ছেলেটা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
এই সেদিনই জন্মাল ছেলেটা,
বাড়িতে খুশির হাওয়া উঠল,
কতজন নাম দিতে থাকল নিজের মতো,
দেখতে দেখতে হামাগুড়ির ধাপ পেরিয়ে হাঁটা শিখল,
সবাই বলল,চারে তো পা পড়ল,এবার ইস্কুলে দাও,
মায়ের হাতে সবচেয়ে বড় মাছটা খেয়ে চারটে খাতাবই কাঁধে ফেলে চলল এক অন্য পরিবেশে,
কত বন্ধু,শিক্ষক শিক্ষিকার সংস্পর্শ পেল সে,
ছেলেটা আটের ঘর ডিঙোতে না ডিঙোতেই ঘরে বোন এল,
সকলে বলল,'লক্ষী এসেছে,'
প্রথমদিকে ছেলেটার অভিমান হল,মার কোলের ভাগিদার এসেছে যে!
আস্তে আস্তে বোন তার নয়নের মণি হয়ে উঠল,আর সে হয়ে উঠল বোনের সব আবদারের উৎস,
সময় বইতে লাগল,বারো ক্লাস পার করে এবার সেই স্কুল ছাড়ার পালা,
বন্ধুত্ব,ঝগড়াঝাটি,প্রথম প্রেম,মান অভিমান সবকিছুর সাক্ষী সেই চারবছরে ভর্তি হওয়া স্কুল ছাড়ল সে,
ভর্তি হল কলেজে,ভালো ছাত্র হিসেবে নামটা তার ছিল বরাবরই,
হঠাৎ এক নির্জন নিস্তব্ধ দুপুরে বিনা মেঘে বজ্রপাত হল,
তাদের মা বাবা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন,
ছেলেটা তখন সেকেন্ড ইয়ারে,বছর এগারোর বোনকে নিয়ে অগাধ জলে পড়ল সে,
বোনের পড়াশুনার জন্য ছাড়তে হল নিজের পড়াশুনা,
এক ছোট চাকরি সে খুঁজে নিল,বিসর্জন দিল নিজের বুকে তিলতিল করে গড়ে তোলা স্বপ্ন,
প্রথম প্রেমিকাও হাত ছেড়ে গেছে ইতিমধ্যে,
বুকে রাশিরাশি কষ্ট চেপে হাসে সে শুধু বোনের দিকে তাকিয়ে,
বোনও ছিল পড়াশোনায় ভালো,নামকরা ডাক্তার হল সে,
মা বাবার মতো আগলে রাখা দাদাকে সেও পরম যত্নে রাখল,
কিন্তু গোল বাধাল বোনের স্বামী,
এক গভীর রাতে সে তার স্ত্রীর দাদাকে বলল সে আর চায়না বোঝা বাড়াতে,
তাই সে যেন চলে যায় তাদের সংসার থেকে।
বোনকে না জানিয়েই চোখের জল নিয়ে নিঃসঙ্গ ছেলেটা চলল এক অজানা পথে,
সে পথেই পরিচয় হল আর একজন অসহায়ার সাথে,
শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন ও বাপের বাড়ির কটাক্ষে যে ঘর ছেড়েছে,
মিলল দুটো ক্ষতবিক্ষত মন,চার হাত এক হল মন্দিরে।
ছেলেটা আজ বাবা হয়েছে,
যে ছেলে ছোটবেলায় মাছ ছাড়া ভাত খেত না,
সে আজ মাছ নিতে প্রচন্ড আপত্তি করে,
স্ত্রী-সন্তানের খাওয়াই যে তার খাওয়া!
মেয়ে তার বড় হল,বিয়ে হল,
হঠাৎ স্ত্রী পড়ল রোগে,চিকিৎসার জন্য দিনরাত এক করে খাটতে লাগল সে,
বহু কষ্টে টাকা জোগাড় হল,স্ত্রী উঠল সেরে,
কিন্তু ততদিনে ছেলেটার শরীরে বেঁধেছে অসুখ,
কতদিন হয়ত গোটাদিন জলটুকুও মুখে পড়েনি খাটতে গিয়ে,তার মাশুল গুণতে হবে না!
তবু মুখ ফুটে কাউকে বলেনি কষ্টের কথাটুকু,
শেষ সময় এসে গেছে,বলে দিয়েছে ডাক্তার,
চারিদিকে উঠছে কান্নার রোল,হাজির হয়েছে বোনও,
কোথা থেকে খবর পেয়ে এসেছে তার স্কুল জীবনের প্রথম প্রেমিকাও,
কোনোরকমে শক্তি সঞ্চয় করে সে বলল,আমাকে নিয়ে গল্প হয়নি জানি,
কিন্তু কোনো একদিন,কেউ একজন গল্পটা লিখবেই,যার মুখ্য চরিত্র হবে ছেলেটা।
0 মন্তব্যসমূহ