Advertisement

নিস্তব্ধতার কষ্ট

নিস্তব্ধতার কষ্ট
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

মেয়েটার পিসিওডি আছে,
বড্ড কষ্ট পায় প্রতি মাসে পিরিয়ডের দিনগুলোতে,
দুর্ভাগ্য এমনই তার, আজ পরীক্ষা কলেজে,
পরীক্ষার সকালেই শুরু হয়েছে পিরিয়ড, 
পেইন কিলার খেয়ে বেরিয়ে পড়েছে সে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে,
আজ আর হেঁটে বাসস্ট্যান্ড যাওয়ার ক্ষমতা নেই তার এত যন্ত্রণা নিয়ে,
তাই বাধ্য হয়েই রিক্সা নিল সে,
রিক্সা বেশ জোরে চলছে,ঝাঁকুনিতে যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে যেন পেট, কোমর,
রিক্সাওয়ালাকে বলল, 'কাকু একটু আস্তে চালান না!'
— 'এখন আপিস টাইম যে,দেরি করলে যে বাসস্ট্যান্ড থেকে যাত্রী পাব না!' বলেই রিক্সাওয়ালা যেমন গতিতে যাচ্ছিল তেমনই যেতে শুরু করল,
মেয়েটি আর কিছু বলল না, অবশ্য কি ই বা আর বলবে সে!
এই কষ্ট কি প্রকাশ করতে আছে নাকি?তাও পুরুষমানুষের কাছে?
রিক্সার হাতল আঁকড়ে ধরল সে অতি কষ্টে,
চোখ মুখ কুঁচকে আসছে অসহ্য যন্ত্রণায়,
তবু মুখ থেকে সামান্য আঃ শব্দটি বের করছেনা সে,
সমাজ যে সে অনুমতি দেয়নি!
রিক্সা থেকে নেমে বাসস্ট্যান্ডে গেল সে,
বাস এল ঠিকই, তবে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়াল স্টপেজ থেকে,
মেয়েটি কোনো রকমে ছুটে উঠে পড়ল বাসে,
রিক্সার ঝাঁকুনিতে এমনিতেই ব্যাথাটা বেশ বেড়েছিল, এখন দৌড়ানোর জন্য সেটা আরও কষ্টকর অবস্থায় পৌঁছেছে, 
উঠে সে দেখল, সবকটি লেডিস সীট ভর্তি,
কেবল একটি সীটে একজন স্কুল পড়ুয়া ছেলে বসে আছে,বয়স তার ষোল সতের হবে,
মেয়েটিকে দেখে নিজে থেকেই সে ছেড়ে দিল সীট,
মেয়েটি অন্য স্বাভাবিক দিনে কখনো কোনো পুরুষ যাত্রীকে সীট ছেড়ে উঠে যেতে বলে না,
কিন্তু আজ নিরুপায় হয়ে সে আর বারণ করতে পারল না ছেলেটিকে,
বসে পড়ল সেই সীটে,
আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগলেন, 'একটা স্কুলে পড়া ছেলে,তাকেও উঠিয়ে দিয়ে বসে পড়ল!মানে মেয়েগুলোও এমন!'
 পাশ থেকে অন্য এক যাত্রী টোন কাটলেন, 'আসলে ফ্রিতে কিছু পেয়ে গেলে সেটা কে না নেয় বলুন!'
একটা হাসির রোল উঠল যাত্রীদের মধ্যে,
মেয়েটি কিছু বলতে পারল না, কারণ এক্ষেত্রেও সমাজ অনুমতি দেয়নি তাকে,
আর যদিও বা বলে সবটা, সকলে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে!
বাস এসে গেল মেয়েটির কলেজের স্টপেজে,
নেমে গেল মেয়েটি, লিফটের দিকে এগোলো সে,
তার পরীক্ষা হবে চারতলার এক ঘরে,
কিন্তু হায়! সেখানে গিয়ে শুনল লিফটটাও আজ খারাপ!
মেয়েটি বেশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ল,
এই শরীরে কিভাবে চারতলা পর্যন্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠবে সে ভেবে পেল না,
তবুও নিরুপায় হয়ে, সিঁড়ির রাস্তাটাই ধরল সে,
অনেক কষ্টে পরীক্ষাহলে পৌঁছালো সে,
দু'ঘন্টা একটানা বসে পরীক্ষা দেওয়াটাও বেশ কষ্টকর, তবুও অনেক কষ্টে পরীক্ষাটা দিল সে,
পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর হল থেকে বেরোচ্ছিল যখন, হঠাৎ কানে এল এক কোলাহলের শব্দ, 
সে ঘুরে দেখে,তার সহপাঠী কিছু ছাত্র তাকে দেখে হাসছে,
মেয়েটি কিছু বোঝার আগেই হঠাৎ তাদের ক্লাসের ম্যাম এসে তাকে বললেন, 'মেয়ে হয়েছ,আর এসব দিনে নিজেকে সামলে চলতে শেখোনি!' বলেই মুখ বেঁকিয়ে চলে গেলেন তিনি,
মেয়েটির সহপাঠিনীরা বলল, 'জামাটার কি হাল করেছিস দেখ ভালো করে!'
এতক্ষণে খেয়াল করল সে, অসাবধান বশত দাগ লেগে গেছে জামায়, আর সেটাই এত হাসির কারণ!
মেয়েটা আর পারল না সহ্য করতে, দু হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল মাটিতে, চোখ ফেটে এল জল,
হঠাৎ এক পুরুষকন্ঠ শুনতে পেল সে!
তাকিয়ে দেখে তাদেরই একজন স্যার,
যথেষ্ট বয়স হয়েছে তাঁর, এক দুবছরের মধ্যেই রিটায়ার করবেন,
তিনি এগিয়ে এসে বললেন, 'এসো আমার গাড়িতে এসে বসো, আমি তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি।'
মেয়েটির মুখ থেকে কোনো কথা সরছে না ঘটনার আকস্মিকতায়,
স্যার বললেন, 'আমার ঘরেও মেয়ে আছে,ঠিক তোমারই মতো,
আজ যদি তোমার জায়গায় সে থাকত, তবে কি আমি তাকে গাড়িতে করে বাড়ি পৌঁছে দিতাম না!'
এতক্ষণে মেয়েটার মুখে হাসি ফুটল, চোখের জল মুছে ফেলল সে,
এগিয়ে গেল স্যারের গাড়িটার দিকে,
একজন মানুষ তো অন্তত তার নিস্তব্ধতার কষ্ট বুঝতে পেরেছেন, এটুকুই বা কম কি!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ