Advertisement

বর্তমান পরিস্থিতি

বর্তমান পরিস্থিতি 

প্রিয় পাঠক পাঠিকা,আপনাদের জন্য রইল বর্তমান পরিস্থিতি বিষয়ক তিনটি কবিতা।

১)


ছুটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

ছয় বছরের যে শিশুটা রোজ একমুঠো তন্দ্রা চোখেমুখে মেখে সকাল ছ'টায় উঠত মায়ের ডাকে,
তারপর দুধ-বিস্কুট খেয়েই রওনা দিত স্কুলের পথে,বাবার হাত ধরে,
গলায় ঝুলত জলের বোতল,
রোজই বাসে ওঠার পর ওর মনে হত,উফ,কবে যে ছুটি পাব!
লকডাউনের প্রথম দশটা দিন বড় আনন্দে কেটেছিল তার,
সকালে মায়ের তাড়া খেয়ে ওঠা নেই,
স্কুলে স্যার ম্যামদের বকুনি নেই,
হোমটাস্কের তাড়া নেই,কি আনন্দ!
কিন্তু এগারো নম্বর দিনটা পেরোতেই কেমন যেন এই আনন্দ ম্লান হতে শুরু করল ওর,
কিছু একটাকে যেন সে মিস করে বড্ড,
বিশেষ করে সকাল ছ'টা বাজলেই,
মিস করে জলের বোতলটা,যেটা অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে ঘরের এক কোণায়,
কতদিন স্কুলের মাঠে সহপাঠীদের সাথে খেলেনি ও,
একমাস যেতেই আর থাকতে পারল না শিশুটি,
ছ'টা বাজলেই নিজেই উঠে পড়ে সে আজকাল,ঘুম আর আসে না চোখে,
ঘুমন্ত মাকে ঠেলে বলে,'আমায় তৈরি করে দাও না মা!'
বাবার হাত ধরে টেনে বলে,'আমায় স্কুলে নিয়ে চল না বাবা!'
মা-বাবা শিশুকে বুকে টেনে নিয়ে বলেন, 'এখন যে চারিদিকে,গোটা পৃথিবীময় ছুটি চলছে সোনা!'
শিশুটি কেঁদে বলে, 'আর যে ছুটি চাই না মা,এবার যে স্কুলে যেতে চাই!'

২)


বিপর্যয়ের পথে
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

জাতীয় সড়কে ছুটছে শয়ে শয়ে গাড়ি দ্রুতবেগে,
এই বুঝি ঠোক্কর খেল একে অপরের সাথে,আর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল এক পথপশুর দেহ,
চারিদিকে উড়ছে কালো ধোঁয়া,
নীল আকাশ ঢেকেছে অম্লবৃষ্টিতে,
সদ্য স্কুলে ভর্তি হওয়া শিশুটি মুখ ঢেকেছে কাশিতে,
চায়ের দোকানে সন্ধ্যেবেলায় সরগরম আলোচনা বসেছে,
আতঙ্কবাদীদের নজরে পড়েছে নাকি দেশের নগরীগুলোতে,
আড্ডারতদের মধ্যে এক ভদ্রলোকের হঠাৎই গলা শুকিয়ে আসে,
তাঁর একমাত্র মেয়ে যে একা পড়ে আছে দূরের এক নগরীতে,
ফোন করেন তাড়াতাড়ি সন্ততিকে,কিন্তু সে ফোন বেজে কেটে যায়,কেউ তোলে না,
হঠাৎ নিউজ চ্যানেলে খবর আসে,এক বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে বিশাল বিস্ফোরণে অনেক ছাত্রছাত্রী আহত ও নিহত,
জ্ঞান হারান একমাত্র মেয়ের অসহায় বাবা,
কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসে উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবকটি,
মোটা টাকা ছাড়া যে আজকাল কেউই চাকরি দিতে চায় না,
নিম্নবিত্ত পরিবারের বড়ো ছেলে কোথায় পাবে এতগুলো টাকা?
দূরদেশে ছড়িয়েছে এক অজানা জ্বর,
ফোনে মা বাবা তাড়তাড়ি ফিরতে বলেন ছেলে ও ছেলের বৌকে,
কিন্তু ফোন কেটে যায় ওপাশ থেকে,ফিরবে না ওরা,
ইতিমধ্যে রোগগ্রস্ত ওরা বৃদ্ধ মা বাবাকে কিভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে?
চার বছরের মেয়ে বইয়ে ছড়া পড়ে দুলে দুলে,
'চারিদিকে মরণস্তূপের ছড়াছড়ি,
লেগেছে দাঙ্গা,বীভৎস মহামারি,
তবু এখনও সকলে কেন করছ কেবল,'আমারই,আমারই!'

৩)


সেদিনের অপেক্ষায়
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

সেদিনের অপেক্ষায় আছি,যেদিন বলতে পারব, 'ধুস,মাস্কগুলো আর কি কাজে লাগবে!'
সেদিনের অপেক্ষায় আছি,যেদিন বাইরে থেকে আনা আপেলটা আর স্যানিটাইজ করার দরকার পড়বে না,
সেদিনের অপেক্ষায় আছি,যেদিন খোলা মাঠে কাশফুল হাতে দাঁড়িয়ে শরতের আকাশ দেখব ঘন্টার পর ঘন্টা,কোনো বাধানিষেধ থাকবে না,
সেদিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন বন্ধুরা মিলে দুপুরের বৃষ্টিতে ভিজব আবার,ছাতা ফেলে দিয়ে,
সেদিনের অপেক্ষায় আছি,যেদিন মনখারাপ হলে খেয়ে আসব ফুচকা,পাপড়ি চাট,
সেদিনের অপেক্ষায় আছি,যেদিন 'রাতের চেয়েও অন্ধকার' এই সকালের অবসান ঘটবে,
সেদিনের অপেক্ষায় আছি, যেদিন জ্বলবে নতুন আশার দীপশিখা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ