সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সংহিতার দিনগুলো কাটছিল ভালোই।সেই উত্তরবঙ্গ থেকে ও পড়তে এসেছে কলকাতার কলেজে।ও যেদিন রওনা দিয়েছিল জলপাইগুড়ির বাড়ি থেকে,ওর মা ভীষণ কাঁদছিলেন মেয়েকে জড়িয়ে।পল্লববাবু আর রোহিনীদেবীর দুই মেয়ে,অপর্ণা,আর সংহিতা।বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়েছে দিল্লিতে বছর চারেক হল।জামাই সুদীপ্ত বসু বাঙালি পরিবারের সন্তান,চাকরি সূত্রে স্ত্রীকে নিয়ে থাকে দিল্লিতে।বড়ো মেয়ের বিয়ের পর ছোট মেয়েই ছিল তাঁদের একমাত্র অবলম্বন,সেও বাড়ি শূন্য করে কলকাতায় চলে যাচ্ছে বলে বড্ড মনমরা হয়ে আছেন দুজনেই,রোহিনীদেবী মাঝেমধ্যেই কান্নাকাটি করছেন মেয়েকে জড়িয়ে,পল্লববাবু কান্না বুকে চেপে বলছেন,'ওরকম ভাবে কাঁদছ কেন?মেয়ে কি সারাজীবনের জন্য আমাদের ছেড়ে যাচ্ছে নাকি?ব্রাইট কেরিয়ার গড়তে কত স্টুডেন্ট দেশের বাইরে যায়,সেখানে ও কলকাতা যাচ্ছে মাত্র,ছুটি পড়লেই চলে আসবে ও।'
— 'একদমই তাই মা',সংহিতা রোহিনীদেবীর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল,'এই তো এখন জুন মাস,অক্টোবরেই পুজোর ছুটি পড়বে,আমি আবার চলে আসব তোমার কাছে।'
সংহিতা এরপর পাড়ি দিয়েছিল কলকাতার পথে।কলেজের হোস্টেলে থাকে ও,আর পড়াশুনা করে।হোস্টেলে সংহিতার রুমমেট বিদিশা,বিদিশা দাশগুপ্ত,কলেজ কাম হোস্টেলের বেস্টফ্রেন্ড সংহিতার।বিদিশা এসেছে মুর্শিদাবাদ থেকে।পড়াশুনা থেকে শুরু করে বাড়ির কথা,মা বাবার কথা কোনো কিছুই গোপন নেই দুই বেস্টফ্রেন্ডের মধ্যে।
কেটে গেছে একটা বছর।দুজনেই এখন সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।ইতিমধ্যে সংহিতা প্রেমেও পড়েছে কলেজেরই একটি ছেলের,নাম তার বিহান,বিহান সোম।ফার্স্ট ইয়ার থেকেই দুজনের প্রেমে পড়া একে অপরের,তারপর সেকথা জানানো একে অপরকে,তারপর নদীর ধারে বিকেল কাটানো,কলেজ স্ট্রিটে চা খাওয়া সব মিলিয়ে দুই কপোত-কপোতী মন খুলে লাভ লাইফ কাটিয়েছে।তাদের এই ঘনিষ্ঠতা যে কখন অন্তরঙ্গতায় রূপ নিয়েছে তা তারা নিজেরাই বুঝতে পারেনি।বিহান তাদের ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট নয়,অন্য ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্ট,যদিও কলেজ একই দুজনের।
বিদিশার কাছে এসব কিছুই অজানা নয়।বিদিশা ছাড়া কলেজের আর বিশেষ কেউই জানে সংহিতা-বিহানের সম্পর্কের কথা।সংহিতা আর বিহান দুজনেই একটু সাধাসিধে গোছের,তবে বিদিশা যথেষ্ট স্মার্ট এবং বুদ্ধিমতী মেয়ে,তাই সামনে পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও যখন সংহিতা আর বিহান রাত জেগে ফোনে কথা বলত একে অপরের সাথে,বিদিশাই ধমক দিয়ে ফোন রাখতে বাধ্য করত সংহিতাকে।বলত,'পাগলামি করিস না হিতা,সামনের সেকেন্ড ইয়ারের সিলেকশন এক্সাম।আমাদের কলেজ কতটা কড়া তা তো তুই জানিস,এখানে ৪০% না পেলে কিন্তু ইউনিভার্সিটির এক্সামে তোরা বসতে পারবি না,তাই এখন মন দিয়ে পড়াশুনাটা কর আগে,প্রেমালাপ করার জন্য গোটা জীবন পড়ে আছে!'
— 'তুই তো জানিস দিশা,দিনে অন্তত একবার বিহানের গলা না শুনলে আমার কিচ্ছু ভালো লাগে না,মুড অফ হয়ে যায়!'
— 'মুড অফ হয়ে যায়,না?যখন দুটোতেই ফেল করবি তখন বুঝবি মুড অফ কাকে বলে!'
সিলেকশন এক্সামটা ভালোয় ভালোয় হয়ে গেল,আর সংহিতা,বিহান,বিদিশা সবাই ভালো মার্কস নিয়েই কোয়ালিফাই করল ইউনিভার্সিটি এক্সামের জন্য।কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই সংহিতার শরীরটা কেমন খারাপ হতে শুরু করল।যখন তখন মাথা ঘোরা,গা গুলিয়ে ওঠা এসব শুরু হল।একদিন তো ক্লাসেই সেন্সলেস হয়ে গেল ও,বিদিশাই ওকে হোস্টেলে নিয়ে এল কলেজ থেকে অনেক কষ্টে।
— 'তখন পইপই করে বলেছিলাম,এখন তোরা স্টুডেন্ট,এটা কেরিয়ার গড়ার সময়,প্রেম করছিস কর কিন্তু লিমিট ক্রশ করিস না,শুনলি না আমার কথা!' রাগী গলায় বলল বিদিশা।
— 'দিশা তুই এরকমভাবে বলিস না প্লিজ,আমার অবস্থাটা বোঝ একবার অন্তত!' কাঁদতে কাঁদতে বলল সংহিতা।
— 'তোর অবস্থাটা বুঝি বলেই তখন সাবধান করেছিলাম,শুনেছিলি আমার কথা?আঙ্কেল আন্টি কত আশা করে তোকে কলকাতায় পাঠিয়েছেন পড়াশুনা করতে,তাঁরা যদি শোনেন খবরটা,কি হবে ভাবতে পারছিস?'
— 'না না,মা বাবাকে প্লিজ কিছু জানাস না....'
— 'যাস্ট শাট আপ হিতা!তুই আগে ওই হারামজাদা বিহানকে ফোন করে সবটা জানা,তারপর দেখি কি করতে পারি আমি!'
ওদিকে বিহানের ফোন বেজে বেজে কেটে যায়,কেউ রিসিভ করে না।
— 'কাজ তো মিটে গেছে,আর সে ধরবে কেন ফোন?এখন দেখবি ন্যাকা সেজে বলবে,সংহিতা কে?এই নামে তো কাউকে আমি চিনি না?' বিরক্তমুখে বিদিশা বলল।
কিছুক্ষণ পরে সংহিতার ফোনটা বেজে উঠল,বিহান করেছে ফোন।
'এই তো কল ব্যাক করেছে,আমি জানতাম বিহান এরকম মানুষ নয়!' বলেই হাসিমুখে ফোনটা ধরল সংহিতা।
কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে একজন অচেনা পুরুষের গলা ভেসে এল,'আপনি কি সংহিতা?আসলে এই মোবাইলটা যার,তার একটা রোড অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে,হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে।'
সংহিতার মাথায় যেন বজ্রপাত হল,বিদিশাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ছুটল ও হসপিটালে,কিন্তু ডাক্তাররা জানালেন,স্পট ডেড হয়েছে বিহান।
বিহানের রক্তাক্ত মৃত শরীরটাকে আঁকড়ে একবুক কান্না নিয়ে আর্তনাদ করে উঠল সংহিতা,'তোমার সন্তান আমার গর্ভে বেড়ে উঠছে বিহান,এখন আমি কার কাছে যাব?'
কেটে গেছে বেশ কয়েকটা মাস।বিদিশা বারবার জোর করেছিল সংহিতাকে অ্যাবরশনের জন্য,কিন্তু রাজি হয়নি সংহিতা।হেসে বলেছিল,'জানিস দিশা,আমার দিদি অপর্ণার বিয়ে হয়েছে চারটে বছর,কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও মা হতে পারেনি দিদি।কত উপোস,মানত,ব্রত করেছে দিদি,কত ডাক্তারের কাছে ছুটেছে হন্যে হয়ে,তবু মা ডাক শুনতে পায়নি ও,দিনরাত চোখের জল ফেলে ও সেজন্য।'
— 'ঠিক আছে হিতা,তোর দিশা তো বেঁচে আছে এখনও,সে ই যা ব্যবস্থা করার করবে।'
সংহিতাকে নিয়ে হোস্টেল ছেড়ে একটা ভাড়া করা ফ্ল্যাটে উঠেছিল বিদিশা।পুরো ব্যাপারটা গোপন রাখার জন্য সংহিতার নকল আইডি প্রুফ বানিয়ে সেটা জমা দেওয়া হয়েছে বাড়িওয়ালার কাছে,বিদিশার বাবার এক বন্ধু উকিল হওয়ায় বিশেষ অসুবিধা হয়নি এসবে।বাড়িওয়ালা জানেন,সংহিতা বিদিশার এক আত্মীয়া,ডিভোর্সী,সন্তান জন্ম না নেওয়া পর্যন্ত সে থাকবে বিদিশার কাছে।বিদিশার বাবা গাইনোকোলজিস্ট,তাই সংহিতাকে তিনিই দেখছেন।অন্যদিকে সংহিতার মা-বাবা,দিদি-জামাইবাবু যতবারই দেখা করার জন্য আসতে চেয়েছেন কলকাতায়,কিছু না কিছু বলে বুঝিয়ে বিদিশা তাঁদের আসাটা আটকে দিয়েছে,ফলে তাঁরা কিছুই জানেন না সংহিতার প্রেগন্যান্সির ব্যাপারে।কলেজেও বাবাকে বলে এক মিথ্যে মেডিকেল রিপোর্ট বানিয়ে সেটা জমা দিয়ে সংহিতার ছুটির ব্যবস্থা করে দিয়েছে বিদিশা।সংহিতা একদিন কেঁদেই ফেলেছিল বিদিশাকে জড়িয়ে ধরে,'তুই আমার জন্য যা করলি দিশা,তার ঋণ শোধ করতে পারব না রে কোনোদিন আমি!'
— 'দুর পাগলি,তোর সাথে কি আমার ঋণ শোধের সম্পর্ক?আর বন্ধু হিসেবে সবসময় তোর পাশে থাকা তো আমার কর্তব্য নাকি!'
কেটে গেল দশটা মাস।একদিন ভীষণ যন্ত্রণা শুরু হল সংহিতার,বুঝল ভূমিষ্ট হওয়ার সময় এসেছে তার সন্তানের।বিদিশা তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করল তাকে।
যন্ত্রণা যেন আর সইতে পারছে না সংহিতা,মনে হচ্ছে পেটটা বুঝি ছিঁড়ে যাবে।
— 'মৃত্যুযন্ত্রণা কি এর চেয়েও বেশি কষ্টের?' কাতরাতে কাতরাতে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল সংহিতা,চারিদিক যেন ঝাপসা হয়ে এল।
হঠাৎই সংহিতা সেই চেনা গলাটা পেল,যে গলা সে শেষবারের মতো শুনেছিল দশ মাস আগে।
— 'বিহান তুমি?তুমি এসেছ?' যন্ত্রণায় কাতর সংহিতার গলায় শোনা গেল আনন্দের সুর।
— 'হ্যাঁ আমি এসেছি হিতা!' সংহিতা অনুভব করল,তার প্রিয়তমর হাত স্পর্শ করে আছে তার কপাল।বিহান বলল,'আর একটুখানি হিতা,তারপরেই তো সে আসবে তোমার কোলে!'
সংহিতা মনে অনেকটা জোর পেল যেন।আশপাশের নার্সরা তখনও বলে চলেছে,'আর একটু প্রেসার দিন!'
একটু পরেই তীব্র যন্ত্রণায় অজ্ঞান হয়ে গেল সংহিতা।জন্ম নিল এক কন্যাসন্তান।
জ্ঞান ফেরার পর সংহিতা পাগলের মতো খুঁজেছিল বিহানকে,কিন্তু সেটা আসলে যন্ত্রণার ঘোরে হ্যালুসিনেশন ছাড়া আর কিছুই নয়।
সেই কন্যাসন্তানকে তুলে দেওয়া হল সংহিতার দিদি অপর্ণার কোলে।যদিও অপর্ণা,সুদীপ্ত,রোহিনীদেবী বা পল্লববাবু কেউই জানেন না শিশুটির আসল পরিচয়।তাঁরা জানেন,এক অনাথ শিশুকে দত্তক নিয়েছে অপর্ণারা অনাথ আশ্রম থেকে।এই পুরো প্ল্যানটা সাজিয়েছেন বিদিশা,বিদিশার বাবা,আর লিগ্যাল কাগজপত্র রেডি করে দিয়েছেন বিদিশার বাবার উকিল বন্ধু।অপর্ণা আর সুদীপ্ত শিশুকন্যার নাম রেখেছে বিনীতা।নামটা সংহিতার দেওয়া,আসলে বিহানের বড় ইচ্ছে ছিল ভবিষ্যতে তাদের কন্যাসন্তান হলে তার নাম হবে বিনীতা।
সাত বছর কেটে গেছে।বিনীতার সাতবছরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অনেক গেস্ট আমন্ত্রিত আজ।অনেকেই বললেন,'অপু,তোর মেয়েকে তো দেখতে এক্কেবারে তোর বোনের মতো,ঠিক যেন ওর মুখটাই কেটে বসানো যাকে বলে!'
সংহিতা একটু থতমত খেয়ে গেল যেন হঠাৎই এই আনন্দের দিনে এমন কথা শুনে।কিন্তু বিনীতা অপর্ণার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,'মোটেই আমায় দেখতে মাসিমণির মতো না,আমায় দেখতে আমার মায়ের মতো,তাই না মা?' বলেই ছোট্ট ছোট্ট হাতদুটো দিয়ে অপর্ণার গলা জড়িয়ে ধরল সে।অপর্ণাও বিনীতার কপালে স্নেহচুম্বন এঁকে দিল।
সংহিতা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়নি আর।দিল্লিতেই চাকরি করে সে,আর প্রায়ই আসে বিনীতাকে দেখতে।
বুকে পাথর চাপা দিয়ে স্মিত হেসে সংহিতা বিনীতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,'সারাজীবন মাকে এইভাবেই ভালোবেসো,কেমন?'
(সমাপ্ত)
0 মন্তব্যসমূহ