েছে।পরে একদিন ও একাই গিয়েছিল বস্তিতে,যদি হেনা ফিরে এসে থাকে,বা পার্বতীকেও কিছু জানিয়ে গিয়ে থাকে,কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছে সে!শহরের বুক থেকে হেনা আর রাণী যেন চিরকলের মতোই হারিয়ে গেছে!
0 মন্তব্যসমূহ