সেলিব্রিটি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সুদক্ষিণা অবসরে লেখালেখি করতে ভালোবাসে সেই কলেজ জীবন থেকে।অবশ্য এর জন্য ওকে আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে বন্ধুমহলে কম হাসির পাত্রী হতে হয়নি।এক আত্মীয় দাদা তো একবার বাড়ি এসে একরকম তাচ্ছিল্য সহকারে বলেছিল,'ওসব লিখে টিখে ফেমাস হওয়া যায় না বুঝলি,ওরকম লাখো লাখো লোক লেখে,কজনকে লোকে চেনে?লেখা পড়েই সবাই ভুলে যায়,তার চেয়ে পড়ায় মন দে যদি জীবনে কিছু করতে চাস!'
সুদক্ষিণা কর্ণপাত করেনি সেকথায়।পড়াশুনার পাশাপাশি লেখাটাও চালিয়ে গেছে পুরোদমে।লেখার এই লড়াইয়ে শুধু ভালোবাসার মানুষটিকে ছাড়া আর কাউকে পাশে পায়নি সে,এমনকি বাড়ির মানুষদেরও না।
কেটে গেছে দশ-বারোটা বছর।সুদক্ষিণার পরের মাসেই বিয়ে তার মনের মানুষটির সাথে,তাই আত্মীয়স্বজন থেকে পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে নেমন্তন্ন করার পালা।সুদক্ষিণা একদমই চায়নি আত্মীয় বা পাড়ার লোকদের ইনভাইট করতে,এরা বিয়েতে এসে ভুরিভোজ খেয়ে পাত্র-পাত্রীকে নিয়েই আড়ালে নিন্দেমন্দ করবে।তবু মা বাবার ইচ্ছেতে একরকম জোর করেই সে মা বাবার সাথে সবার বাড়িতে গেল বিয়ের কার্ড হাতে।
সেই আত্মীয় দাদার সাথে দেখা হল যখন,দাদা বলল,'কি রে,লেখালেখি করিস এখনো?কিছু নাম টাম হল?নাকি সবই বেগার খাটা হয়ে গেল?'
সুদক্ষিণা হেসে বলল,'একবার যেকোনো একটা সোশ্যাল মিডিয়া খোল তো দাদা!'
— 'সোশ্যাল মিডিয়া?' বাঁকা হাসি হেসে দাদা বলল, 'ওসব সেলিব্রিটিদের পারফেক্ট জায়গা,তোর আমার মতো পাতি পাবলিকের জায়গা থোড়ি!' বলে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে দাদা সোশ্যাল মিডিয়া খুলল।
— 'দাদা,একটু কষ্ট করে আমার নামটা সার্চ কর তো!'
সার্চ করেই দাদার চক্ষুস্থির।সুদক্ষিণার নামের পাশে ব্লু টিক রয়েছে।
সুদক্ষিণা হেসে বলল,'গতকালই আমার অ্যাকাউন্ট ভেরিভাই করা হয়েছে।কি,এইবার নিশ্চয়ই আর আমায় পাতি পাবলিক বলবি না,কি তাই তো?'
— 'হ্যাঁ হ্যাঁ ওই নীল টিক নামের পাশে অনেকেরই থাকে,তাই বলেই সে সেলিব্রিটি হয়ে যায় না কখনো!' আমতা আমতা করে দাদা বলল,'সোশ্যাল মিডিয়ায় নীল টিক,এদিকে রাস্তায় বেরোলে কোনো লোকে চেনে না!সে আবার কিসের সেলিব্রিটি হল?'
— 'আর ইউ সিওর দাদা?' সুদক্ষিণা বাঁকা হাসি হাসল।
দাদা কিছু বলার আগেই সুদক্ষিণা আবার বলল,'বাইরে একটা হইচইয়ের আওয়াজ পাচ্ছিস দাদা?একটু বারান্দায় গিয়ে দেখ তো।'
দাদা কিছু না বলে বারান্দায় গেল দেখতে।দেখল তাদের বাড়ির বাইরে সারি সারি লোকের ভিড়,সবাই শুধু একবার সুদক্ষিণা ভৌমিকের সাথে সেলফি তুলতে চায়,বা অটোগ্রাফ নিতে চায়।
সুদক্ষিণা আর কিছু বলল না।নিজের বাঁকা প্রশ্নের এমন উত্তর পেয়ে সেই দাদা হকচকিয়ে গেল,গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোল না আর।
0 মন্তব্যসমূহ