কয়েকটি অণুগল্প
প্রিয় পাঠক-পাঠিকা,আপনাদের জন্য রইল ভিন্ন স্বাদের তিনটি অণুগল্প।
১)
অন্তরটাই সব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
মিমি ক্লাসে ঢুকতেই হাসির রোল উঠল।রাস্তায় জ্যামের জন্য ওর কলেজে আসতে একটু লেট হয়ে গেছে।ক্লাসে ম্যাম চলে এসেছেন।মিমি ক্লাসে ঢুকতেই ক্লাসের অন্যান্য স্টুডেন্টরা ব্যঙ্গ করে বলতে লাগল, এই বুঝি মহারাণীর আসার সময় হল! ম্যাম গম্ভীরস্বরে বললেন,মিমি, আজই লাস্ট।এরপর কোনোদিন লেট করে এলে আর ক্লাসে ঢুকতে দেব না।'
মিমি বুঝতে পারে না ম্যাম সবসময় ওকেই কেন এইভাবে অপমান করেন!কি দোষ ওর?কই রিমঝিম,অপর্ণা ক্যামেলিয়া ওরা যে রেগুলার লেট করে,শুধু আজই ওরা মিমির আগে পৌঁছেছে, ম্যাম তো ওদের এইভাবে বলেন না!অথচ ওরা যে খুব ভালো স্টুডেন্ট এমনও না, মিমি ওদের থেকে পড়াশুনায় অনেক ভালো। আসলে মিমি যে ওদের মতো ম্যামকে বলতে পারে না, ম্যাম আপনার কানের দুলের ডিজাইনটা ব্যাপক,বা আপনাকে এই শাড়িতে একদম হিরোইন লাগছে, বা কালকের ফেসবুকের পোস্টে আপনার হেয়ারস্টাইলটা উফফ!জাষ্ট কোনো কথা হবে না! মিমি নিতান্তই সাধারণ শান্তশিষ্ট মেয়ে যে জানে শিক্ষিকাকে সম্মান করতে হয়৷
রিমঝিম অপর্ণা ক্যামেলিয়াদের মতো তথাকথিত শহুরে আদব-কায়দায় বড়ো হয়নি মিমি,ও শিখেছে শিক্ষক-শিক্ষিকারা অভিভাবক, বাবা-মায়ের মতোই।তাই তো এতকিছুর পরেও সেদিন যখন ম্যাম অসাবধানবশত রাস্তা পেরনোর সময় একটা বড়ো দুর্ঘটনার মুখে পড়েন মিমিই লোকজন জড়ো করে ওনাকে হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করে, কোনো রিমঝিমরা এগিয়ে আসেনি।হসপিটালে যখন ডাক্তারবাবু বললেন, 'পেশেন্টের ব্লাডের প্রয়োজন, তখন ম্যাম আর তার একই ব্লাডগ্রুপ জেনে মিমিই রক্ত দিয়ে ম্যামকে বাঁচিয়ে তোলে।
মানুষের বাইরেটাই সব নয়, অন্তরটাই সব, এটা মিমি প্রমাণ করে দিল৷
২)
দূরত্ব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'এই চল খেলবি আমার সাথে।'
— 'নাম কি তোমার?কোন্ কলেজে পড়ো?'
— 'এক্সকিউজ মি, আপনার নামটা জানতে পারি?বাড়ির অ্যাড্রেসটা দেবেন?'
কিছুই নয়,দুজন অচেনা সমবয়সী মানুষের কথোপকথন।প্রথমটা প্রাইমারি স্কুলে পড়া দুটো শিশুর।দ্বিতীয়টা দুজন কলেজপড়ুয়ার আর তৃতীয়টা তিরিশের কাছাকাছি বয়সের দুজন মানুষের।খেয়াল করলেন কি?তুই,তুমি,আপনি— বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষে মানুষে দূরত্বও অনেকখানি বাড়ে,না?
৩)
উৎসব
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'মিনু,তুই বেরোবি না আজ ঠাকুর দেখতে?তুই অষ্টমীতে বেরোনোর জন্য একটা শাড়ি কিনেছিলি যে?'
— 'হ্যাঁ কিনেছিলাম,কিন্তু আজ আমি আর বেরোবো না,আর শাড়িও পরব না।'
— 'কেন রে?এনি প্রবলেম?'
— 'অর্ক,তুই তো ভালো করেই জানিস তুই আমার সবটুকু।তুই আজ অসুস্থ,আসতে পারবি না ঠাকুর দেখতে,তাহলে আমি কেন যাব শুনি?'
— 'মিনু পাগলামি করিস না।আমি নয় যাবো না,কিন্তু অপু,অনীশ,ঋতু ওরা তো যাবে।তুইও ঘুরে আয় না ওদের সাথে।'
— 'অর্ক,আজ অষ্টমীটা ওদের কাছে,কিন্তু আমার কাছে নয়।আমার কাছে অষ্টমী সেদিনই হবে,যেদিন তুই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে হাসিমুখে আমার সামনে এসে দাঁড়াবি,সেদিন তোর মিনুও শাড়ি পরে দাঁড়াবে তোর সামনে।তোর হাসিমুখে কাটানো,ভালো থাকার দিনগুলোই যে আমার কাছে উৎসব।
0 মন্তব্যসমূহ