Advertisement

এটুকু পারবি না?

এটুকু পারবি না?
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

১) - 'এতদিন এত যত্ন করে খাইয়ে পরিয়ে বড়ো করলাম,নামী স্কুল -কলেজে পড়ালাম,আর আজ কিনা আমাদের কথার অবাধ্য হচ্ছ?'
- 'বাবা আমি তোমার কোন্ কথা শুনিনা বলো তো,কিন্তু এই কথাটা শুনতে পারলাম না।আমি সুচেতাকে ভালোবাসি,ওকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করা সম্ভব নয়।'
- 'থামো থামো,চাকরি পেয়ে গেছে বলে লায়েক হয়েছে!শোনো,অবিনাশের ছোট মেয়ের সাথেই তোমার বিয়ে হবে,আর কাউকে আমি তোমার বৌ বলে মানব না।তুমি জানো,অবিনাশ বিয়েতে কুড়ি ভরি সোনা আর একটা চারচাকা দেবে বলেছে।তোমাকে মিমিকেই বিয়ে করতে হবে,ওসব সুচেতা-ফুচেতাকে ভুলে যাও।'
- 'না বাবা,আমি বিয়ের জন্য বিক্রি হতে পারব না,ক্ষমা করো।'
- 'ওরকম বলতে নেই বাবা।তোর বাবার কত স্বপ্ন ছিল তোর বিয়ে নিয়ে,সেটা ভেঙে দিস না।আর সুচেতার বাবার তো মুদিখানার দোকান আছে,ও তো আমায় একটা দামী নেকলেসও দিতে পারবে না।'
- 'মা!তোমরা পাগল হয়ে গেছ!'
- 'অত জানিনা।তোকে মিমিকেই বিয়ে করতে হবে।হ্যাঁ রে বাবা,তোর জন্য সারাটা জীবন ধরে কি না করেছি আমরা,আর তুই এটুকু করতে পারবি না রে বাবা?আমাদের জন্য?'


২) - 'বাঃ,দারুণ তোমার রুচিবোধ! এইজন্যই বুঝি এত খরচা করে বিদেশে পড়তে পাঠিয়েছিলাম? শেষে হায়ার কাস্টের মেয়ে হয়ে তুমি সিডুল কাস্টের ছেলে বিয়ে করবে!ছিঃ!'
- 'মম প্লিজ,তুমি তো যথেষ্ট মডার্ণ।তোমার কাছ থেকে এটা আশা করিনি।আর দীপমাল্য একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট, সামনে ওর ব্রাইট কেরিয়ার,কলেজের মেয়েরা ওর পেছন পেছন ঘুরত,আর তুমি ওকে এভাবে বললে?'
- 'শোনো পিউ,তুমি যত যাই বলো তুমি একজন মেয়ে,তাই তুমি রায়চৌধুরী থেকে একমুহূর্তে বিশ্বাস হয়ে যাবে ওকে বিয়ে করলেই।ছিঃ,তখন আমি রিলেটিভদের কাছে কি করে মুখ দেখাব ভেবেছ?শোনো তুমি যদি ছেলে হতে তো কোনো প্রবলেম ছিল না,বিকস তখন সেই মেয়েটা রায়চৌধুরী হয়ে যেত,তোমার কোনো সমস্যা হত না,বাট তুমি...'
- 'বাহ মম,ছেলেদের ভালোবাসার দাম আছে,তারা যাকে খুশি বিয়ে করলেও মান যায়না।কিন্তু আমি মেয়ে বলে আমার ভালোবাসা মূল্যহীন! সুন্দর তোমাদের বিচার!'
- 'এমন বোলোনা মাই প্রিন্সেস। আমার সোসাইটিতে একটা মানসম্মান আছে,সেটা ভাবো।তোমার ড্যাডি মারা যাওয়ার পর কত কষ্টে তোমায় বড়ো করেছি,আর তুমি এটুকু করতে পারবে না?'
- 'মম...'
- 'ব্যস,আর কোনো কথা নয়।মায়ের ঋণ শোধ করা যায় না,কিন্তু তুমি যদি দীপকে ভুলে আমার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে কর,তবে আমি জানব আমার ঋণ তুমি শোধ করলে!প্লিজ এটুকু করো আমার জন্য!'


৩) - 'কি বললি?ওই মেয়েকে বিয়ে?কেন পৃথিবীতে কি মেয়ে কম পড়েছিল?'
- 'হ্যাঁ খোকন,তোর বাবা ঠিকই বলছে।তুইই থাকতে পারবি না ওর সাথে।হঠাৎ আবছা আলোয় ওর বীভৎস মুখটা দেখে আঁতকে উঠবি,তখন কি হবে?'
- 'আমার কিচ্ছু হবে না মা।ভয় পাবে তোমরা।সেদিন পর্যন্ত যে মেয়েটাকে চোখে হারাতে,আজ ওর মুখে অ্যাসিড ছোড়া হয়েছে বলেই চক্ষুশূল হয়ে গেল তোমার!মা ভুলে যেও না অনীতাকে কিন্তু তুমিই পছন্দ করেছিলে আমার জন্য।'
- 'হ্যাঁ করেছিলাম, তখন তো আর জানতাম না যে ওদের বাড়ির মালিক ওকে অ্যাসিড ছুড়ে মারবে,জানলে কখনোই সম্বন্ধ করতাম না।'
- 'ছিঃ মা,এতে ওর কি দোষ?আর আমি যখন কথা দিয়েছি অনীতার পরিবারকে, অনীতাকে বিয়ে আমি করবই।'
- 'ওসব কথা-টথা বলে কিছু হয় না,জীবনে অনেককে অনেক কথা দিতে হয় ভদ্রতার খাতিরে,তাই বলে ওসব দিয়ে তো আর জীবন চলে না!জীবনটা অনেক বড়ো খোকন,অনীতাকে বিয়ে করলে কিন্তু পস্তাবে তুমি।
 যাই হোক,এত কিছু আমি বলছিই বা কেন?শোনো নিজে না খেয়ে তোমায় খাইয়েছি,কাজেই বিয়েটা তোমায় আমাদের মতেই করতে হবে।এটুকু যদি বাবা-মার জন্য না করো,তাহলে আর কিসের সন্তান?'


৪) - 'প্লিজ পাপা,আমি মেডিকেল পড়তে পারব না।আমায় জোর কোরো না প্লিজ!'
- 'হোয়াট?তোমার বাবা একজন সার্জেন,তোমার দাদাও আই স্পেশালিষ্ট, তোমার মামা কার্ডিওলজিস্ট।এমন ফ্যামিলির মেয়ে হয়ে তোমার লজ্জা করে না এটা বলতে?'
- 'তোমরা কেন বোঝো না,আমি ম্যাথ ভালোবাসি,বায়োলজিতে আমি ইন্টারেস্ট পাই না।'
- 'শোনো রশ্নি,জীবনে ভালো ইনকাম করাটাই মেন,ওসব ইন্টারেস্ট তুমি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এস।এই ফ্যামিলিতে যখন জন্মেছ,ডাক্তার তোমায় হতেই হবে।আমরা রাত জেগে তোমায় পড়িয়েছি কি এই কথা শুনব বলে?প্রয়োজন হলে বায়োলজিতে আরও একজন টিউটর নাও,বাট মেডিকেলে চান্স তোমায় পেতেই হবে।'


৫) - 'মা,আমি আরও পড়তে চাই।কেন সাত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতে চাইছ আমার?'
- 'অমন বলে না।কৌস্তুভ কত ভালো ছেলে,তোমায় কত ভালো রাখবে দেখো মা।'
- কিন্তু মা আমি সবে কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি,এখনো অনেক দূর পড়া বাকি।'
- 'অতশত জানি না।১৮ পেরিয়েছে তোমার,ওই বয়সে আমার তখন পাঁচ বছরের তুই হয়ে গেছিস।আর মেয়েমানুষ কিই বা করবি পড়াশোনা করে?ওসব পরেও করতে পারবি,কিন্তু কৌস্তুভের মতো ভালো পাত্র হাতছাড়া করতে পারব না।'
- 'মা আমি তো তোমার মেয়ে,আমার এটুকু ইচ্ছেরও দাম দেবে না তুমি?'
- 'তোমার ভালোর কথা ভেবেই তোমার কথা কানে তুলছিনা মা।আজ বুঝছিস না,কিন্তু একদিন ঠিক বুঝবি আমরা কিচ্ছু ভুল করিনি।আর কোনো কথা নয়,আমায় তো মা বলে মানো নাকি?জানো কত কষ্ট করে তোমায় জন্ম দিয়েছি?আমি এত কষ্ট করতে পারলাম,আর তুমি সামান্য কাজটুকু করতে পারবে না?'

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ