Advertisement

রাণী


রাণী

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

আমি এক দরিদ্র,অসুস্থ নারী,
ঘরে একগুচ্ছ সন্তান-সন্ততি,
বেশিরভাগই গরীব,অসহায়,অসুস্থ,
আরও অনেক নারী আছে জানেন আমাদের সবুজ সংসারে,
তাদের মধ্যে কিছু আছে বড়োলোক,কোটিপতি নারী,
গায়ে তাদের রকমারি রত্ন বসানো ঝলমলে শাড়ি,রাঙা পায়ে আলতা,
কান,গলা,হাত,কপাল,খোঁপা হাজারো গয়নায় সুসজ্জিত,
বসে তারা সোনার সিংহাসনে,ভাবে তারাই বুঝি রাণী,ছড়ি ঘোরাবে সংসারে তারাই,
কিন্তু তারা বড়ই বোকা!জানেনা আমিই যে রাণী!
এককালে আমিও পরতাম ঝকঝকে তকতকে হীরে-মতি বসানো শাড়ি,কিন্তু যার ঘরে অসুস্থ,অসহায় ছেলে আছে অগুনতি,তাদের মায়ের পরনে অমন শাড়ি মানায়?
তাই সে বহুমূল্য শাড়ি খুলে আমার বাছাদের হাতে তুলে দিলাম আমি,
নিজে পরলাম শতচ্ছিন্ন শাড়ি,
আহা গো,তবু সব বাছাদের আমার দুঃখ ঘুচল না,
কিছু সন্তান অবশ্য ও শাড়ি বেচে প্রচুর টাকাকড়ি পেল,
কিন্তু তারা কেউ সে টাকা নিয়ে চলে গেল কোটিপতি নারীদের ঘরে,
কেউ বা রয়ে গেল আমার সংসারেই,কিন্তু আমার দরমা দেওয়া মাটির ঘর তাদের পছন্দ হল না আর,
তাই দালান গড়লে তারা,আমাকেও ডেকে বললে,'মা গো,তুমি এসো আমাদের ঘরে',
কিন্তু আমি তো মা,অগুনতি গরীব সন্তানকে ছেড়ে নিজে প্রাসাদে গিয়ে বাস করব,তা কি হয়?
ওরা রেগে বলল,'পচো তাহলে ওই খুপরি ঘরে',বলেই নিজেরা উঠল প্রাসাদে,
গায়ে যেটুকু গয়না ছিল,তা আমায় আর আমার সন্তানদের দেখাশুনার ভার নেওয়া পরিচারক-পরিচারিকাদের হাতে দিলাম,
সেগুলো বেচেও পাওয়া গেল অগুনতি অর্থসম্পদ,
কিছু টাকা অবশ্য লাগল বাছাদের উন্নয়নের কাছে,কিন্তু বাকি টাকাগুলো গেল পরিচারক-পরিচারিকাদের পকেটে,
আমার পা আজ আর রাঙা নেই,নোংরা ধুলো মাখা পায়ে কি আর আলতা মানায়?
পরনে আজ আমার ছেঁড়া শাড়ি,গায়ে আছে কেবল ফুলের গয়না,
সে ফুলও শুকিয়ে গেছে গায়েই,
চুলেতে গেরুয়া ফুল,পায়েতে বাঁধা সবুজ ঘাসের মল,আর পরনে সাদা শাড়ির আমি শয্যা নিয়েছি কবেই,
চোখমুখ গেছে শুকিয়ে,চুল হয়ে আছে এলোমেলো,ধুঁকছি আমি শ্বাসকষ্টে,
কোথাকার এক মারণ ভাইরাস জাঁকিয়ে বসেছে আমার হৃদযন্ত্রে,
সেখান থেকে সে রোগ ছড়াচ্ছে প্রতিটা অঙ্গে অঙ্গে,
আমার কোলের কত বাছাকেও হারিয়ে ফেললাম আমি এই রোগে,
চোখের জলটুকু সঙ্গী করে বিছানায় পড়ে থাকি চুপচাপ,
তবে জানেন,আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছি আমি,
আমার প্রতিটি অঙ্গ হয়ে উঠছে সুস্থ,
ওই যে,আমারই কিছু সন্তান-সন্ততি আছে না,
কেউ বা গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে,কেউ বা পরনে খাকি পোশাক,কেউ বা সাধারণ পোশাকেই,
আমাকে সুস্থ করে তোলার আর ভাইরাসকে আটকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে যারা প্রাণপণ,
আমার সেই সন্তানরা বড়ো আপন,বড়ো কাছের,
অন্যান্য সন্তানরা যখন 'মায়ের ছোঁয়াচে জ্বর এসেছে' বলে সরে যায় আমার থেকে দূরে,
ওরা ততই বেশি আঁকড়ে ধরে আমায় মা মা বলে,ঠেলে সরিয়ে দিই,'বাছারা তোদেরও হবে যে জ্বর',
কিন্তু ওরা আমার কোলে শুয়ে বলে,'মা গো,আমরা তোমায় তুলবই সুস্থ করে।'

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ