Advertisement

এনকাউন্টার (সপ্তম পর্ব)

এনকাউন্টার 
সপ্তম পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 
 

একটু পরেই শুরু হল নবীনবরণের অনুষ্ঠান।একে একে প্রত্যেক জুনিয়রকে মঞ্চে ডাকা হল,তারপর তাদের নাম,কোথায় বাড়ি,প্রিয় গান,হবি এসব জিজ্ঞেস করা হল।
সাগরিকার পালা এল যখন,রবি অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইল মঞ্চের দিকে।সাগরিকার পুরো নাম সাগরিকা মজুমদার,বাড়ি বেহালায়,প্রিয় গান রবিঠাকুরের 'ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে,' আর হবি হল গল্পের বই পড়া।হবি শুনে রবি অবাক,তার হবিও যে একই,গল্পের বই পড়া!নাম-ঠিকানা-হবি জানার পালা শেষ হওয়ার পর শুরু হল জুনিয়রদের সমবেত কন্ঠে উদ্বোধনী সঙ্গীত।এরপর রবিদেরই যে দুজন ক্লাসমেট শ্রেয়সী আর তন্ময় উপস্থাপনা করছিল,তারা ঘোষণা করল, 'এবার একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে সবার জন্য,রেডি তো সবাই?'

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________

 সবাই সমবেত কন্ঠে জবাব দিল,'হ্যাঁ।'
 এরপর ওরা ডাকল অভ্রকে।অভ্র স্টেজের দিকে যাওয়ার আগে রবিকে বলে গেল,'বলেছিলাম না সারপ্রাইজ দেব তোকে আজ!বি রেডি!' বলেই মঞ্চে চলে গেল অভ্র।সে স্টেজে ওঠার পরেই তার হাতে দেওয়া হল গোলাপের তোড়া।এরপর ডাকা হল সাগরিকাকে।সাগরিকাকে ডাকায় রবি বেশ অবাক হল।
  এরপর শ্রেয়সী বলল, 'আমাদের কলেজের এই ছেলেমেয়েদুটো বহুদিন ধরেই একে অপরকে ভালোবাসে,কিন্তু কেউই প্রকাশ করতে পারেনি একে অপরের কাছে,কিন্তু আমরা থাকতে সেটা কি সম্ভব?আমরা কি এই কাপলটাকে মিলিয়ে দিতে পারিনা গাইস?'
 সমবেত কন্ঠে উত্তর এল, 'পারি!'

— 'সো অভ্র,আর দেরি কেন?এইবার প্রোপোজ হয়ে যাক হিরোর স্টাইলে!' তন্ময় বলল।

_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra's Gaming

_________________________


— 'একদম একদম!আমরা যে আর ওয়েট করতে পারছি না!' সমবেত কন্ঠে উত্তর এল অডিয়েন্স থেকে।
 অভ্র হাঁটু গেড়ে বসল সাগরিকার সামনে,তারপর গোলাপের তোড়াটা সাগরিকার দিকে বাড়িয়ে বলল, 'আই লাভ ইউ রিকা,লাভ ইউ সো মাচ!'
 লাজুক হেসে তোড়াটা নিয়ে সাগরিকা বলল, 'আই লাভ ইউ টু!' 
 গোটা অডিয়েন্স হাততালি দিয়ে উঠল,কেউ কেউ শিস দিল।এত আওয়াজে একটা সরল সাধাসিধে ছেলের মন ভাঙার করুণ আর্তনাদ ডুবে গেল।চোখভরা জল,আর ভাঙা মন নিয়ে চুপিসারে রবি যে কখন হল ছেড়ে বেরিয়ে গেল,সেটা কেউ খেয়াল করল না।
 রবি হাঁটতে লাগল শহরের আলো ঝলমলে রাস্তা দিয়ে।না হোস্টেলের পথ ধরল না সে,ধরল অন্য এক রাস্তা,যে রাস্তা দিয়ে অনেকটা হাঁটলে নদী পড়ে।চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল টপটপ করে,কিন্তু ব্যস্ত রাস্তার পথচলতি কোনো মানুষ তা লক্ষ করল না।বারবার তার মনে পড়ছিল সাগরিকার লাজুক হেসে অভ্রকে 'আই লাভ ইউ টু' বলাটা,মনে পড়ছিল শ্রেয়সীর সেই কথাটা,সাগরিকা আর অভ্র একে অপরকে ভালোবেসেও প্রকাশ করতে পারেনি এতদিন!মনে পড়ছিল অভ্রর রবিকে সারপ্রাইজ দেওয়ার কথাটাও,এটাই কি তবে সেই সারপ্রাইজ?সারপ্রাইজ সবসময় আনন্দের হয়না,অনেক সময় বড়ো মর্মান্তিকও হয়,রবি জলজ্যান্ত তার প্রমাণ।
  এতকিছু ভাবতে ভাবতেই একসময় রবি নদীর পাড়ে এসে পৌঁছালো।নদীর পাড়ে এসে মনটা একটু শান্ত হয়েছে রবির,কান্নাও থেমেছে,কিন্তু অসম্ভব শূন্যতা গ্রাস করেছে তাকে।এতদিন ট্রাজিক হিরোর অনেক গল্প-কাহিনী সে বইয়ে পড়েছে,কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে আজ সে নিজেই বাস্তবের ট্রাজিক হিরোতে পরিণত হয়েছে।ভেবেই হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলে রবি।এই মুহূর্তে নিঃসঙ্গ নদীকেই বড়ো বেশি আপন বলে মনে হয় নিঃসঙ্গ সদ্য মন ভাঙা প্রেমিকের।অন্যদিন যে ব্যাগ পিঠে রবি কলেজ যায়,আজও সেই ব্যাগটা নিয়েই ও কলেজ গিয়েছিল,যদিও তাতে পাঠ্যবই-খাতা ছিল না,শুধু একটাই খাতা ছিল,ওই খাতাতেই সাগরিকাকে লেখা প্রেমপত্রটা ছিল।এই প্রেমপত্র অনেকদিন আগে এক নির্জন দুপুরের সৌন্দর্য মনে মেখে লিখেছিল রবি সাগরিকার উদ্দেশ্যে,ভেবেছিল কখনো এক পড়ন্ত বিকেলে যখন আকাশ লাল হয়ে আসবে,সে সময় সে তার প্রিয়তমার হাতে দেবে চিঠিখানা,আর চিঠিটা পেয়েই সাগরিকার গালদুটো রাঙা হয়ে যাবে লজ্জায়,ঠিক পড়ন্ত বেলার সূর্যের মতোই রাঙা,আর সেই দৃশ্য দেখে রবির মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে আসবে, 'সাগর,তুই কোনো সাধারণ মানবী নোস,ঠিক যেন ওই রাঙা আকাশ থেকেই নেমে আসা কোনো ডানাহীন পরী!'
  সাগরের গালদুটো তাতে আরও রাঙা হয়ে আসবে,সে একমুখ হাসি নিয়ে বলবে, 'ধুস রবিদা,কি যে বলো!এই সেদিনই তো বললে,আমি বুঝি সাগর ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা কোনো জলকন্যা,তাহলে আজ আবার আকাশ থেকে নেমে আসা পরী হলাম কিভাবে?'
  রবি তখন প্রেমিকাকে বুকে টেনে নিয়ে বলবে, 'বোকা মেয়ে,প্রেমিককে কেউ দাদা বলে ডাকে?আমায় রবি বলে ডাকবি এখন থেকে!'
   রবির চোখে আবার নোনা জল এল,নদীর এলোমেলো হাওয়াও যেন ওকে নিয়ে ব্যঙ্গ করতে লাগল,বয়ে চলা জলরাশি,গাছের পাখিগুলোও যেন ঠাট্টা করে রবিকে বলতে লাগল, 'তুই এক ব্যর্থ প্রেমিক রবি!'
   রবি তাড়াতাড়ি ব্যাগের ভেতর চিঠিটা খুঁজতে লাগল,কিন্তু হাতে একটা প্যাকেট ঠেকল তার,তাড়াতাড়ি প্যাকেটটা বের করে এনে রবি দেখে একটা সিগারেটের প্যাকেট,অভ্র প্যাকেটটা রবির ব্যাগে রেখেছিল,ভেবেছিল ফেরার সময় তার কাছ থেকে চেয়ে নেবে।রবি হঠাৎই প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল।রবির ব্যাগে দেশলাইয়ের প্যাকেটও ছিল,এটাও অভ্রই রেখেছিল।সিগারেট ধরানোর সময় রবির মনে পড়ছিল,এতদিন অভ্র কতবারই না রবিকে অনুরোধ করেছে সিগারেট খাওয়ার জন্য,কিন্তু রবি কখনোই রাজি হয়নি,অথচ আজ সে নিজে থেকেই!রবি একটু হাসল,তারপরেই সিগারেটটা খেতে গেল ও,কিন্তু বিষম খেয়ে ভীষণ কাশতে লাগল সে।রবি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো,আর তারপরেই হঠাৎ এক হাসির শব্দ শুনতে পেল ও।রবি দেখে,ওর পাশেই এসে বসেছে একজন যুবক,তার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে,তার মুখ থেকে আসছে মাদকের গন্ধ,আর এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট,অন্য হাতে মদের গ্লাস।সে হেসে বলল, 'জানো ছোকরা,এক সময় ছিল যখন আমিও খুউউউব ভালো ছেলে ছিলাম,মদ সিগারেট থেকে শতহস্ত দূরে ছিলাম,তারপর শালা একজন এসে আমাকে ভেঙেচুরে দিল,' বলেই তার অন্য হাতে থাকা মদের গ্লাসটা ছুড়ে দিল মাটিতে,ভেঙে চুরমার হয়ে গেল গ্লাসটা,সে বলল ' ঠিক এই গ্লাসটার মতো!তারপর থেকেই সিগারেট, মদ এসবই আমার বন্ধু হয়েছে!জানো ছোকরা,আজকাল আর আমি কাঁদিনা,আজ শুধু আনন্দ আর আনন্দ!' বলেই সে উঠে পড়ে টলতে টলতে কোথায় যেন চলে গেল।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ