সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
হসপিটালে মল্লিকার শ্বশুরবাড়ি,বাপের বাড়ির সবাই চিন্তাগ্রস্ত মুখে অপেক্ষারত,
একটু পরেই ওটি থেকে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার,চিন্তান্বিত মুখে বললেন, 'কমপ্লিকেশন আছে।যেকোনো একজন বাঁচবে।কাকে বাঁচাতে চান আপনারা?মা?না বেবি?'
সকলে নিরুত্তর,মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে একে অপরের,কারোর থমথমে মুখে ঘাম দেখা দিয়েছে,কারোর বা চোখের জল,
হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে এগিয়ে এলেন এক প্রৌঢ়া,
বললেন, 'ডাক্তারবাবু,বাচ্চাকেই বাঁচান!'
ভ্রু কুঁচকে ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি পেশেন্টের কে হন?'
সেই প্রৌঢ়া আঁচলে চোখের জল মুছে বললেন, 'আমি ওই হতভাগিনীর জন্মদাত্রী মা!আমি বলছি,আপনি নাতিকেই বাঁচান,মেয়েকে নয়!'
হসপিটালে অপেক্ষারত বাকিরা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন প্রৌঢ়ার দিকে,কারো মুখে কথা সরল না,
প্রৌঢ়া বলে যেতে লাগলেন, 'হতভাগিনী মলির পোড়া কপাল,জানেন?জন্ম থেকে বাপ,ঠাকুর্দা,ঠাকুমা সবাই হ্যাটা করে এল,মেয়েসন্তান কিনা!
কত আশা করে মলির বিয়ে দিয়েছিলাম,ভেবেছিলাম স্বামীর ঘরে সম্মানটুকু পাবে,বাপের বাড়িতে পাওয়া সব কষ্ট মুছে যাবে শ্বশুরবাড়িতে,
কিন্তু সেখানেও মলি যখন প্রথমে কন্যাশিশুর জন্ম দিল,সবাই ওকেই দায়ী করতে লাগল,
উঠতে বসতে কথা শোনাতো,বলত, 'কি অলক্ষ্মী মেয়েই ঘরে এনেছি!একখান ছেলে দিতে পারলে না গো!'
মেয়ে যে বাপের বাড়ি এসে দু দন্ড থাকবে,তাতে তার বাপ-দাদাদের সে কি আপত্তি!
মেয়েমানুষের বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই তো থাকার জায়গা,তারা বলত প্রতি মুহূর্তে,
জানেন ডাক্তারবাবু,প্রথম মেয়ের পর মলি যখন দ্বিতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা হল,শ্বশুরবাড়ির লোক উঠতে বসতে কথার ছুরির ঘায়ে বিদ্ধ করেছে, 'এবার যেন ছেলে হয়,ঘরে যেন বংশের প্রদীপ আসে,নইলে ছেলের আবার বিয়ে দেব!'
এমনকি অবৈধ ভাবে ভ্রূণের লিঙ্গ পরীক্ষাও করেছে,
পরীক্ষাতেই জানা গেছে,এবার নাকি ছেলে হবে মলির,
জন্মের পরের দিন থেকে একটা দিনের জন্যও মেয়েটা আমার শান্তি পায়নি,বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ি সর্বত্র চোখের জল ফেলেছে,
তাই আজ বোধহয় ভগবান মুখ তুলে চেয়েছেন,এবার ওর সব দুঃখ কষ্ট দূর হওয়ার পালা,
কারণ এবার যে ও পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছে,
ও বাঁচল কিনা তাতে কার কি যায় আসে বলুন?বংশের প্রদীপ আনতে পেরেছে হতভাগিনী,এই তো পরম সৌভাগ্য ওর,
তাই ডাক্তারবাবু,আপনি নাতিকেই বাঁচান,আর আমার মেয়েটাকে জীবনের মতো শান্তি দিন,মুক্তি দিন ওকে জীবনের অসহ্য যন্ত্রণা থেকে,প্রতিদিনের অপমান থেকে,
আমি যে মা,তাই চাই ও সুখী থাকুক,পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দূরের কোনো দেশে গিয়ে,এখানে যে ওকে ভালোবাসার কেউ নেই!
2 মন্তব্যসমূহ
খুব সুন্দর লাগলো পড়ে, খুব কষ্টের শেষ টা 😢😢😢
উত্তরমুছুন🤗🤗🤗🤗
মুছুন