— 'ধুস তোমার সাথে কথাই বলব না!তুমি মা না ধূমকেতু শুনি!' অভিমানী সুরে প্রশ্ন করল নয় বছরের নিবেদিতা।
— 'রাগ করে না দিতা মা,আসলে আসার সময় হয়না রে একদম সোনা,এত কাজ ওদিকে!' মীনাক্ষী একমাত্র মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে চোখের জল মুছে নেয় মেয়ের অলক্ষ্যে,জোর করে মুখে হাসি এনে বলে,'ও কি কথা মা?মাকে কেউ ধূমকেতু বলে?'
— 'সেদিন যে মিস গল্প বলার সময় বললেন যে যাদের সাথে আমাদের প্রায় দেখাই হয় না,মাঝেমধ্যে দেখা যায় যাদের,তাদের ধূমকেতু বলা হয়,তাই তো বললাম।'
— 'হ্যাঁ রে সোনা,ধূমকেতু তো খুব কম আসে,তাই ওরকমটা বলে।'
— 'কেন এরকম করো মা?সব বন্ধুদের বাড়ি ফেরার সময় মা নিতে আসে,ওরা বেড়াতে যায় মায়ের সাথে,পেরেন্ট টিচার মিটিংয়েও আসে ওদের মায়েরা,তুমি কেন আসোনা মা?প্রতি বছর পুজোর আগে একদিন এসে জামা দিয়ে যাও,বলো 'এটা পুজোয় পরবি',কিন্তু পুজোয় একদিনও আসোনা কেন আমার কাছে?'
মীনাক্ষী মেয়ের প্রশ্নের কি উত্তর দেবে ভেবে পায় না।হেসে বলে,'তাতে কি?এই তো এখন এসেছি তোর কাছে,দেখ কি এনেছি' বলেই একটা ক্যাডবেরি দেয় মেয়ের হাতে,হাসিমুখে বলে,'কি রে মা,পছন্দ?'
মীনাক্ষী আজ নিজের সন্তানের কাছে 'ধূমকেতু',শ্বশুরবাড়ির সকলের চোখে 'মন্দ মেয়ে',কারণ একটাই,সে মা হয়ে,স্ত্রী হয়ে,গৃহবধূ হয়েও স্বপ্ন দেখতে ভোলেনি।বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে আপোস না করে বেরোতে চেয়েছে বাইরের পৃথিবীতে,দাঁড়াতে চেয়েছে নিজের পায়ে।উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে চাকুরিরতা হতে চেয়েছে।মীনাক্ষীর শ্বশুর শাশুড়ি,অর্থাৎ বিহানের মা বাবা একদমই মেনে নেননি সেটা।অবশ্য ওদের দোষ আর কি দেবে মীনাক্ষী?যেখানে তার জন্মদাতা মা বাবাই বোঝেনি তার মনের ইচ্ছে,সম্মান করেনি তার স্বপ্নকে।কলেজ পাশ করার পরেই মা বাবা তোড়জোড় করতে শুরু করলেন বিয়ের জন্য।কোনোরকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে মাস্টার্স ডিগ্রীর জন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছিল সে।উচ্চশিক্ষিতা হলে মেয়ের জন্য আরও ভালো পাত্র জুটবে ভেবে সায় দিয়েছিলেন ওঁরা।মাস্টার্স কমপ্লিট হওয়ার পর আর অপেক্ষা করতে পারলেন না ওঁরা,মাত্র দু'মাসের মাথায় বিয়ে ঠিক করে ফেললেন বিহান দাশগুপ্তর সাথে।নামকরা ডাক্তার সে,এত ভালো পাত্র আর পাবেন না ভেবে খুব খুশি মনে বিয়ের জোগাড় করতে লাগলেন তাঁরা।খোঁজ নিলেন না তাঁদের মেয়ের ইচ্ছেটা কি!আলাপের শুরু থেকেই বিহানকে,ওর বাড়ির লোককে মীনাক্ষীর পছন্দ হয়নি একদমই।বাইরে থেকে শিক্ষিত পরিবার,প্রতিষ্ঠিত পাত্র,অথচ মনের ভেতর কি গাঢ় অন্ধকার!বাড়ির বৌ চাকরি করবে না,পছন্দসই পোশাক পরবে না,নাচ করবে না,এমনকি পুত্রসন্তান হওয়া চাই বিয়ের কয়েকবছরের মধ্যে!দাবিদাওয়াও ছিল অনেক,কারণ বিহানের জন্য নাকি পাত্রীর লাইন লেগে আছে!মীনাক্ষীর একদমই মত ছিল না বিয়েতে,কিন্তু সেকথা মা বাবাকে বলতে যেতেই ধমকে চুপ করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁরা।মীনাক্ষী ভেবেছিল,যদি কোনোভাবে পালিয়ে যাওয়া যায়!কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারেনি।বিয়েটা হয়েই গিয়েছিল ধুমধাম করে।বিয়ের পরেই শাশুড়ির ঘুরেফিরে এক কথা,'ঘরে একটা নাতি এলে বড় ভালো হয় বৌমা,বুড়ি মানুষ,সময় কাটে না,একটা নাতি এলে বড় ভালো হত।' বিহানকে সেকথা বলায় সে মায়ের কথায় সায় দিয়ে বলেছিল,'মা তো খুব বেশি কিছু চায়নি বলো।' মীনাক্ষী চেয়েছে চাকরি করতে,কিন্ত বিহান একদমই সায় দেয়নি,আপত্তি করেছে ভীষণ।তবুও লুকিয়ে লুকিয়ে মাঝে মাঝেই অ্যাপ্লাই করে দিতেও গেছে পরীক্ষা,কিন্তু বিয়ের পর যথাযথ প্রস্তুতির অভাবে সাফল্য পায়নি সে।একবার সে ধরা পড়ে গিয়েছিল বিহানের কাছে একটা পরীক্ষায় অ্যাপ্লাই করতে গিয়ে,কি রাগারাগিই করেছিল বিহান।তখন সবে মাস ছয়েক হল বিয়ে হয়েছে,মীনাক্ষী চুপ করে শুধু চোখের জল ফেলেছে,শাশুড়ি ছেলের গলা শুনে ঘরে হাজির,বললেন,'ও যেগুলো পছন্দ করে না,সেগুলো না করলেই তো পারো মা,মেয়ে হয়েছ এটুকু মানিয়ে নিতে পারো না?' এরপর বিহান আর তার মা বাবার মনে হল,বৌয়ের কোলে সন্তান এলে তার এত 'ওড়াউড়ি' বন্ধ হবে,সংসারে মন বসবে।তারপর বছর ঘুরতেই এল নিবেদিতা,মীনাক্ষীর আদরের দিতা।সন্তানসম্ভবা হওয়ার পর বিহান চেয়েছিল ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ করতে,কিন্তু ততদিনে মীনাক্ষী প্রতিবাদ করতে শিখে গেছে,সন্তানের সাথে এত বড়ো অন্যায়টা ও কিছুতেই হতে দেবে না,তাই সুইসাইডের ভয় দেখাল সে।ওষুধ ধরল তাতে,বিহান সহ শ্বশুরবাড়ির লোক ক্ষান্ত হলেন।হাঁপ ছেড়ে বাঁচল মীনাক্ষী।তারপর কোল আলো করে এল দিতা।প্রথমে সকলের ভ্রূ কুঁচকালেও আস্তে আস্তে তাকে সকলে কাছে টেনে নিলেন,বিহানও তাকে অপত্য স্নেহে টেনে নিয়েছিল বুকে,তারপর মীনাক্ষীর হাত ধরে বলেছিল,'আই অ্যাম সরি মিনু,টেস্টটা করাতে চেয়ে অন্যায় করেছিলাম আমি।'
মীনাক্ষী দুর্বল শরীরে প্রশান্তির হাসি হেসেছিল,যাক লোকটা বুঝেছে তাহলে! কিন্তু মীনাক্ষী বোঝেনি যে তার বাড়িতে যে অবস্থান আগে ছিল তার কোনো পরিবর্তন হবে না,বরং আরোই আষ্টেপৃষ্টে সংসারের জালে আটকে ফেলার চেষ্টা করা হবে তাকে।ফলে শুরু হল দাম্পত্য কলহ।মীনাক্ষী মা হওয়ার পর আর আগের মতো মুখ বুজে সবটা মেনে নেয় না,প্রতিবাদ করতে শিখেছে সে।আর যতই সে প্রতিবাদ করে,নিজের ইচ্ছেপূরণ করতে চায়,ততই তার প্রতি রূঢ় হয়ে পড়ে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকেরা।মেয়েকে কোলে নিয়েই সে শুরু করে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি,শাশুড়ির বাঁকা কথাকে পাত্তা না দিয়েই।চাকরি পেয়েও গেল সে অদম্য চেষ্টার জোরে,আর তখনই শুরু হল তুমুল অশান্তি।বিহান কথায় কথায় খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করল তার ওপর,অকারণে মেজাজ হারিয়ে ফেলতে লাগল যখন তখন।নিবেদিতার তখন দু'বছর বয়স,স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ার চোটে একরত্তি মেয়েটা ঘুমোতে পর্যন্ত পারত না রাতে,মায়ের কোলে সিঁটিয়ে থাকত সে,আর বিহান চিৎকার চেঁচামেচি করত।মীনাক্ষী বুঝেছিল,এই সংসারে মেয়েকে রাখলে তার শিশুকাল বিনষ্ট হয়ে যাবে মা বাবার এই অশান্তি দেখতে দেখতে,তাই মেয়েকে কোলে নিয়েই শ্বশুরবাড়ি ছেড়েছিল সে,একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে সেখানেই উঠেছিল সে।তারপর জল অনেক দূর গড়িয়েছিল,আইনত মেয়ের কাস্টাডি মীনাক্ষী পেলেও বিহান ও তার মা বাবা চেয়েছিলেন নিবেদিতা তাঁদের কাছে থাকুক,এমনকি মীনাক্ষীর মা বাবাও তাই।মীনাক্ষীর মা বাবা এসেছিলেন একদিন ভাড়া ফ্ল্যাটে,এসে ঘৃণার চোখে মীনাক্ষীর দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,'নিজে তো উচ্ছন্নে গেছই,আবার মেয়েটাকেও সাথে নিলে কেন?সে তুমি যেখানে খুশি যাও আমাদের কিছু বলার নেই,কিন্তু মেয়েকে তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দাও,তোমার কাছে থাকলে যে কি শিক্ষা পাবে তা আর বুঝতে বাকি নেই!' নিজের মা বাবার মুখে এমন কথা শুনে লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছিল মীনাক্ষীর,তবুও মেয়েকে কাছ ছাড়া করেনি সে।কিন্তু বিহান আর তার মা বাবার যখন তখন ফ্ল্যাটে এসে উপদ্রব,চিৎকার চেঁচামেচি,মীনাক্ষীর মা বাবারও সবেতে সায় দেওয়া,আর পারছিল না মীনাক্ষী।ভেবেছিল এরকম চলতে থাকলে মেয়েটার মানসিক স্বাস্থ্য ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হবে,তাই মেয়েটার মুখ চেয়ে অসম্ভব যন্ত্রণা হওয়া সত্ত্বেও তিন বছরের শিশুকন্যাকে তুলে দিয়েছিল বাবার কোলে,বলেছিল,'ওকে নিয়ে যাও,শুধু মাঝে মাঝে দেখা করতে দিও আমায় ওর সাথে।' শ্বশুরবাড়ির লোক সেটুকুতেও আপত্তি জানিয়েছিল,পরে মীনাক্ষী কান্নাকাটি করায় সুর নরম হয়েছিল তাদের,বলেছিল,মাসে একটাদিন সে আসতে পারে নিবেদিতার সাথে দেখা করতে।তারপর থেকেই এখনো পর্যন্ত মীনাক্ষী নিবেদিতার কাছে 'ধূমকেতু'।
কেটে গেছে অনেকগুলো বছর।নিবেদিতা আজ একুশ বছরের যুবতী,মায়ের মতোই সেও ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট,কিন্তু কলেজ পাশ করার পরেই বিহান চেয়েছে নিবেদিতার বিয়ে দিতে,মেয়ে চাকরি করুক তা সে চায় না।মীনাক্ষী জানত এমনটাই হবে,বিহানের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কি আশা করা যায়?
নিবেদিতা আজ আর বাবার কাছে থাকে না, থাকে মায়ের কাছে,আরও অনেক দূর পড়াশোনা করতে চায় ও,নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়।মীনাক্ষী নিজের রোজগারে একটা দু'কামরার ফ্ল্যাট কিনেছে,তাতে মা মেয়ের দিব্যি চলে যাবে।
রাতের আকাশের বুকে আজ একটা ধূমকেতু দেখা যাচ্ছে আজ।নিবেদিতা মায়ের কোলে মাথা রেখে বলে, 'ভাগ্যিস সেদিন তুমি ধূমকেতু ছিলে মা আমার কাছে,তাই তো আজ আমিও পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পারছি।ভাগ্যিস সেদিন বলি দাওনি নিজের ইচ্ছেকে,স্বপ্নকে,তাই তো আজ আমিও নির্বিঘ্নে এগিয়ে চলেছি আমার স্বপ্নপূরণের পথে।
0 মন্তব্যসমূহ