এতই সহজ?
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'এত আস্তে হাঁটিস কেন রে ভাই তুই?লেডিস নাকি?' অমিয় টিটকিরি দিল তার বন্ধু পরেশকে।
— 'সিরিয়াসলি ভাই,ও লেডিসই,নইলে একটা মেয়েকে ধরে রাখতে পারে না!ওর গার্লফ্রেন্ড নাকি ব্রেকাপ করেছে ওর সাথে!' পাশ থেকে অর্ক ফুট কাটল।
— 'বলিস কি!শোন পরেশ,এক কাজ কর,সামনের দোকান থেকে ক'টা চুড়ি কিনে আন,তারপর হাতে চুড়ি পরে বসে থাক,মেয়ে হয়ে যা পুরোপুরি!'
— 'তাই নাকি?হাতে ক'টা চুড়ি পরলেই ও মেয়ে হয়ে যাবে?এতই সোজা?'
এক নারীকন্ঠ শুনে পিছন ফিরল অমিয়,পরেশ আর অর্ক।পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবতীটি বলে যেতে লাগল, 'হাতে ক'টা চুড়ি পরলেই ও আমাদের মতো হয়ে যাবে?বাড়িতে প্রতিটা মুহূর্ত লড়াই করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়েছে আমায়,বাড়ি থেকে পড়াশুনা করাতে চায়নি আমায়,সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় টিউশনি পড়িয়ে পড়ার খরচ চালিয়েছি আমি,প্রতি মুহূর্তে বিয়ের জন্য জোর করেছে আমায় আমি মেধাবী ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও,অথচ দাদাকে এসব কখনো ফেস করতে হয়নি।বাসে-ট্রামে প্রতিনিয়ত তোমাদের মতো কিছু অমানুষের নোংরা হাত স্পর্শ করেছে আমায়,ছেড়ে দিইনি আমিও,কষিয়ে চড় মেরেছি,তা সে কুড়ি বছরের হোক,বা সত্তর বছরের।প্রতি মাসে পিরিয়ডের যন্ত্রণা-অস্বস্তি নিয়েও পড়াশুনায়,কাজে বেরিয়েছি।বেখেয়ালে জামায় রক্তের দাগ লেগে গেলে তোমাদের মতো কিছু কাপুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে হেসেছে কিছু মেয়েও,তাদেরও ছাড়িনি আমি,সোজা মুখের ওপর প্রশ্ন করেছিলাম, 'তোমাদের মায়েদের এমনটা হয়না বুঝি?জিজ্ঞেস করো তো বাড়ি ফিরে!' জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে দাঁতে দাঁত চেপে পুরুষের সাথে,সমাজের সাথে সমান তালে লড়াই করার পরেও এই ২০২০ তে আমায় প্রশ্ন করা হয়েছে,আমি ক্রিকেট-ফুটবল বুঝি কিনা,কারণ আমি নারী,আর সমাজ বলে 'মেয়েদের বুদ্ধি থাকে হাঁটুর নীচে!' বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মা-বাবা চিন্তা করে,কারণ যতই আমি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করি,নিজস্ব বাড়ি গাড়ি কেনার ক্ষমতা রাখি,আমার নারী শরীর আছে,তাই তোমাদের মতো কিছু কাপুরুষের চোখে পিৎজা-বার্গারের মতোই আমি একটা খাবার,যাকে অনায়াসে সকলে মিলে ভাগ করে খেয়ে সাধ মিটে গেলে ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায়!পাঁচটা বাড়ি থেকে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছিল,নাকচ হয়ে গেছে শুধুমাত্র আমি চাকরি করি বলে,ঘরের ছেলে একশোবার বাইরে কাজে যাবে,তা বলে ঘরের বৌ?তাও কি হয়! আমিও বলে দিয়েছিলাম তাদের, 'কুমোরটুলি থেকে মাটির পুতুল অর্ডার দিন ছেলের জন্য,বেটার হবে।হাঁটতে চলতেই পারবে না পুতুল,তো বাইরে যাবে কি করে?' স্বামীর জীবনে কোনো সমস্যা হলে তার স্ত্রীকেই অপয়া,অলক্ষী বলা হয়,গায়ে ছেটানো হয় চরিত্রহীনতার কালি,আর এসব কাজে লিপ্ত হন মহিলারাই।
কিছুক্ষণের জন্য যুবতীটি থামল।তারপর বলল, 'সমাজের বিরুদ্ধে,কিছু কাপুরুষের বিরুদ্ধে,এমনকি নারীসমাজের একাংশের বিরুদ্ধেও অবিরাম লড়াই করে যেতে হয় আমাদের প্রতিনিয়ত শুধুমাত্র নিজের মতো করে বাঁচার জন্য,নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য।তবুও হার মানি না আমরা,পরিস্থিতি অনুযায়ী দশভুজার মতো হাতে অস্ত্র তুলে নিই আমরা,আবার সেই দশভুজা হয়েই আগলে রাখি কাছের মানুষদের।শুধুমাত্র হাতে ক'খানা চুড়ি পরলেই নারী হয়ে যাবে তোমরা?এতই সহজ নারী হয়ে ওঠা?'
0 মন্তব্যসমূহ