Advertisement

চুম্বক


চুম্বক
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী

তো হয়েছে কি,আজ থেকে কয়েক বছর বছর আগে মেয়েটার হঠাৎ করেই শরীরটা কেমন খারাপ লাগতে শুরু করল।যখন তখন মাথা ঘোরা,শরীর দুর্বল লাগা,একটা শীত শীত অনুভূতি,সব মিলিয়ে একাকার অবস্থা।বাধ্য হয়েই মেয়েটার স্বামী তাকে একজন ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল।মেয়েটার আসল নাম তো আর বলা যাবে না,বললেই তার স্বামী মহাশয় আমায় ছেড়ে কথা কইবেন না,বুঝলেন কিনা?অবশ্য আপনারা বুঝবেন কি করে?এখনো পর্যন্ত তো পুরো কথাটা খুলেই বলা হয়নি!আসুন বলি।
তো হয়েছে কি,ডাক্তারবাবু মেয়েটাকে দেখে বললেন,তার আয়রন ডেফিসিয়েন্সি হয়েছে,তাই তাকে বেশ কয়েকমাস আয়রন ট্যাবলেট খেতে হবে,যাতে এই ঘাটতি পূরণ হয়,সেই সাথে কিছু খাবারও খেতে বললেন।
এইবার হল আসল সমস্যা।ডাক্তারের ওষুধ সে নিয়মিত খাচ্ছে ঠিকই,কিন্তু তেমন ফল পাচ্ছে না।না পাওয়ারই কথা,কারণ মেয়েটা বড্ড তাড়াহুড়ো করছে,সুস্থ হতে তার মিনিমাম দেড়-দুমাস লাগবেই লাগবে,ডাক্তারবাবু বলে দিয়েছেন।এদিকে মেয়েটা তিন চারদিন ওষুধ খেতে না খেতেই চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে,যে তার দুর্বলতা মোটেই কাটছে না,যার জন্য তাকে বাড়ি থেকে বেরোতে দিচ্ছে না কেউ,আর রাস্তায় বেরিয়ে ফুচকা-পাপড়ি চাটও খাওয়া হচ্ছে না আর!
মেয়েটা পড়ল মহা ফ্যাসাদে,এভাবে স্ট্রিট ফুড ছাড়া থাকা যায়!স্ট্রিট ফুড লাভারদের বাইরে বেরোতে না দিলে যে কি পরিমাণ ডিপ্রেশনে ভোগে তারা,সে আর অন্য লোকে কি বুঝবে!জল না পেলেও হবে,কিন্তু মাতালদের দু'বেলা মদ খাওয়ার মতো স্ট্রিট ফুড তাদের খাওয়া চাই ই চাই!
অনেক ভেবে মেয়েটা একটা উপায় বের করল।মেয়েটা মনে মনে ভাবল,ডাক্তারবাবু তাকে দু'মাসের আয়রন ট্যাবলেট দিয়েছেন,প্রতিদিন একটা করে খেতে বলেছেন।হঠাৎ করেই এক অদ্ভুত বুদ্ধি খেলে গেল মেয়েটার মাথায়,সে ভাবল,দু'মাসের ওষুধ খেলেই ও সুস্থ হয়ে যাবে,তাহলে যদি দু'মাসের ওষুধ ও এক সপ্তাহেই খেয়ে নেয়,তাহলে তো এক সপ্তাহেই ও সুস্থ হয়ে যাবে,কারণ ব্যাপারটা তো একই!ওষুধের সংখ্যা তো একই থাকছে!
যেমন ভাবা তেমন কাজ।মেয়েটা বাড়ির সবার চোখ এড়িয়ে রোজ আট-ন'টা করে ওষুধ খেতে শুরু করল,যাতে এক সপ্তাহের মাথাতেই সব ওষুধ শেষ হয়ে যায়।
হলও তাই,এক সপ্তাহের মধ্যেই সব ওষুধ শেষ হয়ে গেল,আর মেয়েটা সুস্থও হয়ে উঠল।মেয়েটা ভাবল,এইবার আনন্দে রাস্তায় বেরোনো যাবে,আর স্ট্রিট ফুডও খাওয়া যাবে মনের সুখে।টিপিক্যাল বাঙালি ল্যাদখোর বলে কথা,ভাবল এই আনন্দে জমিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুম দেওয়া যাক,আসলে ল্যাদখোররা আনন্দ সেলিব্রেট করে শ্যাম্পেনে নয়,ঘুম্পেনে!তো মেয়েটা মহানন্দে ফ্যান চালিয়ে গায়ে চাদর চাপিয়ে ঘুমিয়েছে,হঠাৎই হাতে কেমন একটা ভারী জিনিস কিছুর স্পর্শে ওর ঘুম ভেঙে গেল,তাড়াতাড়ি উঠেই ও দেখল,বিছানায় যে স্টিলের জলের বোতলটা ছিল,ওটা বাঁ হাতে হাতে যেন আটকে গেছে।ঘুমের ঘোরেই বোতলটা ও ডান হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিল,কিন্তু বোতলটা সরল না।ঘুমের ঘোরে বেশি জোরে ঠেলতে পারেনি ভেবে মেয়েটা আবার ঠেলল,কিন্তু বোতল মেয়েটার হাতেই লেগে রইল।এইবার বিরক্ত হয়ে উঠে বসে গায়ের জোরে বোতলটা ঠেলে দিল মেয়েটা,আর বোতলটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল।বোতলটা পড়ে যাওয়ার শব্দে বাড়ির সবাই ছুটে এল কি হয়েছে কি হয়েছে বলে।
— 'আর কি হয়েছে!' মেয়েটা রাগীস্বরে বলল,'কোন্ হতচ্ছাড়া আমার জলের বোতলটায় আঠা লাগিয়ে দিয়েছিল কে জানে!হাতে এইসা আটকে গেছিল যে মনে হচ্ছিল ভূতে এসে বোতলটা গায়ে চেপে রেখেছে!'
— 'আহা তা কেন হবে?ভূত কখনো ভূতকে ভয় দেখায় না!' মেয়েটির বর বলল।
— 'অ্যাঁ,তুমি আমায় ভূত বললে?' মেয়েটা তেড়ে এল।
— 'তা নয়ত কি বলব!যত ঘুম দিনের বেলায়,আর রাত হলেই চোখে ঘুম নেই,খালি বিয়ের আগে কোন্ কালে তোমার সাথে দেখা করতে যেতে পাঁচ মিনিট লেট করেছি সেসব মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় আর আমার রাতের ঘুমটা চটকে দাও ঝগড়া করে!ভূত বলব না তো আর কি বলব!'
— 'ধুর ধুর,সরো তো সরো,আমায় রেডি হতে হবে।ফুচকা,ঘুগনি,বার্গার,পিজ্জা,বিরিয়ানি ওরা আমায় কেঁদে কেঁদে ডাকছে,বলছে,ওগো ভোজনরসিক,আমাদের তোমার পেটে নিয়ে নাও গো,আমরা যে আর বাইরে থাকতে পারছি না!আহা রে,ওদের কষ্ট আর আমি দেখতে পারছি না!সরো,এখুনি রেডি হব আমি!' বলেই মেয়েটা চলে গেল রেডি হতে,কিন্তু আর এক সমস্যা বাধল।শাড়ির আঁচলে সেফটিপিন আঁটতে গেল যেই,অমনি সেফটিপিনটা আঙুলে আটকে গেল,কিছুতেই শাড়িতে আটকাতে পারল না সে।
— 'সব নিশ্চয়ই আমার বর ব্যাটার কান্ড,ইচ্ছে করে সেফটিপিনে আঠা লাগিয়ে রেখেছে আমার যাওয়া পণ্ড করবে বলে,কিন্তু সে গুড়ে বালি মশাই,আমি তো আজ যাবই ভক্ষণ করিতে,তোমার মতো অতি তুচ্ছ মানবের শক্তি কি আমায় আমার প্রিয়তম প্রেমিক স্ট্রিট ফুডের কাছে যাওয়া আটকাবে?সে যে আমায় চুম্বকের মতো টানছে,আজ আমি সালোয়ার কামিজ পরেই বেরোবো।
যেমন ভাবা তেমন কাজ।মেয়েটা সালোয়ার কামিজ পরেই বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।প্রথমেই ও গেল ফুচকা স্টলে,মনের সুখে চল্লিশটা ফুচকা খেল ও,তারপর টাকা দিতে গিয়ে মহা সমস্যায় পড়ল ও।ফুচকাওয়ালাকে নোট দিতে গিয়ে কোনো সমস্যা হল না,কিন্তু একটা দশ টাকার কয়েন দিতে গিয়েই হল সমস্যা।কয়েনটা ওর হাতের তালুতে আটকে গেছে,কিছুতেই ও হাত থেকে ছাড়াতে পারছে না।বারবার হাত ঝাঁকাতে লাগল ও,এইভাবে অনেকক্ষণ হাতটা ঝাঁকানোর পর কয়েনটা পড়ে গেল রাস্তায়।মেয়েটা বিরক্ত হয়ে দশ টাকার নোটই দিল ফুচকাওয়ালাকে,তারপর রাস্তায় পড়ে থাকা কয়েনটা না তুলেই চলতে লাগল রাস্তা দিয়ে।ফুচকাওয়ালা বলতে গেল,'ও দিদি,টাকাটা তুলে নিন!' কিন্তু বলতে গিয়েই সে হতবাক!সে দেখে মেয়েটা হেঁটে চলেছে রাস্তা দিয়ে,আর কয়েনটাও রাস্তা দিয়ে মেয়েটার পিছু পিছু চলছে,এইভাবে চলতে চলতে একটু পরেই কয়েনটা সেঁটে গেল মেয়েটার পায়ে।মেয়েটা আর তুলল না কয়েনটা,ও বুঝেই গেল রাস্তার মাঝে আবার একটা হাসির বিষয় হবে,ও তুলতে পারবে না,তাই ভীষণ বিরক্ত হয়ে ও কয়েনটা পায়ে সেঁটে থাকা অবস্থাতেই চলতে লাগল।আর এসব কান্ডকারখানা দেখে ফুচকাওয়ালা গেলে ভেবলে,ভুতুড়ে কান্ড না যাদু এটা কিছুতেই বুঝতে পারল না সে।
একটু পরেই বিরিয়ানির দোকান পড়ল।মেয়েটা পায়ে কয়েনসুদ্ধুই দোকানে ঢুকে একটা চেয়ারে বসল,তারপর দোকানের মালিককে বলল,'জেঠু,এক প্লেট চিকেন বিরিয়ানি দাও তো!'
দোকানের মালিক যে প্রৌঢ় মানুষটি,তিনি মেয়েটি আর তার বরকে ভালোভাবেই চেনেন,আর নিজের সন্তানের মতোই স্নেহ করেন ওদের।তবে তাঁর স্ত্রী অবশ্য....যাক সে কথা।ওঁর স্ত্রী কেমন সেটা একটু পরেই জানতে পারবেন।
বিরিয়ানি চেয়েই মেয়েটি হঠাৎ বুঝতে পারল,স্টিলের প্লেটে স্টিলের চামচসহ বিরিয়ানি দিলে তার সমূহ বিপদ,তাই সে বলল,'জেঠু,আমায় প্লিজ স্টিলের প্লেট আর চামচ দিও না!'
— 'আচ্ছা মা।'
একটু পরেই তিনি প্লাস্টিকের প্লেটে আনলেন চিকেন বিরিয়ানি,সাথে প্লাস্টিকের চামচ।কিন্তু এনেই তিনি দেখলেন,মেয়েটির পায়ে লেগে রয়েছে দশ টাকার কয়েন।তিনি বললেন,'ও কি মা,মা লক্ষ্মীকে পায়ে ফেলে রেখেছ কেন?তুলে নাও!'
— 'অনেক চেষ্টা করলাম জেঠু,ও আমার কম্ম নয়!'
— 'দাঁড়াও মা,আমি তুলে দিচ্ছি!'
তিনি এসে মেয়েটির পায়ে হাত দিতেই মেয়েটি ভীষণ আপত্তি জানাল,'এ কি করছেন জেঠু?আপনি আমার গুরুজন,পায়ে হাত দিচ্ছেন?'
— 'তাতে কি হয়েছে মা?তুমি তো আমার মেয়েরই মতো!'
এই কথাটি বলেই মেয়েটির আপত্তিতে কান না দিয়েই তিনি মেয়েটির পা থেকে কয়েনটি তোলার চেষ্টা করতে লাগলেন,কিন্তু কয়েনটা এমন শক্ত হয়ে আটকে আছে যে ব্যর্থ হলেন তিনিও বারবার।
— 'মা,এ তো মনে হচ্ছে আঠা লেগে ছিল কয়েনে,সেটাই আটকে গেছে তোমার পায়ের চামড়ায়!'
— 'আপনি ছেড়ে দিন জেঠু,আমি বাড়ি গিয়ে ছাড়িয়ে নেব।'
— 'না মা,তা হয়না।তুমি রাস্তা দিয়ে এইভাবে যাবে?কেউ এসে কয়েনটা চুরি করে নিলে?'
— 'আপনার মনে হয় জেঠু যে এটা চুরি করতে পারবে কেউ?'
ঠিক সেই মুহূর্তেই দোকানে প্রবেশ মেয়েটির সেই জেঠুর সহধর্মিণীর।তিনি এসেই চিৎকার করে বলে উঠলেন,'ও মা গো,এ কি অলুক্ষুণে মেয়ে গো!বাপের বয়সী একটা লোককে নিজের পায়ে ধরালে!'
— 'এই তুমি থামো তো,ওর পায়ে কয়েন আটকে গেছে একটা,ও কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না,তাই জন্যই তো...'
— 'ও মা কি অলুক্ষুণে কান্ড গো!টাকা মানে মা লক্ষ্মী,তাকে পায়ে রেখেছে!' তিনি সুর করে আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন।
— 'শুনুন জেঠু,আপনি ছেড়ে দিন,বেকার চেষ্টা করছেন আপনি,ও কয়েন ছাড়ানো কারোর সাধ্য নেই,তার চেয়ে 
 বরং আপনি জেঠিমাকে গানের স্কুলে ভর্তি করে দিন,ওনার গলায় সুর আছে দারুণ!' বলেই বিরিয়ানি রেখেই মেয়েটা গটগট করে বেরিয়ে গেল দোকান থেকে।
  — 'ও মা গো,কি অসভ্য মেয়েমানুষ গো!লঘু গুরু জ্ঞান নেই!মায়ের বয়সী মহিলাকে কিরকম অপমান করল সবাই দেখো শুধু!আবার বিরিয়ানিটাও ফেলে গেল,কি অলক্ষ্মী মেয়ে!মা লক্ষ্মী এদের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়েছেন গো,বিদায় নিয়েছেন!'
বাড়িতে এসেই ফ্রেস হয়ে কয়েনসুদ্ধুই শুয়ে পড়ল মেয়েটা ঘরে,কিন্তু শুয়েই সে দেখে আশ্চর্য কান্ড!কয়েনটা নিজে থেকেই কেমন আলগা হয়ে গেল,আর মেয়েটার পায়ের কাছেই একটা প্লাগ ছিল,আর সেখানে ছিল একটা তড়িৎচুম্বক,কয়েনটা মেয়েটার পা থেকে খুলে গিয়ে ওই চুম্বকেই আটকে গেল।মেয়েটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল,আর সেই সাথে একটা দারুণ বুদ্ধিও বের করল সে,এরপর যেখানেই যাবে,সাথে একটা চুম্বক নিয়ে যাবে,ব্যাস কেল্লা ফতে।

কয়েকদিন পর মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হল সেই ডাক্তারবাবুর কাছে,যিনি আয়রন ট্যাবলেট দিয়েছিলেন মেয়েটিকে খেতে।সব শুনে ডাক্তারবাবু বললেন,মেয়েটির এক অদ্ভুত অসুখ হয়েছে (সুখ না অসুখ সেটা অবশ্য পরে দেখা যাবে),যে অসুখ হলে মানুষের শরীর চুম্বকের মতো হয়ে যায়,লোহার জিনিস পেলেই টানে,কিন্তু চুম্বককে আকর্ষণ করে না।আর মেয়েটার এই রোগ হওয়ার কারণ হল আয়রন ট্যাবলেট অল্প সময়ে এত বেশি পরিমাণে খাওয়ার জন্য,রক্তে আয়রন হঠাৎ এতটাই বেড়ে গেছে যে সে হয়ে উঠেছে চুম্বক নারী।
ডাক্তারের কাছ থেকে বাড়ি ফেরার সময় ঘটল আরেক বিপত্তি।মেয়েটি তার বরের সাথে দিব্যি খোশগল্প করতে করতে ফিরছিল,হঠাৎই মেয়েটির পাশ দিয়ে একজন পুরুষ হেঁটে গেল তার গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে, তার হাতে ছিল রিস্ট ওয়াচ,যার ব্যান্ডটা ছিল লোহার।ব্যস,মেয়েটাকে ক্রশ করার সময় ঘটল নিদারুণ এক দুর্ঘটনা,মেয়েটির গাল আটকে গেল ছেলেটির রিস্ট ওয়াচে।দুর্ভাগ্যবশত মেয়েটির কাছে চুম্বক ছিল না সেদিন।
ছেলেটি প্রথমে তো ভীষণ রেগে গিয়েছিল,ভেবেছিল এটা মেয়েটি ইচ্ছাকৃত করছে,কিন্তু মেয়েটির বর ব্যাপারটা সামলে নিল কোনোরকমে।মেয়েটির বর আর ছেলেটি দুজন মিলে চেষ্টা করতে লাগল মেয়েটিকে ছাড়াতে,মানে মেয়েটির গাল ছাড়াতে,কিন্তু ব্যর্থ হল।
অন্যদিকে ছেলেটির এত দেরি দেখে তার গার্লফ্রেন্ড সটান হাজির সেখানে,আর এসেই এই কান্ড দেখে তার চক্ষুস্থির!সে রেগেমেগে আগুন হয়ে ছেলেটিকে যা নয় তাই বলল,তারপর 'ব্রেকাপ!' বলেই চলে গেল।
তারপর সে আরেক কান্ড!মেয়েটা তার বরকে নিয়ে একদিন গেল সেই গার্লফ্রেন্ডের বাড়ি তাকে সবটা বোঝাবে বলে,সেই ছেলেটির কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে।কিন্তু সেই প্রেমিকা দেখেই রে রে করে তেড়ে তাদের দিকে,কিছুতেই ঢুকতে দেবে না তার বাড়িতে,শেষমেশ তার বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়েই সব ঘটনা খুলে বলল মেয়েটির বর।অনেকক্ষণ যুক্তিতর্কের পর সেই গার্লফ্রেন্ডের রাগ পড়ল,বয়ফ্রেন্ডকে ফোন করে সে সরি বলে সব মিটিয়ে নিতে চাইল,কিন্তু অন্যদিকে সেই বয়ফ্রেন্ড গেছে খেপে,সে কিছুতেই ঝগড়া মেটাতে চাইল না,তার এতদিনের প্রেমিকা তাকে এভাবে অবিশ্বাস করেছে,এ অভিমান কি এত তাড়াতাড়ি ভোলা যায় আপনারাই বলুন!
বয়ফ্রেন্ডটির নীল রঙ ছিল ভীষণ প্রিয়,তাই প্রেমিকা নীল শাড়ি,নীল টিপ,নীল জুতো পরল,হাতে পড়ল বয়ফ্রেন্ডটির দেওয়া নীল পাথরের আংটি,গলায় নীল পাথরের হার আর কানের দুল,তারপর সিঁথিতে পরল নীল আবির,কারণ নীল রঙের সিঁদুর তো আর হয় না যতই হোক!তারপর পোজ দিয়ে ছবি তুলে বয়ফ্রেন্ডকে সেন্ড করে সে যাত্রায় মানভঞ্জন করা হল তার।
মেয়েটি আজকাল ভয়ে আর রাস্তাঘাটে বেরোয় না।কিন্তু কপালে যদি কারোর বিখ্যাত(কুখ্যাতও বলা যায়,ওর বর তাই বলে অবশ্য)হওয়া থাকে,তা কি আর আটকানো যায়!মেয়েটারও তাই হল।ওদের বাড়িতে যে মেয়েটা কাজ করে,তার নাম ময়না।একদিন জানালা মুছতে গিয়ে জানলায় রাখা একটা স্টিলের চামচ জানালা দিয়ে পড়ে গেল সোজা বাড়ির উঠোনের এক কোণের জঙ্গলে।সকলে মিলে খুঁজেও চামচটা উদ্ধার করতে পারলেন না জঙ্গল থেকে।শেষে মেয়েটা গেল,তারপর হাত বাড়িয়ে দিল জঙ্গলের দিকে,সাথে সাথেই চামচটা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেই পটাং করে মেয়েটার হাতের সাথে সেঁটে গেল।বাড়ির সকলের সামনেই ঘটল ঘটনাটা,ময়নাও ছিল ওখানেই,ব্যস,আর কি!ময়না যে বস্তিতে কাজ করে সেখানে,এমনকি আরও যে যে বাড়িতে কাজ করে ও,সবাইকে কথাটা রটিয়ে দিল,যে ও বাড়ির দিদিমণি যাদু জানে।ব্যাপারটা এতটাই বেশি রটে গেল যে শেষ পর্যন্ত মিডিয়া পর্যন্ত এসে গেল মেয়েটার বাড়িতে,মেয়েটার হাতে কপালে লোহার জিনিসপত্র লাগিয়ে ছবি তোলা হল,তারপর খবরের কাগজের প্রথম পাতায় ছাপাও হল,হেডলাইন হল,'তবে কি শহরের বুকে জন্ম নিল চুম্বক-মেয়ে?' কিছু কাগজের হেডলাইন হল 'গৃহবধূ কি তবে যাদুবিদ্যায় পারদর্শী?'
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হল মেয়েটির ছবি,ভিডিও।এতটাই বিখ্যাত হয়ে গেল মেয়েটি যে শেষ পর্যন্ত একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলেছে সে,সেসব ভিডিওতে আসছে কোটি কোটি ভিউজ।এমনকি কারোর লোহার জিনিস পুকুরে,দীঘিতে পড়ে গেলে মেয়েটি শুধু জলে হাতটা একটু ডোবাতেই চলে আসছে তার হাতে জিনিসটি।অবশ্য এসব বিনা পয়সায় করে না মেয়েটি,তার জন্য সে মোটা টাকা দাবি করে।এইভাবেই মেয়েটি হয়ে গেল একদিন কোটিপতি,করল প্রাসাদোপম বাড়ি শহরের বুকে।মেয়েটি ভেবেছিল তার এই সাফল্যের অসাধারণ কাহিনী সে শোনাবে কোনো এক রিয়্যালিটি শো তে,কিন্তু তার বরই যেতে বারণ করল তাকে।তা করবে না বলুন তো?শো তে যখন মেয়েটিকে প্রাইজ হিসেবে স্টিলের প্রেসার কুকার দেওয়া হবে,তখন কি হবে বলুন তো?প্রেসার কুকার নিতে গিয়ে মেয়েটা তো রিয়্যালিটি শো কে প্রেসার শো বানিয়ে দেবে,কি বলেন?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ