শিকল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চারিদিকে খেলছে সানাইয়ের সুর,
লাল-নীল টুনির আলোয় রঙের দৌরাত্ম্য,
ঝলমলে পোশাকে বাচ্চাগুলো ছোঁয়াছুঁয়ি খেলে বেড়াচ্ছে আনমনে,
কত বিবাহিত এয়রা এসেছে,
কেউ কচিমেয়ে,কারোর তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে,
সিঁথি রাঙিয়েছে ওরা ভরাট করে,
ঠিক যেন জোয়ারের সময়কার নদী,
শাঁখা পলা হাতে,পরিপাটি চকচকে শাড়ি,
আলো ঠিকরোয় শাড়ি থেকে,
তাকানো যায় না,চোখ ব্যথা করে,
'এত ভারী শাড়ি পরে যে ঘুরে বেড়াও,কষ্ট হয়না?'আশ্চর্য সুরে জিজ্ঞাসা করে মোহনা।
'ধুর পাগলীটা,সংসারের বোঝা বইলাম এতকাল,এ শাড়ি কি তার চেয়েও ভারী?'হাসতে থাকে এয়রা।
মনের যাবতীয় বিষাদ আনন্দে ঢাকার চেষ্টাটা কেমন যেন শাক দিয়ে মাছ ঢাকা মনে হয় মোহনার,
ও চুপ করে বসে থাকে আপনমনে,
হঠাৎ তাড়া আসে ঘরের ভেতরের মহিলামহল থেকে,
বিকেল পড়ে এল,সন্ধ্যে এবার ঝুপ করে নামবে,
এবেলা কনেকে না সাজালে আর সাজানো যাবে কখন?
আনমনা মোহনাকে টেনে আনা হল আয়নার সামনে,
গয়নায় ছেয়ে গেল গলা,হাত,পা,কোমর,
ভারী শাড়ি নেমে এল অঙ্গে,
কপালে উঠল চন্দন,তারপর লাল টিপ,
'কই দেখি,কেমন দেখায় আমার মিষ্টি ননদকে?'গাল টিপে রসিকতা করল মোহনার বৌদি।
— 'চিড়িয়াখানার পাখিদের দেখেছ বৌদি?'
— 'হঠাৎ চিড়িয়াখানার কথা কেন ননদিনী?'
— 'ওমা,আমায় দেখছ না?দেখ,গলায় পায়ে হাতে কোমরে কত্ত শেকল!সোনার শেকল!'
— 'ও কি কথা মোহনা?কত কষ্টে তোমার বাবা ওগুলো এনেছেন,জানো?'
— 'হুম জানি বৈকি।আচ্ছা মা,পাত্রপক্ষ যেন কত চেয়েছিল আমায় বহনের খরচ হিসেবে?'
— 'তোর বড্ড বেশি কথা,ওই তো আশিহাজার!জানিস না যেন,কচি খুকি!'
— 'বাবা যেন বকেয়া কত রেখেছে?'
— 'তিরিশ হাজার,বিয়ের পর ওটা ঠিক দিয়ে দেবে তোর বাবা,দরকার হলে টিউশনি আরও বেশি পরাবে।'
— 'আচ্ছা মা,কবে যেন টিউশনির ক্লাসে বাবার কাশির সাথে রক্তবমি হয়েছিল না?'
বর এসে গেল,ধুমধাম করে বরণ করে নিল এয়রা,
মোহনার সিঁথি রাঙিয়ে উঠল,শঙ্খ উলুধ্বনিতে আলোড়িত হল ছাদনাতলা।
রাতে খাওয়ার সময় মোহনা তুলিকাকে প্রশ্ন করল,'সাক্ষী এলনা তো রে?'
— 'পণ দিতে পারেনি,তাই শাশুড়ি স্বামীর হাতে মরেছে হতভাগী!'তুলিকার চোখ লাল হল,'সে যাই হোক,সিঁদুরে তোকে অসাধারণ লাগছে মোহনা!'
— 'হুম,হাঁড়িকাঠে গলা দেওয়ার আগে ছাগলকেও ঠিক এমনি করেই সিঁদুরে রাঙানো হয়,না রে?'
0 মন্তব্যসমূহ