ভাইরাল
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
১)
অপমানিত,বিধ্বস্ত নলিনী ঘরে ঢুকেই ছিটকিনিটা লাগিয়ে দিল।তার জীবনের সবচেয়ে অভিশপ্ত দিন আজ।প্রতিবারের মতো এবারের বার্ষিক পরীক্ষাতেও কলেজে প্রথম হয়েছে নলিনী,আর দ্বিতীয় হয়েছে অপর্ণা।অপর্ণা যে মনেমনে নলিনীকে যথেষ্ট হিংসা করে তা সে জানত,কিন্তু সে হিংসার আগুন যে এমন ভয়াবহ রূপ নেবে তা সে ভাবেনি।এবছরের ফলপ্রকাশের পরেই অপর্ণা কলেজের ডিপার্টমেন্টে গিয়ে নির্লজ্জের মতো বলে ওঠে,'আপনারা যে রেসিস্ট তা তো জানতাম না রেস্পেক্টেড স্যার এন্ড ম্যাম,নলিনী ফরসা বলে ওকে প্রতিবার হাইয়েস্ট মার্কস দেন ইচ্ছাকৃত,অথচ আমি কালো বলে ভালো পরীক্ষা দেওয়া সত্ত্বেও আমায় দ্বিতীয় করা হয়।আপনারা কি মানুষ?'
এমন উদ্ধত ব্যবহারে ক্রুদ্ধ হয়ে বিভাগীয় প্রধান বলে ওঠেন,'আমরা অবিলম্বে তোমার টি.সি. র ব্যবস্থা করছি।এ কলেজ তোমার মতো অভদ্র ছাত্রীকে চায় না।'
এরপরই অপর্ণা এক সুনিপুণ চাল দেয়।সোশ্যাল মিডিয়ায় সে ডিপার্টমেন্টে ঘটা ঘটনার ভিডিও,এবং নলিনীর ছবি আপলোড করে,সেই সাথে গুছিয়ে লেখে এক মিথ্যা ইতিহাস,যে নলিনী দুধের মতো ফর্সা,এবং সে কৃষ্ণবর্ণা হওয়ার কারণে কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দ্বারা বহুবার হেনস্থার শিকার হয়েছে,এমনকি বিভাগীয় প্রধানের সাথে নলিনীর অবৈধ সম্পর্কও আছে বলে দাবী করে সে।যথারীতি সোশ্যাল মিডিয়ায় রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায় এই পোষ্টটি,সাথে সাথে নলিনী আর বিভাগীয় প্রধানের ওপর নেমে আসে চূড়ান্ত অশ্রাব্য গালিগালাজ।নলিনীর চেনাজানা লোকেরাও তাকে নিয়ে হাসি মস্করা করতে থাকে।
প্রকৃতিগতভাবে শান্ত নিরীহ নলিনী এ বীভৎস অত্যাচার সহ্য করতে পারেনি।আত্মহত্যা করে সে,মাথার পাশে রাখা চিরকুটে লেখা,'
'বর্ণবিদ্বেষী শুধু সে তো নয় কালো চামড়া দেখে যার সিঁটকায় নাক,
বর্ণবিদ্বেষী যে সেও,যে ফরসা মানুষকে দেখতে পারেনা দুচক্ষে,ফিরিয়ে দেয় তাদের ডাক।'
২)
বিশ্বনাথবাবু ফেবুপাড়ার জনপ্রিয় এক নারীবাদী লেখক।কত মহিলা ফ্যান ফলোয়ার তার।প্রতিটি লেখা শত শত শেয়ার পায়,লাইকের বন্যা বয়ে যায়।অথচ বাড়িতে কিন্তু তিনি একেবারে অন্য মানুষ।ফেসবুকে যেমন প্রতিটি লেখায় নারীদের কোনো কষ্টই লিখতে তিনি ভোলেন না,তেমনই রান্নায় নুনটা ঠিকমত না হলে,চা একটু বেশি গরম হলে,একটা মারও স্ত্রীর গায়ের বাইরে ফেলেন না তিনি।পিঙ্কি অসহায় বাপ মা মরা মেয়ে,দাদারাও খোঁজ নেয় না বোন মরল কি বাঁচল,তাই বেচারা এতদিন স্বামীর হাতে মার খেয়ে কোনোরকমে পড়ে ছিল।
হঠাৎই একদিন পিঙ্কির কলেজ জীবনের এক বন্ধু সুরজিৎ বিশ্বনাথবাবুদের পাড়ায় বাড়ি কিনে চলে আসে।কিছুটা হলেও যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে পিঙ্কি।একদিন রাতে যখন বিশ্বনাথবাবু গভীর ঘুমে মগ্ন,তখন পিঙ্কি ভাবে,'এই সুবর্ণ সুযোগ জানোয়ারটার হাত থেকে পালাবার,'এই ভেবে তাড়াতাড়ি সুরজিতের বাড়ি চলে যায় সে,কারণ সে আশা করেছিল,একমাত্র সুরজিৎ ই পারে তাকে বাঁচাতে।
কলিংবেলের আওয়াজে দরজা খোলে সুরজিৎ, 'পিঙ্কি তুই?এত রাতে?কেমন আছিস বল।মনে আছে,কলেজে কত ভালো বন্ধু ছিলাম আমরা,তারপর বিয়ের পর তো আর যোগাযোগও রাখলি না!
— 'কিভাবে রাখব বল,ওই পশুটা যে আমার ফোনটাও কেড়ে নিয়েছে,'কাঁদতে কাঁদতে নিজের জীবনের সব ঘটনা খুলে বলল পিঙ্কি।
প্রিয় বান্ধবীর এমন দশা শুনে রাগে কাঁপতে থাকে সুরজিৎ।পিঙ্কির হাত ধরে সে বলল,'চিন্তা করিস না,তোর বন্ধুর কাছে যখন একবার এসেছিস সে তোকে ঠিক রক্ষা করবে।আপাতত ওই ফেক নারীবাদীর মুখোশ খুলতে হবে সবার কাছে।'
সুরজিতের বাড়িতে সে ছাড়াও তার মা,বাবা ও বোন থাকে,পিঙ্কিকে সে ওই রাতে বোনের ঘরেই থাকতে বলে।
পরেরদিন সকালে মোবাইলটা খুলতেই সুরজিৎ হতবাক।সোশ্যাল মিডিয়ায় তার আর পিঙ্কির নামে খারাপ কথা বলছে সকলে,এমনকি তার ইনবক্সেও নোংরা মেসেজের পাহাড়।
বিশ্বনাথবাবু আসলে আগের রাতে পিঙ্কির বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার সময় তার পিছু নিয়েছিলেন,আর সুরজিৎ ও পিঙ্কির কিছু ছবিও মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন,যে ছবিতে দেখা যাচ্ছিল পিঙ্কি সুরজিতের হাতদুটো ধরে কাঁদছে।ছবিগুলো সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করে তিনি যা লেখেন তার সারমর্ম এই,যে পিঙ্কি আর সুরজিৎ পরকীয়ায় লিপ্ত, এবং বিশ্বনাথবাবুকে এতদিন ধরে ঠকিয়েছে পিঙ্কি।তবুও পিঙ্কিকে তিনি আজও ভালোবাসেন,পিঙ্কি যদি আজও তাঁর কাছে ফিরে আসতে চায়,তিনি বুকে টেনে নেবেন তাকে।মুহূর্তে ভাইরাল হয় সেই পোস্ট।পিঙ্কি আর সুরজিতের গায়ে কাদা ছেটাতে থাকে সোশ্যাল সমাজ।এমনকি কর্মক্ষেত্রেও হেনস্থার শিকার হতে হয় সুরজিৎ কে।
৩)
ইলা প্রায় কয়েকমাস হয়ে গেল অভিজিতের কাছ থেকে পাঁচহাজার টাকা ধার নিয়েছিল।অভিজিৎ সরল মনে বন্ধু হিসেবে টাকাটা দিয়েছিল ইলাকে।ইলা বলেছিল,একমাসের মধ্যেই টাকা ফেরত দিয়ে দেবে সে।
কিন্তু বছর ঘুরতে চলল,তবু টাকা ফেরত দেবার নাম নেই ইলার।অভিজিৎ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে,পাঁচ হাজার টাকাটা তার কাছে বেশ প্রয়োজনীয়।যতবারই সে টাকাটা চাইতে যায়,ইলা কিছু না কিছু অজুহাত দিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেয়।ভদ্র অভিজিৎ বেশি কিছু বলতে পারেনা।
একদিন সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল অভিজিতের।সে ফোন করে রীতিমতো কড়া ভাবেই চাইল টাকাটা।ইলা টাকা ফেরত তো দিলই না,উলটে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে ব্লক করে দিল।শেষমেশ ইলার বাড়ি গিয়েই উপস্থিত হল অভিজিৎ।তবুও টাকাটা ফেরত দিল না ইলা,উলটে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল।ফেরার সময় অভিজিৎ বলে গেল,'তোর ভালো হবে না দেখে নিস,ঠগ!'
ঠগ কথাটা শুনে মাথায় রক্ত চড়ে গেল ইলার।সে ভাবল,তার বাড়িতে এসে তাকেই এভাবে অপমানের বদলা সে নেবেই।যেমন ভাবা তেমনি কাজ।সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিজিতের ছবি পোস্ট করে তার সম্পর্কে গুছিয়ে গুছিয়ে মিথ্যে লিখল সে।বহুদিন ধরেই যে সে অভিজিতের দ্বারা অত্যাচারিত,নিপীড়িত হয়েছে এরকম ইতিহাস লিখল সে।
মুহূর্তে ভাইরাল হল সেই পোস্ট।নারী হওয়ার সুবাদে ইলার মিথ্যে কান্না অচিরেই জায়গা করে নিল সকলের হৃদয়ে।
সোশ্যাল মিডিয়া তো বটেই,এমনকি পাড়াপ্রতিবেশীরাও অভিজিৎ ও তার বাবা মাকে দেখলেই মুচকি হাসে,কানাঘুষো কথাবার্তা চলে।হার্টের রুগী অভিজিতের বাবা এমন অপমান সইতে পারেননি,পরলোকগমন করেন তিনি।অসহায় অভিজিৎ মাকে নিয়ে সে শহর ছাড়তে বাধ্য হয়।
1 মন্তব্যসমূহ
Nice
উত্তরমুছুন