সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
শরীর মনে চরম ব্যথা নিয়ে অতিকষ্টে ট্রেন থেকে নামল অনিমা,
গন্তব্য বাপেরবাড়ি,বাবা মায়ের কাছে এই কঠিন সময়ে আদরের আশ্রয় পাবে,এই তার আশ্বাস,
মা বাবা যদিও বিয়ের পর সেভাবে খোঁজ রাখেন না মেয়ের,
বেশি ফোন করলে বিরক্ত হন,বলেন,বিয়ের পর এত বাপেরবাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখতে নেই,
সংসারটা করো মন দিয়ে,মানিয়ে গুছিয়ে নাও,
তা হোক! তবু তো মা বাবা,জন্ম দিয়েছেন,বড়ো করেছেন এত কষ্টে,
সবটা শুনলে নিশ্চয়ই ফিরিয়ে দেবেন না,নিশ্চয়ই বুকে টেনে নেবেন,
এই আশাটুকু বুকে নিয়ে এগিয়ে চলল সে বাপের বাড়ির পথে,
বাড়ির দরজায় কলিং বেল বাজাল,
মা এসেই দরজা খুললেন, 'আরে অনু মা যে!আয় আয়! জামাই কই! মিষ্টি কিনে আনছে বুঝি?আবার ওসবের কি দরকার....'
— 'দীপ আসেনি মা।আমি একাই এসেছি।'
মায়ের অবাক মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো জবাব না দিয়েই অনিমা চলে গেল ভেতরে,
— 'জামাই কেন এল না?ঝগড়া করে এসেছিস নাকি অলুক্ষুণে মেয়ে?'
মায়ের কথার জবাবে সে একটি কথাও বলল না,
চুপচাপ কাগজটা বের করে বাবার হাতে ধরিয়ে দিল,
একটা প্রেসক্রিপশন সেটা,যাতে স্পষ্ট লেখা আছে,অনিমা ক্যান্সারে আক্রান্ত,
এইবার অনিমা মুখ খোলে, 'দীপ আর তার মা-বাবা আমার উপর চরম বিরক্ত,রাগান্বিত,
এমন অসুস্থ এক বৌয়ের বোঝা তাঁরা বইতে রাজি নন,
উঠতে বসতে তাঁরা শোনাচ্ছেন কড়া নিষ্ঠুর কথা,
বুকের ভেতরটা পর্যন্ত জ্বলে যায় সেসব কথা শুনলে,
তাই এখানে এলাম বাবা,আশ্রয় কি দেবে আমায়?
ডাক্তার যে বলেছেন শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিকভাবেও সুস্থ থাকা প্রয়োজন,
প্রয়োজন এক সুস্থ পরিবেশের,তাই তো এলাম বাবা!'
কিন্তু বাবার মুখে কোনো স্নেহমাখা দুঃখের আভাসমাত্র ফুটে উঠল না,
দীপের মতোই বাবারও চোখে মুখে ফুটে উঠল একরাশ বিরক্তি,
যেন এক অসহনীয় বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর উপর,
তিনি না পারছেন সে বোঝা গিলতে,না পারছেন উপড়াতে,
'আচ্ছা ভেতরে যাও তুমি,নিজের ঘরে বিশ্রাম নাও!' বলে চলে গেলেন বাবা,
মরার উপর খাঁড়ার ঘা কেই সম্বল করে সে মেয়ে ব্যাগপত্র নিয়ে চলে গেল নিজের ঘরে,
'ফোন করো একবার দীপকে,হাজার হোক ওরই তো স্ত্রী!' মা বললেন বাবাকে নিচু গলায়,যাতে মেয়ের কানে কথা না পৌঁছায়,
'আমিও সেটাই ভেবেছি!' গলায় একরাশ বিরক্তি নিয়ে দীপকে ফোন করলেন বাবা,
— 'যতই হোক বাবা,ও তো তোমারই ঘরের বৌ,নিয়ে যাও না তাকে তোমাদেরই ঘরে!'
— 'ক্ষমা করবেন আঙ্কেল,অমন রুগ্ন মেয়েকে সংসারের কোন্ কাজে লাগবে যে ঘরে নিয়ে আসব যত্ন করে?আর আপনি বাবা হয়েই অনিমার ওপর বিরক্ত,তাহলে আমরা কেন অযথা বোঝা বইতে যাব বলুন তো?'
— 'হ্যালো হ্যালো!' কিন্তু ফোন ততক্ষণে কেটে গেছে,
এক বিরক্তি মাখা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবা বললেন, 'সত্যিই বোঝা!'
— 'হ্যাঁ,সেই,বিয়ে দিয়েও ও মেয়ের হাত থেকে নিষ্কৃতি মিলল না এতটুকু!সেই রোগ নিয়ে এসে উঠল বাপের বাড়ি!'
দরজার আড়াল থেকে সবটাই শুনল অনিমা,
ওষুধ কিনতে যাওয়ার অছিলায় বাড়ি থেকে বেরোলো ও,
ওষুধের দোকান একটু দূরেই,ওটুকু কষ্ট করে ঠিক চলে যেতে পারবে ও,
আর ওর যা শরীরের অবস্থা,তাতে দশটা স্লিপিং পিল অনায়াসেই ওর ইচ্ছাপূরণ করতে সক্ষম,তা ও বেশ ভালোভাবেই জানে।
0 মন্তব্যসমূহ