Advertisement

শেষ চিঠি

শেষ চিঠি 
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

'মা বাবা,এ চিঠি তোমাদের উদ্দেশ্যে লেখা,হ্যাঁ শুধু তোমাদেরই উদ্দেশ্যে বললাম,কারণ পড়েই তোমরা এটা ছিঁড়ে ফেলো যেন!অবশ্য ছিঁড়ে ফেলতে তোমরা ভুলবে না জানি,কারণ দুঃখ-স্নেহের থেকে সামাজিক সম্মান টা তোমাদের কাছে অনেক বড়ো,বড়ো এই ইঁদুর দৌড়ে সবার আগে এগিয়ে থাকা।তাতে দুটো সন্তানের মধ্যে একটা মরলই বা,তাতে কিই বা এসে যায়?মা,আমি পাঁচটা সাবজেক্টে লেটার পেয়েও একটায় টেনেটুনে পাস করেছি,তাই তো আমার মুখই দেখতে চাওনি কিছুদিন।মা রেজাল্ট বেরোনোর দিন আমার গায়ে জ্বর ছিল,বন্ধুবান্ধব সবাই বুঝতে পারল,কিন্তু তোমরা বুঝতে পারলে না!হয়ত দরকারও পড়েনি।আর সত্যিই তো,আমার পড়ার ঘরে একখানা এসি বসিয়ে দিয়েছ,তাও কিনা অঙ্কে আমি নব্বই না পেয়ে উনপঞ্চাশ পাব!এ অন্যায় নয়?মা,ভেবে দেখো,আমি কিন্তু এসি লাগাতে শতবার বারণ করেছিলাম,কিন্তু কানে তোলোনি।কি জানি এসিটাই মার্কস তোলার মেশিন ভেবেছিলে হয়ত।মা জানো,পাশের বাড়ির সুপ্রতিম সব সাবজেক্টেই বিলো ফিফটি পেয়েছে,ওর বাবা একজন আইপিএস অফিসার, সমাজে প্রতিপত্তি তো ওদেরও কিছু কম না বলো বাবা?কিন্তু তবুও সুপ্রতিমকে কোনোদিনও শুকনো মুখে বারান্দায় আনমনা হয়ে বসে থাকতে দেখিনি,শুনিনি আঙ্কেল আন্টির জোর গলায় চেঁচানি।কিন্তু আমার একটা রেজাল্ট একটু খারাপ হওয়ার জন্য তোমরা এমন কেন করছ আমার সাথে?আমি অসুস্থ জেনেও খোঁজ নিতে আসোনি একটিবারও আমার ঘরে।গায়ে জ্বর নিয়েও চোখের জল ফেলেছি,কিন্তু যে ছেলের ভালো রেজাল্টের মুরোদ নেই তার তো এসব ন্যাকামি তাই না বলো?কিন্ত মা বাবা,জীবনের অনেক পরীক্ষায় তো আমি যথেষ্ট ভালো রেজাল্ট করেছি,কই তখন তো উৎসাহ দাওনি?বরং যখনই মজার সুরেও বলতাম,বাবা চলো না একদিন আইসক্রিম ফুচকা খাওয়াবে আমায়।তখন বিরক্ত হয়ে বলেছ,'রেজাল্ট ভালো হলে নিজের লাভ,আমরা অত আদিখ্যেতা করতে পারবনা বাপু!'ছোট থেকেই মা তোমায় অনেকেই বলে শুনেছি,যে তুমি নাকি রামগরুড়ের ছানা,হাসতে ভালোবাসো না এক্কেবারে।মা তোমায় কোনোদিনও দেখিনি আমার সাথে ভালো করে কথা বলতে,আর বাবা?তোমার কথা তো ছেড়েই দিলাম।সন্তানের কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখার থাকে,বিশ্বাস করো তোমরা!তোমরা আমার জন্য জান লড়িয়ে দাও আমি জানি,কিন্তু তাই বলে আমার সামান্যতম স্পেসও কি তোমাদের জিম্মায় থাকবে?না,কিন্তু সন্তানের মন বোঝার চেয়েও নিজেদের সুপ্রিমো প্রমাণ করা,অধিকার ফলানো মনে হয় বেশি জরুরি।যে ছেলে কোনোদিন কষ্ট পেলে,আঘাত পেলে,মাথায় হাত বুলিয়ে দুটো মিষ্টি কথা বলোনি,সেই তোমরাই যখন তখন অপমানের অধিকার কিভাবে পাও বলবে?হাজারবার বোঝানো সত্ত্বেও তোমরা বোঝোনি,বলা ভালো বুঝতে চাওনি।আমার কথা শুনলে তোমাদের সম্মান কিভাবে বজায় থাকে বলো?তোমরা কেন বুঝতে চাও না,আমার-তোমাদের সম্পর্কটা কাউকে ছোট বড়ো করা নয়,ইগো স্যাটিসফাই করা নয়,আমায় দমিয়ে রাখা নয়,সম্পর্কটা স্নেহ ভালোবাসার।ঠিক যেন বটগাছ আর পথিক।হ্যাঁ আমি জানি বাইরের লোক আমাকেই খারাপ বলবে,কারণ মা বাবার কোনো দোষ থাকতে নেই এ সমাজে।তাই তোমাদের যাবতীয় জ্বালা আজ মেটাবো,চিন্তা নেই।কম নম্বর পেয়েছি বলে এতটাই রাগ,ঘৃণা,যে অসুস্থ আমি টাকেও মেন্টাল টরচার করতে ছাড়োনি।আমি অনেকদিন মনের জোর ধরে রেখেছিলাম,কিন্তু এত অসুস্থ শরীরে কঠিন দিনগুলো যেন নরকযন্ত্রণা হয়ে উঠেছে।তাই চললাম।হ্যাঁ জানি আমি মরে গেলে কষ্ট হয়ত পাবে,কিন্তু একবার হলেও 'উফফ ছেলেটাকে মানুষ করতে পারলাম না,বেশি পেয়ে উচ্ছন্নে গেছে' বলবে,আমি জানি বলবেই।'
— ইতি তোমাদের কুলাঙ্গার অবিনাশ। 


হ্যাঁ এরকম অবিনাশদের কিন্তু জন্ম থেকেই ডিপ্রেশন থাকে না,তারাও আর পাঁচটা সন্তানের মতই হেসেখেলে বাড়তে চায়, হয়ত ছেলেটি আজ সুস্থ থাকত, যদি একটু হলেও তার কাছের মানুষদের পাশে পেত, কে বলতে পারে!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ