Advertisement

এনকাউন্টার (দ্বাদশ পর্ব)

এনকাউন্টার 
দ্বাদশ পর্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 



স্ক্রিনশটটা দেখে রবির পায়ের তলার মাটি সরে গেল।সে দেখল,ছবিতে বিছানায় সে শুয়ে আছে,চোখ বন্ধ তার,পরনে শার্টটা নেই,আর মেনকা তার খুব কাছাকাছি।রবির চোখের সামনে যেন অন্ধকার ঘনিয়ে এল,যে মেনকাকে সে মায়ের মতো দেখত,সেই মেনকা তাকে এভাবে ফাঁসাল!তার মোবাইল থেকে আসল অডিও,ভিডিও আর ছবিগুলো সরানো যে অভ্রর কাজ তাও বুঝতে বাকি ছিল না রবির।তার মনে পড়ল গতকাল বিকেলে মেনকার দেওয়া জলটা খাওয়ার পরেই মাথা ধরে তার,সারা শরীরও অবশ হয়ে আসে,তারপরের ঘটনা আর কিছুই মনে নেই রবির।মেনকা যে জলে কিছু একটা মিশিয়েছিল সেকথাও স্পষ্ট হয়ে গেল রবির কাছে।ও স্পষ্ট বুঝতে পারল অভ্র মেনকার সাথে হাত মিলিয়ে রবিকে ফাঁসিয়ে নিজের দোষ ঢাকতে চেয়েছে।

_________________________

একটি সনির্বন্ধ অনুরোধ :  পড়ুন

_________________________


রবি ব্যস্ত হয়ে বলল,'বিশ্বাস কর সাগরিকা,এসব মিথ্যে।তুই যা দেখছিস,শুনছিস সবটাই মিথ্যে।একটা গভীর কন্সপিরেসি চলছে যেটা তুই বুঝতে পারছিস না!'

— 'আর কত মিথ্যে বলবে তুমি রবিদা?তোমায় আমি শ্রদ্ধা করতাম,সমাজের আর পাঁচটা মানুষের থেকে তোমাকে আলাদা ভাবতাম,তোমাকে একজন প্রকৃত সৎ,দৃঢ় চরিত্রের মানুষ বলে জানতাম,সেই তুমি কিনা!ছি ছি ছি!'
রবি মাথা নিচু করে,দু চোখ জলে ভরে যায় তার।সাগরিকার চোখের দিকে তাকাতে পারে না ও,যে চোখে এতদিন সে তার প্রতি শ্রদ্ধা দেখেছে আজ সেই দুটো চোখে একরাশ ঘৃণা আর হতাশা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না রবি।গলা বুজে আসে তার।হঠাৎই তার মনে পড়ে হেনাদির তাকে লেখা চিঠিটার কথা।চিঠিটা ওর ব্যাগেই ছিল,তাড়াতাড়ি ব্যাগটা খুলে ও চিঠিটা বের করে,তারপর সাগরিকার হাতে দিয়ে বলে,'এটা পড় সাগরিকা।হেনাদি এই চিঠিটা দিয়েছিল আমায়,হেনাদির মেয়ে রাণী লিখেছিল এটা।'
সাগরিকা চিঠিটা না পড়েই রবিকে ফিরিয়ে দেয়,'আর কত মিথ্যাচার করবে তুমি রবিদা?আর কত?আমার কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে সবটা।যে হেনাদিকে তুমি দিনের পর দিন হুমকি দিয়েছ,তাকে ভয় দেখিয়ে তার মেয়েকে দিয়ে একটা চিঠি লিখিয়ে নেওয়া কি খুব অসম্ভব তোমার পক্ষে?'

_________________________

Subscribe my YouTube channel : Suchandra's Gaming

_________________________

— 'এ তুই কি বলছিস?'

— 'ঠিকই বলছি রবিদা।মেনকা মাসির একটা কথাও যে মিথ্যে নয় তার আরও প্রমাণ আছে আমার কাছে।আমাদের ক্লাসমেট জয়দীপ তোমার রুমমেট।আমি আজ সকালে ওকে মেসেজ করেছিলাম যে সত্যিই কাল রাতে তুমি ড্রিঙ্ক করেছিলে কিনা,ও রিপ্লাইয়ে বলল যে কাল তুমি মদে এতটাই চুর হয়েছিলে যে হাঁটার ক্ষমতা পর্যন্ত ছিল না,চোখ খুলতেই পারছিলে না তুমি,তোমার গা থেকে,মুখ থেকে মদের গন্ধ পেয়েছে ও।অভ্র আর প্রীতমদাই তোমাকে কাল হোস্টেলে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে এটা শুধু জয়দীপ নয়,হোস্টেলের আরও অনেকেই দেখেছে।এরপরও বলবে সব মিথ্যে?তুমি কোনো অন্যায় করোনি?'

— 'সাগরিকা তুই বিশ্বাস কর,আমি অনেক বড়ো একটা চক্রান্তের শিকার।আমার একমাত্র দোষ আমি ভালোমানুষ সেজে ঘুরে বেড়ানো এক জানোয়ারের মুখোশ খুলে দিতে চেয়েছি,আর এই দোষেই আজ আমায় এভাবে ফাঁসানো হয়েছে।'

— 'আর কত্ত ভুলভাল বকবি তুই মাইরি?' লাবণ্য হঠাৎ এসে হাজির সেখানে,'গতকাল তুই অভ্রদের ফ্ল্যাটে যাসনি বলতে চাস?'

— 'হ্যাঁ আমি গিয়েছিলাম তো..'

— 'একদমই তাই,কাল তুই অভ্রর ফ্ল্যাটে গিয়েছিলি,গিয়ে গলা পর্যন্ত ড্রিঙ্ক করলি,তারপর মেনকামাসিকে একরকম জোর করে ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে দরজা আটকে দিলি,সবটা তো আমাদের চোখের সামনেই হল!'

— 'লাবণ্য যাস্ট শাট আপ!' রবি গর্জন করে ওঠে।

— 'ইউ শাট আপ রবি!কাল তুই আমার সাথেও অসভ্যতামি করছিলি,ভুলে গেছিস?'

— 'লাবণ্য আর কত নীচে নামবি তুই?' 

— 'ওহ প্লিজ রবিদা,আমি আর পারছিনা বিশ্বাস করো,যাস্ট পারছিনা!আমায় ক্ষমা করো,প্লিজ আর কোনোদিন আমার সামনে এসো না তুমি,অন্তত এটুকু কোরো আমার জন্য!প্লিজ!' বলেই সাগরিকা একবুক ঘৃণা বিলিয়ে চলে গেল রবির প্রতি।লাবণ্যও বাঁকা হাসি হেসে সরে পড়ল সেখান থেকে।
কলেজের গেট থেকে একবুক শূন্যতা নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগল রবি।কলেজে আজ সে যে উদ্দেশ্যে এসেছিল সেটা তো ব্যর্থ হয়েছেই,উলটে তাকেই মিথ্যে বদনামের জালে জড়ানো হয়েছে সুনিপুণভাবে,আর সবটা করেছে তার ছোটবেলা থেকে সবচেয়ে কাছের বন্ধু অভ্র।এই শহরে এসে থেকেই সে নানাভাবে অপমানিত হয়েছে ক্লাসমেটদের কাছে,এমনকি সাগরকে ভালোবেসেও মন ভেঙেছে তার,কিন্তু আজ যে ঘটনা ঘটল তার সাথে,এটা সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।রবির বড্ড বাড়ির কথা মনে পড়ছে,বাবার সেই মিষ্টি রসিকতা,মায়ের কোলে ঘুমোনো,এই সবকিছু বড্ড প্রয়োজনীয় মনে হয় তার এই মুহূর্তে।
 পরের দিন সকালেই ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি রওনা দেয় সে।বাড়ি গিয়ে অনেকটা মন শান্ত হয় তার।মায়ের হাতের খাবারের স্বাদ পেয়ে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায় রবির,ও স্নিগ্ধ হেসে বলে,'কতদিন এমন সুন্দর খাবার খাইনি গো মা!'
 রবির মায়ের চোখে জল আসে।তিনি রবিকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে বলেন,'তোকে ছেড়ে থাকতে কি যে কষ্ট হয় বাবা,কি বলব।আমি আর তোর বাবা যখন খেতে বসি,মনে হয়,আহা রবি আমার ওখানে হয়ত আধপেটা খেয়ে আছে,হয়ত ঠিক করে জল খাচ্ছে না,হয়ত রাতে ভালোভাবে ঘুমোতে পারছে না,বুকটা ফেটে যায় রে বাবা!'
 রবি মায়ের বুকে মাথা গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়ল।কতদিন তাকে এভাবে আগলে রাখেনি কেউ,স্নেহ করেনি,ভালোবাসেনি।চিন্ময়ীও চোখের জল ধরে রাখতে পারেন না,ছেলের কপালে স্নেহচুম্বন এঁকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরেন তাকে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ