অযোগ্য
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'ওই ব্লু ড্রেসটা খুব পছন্দ হয়েছে মা, নেব?'
— 'আরে দেখো মেয়ের কান্ড! তোকে এতবার করে বলি সেনী যে হালকা রঙের জামা কাপড় পরিস না, ওসব তোকে মানায় না, মেয়ের সেই ঘুরেফিরে চোখ যায় খালি ওসব রঙের দিকেই! তার চেয়ে ওই ব্রাউন ড্রেসটা দেখ, ওটা বেশি মানাবে তোকে।'
— 'ঠিক আছে মা, তাহলে ওটাই নাও।'
— 'ঠিক তো? পছন্দ হয়েছে তোর ওটা?'
— 'হয়েছে মা।' সৌরসেনী শ্লেষের হাসি হাসে,মনে মনে ভাবে, 'আমি কি রঙের পোশাক পরব সেটা যখন আমি না, সমাজ আর তোমরাই ঠিক করে দাও, তাহলে আর আমায় সঙ্গে করে কেন নিয়ে যাও জামাকাপড় কিনতে?'
অবশ্য এই ঘটনা সৌরসেনীর জীবনে নতুন নয়। জ্ঞান হওয়া থেকেই গাত্রবর্ণের জন্য সমাজ থেকে শুরু করে ঘরের মানুষ সবার কাছেই ঠাট্টা-তাচ্ছিল্য সহ্য করেছে ও। সৌরসেনী মা-বাবার প্রথম কন্যাসন্তান, তায় গায়ের রঙ কালো, সকলেই অল্পবিস্তর ভ্রূ কুঁচকেছিলেন, আর সৌরসেনীর ঠাকুমা বিরক্ত মুখে বলেছিলেন, 'এইজন্যই তখন খোকনের বাপকে বলেছিলাম, ওগো,পাত্রী ফরসা হলে কি হবে, পাত্রীর বাপ মায়ের গায়ের রংটাও দেখো গো! মেয়ে ফরসা হলেও বাপ মায়ের জিন তো আছে নাকি, যদি আমার বংশধর ওই রঙ পায়? শুনলেন না তখন তিনি আমার কথা! এখন পস্তাক!'
সৌরসেনীর ঠাকুরদা অবশ্য এসবে কান দেননি, তিনি হেসে বলেছিলেন, 'তবে ঠাকুরঘরে যে কালীমূর্তি আছে, তাঁর গায়ের রঙটাও সাদা করে দাও, তারপর পুজো করো!' তারপর নাতনিকে সস্নেহে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, 'স্বয়ং শ্যামা এসেছেন আমার ঘরে, আমার এই মা অনেক বড়ো হবে একদিন, সমাজের যা কিছু অন্ধকার, কালো তা এই কালো মেয়েই দূর করবে একদিন নিজের ঔজ্জ্বল্যে।'
সৌরসেনীর ঠাকুমা নীলিমা অবশ্য সেসবে কান দেননি, তিনি সৌরসেনীর জন্মের পর উঠতে বসতে কথা শোনাতেন সৌরসেনীর মা সুস্মিতাকে, খোঁটা দিতেন সুস্মিতার মা-বাবার গায়ের রঙ নিয়েও। প্রথম প্রথম সুস্মিতা মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে কাঁদতেন ঘরের দরজা বন্ধ করে, কিন্তু যত দিন যেতে লাগল, সুস্মিতার নীলিমাদেবীর করা সমস্ত অপমানের রাগ গিয়ে পড়ল শিশু সৌরসেনীর ওপরেই। সৌরসেনী তখন সবে চার-পাঁচ বছরের শিশু, সুস্মিতা একপ্রকার সহ্যই করতে পারতেন না যেন মেয়েকে, সামান্যতম ভুল করলেই সৌরসেনীর প্রাপ্য হত মায়ের হাতের মার, কখনো একবেলা খেতে না পাওয়া, কখনো বা ঘরে আটকে থাকা। এতকিছুতেও রাগ পড়ত না সুস্মিতার, তিনি রেগে দাঁত কিড়মিড় করতেন মাঝে মাঝেই, 'আজ তোর জন্য আমাকে, আমার মা বাবাকে সবাই ছোট করার সুযোগ পায়! কেন জন্মালি তুই? জন্মের আগেই কেন মরে গেলিনা বল্?'
শিশু সৌরসেনী এসব শুনে ভয়ে কেঁদে ফেলত, আর ছুটে চলে যেত ঠাকুরদা বিপিনবাবুর কাছে।সৌরসেনীর বাবা সৌরভবাবু অফিসে থাকেন দিনের অনেকটা সময়, চাইলেও বাবাকে সেভাবে কাছে পায় না ও। এই বাড়িতে একমাত্র বিপিনবাবুই সহমর্মী সৌরসেনীর, তাই দিনের বেশিরভাগ সময়টা ও ওঁর কাছেই কাটায়। তিনি ছড়ার বই এনে দিয়েছেন ওকে, এনে দিয়েছেন নামতার বইও।
— 'আচ্ছা দাদুন, মা সবসময় এত বকে কেন আমায়? আর ঠাম্মাও কেন কোলে নেয় না আমায়? বলো না দাদু বলো না!'
— 'জানিনা রে মা, বয়স বাড়লে বোধহয় মানুষরা বোকা হয়ে যায় রে দিদিভাই!'
কেটে গেল আরও দুটো বছর। সুস্মিতা সন্তানসম্ভবা হলেন আবার, কিন্তু তিনি প্রত্যেকটা মুহূর্তে ভয়ে থাকেন, যদি এই সন্তানটিও কৃষ্ণবর্ণ হয়! একদিন সুস্মিতা সৌরভের কাছে কেঁদে ফেলে বললেন, 'হ্যাঁ গো, বাচ্চার গায়ের রঙ কি হবে সেটা পরীক্ষা করা যায় না গো কোনোভাবে? যদি এই বাচ্চাটাও সেনীর মতো হয়, তাহলে না হয় নষ্ট করে দেওয়া যাবে!'
— 'এসব কি বলছ তুমি সুস্মিতা? পাগল হয়ে গেছ?'
— 'আমি এই সাতটা বছর ধরে অনেক সহ্য করেছি সৌরভ, আর পারছিনা বিশ্বাস করো!'
দ্বিতীয় সন্তানটি জন্মের পর অবশ্য সুস্মিতা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, কারণ এই সন্তানটি পুত্রসন্তান, এবং সেই সাথে গৌরবর্ণ। নবজাতককে দেখে নীলিমা দেবীর আনন্দ দেখে কে! তিনি তাকে কোলে নিয়ে বললেন, 'ওমা, গোপাল এসেছে যে!'
নবজাতকের নাম রাখা হল সূর্য। সৌরসেনী ভাইকে খুব ভালোবাসে, দিদির সাথে হেসেখেলেই বেড়ে উঠল ও। সুস্মিতার এখন আর মেয়ের ওপর আগের মতো রাগ নেই বটে, তবে প্রতিটা মুহূর্তে সৌরসেনী অনুভব করে তার আর তার ভাইয়ের মধ্যে পার্থক্য অনেক এবাড়িতে, বিশেষত তার মা আর ঠাকুমার কাছে। সৌরসেনী অবশ্য এসবের জন্য দুঃখ পেলেও কখনো ভাইয়ের ওপর রাগ করেনি, বরং আগলে রেখেছে তাকে।
বাড়ির বৈষম্যের মধ্যেও দুই ভাইবোন দিব্যি বেড়ে উঠল। একে অপরের বন্ধুর মতো, কোনোপ্রকার হিংসা-অহংকার ঠাঁই পায়নি কোনোদিনই তাদের মিষ্টি সম্পর্কের মাঝে। সৌরসেনী আজ কলেজে পড়ে, আর ভাই পড়ে ক্লাস সিক্সে। সৌরসেনী বরাবরই ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টের আওতাভুক্ত, স্কুল হোক কি কলেজ, ক্লাসে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি ও কোনোদিন, ভাইকে ও ই পড়ায়। সৌরসেনীর ঠাকুরদা গর্ব করে বলেন, 'কি নীলিমা, কি বলেছিলাম আমি? বলেছিলাম না, আমার এই মা একদিন আমাদের সকলের মুখ উজ্জ্বল করবে?'
— 'হুঁঃ, ছাড়ো তো! মেয়েমানুষ, তার আবার ফার্স্ট হয়ে টয়ে কি হবে শুনি? আজও বিয়ের সময় লোকে পাত্রীর রূপটাই দেখে, ডিগ্রি-ফিগ্রি দেখে না!'
সুস্মিতা মনে মনে সৌরসেনীর প্রতি আর আগের মনোভাব না রাখলেও সেভাবে কাছে টেনেও নেননি কোনোদিন মেয়েকে, তাই মেয়ে ভালো রেজাল্ট করলেও আনন্দটুকু মনেই রেখেছেন শুধু, প্রকাশ করেননি সেভাবে, আর আশীর্বাদ করে গেছেন মনে মনে।
কলেজে সৌরসেনীর একজন ছেলেকে বড্ড মনে ধরল। ছেলেটির নাম তন্ময় দত্ত। সৌরসেনী যদিও তার এই মনের কথা কখনো জানায়নি কোনো বন্ধুকে, কারণ এমনিতেই গায়ের রঙের জন্য বন্ধুবান্ধবীরা তাকে হাবেভাবে বুঝিয়ে দেয়, যে ক্লাসে প্রথম হলেও কারোর ভালোবাসা পাওয়ার সে অযোগ্য। কিন্তু বেশিদিন নিজের এই অনুভূতি ও লুকিয়ে রাখতে পারল না, সৌরসেনীর এক ক্লাসমেট বীণা লক্ষ করল, ক্লাসে আজকাল সৌরসেনী পড়া মন দিয়ে শোনার বদলে তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টে।
একদিন সৌরসেনী আর বীণা যখন একসাথে ফিরছিল কলেজ থেকে, বীণা বাঁকা হেসে বলল, 'আজকাল ক্লাসে কার ভাবনায় তন্ময় হয়ে থাকিস?'
— 'ধুস, যত আবোলতাবোল কথা তোর!' বলেই লাজুক হেসে মুখ নামিয়ে নিল সৌরসেনী।
— 'না বস, আবোলতাবোল বলে কথা ঘোরালে তো হবে না, তোর মুখের এই লাজুক হাসিই বলে দিচ্ছে সত্যিটা!'
ক্লাসে বীণার মতো পেটপাতলা মেয়ে আর দুটো নেই, তাই ওর দৌলতেই গোটা ক্লাস জেনে গেল সৌরসেনীর মনের কথা। বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই হাসাহাসি করল সৌরসেনীকে নিয়ে, 'শালা বামন হয়ে চাঁদ ছোঁয়ার শখ! তন্ময় যদি অর্জুন হয় তো ও তারকা রাক্ষসী!'
— 'যা বলেছিস! পাশাপাশি মানাবে ওদের কোনোদিন?'
— 'তাই না তাই! ক্লাসে ফার্স্ট হয় বলে নিজেকে মিস ওয়ার্ল্ড ভেবে নিয়েছে যেন!'
এই কথাগুলো হামেশাই শোনা যায় ক্লাসে সৌরসেনীর অনুপস্থিতিতে। তন্ময় অবশ্য এসব কথা শুনলেই প্রচন্ড রেগে যায়, বলে, 'ওর মতো রেজাল্ট করতে পারিস না বলে এত ফ্রাস্টেশন? আর কালো মানুষরা বুঝি সুন্দর হয় না? কখনো অনুভব করেছিস রাতের কালো আকাশের রূপ-রস-গন্ধ? কখনো পান করেছিস ঝড়ের কালো মেঘের সৌন্দর্যসুধা? মন্দিরের কালীকে ভক্তিভরে পুজো করিস, অথচ জীবন্ত কালীকে এত নীচু চোখে দেখিস তোরা? ছি!'
তন্ময় ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে সৌরসেনীর প্রতি। সমাজের কটাক্ষকে উপেক্ষা করেই শুরু হয় দুটির দুরন্ত প্রেম। নদীর পাড়ে হাতে হাত রেখে বিকেল কাটানো থেকে শুরু করে গভীর অন্তরঙ্গতা, সবটুকু উপভোগ করেছে দুই প্রেমিক-প্রেমিকা।
কেটে গেল তিন বছর। কলেজ ছেড়ে দুটিতেই ভর্তি হয়েছে ইউনিভার্সিটিতে। প্রেম-পড়াশুনা-খুনসুটি আর অন্তরঙ্গতায় দিব্যি কেটে গেল দুবছর। ইউনিভার্সিটি পাশ করার পর চাকরি পেয়ে গেল দুজনেই।তন্ময় চাকরি পেল ব্যাঙ্কে, আর সৌরসেনী পেল এক বেসরকারি সংস্থায় মোটা মাইনের চাকরি।
সৌরসেনী বাড়িতে জানাল তাদের সম্পর্কের কথা। সৌরসেনীর মা-ঠাকুমা তো একপায়ে খাড়া, কারণ তাঁদের মতে তাঁদের বাড়ির তথাকথিত অসুন্দর মেয়েকে 'পার' করতে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হত তাঁদের, তাই তন্ময়ের মতো এত সুন্দর পাত্র পেয়ে তাঁরা একপ্রকার ধন্য। শুধু সৌরসেনীর ঠাকুরদা বলেছিলেন, 'আমার মালক্ষ্মী তো যেমন তেমন মেয়ে নয়, একদম কোহিনূর হীরে, ওই ছেলে ওর সঠিক মূল্য দিতে পারবে তো?'
তাঁর কথায় নীলিমাদেবী মুখ কুঁচকে বলেছিলেন, 'ওই তো কয়লার মতো রঙ, তাকে নিয়ে বুড়োর আদিখ্যেতা দেখো না!'
সৌরসেনী তন্ময়ের সাথে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়েটা সেরে নিতে চেয়েছিল, কারণ ছোটো থেকে এত অপমান সহ্য করে করে সে ক্লান্ত, তাই এই বাড়ি থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে চলে যেতে চায় ও।সেইমতো একদিন তন্ময়ের সাথে দেখাও করল সৌরসেনী এই ব্যাপারে কথা বলার জন্য।
— 'তোমার সম্পর্কে বাড়িতে আমি বলেছি সেনী, ছবিও দেখিয়েছি তোমার।'
— 'আঙ্কেল আন্টি কি বললেন গো?'
— 'সেনী, তুমি আমার কথাটা মন দিয়ে শোনো কেমন', তন্ময় সৌরসেনীর হাতদুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, 'প্লিজ ভুল বুঝোনা আমায়!'
— 'ভুল কেন বুঝব তন্ময়, তুমি খুলে বলোই না সবটা!'
— 'দেখো সেনী, বাবার তোমাকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে গো, বাবা চান তুমিই তাঁর পুত্রবধূ হও, তবে মা....'
— 'আন্টি কি বললেন গো?'
— 'আসলে সেনী মায়ের হার্টের অসুখ তুমি তো জানোই, তাই মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি-বাবা কেউ একটাও কথা বলি না, কারণ ডাক্তার বলেই দিয়েছেন বেশি উত্তেজনা মায়ের পক্ষে ভালো নয়।'
— 'হ্যাঁ তন্ময়, এগুলো তো সবই আমি জানি।'
— 'সেনী!' তন্ময় মাথা নীচু করে বলল, 'তোমার ছবি দেখে মা একদমই মেনে নেননি তোমায়, মেনে নেননি আমাদের সম্পর্কটাকেও! মা তোমার ছবি দেখেই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েন, বলেন এই মেয়েকে আমি কিছুতেই ঘরের বৌ হিসেবে মানব না! ইস কি গায়ের রঙ দেখেছিস? ছি! এমন মেয়েকে তোর মতো ফরসা টুকটুকে ছেলের পাশে মানায় না বাবা, কিভাবে ওই মেয়েকে মনে ধরল তোর?'
একটু থেমে তন্ময় বলল, 'জানো সেনী, আমি আর বাবা মাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু মা বললেন, 'ওই মেয়েকে বিয়ে করিস যদি তুই, আমি আজ থেকেই সব ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেব, মরে যাব আমি! তারপর আমার লাশের ওপর দিয়ে বিয়ে করতে যাস তুই!' তন্ময় গম্ভীর গলায় বলল, 'হাজার হোক উনি আমার মা সেনী, কত কষ্ট করে মানুষ করেছেন উনি আমায় বলো তো, আজ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে কি পারি আমি একটা সামান্য ব্যাপারের জন্য?'
— 'কি বললে তুমি তন্ময়? সামান্য ব্যাপার? এতদিন এত সুন্দর মুহূর্ত, প্রতিটা মোমেন্টে একে অপরের পাশে থাকার প্রমিস, কাছাকাছি আসা এই সবকিছু তুমি সামান্য মনে করো তন্ময়?'
— 'সেনী তুমি কেন এতটা অবুঝ হচ্ছ? আমার দিকটা একবার ভাবো! আমি মায়ের একমাত্র সন্তান, আমি ছাড়া ওনার আর কে আছে? তোমার সাথে তো আমার দুদিনের পরিচয়, আজ আছো, কাল নাও থাকতে পারো, তোমার কাছে অপশন আছে অন্য কাউকে বিয়ে করার, কিন্তু আমার মায়ের যে আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোনো অপশন নেই!'
— 'তুমিও তন্ময়? তুমিও সমাজের আর পাঁচটা মানুষের মতো আমায় জীবনসঙ্গী হিসেবে অযোগ্য ভাবলে?'
— 'না সেনী, আমি সেকথা বলিনি। তোমায় অযোগ্য বলব, সেই স্পর্ধা আমার নেই। আসলে অযোগ্য আমি সেনী, তুমি নও, তুমি আমার চেয়েও বেটার কাউকে ডিসার্ভ করো।'
সৌরসেনীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। কিন্তু আগের মতো তন্ময় আর সস্নেহে মুছিয়ে দিল না তার চোখের জল।
তন্ময় হেঁটে যেতে লাগল নিজের পথে। সৌরসেনী কান্নাভরা গলায় চিৎকার করতে লাগল, 'আমার সাথে এতগুলো দিন কাটানোর আগে কি অনুমতি নিয়ে এসেছিলি তোর মায়ের? কাপুরুষ কোথাকার, আর হ্যাঁ রে, আমি অযোগ্য নই, অযোগ্য তুই! শুধু তুই না, এই সমাজ অযোগ্য, যারা কালো মানুষ ঘৃণা করে তারা অযোগ্য! তোরা কেউ ডিসার্ভ করিস না আমায়, কেউ না!'
সৌরসেনী কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ল। আকাশে কালো মেঘ জমল, নেমে এল বৃষ্টি ধরিত্রীর বুকে। সৌরসেনীর মনে হল, ওই কালো মেঘ যেন ওকে বলছে, 'বোকা মেয়ে, কাঁদছিস কেন এভাবে? তুই যে কি সেকথা সমাজ দূর, তুই নিজেই জানিস না! আমায় দেখ তো একবার, এ পৃথিবীর বুকে বৃষ্টি আনি আমি, ফসল ফলাই আমি, শস্যশ্যামলা করি আমি, আবার এই আমিই বিধ্বংসী ঝড় হয়ে তছনছ করে দিতে পারি সবকিছু! কালোর যে অনেক ক্ষমতা রে, একথা তুই কবে বুঝবি?'
বাড়িতে বিয়ে ভাঙার কথা শুনে তুমুল অশান্তি শুরু হয়ে গেল। সুস্মিতা বললেন, 'বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে গিয়েছিলি, হল তো? হুমড়ি খেয়ে পড়লি তো মাটিতে?'
নীলিমাদেবী বললেন, 'ক'দিন ময়ূরের পালক লাগিয়ে খুব ময়ূরী সেজে ঘুরেছিল ময়ূরের সাথে! কিন্তু সে তো ময়ূর, কাককে বিয়ে করতে তার বয়েই গেছে! এখন বোঝো ঠ্যালা!'
— 'ছেলেটার গালে কষিয়ে এক চড় মারতে পারলি না মা রে?' বিপিনবাবু বললেন, 'দুই গালে দুটো চড় মেরে গাল লাল করে দিতে হত ওর!'
— 'কি আর করব বলো দাদুন, হাজার হোক ভালোবেসেছি তো, তাছাড়া ও বেশ চিন্তান্বিতও ছিল আন্টিকে নিয়ে, তাই মরার ওপর আর খাঁড়ার গা দিইনি।'
— 'তা বেশ করেছিস দিদি', সূর্য বলল, 'ওই হনুটা তোর রাগ তো দূর, করুণারও যোগ্য নয়।'
বিপিনবাবুর মতো সূর্যও দিদি বলতে অজ্ঞান। একবার তো স্কুলে গার্জেন কলও হয়েছিল সূর্যর এই কারণেই। সূর্যর এক ক্লাসমেট অরিন্দম সূর্যকে ঠাট্টা করে বলেছিল, 'মা বলে তোর দিদিটাকে দেখতে একদম রাক্ষুসির মতো, কি বিচ্ছিরি ওয়াক!'
দিদির এই অপমান সূর্য সহ্য করতে পারেনি, এমন মেরেছিল অরিন্দমকে যে বেচারা সাতদিন বিছানায় পড়ে ছিল। বাড়িতে এসে সুস্মিতা যখন ঘা কতক দিয়েছিলেন ওর পিঠে, ও বলেছিল, 'তুমি আমায় মারতে মারতে মেরে ফেললেও দিদির নামে বাজে কথা আমি সইব না কোনোদিন! দিদিকে যে খারাপ কথা বলবে তাকে খুন করে ফেলব আমি!'
সূর্য এখনও বলে, 'নেহাত মা আর ঠাকুমাকে বাজে কথা বলতে নেই তাই, নয়তো ওই দুটোও খুব বাজে মহিলা!'
— 'ছিঃ সূর্য, বড়োদের সম্বন্ধে অমন বলতে নেই রে!' কিশোর ভাইকে বুকে টেনে নেয় সৌরসেনী।
দিনে দিনে নিজের বাড়িটা যেন শরশয্যায় পরিণত হয়ে যাচ্ছিল সৌরসেনীর কাছে। উঠতে বসতে মা-ঠাকুমার কাছে অপমান সহ্য করতে করতে ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল ও। আজকাল আবার বাবাও যোগ দিয়েছে ওদের সাথে। অফিসে কলিগদের অপমান, রাস্তাঘাটে অচেনা লোকদের হাসাহাসি করা ওকে নিয়ে, সেই সাথে বাড়ির দমবন্ধ করা পরিবেশ সদ্য মন ভাঙা সৌরসেনীকে যেন সবদিক থেকে শেষ করে দিচ্ছিল।
রাতে শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসছিল না ওর। বালিশ জলে ভিজে যাচ্ছিল, আর ছোট থেকে আজ পর্যন্ত অচেনা মানুষ থেকে শুরু করে চেনা মানুষের করা প্রত্যেকটা অপমান মনে পড়ছিল ওর। নিজের অজান্তেই সৌরসেনী অস্ফুটে বলে উঠল, 'পড়াশোনা, ডিগ্রি, চাকরি, মনের পবিত্রতা এই সবকিছুকে ছাপিয়ে যায় গায়ের রঙ, তথাকথিত শারীরিক সৌন্দর্য, তাই আজ আমার মতো যোগ্যতম মানুষকেও উঠতে বসতে সমাজ কথা শোনায়, অপমান করে, অযোগ্য প্রতিপন্ন করে।'
আস্তে আস্তে ভেজা চোখে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে সৌরসেনী,ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে আয়নার কাছে যায়। আয়নার পাশেই একটা তাক ছিল, ওই তাকে অনেক ফেয়ারনেস ক্রিম রাখা ছিল মায়ের দৌলতে।মা বারবার বকাঝকা করা সত্ত্বেও সৌরসেনী কোনোদিনও একটা ক্রিম ছুঁয়েও দেখেনি। তাকে রয়েছে একটা গিফট প্যাকও, যেটা সৌরসেনীকে জন্মদিনে তার অফিস কলিগরা দিয়েছিল। জন্মদিনের দিন কলিগদের সামনেই প্যাকটা খুলেছিল সৌরসেনী, আর খুলেই হতবাক হয়ে গিয়েছিল ও। প্যাকের ভেতর অনেক ফেয়ারনেস ক্রিম ছিল, স্তম্ভিত সৌরসেনীর মুখে কথা সরছিল না, জন্মদিনের আনন্দ মুহূর্তে ম্লান হয়ে গিয়েছিল তার। নির্লজ্জ কলিগরা হেসে বলেছিল, 'তুমি অনন্যসুন্দরী সৌরসেনী, শুধু স্কিনের রংটা একটু ব্রাইট হলেই একদম কেল্লা ফতে!'
সৌরসেনী তাক থেকে একটা ফেয়ারনেস ক্রিম নিল, তারপর সেই ক্রিম মাখল মুখে, হাতে। তারপর এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে, একটা কাগজ আর পেন নিল ও।
পরেরদিন সকালে হাজারবার ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পাওয়া গেল না সৌরসেনীর ঘর থেকে।
দরজা ভেঙে দেখা গেল, সৌরসেনী নিথর হয়ে পড়ে আছে বিছানায়, বিপিনবাবুর ঘুমের ওষুধের শিশিটা প্রায় খালি, আর পাশে পড়ে আছে একটা চিরকূট, যাতে লেখা, 'এই পৃথিবীতে বাস করার অযোগ্য আমি বিদায় নিলাম চিরতরে।'
সৌরসেনীর জ্ঞান ফিরল নার্সিংহোমের বেডে। ও চোখ মেলতেই তরুণ ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি ঘোরে কেবলই বলছিলেন 'অযোগ্য!' কে অযোগ্য জানতে পারি কি?'
— 'আমি!' সৌরসেনীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
কেটে গেছে প্রায় দশ বারোটা বছর। সৌরসেনীর বিয়ে হয়েছে সেই তরুণ ডাক্তারবাবুটিরই সাথে, যাঁর নাম সন্দীপ বিশ্বাস। আজ সৌরসেনী হাজার হাজার মানুষের ইন্সপিরেশন, ক্রাশ। মিস ওয়ার্ল্ড অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত নায়িকা কাম মডেল সৌরসেনীকে আজ কে না চেনে? সে প্রমাণ করে দিয়েছে, এই সমাজই অযোগ্য তাকে ডিসার্ভ করার।

0 মন্তব্যসমূহ