— 'কি ব্যাপার, এত রাত করে বাড়ি ফিরলি দক্ষিণী?'
— 'বাপি,আর বোলো না।রাস্তায় এত জ্যাম...'
— 'রোজই রাস্তায় খুব জ্যাম থাকে না দক্ষিণী?কেবল তোর ফেরার সময়ই থাকে তাই না?আমিও রোজ অফিস থেকে ফিরি...'
— 'বাপি,তুমি আবার শুরু করলে?আচ্ছা তোমার আর আমার ফেরার টাইম কি এক বলোতো?তুমি ফেরো বিকেল সাড়ে চারটের দিকে,খুব বেশি হলে বিকেল পাঁচটা,আর আমি ফিরি রাত ন'টা।তুমি ভালো করেই জানো কলকাতায় যত রাত বাড়ে,বাস-গাড়িঘোড়ার ভিড়ও ততই বাড়ে।'
— 'অ্যাই মামণি,দাঁড়া তো একটু!'
— 'আবার কি হল বাপি!'
— 'হ্যাঁ রে মামণি,তোর চুড়িদারের হাতাটা ছিঁড়ল কি করে?আর কড়ে আঙুলটাই বা কাটলি কি করে?রক্ত পড়ছে তো!' তপনবাবু একরকম চেঁচিয়ে ওঠেন।
— 'আর বোলোনা বাপি,বলতেই যাচ্ছিলাম,তুমি এত কথা জিজ্ঞেস করলে যে বলার সুযোগই পেলাম না!'
— 'বল্ মা!'
— 'আসলে বাপি আসার সময় অটোওয়ালা এত তাড়া দিচ্ছিল অটোয় ওঠার জন্য,ওই অটোয় উঠতে গিয়েই আমার হাতে চোট লাগল,আর তাতেই...'
— 'মামণি!' তপনবাবু বুকে জড়িয়ে ধরেন মেয়েকে,চোখের জল বাঁধ মানে না আর।অজান্তেই উনিশ বছর আগের এক রাতের কথা তাঁর মনে পড়ে।দক্ষিণী তখন পাঁচ বছরের মেয়ে,তপনবাবুর স্ত্রী নেহা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।নেহা চাকরি করতেন এক বেসরকারি অফিসে।তখন শুরুর দিক,নেহা ভেবেছিলেন আর কটা মাস যাক,তার পরেই ছুটি নেবেন অফিস থেকে।একদিন অফিস থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল নেহার।কোনো গাড়ি পাচ্ছিলেন না।হঠাৎ দেখা পেলেন একটা অটোর।অটোতে একজন পুরুষ যাত্রী ছিলেন,আর কেউ ছিল না।হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে নেহা দেখলেন,সাড়ে দশটা বাজে,তাই আর দেরি না করে উঠে বসলেন অটোয়।কিন্তু অটোওয়ালা আর সেই সহযাত্রী যে পূর্বপরিচিত,তা তিনি জানতেন না।কিছুদূর যাওয়ার পরেই অটোওয়ালা নির্ধারিত রাস্তায় না গিয়ে অন্য এক গলিতে ঢুকে পড়ে।বেগতিক দেখে নেহা অটো থেকে পালানোর চেষ্টা করেন,কিন্তু ব্যর্থ হন।শেষে এক ধূ ধূ মাঠে গিয়ে অটো থামল যখন,নেহা অটো থেকে নেমেই দৌড়াতে শুরু করলেন,কিন্তু একটু পরেই হোঁচট খেয়ে তিনি পড়ে গেলেন রাস্তায়।ব্যথায় জর্জরিত নেহা আর উঠতে পারলেন না।
পরের দিন ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত নেহার মৃতদেহ উদ্ধার হয় স্টেশনের অনতিদূরে এক পরিত্যক্ত বাড়িতে।
দক্ষিণীকে বুকে শক্ত করে চেপে ধরে তপনবাবু অস্ফুটে বলে ওঠেন,'ঘরপোড়া গরু তো,সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় করে।বুক কাঁপে।'
0 মন্তব্যসমূহ