ভিজেছিল কি?
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
একজন পেশেন্ট চলে যেতেই কম্পাউন্ডার প্রসাদ হাঁক দিল, 'অরুণা কে আছেন?'
ডাক শুনেই দিশা উঠে পড়ল, অরুণা ওর কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল জ্বরের ঘোরে, দিশা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে ডাকল, 'বাবু ওঠ!' কোনো রকমে ওকে ডেকে তুলেই দিশা ওর হাত ধরে নিয়ে গেলো ডাক্তারবাবুর চেম্বারে। প্রসাদ ওদের দেখে একটু ভ্রূ কোঁচকালেও মুখে বলল না কিছুই।
- ' ডাক্তারবাবু আসব?'
- ' আসুন।' রাকেশ একটু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, 'ও আপনি! হ্যাঁ বসুন!'
- 'এতো অস্বস্তির কিছু নেই স্যার, আমি ভিক্ষা চাইতে আসিনি, কোনোদিন চাইতে হবে সেই দুরাশাও রাখিনে, শুধু আমার বাবুটাকে ভালো করে দিন, আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো আমি।'
- ' না না আমি অস্বস্তিতে কেন পড়ব?'
- ' সে মুখে আপনি যাই বলুন স্যার, আপনাদের সমাজের ভাষায় আমি হিজড়ে, থার্ড জেন্ডার, আমাকে সো কল্ড সুস্থ মানুষেরা এড়িয়ে চলে, ভাবে এই বুঝি আমি তাদের ওপর হামলে পড়ব 'টাকা দে' বলে! তবে স্যার, আমি সেরকমটা করব না, ভয় পাবেন না! আমি একটা স্কুলে পড়াই,
এই বাবুর মতো ছেলেমেয়েদের আর কি, যারা ওই আমাদেরই মতো। জানেন স্যার, এই ৯ বছরের বাচ্চাটার আসল নাম অরুণ, কিন্তু একটু বয়স বাড়তেই বাড়ির লোকেরা বুঝল, সাধ করে যার নাম রেখেছে অরুণ সে আসলে অরুণা হতে চায়, ব্যস! রাতের অন্ধকারে রেখে গেলো রাস্তায়, বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাধালো ছেলেটা, স্কুলফেরত আমি ওকে নিয়ে এলাম আমার বাড়িতে, নাম দিলাম অরুণা।'
দিশারা চলে যাওয়ার পর রাকেশ একদৃষ্টে চেয়ে ছিল খোলা দরজাটার দিকে। তার রঙ্গনার কথা বড্ড মনে পড়ছিল। প্রথম সন্তান মেয়ে হওয়ায় কি খুশিটাই হয়েছিল সকলে, ভালোবেসে নাম রাখা হয়েছিল রঙ্গনা। কিন্তু বয়স বাড়তেই দেখা গেল, সে আসলে রঙ্গন হতে চায়! কি বকাবকিটাই করেছিল সেদিন রাকেশ তাকে, গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা বোধ করেনি! পরেরদিন সকালেই ঘর থেকে পাওয়া গেল তার মৃতদেহ, যে জীবন চলচ্চিত্রে নায়ক হতে চেয়েছিল, নায়িকা নয়, কিন্তু পোড়া সমাজ তাকে ভিলেন বানিয়ে ছেড়েছিল, ঠিক অরুণের মতো।
বাইরে বৃষ্টিটা আবার নামলো অঝোর ধারায়, চারিদিক ভিজে গেল। সাথে রাকেশের গালদুটোও ভিজেছিল কি?
2 মন্তব্যসমূহ
দারুন 💐💐💐
উত্তরমুছুনJust Asadharon
উত্তরমুছুন