Advertisement

জন্ম দিলেই হয় নাকো মা


জন্ম দিলেই হয় নাকো মা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

 অদিতি খুব ভয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরছে আজ।ও আর সৈকত হাত ধরে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিল,সেটা অদিতিদের প্রতিবেশী ভবেশকাকু দেখে ফেলেছে।সেই থেকেই বুক টিপ টিপ করছে সমানে ওর।ভবেশকাকু যা কান পাতলা,কথাটা হয়ত বলেও দিয়েছে এতক্ষণে বাড়িকে।না জানি কি তুলকালাম হবে ও বাড়ি ফিরলে!
  মা বাবাকে বড্ড ভয় পায় অদিতি,বিশেষত মাকে।সেই জন্ম থেকেই মা আর ভয় তার কাছে সমার্থক।অন্য বন্ধু বান্ধবদের মা বাবাকে ও দেখেছে,যে কত আন্ডারস্ট্যান্ডিং তাঁরা,অথচ তার মা!যেটা একবার মনে গেঁথে নেয়,হাজার লজিক দিলেও আর সেখান থেকে বেরিয়ে আসে না মা,নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তই সঠিক বলে বিবেচিত হয় মায়ের কাছে,এমনটাই দেখে এসেছে সে।
  যা ভেবেছিল ঠিক তাই হল।বাড়ির কলিংবেল বাজাতেই অদিতির বাবা এসে খুলে দিলেন গেট।অন্যদিন মা খোলে,আজ বাবাকে খুলতে দেখে বেশ অবাক হল অদিতি।অবাক হয়ে বাড়িতে ঢুকতে যাবে এমন সময় বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে আসা চিরুনির ধার কপালে লেগে কপাল ছড়ে গেল তার।আতঙ্কিত হয়ে গেট থেকে বেশ কিছুটা দূরে সরে গিয়ে দাঁড়াল সে।বাড়ির ভেতর থেকে তীর বেগে বেরিয়ে এল মা,হাতে গরম খুন্তি।এসেই রীতিমতো চিৎকার করতে লাগলেন তিনি, 'বাবা-মার সম্মান পায়ের তলায় পিষে দিয়ে বাড়ি ফেরার মর্জি হল তবে মহারাণীর?' 
  অদিতির বাবা বিকাশবাবু এগিয়ে এলেন, 'মেয়েটা সবে কলেজ থেকে ফিরল,আগে তো বাড়িতে ঢুকতে দাও,তারপরেই না হয় যা বলার বোলো।'
— 'থামো তুমি!' চিৎকার করে উঠলেন অদিতির মা মহুয়া,'এই তোমার প্রশ্রয়েই তো দিন দিন অসভ্য হয়ে উঠেছে মেয়েটা!তুমি পুরুষমানুষ, কোথায় কড়া শাসন করবে মেয়েকে,দরকার হলে লাঠি ভাঙবে ওর পিঠে,তা নয়,মেনি বেড়ালের মতো মিনমিন করছ!এরকম কাপুরুষ বাপ ঘরে থাকলে আর মেয়ে মানুষ কি করে হবে!'
 থেমে গেলেন বিকাশবাবু।প্রতিবাদ করতে গেলেই মহুয়া আবার পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতে শুরু করবেন,আর অপমান করবেন।তিনি শুধু বললেন, 'আচ্ছা বেশ,আমিও শাসন করব আজ ওকে,আগে ভেতরে তো আসতে দাও!'
 — 'যাক শুনে ভালো লাগল! আর এই যে শয়তান মেয়ে,বাইরে দাঁড়িয়ে কি নাটক দেখাচ্ছিস পাড়ার লোককে?ভেতরে আয় বাইরে না দাঁড়িয়ে থেকে!'
 অদিতির হঠাৎ কি হল কে জানে,সে বলে উঠল, 'না!ভেতরে যাব না আমি কিছুতেই!'
— 'তবে রে!অন্যায় করে আবার মুখে মুখে চোপা!চল জানোয়ার মেয়ে ঘরে!' বলেই চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে বাড়ির ভেতরে টেনে নিয়ে গেলেন মহুয়া অদিতিকে।ঘটনার আকস্মিকতায় অদিতি পড়ে গেল,হাঁটু ছড়ে গেল তার,কিন্তু মহুয়ার সেসবে খেয়ালই নেই।বাড়ির ভেতরে এসেই অদিতি বলল, 'আগে ফ্রেস হয়ে আসি আমি,তারপর না হয় আমায় বোকো মারো যা ইচ্ছে কোরো!'
— 'হ্যাঁ যা না যা,বাথরুমে ঢুকে ওইসব ক্রিম ফেসওয়াশ মাখ গে,আর রাজ্যের ছেলেদের নিজের সুন্দর মুখের ছবি তুলে পাঠা!পড়াশোনার তো নামগন্ধ নেই,এদিকে ছেলেবন্ধু জোটানো হয়েছে ঠিক!ইচ্ছে হয় অমন পোড়া মুখে অ্যাসিড ঢেলে দিই,তবে যদি ছেলেদের ওনার প্রতি ছুকছুকানি একটু কমে!'
অনেকটা সময় কেটে গেল,কিন্তু বাথরুমের দরজা খুলে আর বেরিয়ে এল না অদিতি।বিকাশবাবু এবার চিন্তায় পড়ে গেলেন,মহুয়াদেবীকে বললেন,'মেয়েটা ফিরতে না ফিরতেই ওর ওপর এত অত্যাচার না করলেই পারতে!দেখো হয়ত বাথরুমে বসে কাঁদছে মেয়েটা!ঘরে বসে যে দুদন্ড কাঁদবে,সেটাও পারেনা তোমার জ্বালায়!'
— 'এই থামো তো তুমি বুড়ো মিনসে কোথাকার!এই তোমার জন্যই আজকাল কলেজ যাওয়ার নাম করে ছেলে চড়িয়ে বেড়ায়!সেদিনই তো ওর ক্লাসমেট অজন্তাকে ফোন করলাম,কলেজে গিয়েছিল কিনা জানতে,অজন্তা বলল আসেনি,কোন্ এক প্রেমিকের সাথে ঘুরতে গেছেন তিনি!আমার তো সন্দেহ হয় আদৌ কলেজ যায় তো একদিনও?'
— 'বোকার মতো কথা বোলোনা মহুয়া,তুমি ভালো করেই জানো অজন্তা ওসব বানিয়ে বলেছিল!ও যে অদিতিকে হিংসে করে,জানোনা তুমি?'
— 'হ্যাঁ সেই তো,রাজ্যশুদ্ধু সবাই ওনার মেয়েকে হিংসে করে!ক্লাসে ফার্স্ট যেন আর কেউ হয়নি কোনো জন্মে ওনার মেয়ে ছাড়া!'
— 'বাজে বোকো না মহুয়া,লজিক্যাল কথা বলো!মেয়েকে কড়া শাসনে রাখবে মানে এই নয় যে যেক্ষেত্রে ওর দোষ নেই সেই ক্ষেত্রেও তুমি মারধোর করবে ওকে!তাছাড়া ওদের কলেজে পরীক্ষায় বসার জন্য ৬০% উপস্থিতি লাগে,যদি কলেজ এতই কামাই করত ও তাহলে আর পরীক্ষায় বসতে হত না ওকে,আর দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষায় প্রথমও হওয়া হত না!এত ভালো একটা মেয়ে আমাদের,কোথায় গর্ব করবে ওকে নিয়ে তা না.....'
— 'হুহ,গর্ব!মেয়ে যেন ওনার নোবেল পেয়েছে!'
— 'হ্যাঁ অবশ্য তুমি যেমন মানুষ সেদিনও তুমি ওকে বিন্দুমাত্র অ্যাপ্রিশিয়েট করবে বলে মনে হয় না!যাই হোক এখানে দাঁড়িয়ে এত তর্ক করার সময় আমার নেই,দেড় ঘন্টা হয়ে গেল মেয়েটা বাথরুম থেকে এখনো বের হল না,ফ্রেস হতে এতক্ষণ সময় লাগার তো কথা নয়!' 
বিকাশবাবু বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলেন,'অদিতি,দরজাটা খোল মা!'
ওপার থেকে কোনো উত্তর এল না।হঠাৎ মহুয়া দেবী খেয়াল করলেন,অদিতির ঘরে ওর ব্যাগটা নেই,নেই ওর মোবাইলটাও!
— 'নিশ্চয়ই দেখো ওই ছেলের সাথেই ভেগেছে!' চিৎকার করে উঠলেন মহুয়া,'আরও গরব করো মেয়েকে নিয়ে!'
বিকাশবাবু আর মহুয়াদেবী অনেক কষ্টে বাইরে থেকে দরজাটা ভেঙে ঢুকলেন বাথরুমের ভেতরে,দেখলেন অদিতি কোত্থাও নেই,বাথরুমের বড়ো জানালাটা খোলা,যে জানালা দিয়ে একজন মানুষ অনায়াসেই বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে,আর আয়নার কাছে রাখা আছে একটা চিঠি,আর পাশে একটা গোল্ড মেডেল।
— 'ওই দেখো বুড়ো,তোমার মেয়ের কান্ডটা দেখো শুধু!কোন্ ছেলের সাথে ভেগেছে,তাই চিঠি দিয়ে গেছে গো!এবার আত্মীয়স্বজন,পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে কি করে মুখ দেখাব গো!এ কি সর্বনাশ করল জানোয়ার মেয়েটা,আমাদের ফ্যামিলির মান সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিল!'
— 'সব সময় এত সিনক্রিয়েট যে কেন করো তুমি!' বিরক্তমুখে বললেন বিকাশবাবু,'আগে তো দেখো কাগজে কি লেখা আছে!'
কাগজটা খুললেন বিকাশবাবু,দেখলেন কাগজে অদিতির হাতে কিছু লেখা,আর ওই চিঠির সাথে আটকানো অদিতির তৃতীয় বর্ষের মার্কসিটের একটা ফোটোকপি।বিপিনবাবু চিঠিটা পড়তে লাগলেন।
'মা,বাবা,
      আমি তোমাদের খারাপ মেয়ে,অদিতি সাহা।সেই ছোট্টবেলা থেকে আজ পর্যন্ত তোমাদের শুধু কষ্ট দিয়েছি আমি,আমার জন্য সম্মান নষ্ট হয়েছে তোমাদের সবার কাছে।মা চেয়েছিল পুত্র সন্তান,কিন্তু আমার জন্য মায়ের সেই আশা নষ্ট হয়েছে।মা চেয়েছিল আমি গান শিখি,কিন্তু ওটাও আমি ঠিক করে পারিনি।মা চেয়েছিল আমি যেন কখনো কোনো ছেলের সাথে শুধু বন্ধু হিসেবেও না মিশি,অথচ আজ দেখো!একটা ছেলের হাত ধরেই গোটা পাড়া হেঁটে বাড়ি ফিরলাম আমি!অনেক চেষ্টা করলাম তোমাদের ভালো রাখতে,পারলাম না।অনেক ভেবে তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি,তোমাদের জীবন থেকে আমি সরে যাব,ভেবে নিও আজ আমি কলেজ থেকে বাড়িই আর ফিরিনি,রাস্তায় একটা অ্যাক্সিডেন্টে মরে গেছি আমি।মা ই তো কথায় কথায় বলে,'তোর মত অসভ্য মেয়ে থাকার চেয়ে শূন্য বাড়িই ভালো,তাই চিরতরে শূন্য করেই চলে গেলাম এ বাড়ি ছেড়ে।
      আর মা,বাবা,শুধু তোমাদের জন্য না গো,আমি কিছুটা নিজের জন্যও এই বাড়ি ছেড়ে,তোমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি।হয়ত কথাটা খুব স্বার্থপরের মতো শোনালো,তাও আমি বলতে বাধ্য ছচ্ছি যে এই বাড়িতে আমার অবস্থা ছিল শাঁখের করাতের মতো,যেদিকেই এগোই সেদিকেই আতঙ্ক গ্রাস করেছিল আমায়।মায়ের কাছে আমার ভালো লাগা,খারাপ লাগার চেয়ে ইমপরট্যান্ট ছিল আশপাশের লোকেরা কি বলল!আমি তখনই ভালো যখন অন্য লোকেরা আমায় ভালো বলবে,নইলে না!আমি কন্যাসন্তান বলে মায়ের আপত্তি ছিল,কারণ পুত্রসন্তানের মায়েরা মাকে মুখ কুঁচকে বলত,'এ বাবা,তোমার তো মেয়ে গো!বিয়ে করে বিদেয় না করা পর্যন্ত কি আর শান্তি আছে!' তাই জন্মের পর থেকেই আমি হয়ে গেলাম মায়ের সমস্ত দুর্ভাগ্যের কারণ।উঠতে বসতে সামান্য কারণে মার খেয়েছি,কান্নাকাটিটুকু পর্যন্ত করতে পারিনি ভয়ে।পরীক্ষায় ক্লাসে হায়েস্ট মার্কস না পেলে খেতে বসেও আমায় কথা শুনতে হয়েছে,প্রতি মুহূর্তে তুলনা করা হয়েছে ক্লাসের ফার্স্ট স্টুডেন্টের সাথে।খেতে খেতে গলা বুজে আসত আমার লজ্জায়,অপমানে,কিন্তু কোনোদিন মুখ ফুটে কিচ্ছু বলতে পারিনি,বললেই তো আমার ঘাড়ে পিঠে পড়বে কালশিটের দাগ,তারপর সেই দাগ দেখে আমার বন্ধুমহল আমার আড়ালে হাসাহাসি করবে,বলবে,'ভাব শুধু,এই বয়সেও মায়ের কাছে মার খায়!' আসলে জানো তো,আমাদের সমাজ বড়ো অদ্ভুত!জীবনসঙ্গী গায়ে হাত তুললে হয় ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স,কিন্তু কলেজ পড়ুয়া মেয়ের গায়ে সামান্য কারণে মা যদি হাত তোলে,চামড়া হয় রক্তাক্ত,সেটা হয় জাস্টিফায়েড!কারণ মা যদি আমায় এক রাত খেতে না দেয়,এমনকি বাড়িতেও ঢুকতে না দেয়,হিমশীতল রাত আমায় উঠোনে বসেই কাটাতে হয়,তবুও সমাজ হেসে বলবে,মা বাবা তো!যা করবে সন্তানের ভালোর জন্যই করবে,সে সন্তান যতই নার্ভাস হয়ে পড়ুক,ডিপ্রেশনের অতলে তলিয়ে যাক,কাটাক ঘুমহীন কান্নাভেজা রাত!অথচ আমি সাফল্য পেলে কখনো তোমরা এসে বাহবা দাওনি,শুধু বলেছ,'ওরকম ফার্স্ট প্রত্যেক বছর কেউ না কেউ হয়,ওতে আর নতুন কি!তাই বলে কি মাথায় নিয়ে নাচব নাকি?' সায়েন্স নিয়ে পড়ে উচ্চমাধ্যমিকে আমি ভালো রেজাল্ট করলাম,তোমরা চেয়েছিলে আমি হই ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার,কিন্তু ততদিনে আমি একটু হলেও নিজের ইচ্ছেটুকু জানাতে শিখেছি,তাই বলেই দিলাম,'আমি বাংলা নিয়ে গড়তে চাই আমার কেরিয়ার,কয়েকটা কলেজে ফর্মও ফিলাপ করেছি বাংলা অনার্সের।' 
      শুরু হল আবার একচোট 'কড়া শাসন'।এক রাত আমায় খেতেই দেওয়া হল না।কিন্তু আমি এইবার নাছোড়বান্দা,তাই দরজা এঁটে রইলাম বসে,একদিন ইচ্ছে করেই না খেয়ে শুয়ে থাকলাম ঘরে,মাথা ঘুরে গেল আমার,সেন্সলেস হয়ে পড়লাম মেঝেয়,এইবার একটু হলেও দয়া হল তোমাদের,বাংলায় অনার্স নিয়েই ভর্তি হলাম আমি।যদিও এই নিয়ে পরে অবশ্য আমায় শুনতে হয়েছে,যে 'ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল' করে কাজ হাসিল করেছি আমি।এরপর শুরু হল বাড়িতে আলাদা এক অসন্তোষ!কোনো ছেলেবন্ধু পড়ার প্রয়োজনে আমায় ফোন করলেও জুটেছে মার,আমার কথা সামান্যতম বিশ্বাস করার প্রয়োজনবোধ করোনি তোমরা,বিশ্বাস করেছ অন্যদের কথা,আমি যে সত্যি বলতে পারি এটা যেন খুব অবাস্তব!আর এই সুযোগ টাই দিনের পর দিন নিয়ে গেছে অজন্তা।আমার প্রতি বরাবরই ওর একটা বিদ্বেষ ছিল,রেষারেষি করত ও রেজাল্ট নিয়ে,কারণ ও প্রতিবার সেকেন্ড হত,আর আমি ফার্স্ট।মা ফোন করলেই ও বলত,আমি কলেজ আসিনি,বেড়াতে গেছি ছেলেবন্ধুদের সাথে,আর মা সেটাই বিশ্বাস করত,আর বাড়ি ফিরতেই শুরু হত চেঁচামেচি,অশান্তি।জবাবদিহি করতে করতে আর শাসনের নামে এই অত্যাচার সইতে সইতে আমি ক্লান্ত বিশ্বাস করো,বড্ড ক্লান্ত।প্রতিদিন বাড়ি ফিরতে আমি ভয় পেতাম,কি জানি আজ কি অপেক্ষা করে আছে আমার জন্য!ভেবেই শিউরে উঠতাম।তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম,এই বাড়ি আমি ছাড়ব,একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই আমি,আর পড়াশুনাটাও চালিয়ে যেতে চাই নির্বিঘ্নে।
      চিন্তা কোরোনা,আমি কার সাথে বাড়ি ছাড়ছি এটাও বলব।মা,বাবা,আমাদের বাড়ির উল্টোদিকেই যাঁর বাড়ি,তাঁর নাম পূজা রায়,আমাদের কলেজের প্রফেসর,আমাদের বাংলা ডিপার্টমেন্টেরই।উনি অবিবাহিতা মানুষ,কলেজের ছাত্রছাত্রীরাই ওঁর সন্তানসম।তোমাদের মনে আছে,আমি প্রায়ই ওনার বাড়িতে যেতাম পড়া বোঝার জন্য,কিন্তু পড়া বোঝার চেয়ে বেশি আমি ওঁর কাছে মনের কষ্টের কথা শেয়ার করতাম,উনি স্নেহময়ী মায়ের মতো নিজের কোলে আমার মাথা টেনে নিতেন,কপালে মাথায় হাত বুলিয়ে সমব্যথী হতেন।আস্তে আস্তে কবে যে তাঁকেই আমি মায়ের আসনে বসিয়েছি নিজেই বুঝিনি।তাই 'ম্যাম' ডাকটাও হয়ে উঠল 'মামণি','আপনি' থেকে হল 'তুমি'।মাঝেমধ্যে এরকমও হত,যখন আমি মামণিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতাম,বলতাম,'মামণি,আমি বাড়ি যাব না,আমায় তোমার কাছে রেখে দাও না!' দেখতাম,মামণির চোখেও বিন্দু বিন্দু জল জমেছে,বলতেন,'এই বাড়ি তো তোমারও বাড়ি,সবসময় এই বাড়ির দরজা খোলা তোমার জন্য,যখন ইচ্ছে চলে এসো।' এদিকে বাড়িতে দিনের পর দিন ভয়ে আতঙ্কে থাকতে থাকতে আমি একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম,কিন্তু সেদিকে তোমাদের হুঁশ কই?তোমরা তো ব্যস্ত আমার সাথে পাড়ার,কলেজের অন্য ছেলে মেয়েদের সাথে তুলনা করতে।মায়ের ভয়েই আমি আত্মীয় বাড়িতে গিয়েও ছেলেদের এড়িয়ে গেছি,তখন আমায় শুনতে হয়েছে,আমি আনস্মার্ট,মিশতে জানিনা,তারপর আবার একচোট ঝড় বয়ে গেছে বাড়িতে।তোমরা হয়ত কোনোদিন আমায় মানুষ বলেই গণ্য করোনি,ভেবেছিলে সারাজীবন রোবট হয়েই থাকব তোমাদের,আর যন্ত্রের আবার মন কি?তাইজন্যই আমার মন কেমন আছে সেটা তোমরা কোনোদিন জানার চেষ্টা করোনি।বাবা আমি জানি,তুমি হয়ত ভাবছ,যে তুমি তো কখনো আমার গায়ে হাত তোলোনি,কড়া শাসনের নামে অত্যাচারও করোনি,তাও আমি তোমাদের দুজনকেই দায়ী করেছি কেন?বাবা,তুমি আমায় বকোনি,যা বলেছ সবটাই বুঝিয়ে বলেছ,কিন্তু সেসব মায়ের অনুপস্থিতিতে।মায়ের উপস্থিতিতে কোনোদিন মাকে বাধা পর্যন্ত দাওনি,তোমার সামনেই মা কলেজ পড়ুয়া আমাকে জুতো দিয়ে পর্যন্ত মেরেছে সামান্য কারণে,তুমি দাঁড়িয়ে দেখেছ সবটাই,কোনো প্রতিবাদ করোনি।অন্যায় যে সহে,সেও তো সমান দোষী হয়,তাই না বাবা?তাই এবাড়ি ছেড়ে আমি চললাম মামণির কাছে,মামণি আমায় আজই কলেজে বলল,'তোর চোখের তলায় কালি পড়ে গেছে রে অদিতি,শরীরটাও ভেঙে পড়েছে কেমন,নিজের যত্ন নিস না নাকি রে?শোন্,আমি তোকে বলছি,এরপর যদি আর একটা দিনও অশান্তি হয় বাড়িতে,তোর ওপর অত্যাচার চলে শাসনের নামে,তুই নির্দ্বিধায় আমার কাছে চলে আসিস।তুই-আমি যে পাড়ায় থাকি,সেখান থেকে অনেক দূরের এক পাড়ায় আমার একটা ফ্ল্যাট আছে,মা-মেয়ে ওখানেই উঠব,কেমন?আমার কাছে থেকে তুই পড়াশুনা করবি,তারপর নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বিয়ে করবি সৈকতকে।'
      ও,তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ সৈকত কে?সৈকত চৌধুরী,যাকে আমি ভালোবাসি।আমাদের কলেজে ও পড়ে না,পড়ে অন্য কলেজে।মামণির মাসতুতো দিদির মেয়ে ও,আমারই বয়সী।মামণির মাধ্যমেই পরিচয় হয়েছিল আমার ওর সাথে,তারপর কবে যে ভালোবেসে ফেললাম একে অপরকে,টেরই পেলাম না!আজ আমি ওর হাত ধরেই বাড়ি ফিরেছি,জানো!
      চিঠির একদম শেষ দিকে এসে গেছি।আজ ইউনিভার্সিটির রেজাল্ট ছিল,ফাইনাল ইয়ারের।তিনটে ইয়ার মিলিয়ে আমি শুধু কলেজ থেকে নয়,ইউনিভার্সিটি থেকেও প্রথম হয়েছি।আজ কলেজে তাই ছোট্ট অনুষ্ঠান হয়েছে,ডিপার্টমেন্ট থেকেই এই মেডেলটা পেয়েছি আমি,মামণি নিজের হাতে পরিয়ে দিয়েছে এটা আমায়।তোমরা ভালো করেই জানো,এই মেডেল,ট্রফি,স্কলারশিপ এসবের চেয়ে কাছের মানুষগুলোর ভালোবাসাই আমার কাছে বেশি মূল্যবান পুরস্কার,যেটা আমি মামণি আর সৈকত ছাড়া আর কারো কাছে পাইনি কখনো।তবে মায়ের কাছে তো এগুলোই আসল,তাই এই গোল্ড মেডেলটা আর মার্কসিটের একটা ফোটোকপি রেখে গেলাম বাড়িতে,মা,সবাইকে এগুলো দেখিয়ো,আশাকরি আর তোমায় সবার কাছে অসম্মানিত হতে হবে না আমার জন্য।এক মাস পর ইউনিভার্সিটির পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান আছে,ওখানেও যে গোল্ড মেডেলটা আমি পাব,তোমাদের পার্সেল করে দেব,চিন্তা কোরোনা।আমি এলাম,তোমরা ভালো থেকো।'
                                          — ইতি,তোমাদের অপ্রিয়
অদিতি
(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ