Advertisement

সেই রাত

সেই রাত
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

১) মেয়েটির আজ সন্ধ্যেতেই বিয়ে হয়েছে,সিঁথিতে সিঁদুর জ্বলজ্বল করছে,নাক রাঙা হয়ে আছে গুঁড়ো সিঁদুরে।মেয়েটি বাবার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে কখন।তবু বাবার চোখে ঘুম নেই,রাত পোহালেই হৃদয়ের টুকরোকে এক অচেনা পরিবারে পাঠিয়ে দিতে হবে যে!অসহায় প্রৌঢ় কেবলই ভাবছেন,এ রাত যদি না শেষ হত!

২) বিধবা প্রৌঢ়া কিছুতেই দু চোখের পাতা এক করতে পারছেন না।সেই কবে বুকে পাথর চেপে পড়াশুনার জন্য দূরদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নিজের একমাত্র সন্তানকে।এখন তাঁর সেই ছোট্ট ছেলেটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে,পড়াশুনাও শেষ।বিদেশে চাকরিও পেয়েছিল,কিন্তু চাকরি সে জন্মভূমিতেই করবে,তাই আগামীকালই তার ফেরার কথা দেশে।মায়ের আর ঘুম আসছে না,শুধু ভাবছেন,এ রাত কখন শেষ হবে!

৩) মীনাক্ষীর ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ।মা বাপ মরা মেয়েটার কাছে অভিজিৎই ছিল স্বামী,অভিভাবক, বন্ধু সবকিছু।ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল মীনাক্ষী,অভিজিৎ ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।ডাক্তার বলেছেন,তার হাতে আর মাসখানেক সময় আছে।মীনাক্ষীর জরাজীর্ণ হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে অভিজিৎ ভাবে,যদি এ মাসটা না কাটত,যদি এই রাতগুলো না শেষ হত!

৪) তুহিনা চোখ দুটো বুজে আছে,তবু ঘুম আসছে না কিছুতেই!উঠে একটু জল খেল,চেষ্টা করল ঘুমোবার,কিন্তু পারল না।রাত পোহালেই তার বিয়ের সানাই বাজবে।সে শুধু ভাবছে,যদি কোনোভাবে এই রাতের অন্ধকারে পালানো যেত,বড্ড ভালো হত।তুহিনা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়,স্বাবলম্বী হতে চায়।কিন্তু মা বাবা কিছুতেই মেয়েকে চাকরি করতে দিতে রাজি নন,তাঁরা মেয়েকে অন্য এক ঘরের লক্ষ্মী হিসেবেই দেখতে চান।অন্যদিকে তুহিনার হবু স্বামী আবীর তাকে কথা দিয়েছে,বিয়ের পর তুহিনার স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব তার,কিন্তু তবুও ভয় হয় তুহিনার,যদি আবীরও তার নিজের বাবার মতোই মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বিরোধী হয়!এ রাতটা শেষ হলে তার জীবনে কি নেমে আসবে সেই আশঙ্কাতেই ঘুম আসছে না তুহিনার।হয়ত এ রাতের শেষ হলেই তার জীবনে আসবে স্বপ্নপূরণের আলো,অথবা সে নিমজ্জিত হবে স্বপ্ন ও বিশ্বাসভঙ্গের গভীর অন্ধকারে!

৫) চারটে অধীর অপেক্ষারত চোখ আজ জানালা দিয়ে আসা জ্যোৎস্নার আলো মাখছে।অনেক বাধা বিপত্তির পর জোড়া লাগতে চলেছে শুভম আর আত্রেয়ীর জীবন।আগামীকাল ওদের বিয়ে।ছোট থেকে দুজনেই এক স্কুল কলেজে পড়েছে,একে অপরের সাথে সারাদিন কেবল ঝগড়া আর কথা কাটাকাটি লেগে থাকত।গোটা দুনিয়া বুঝলেও ওরা বুঝত না,যে একে অপরকে কতটা ভালোবাসে ওরা।আগামীকাল সবর্দা আপাত তর্কে ব্যস্ত মনদুটির মিলনের দিন,তাই তো ঘুম নেই আজ শুভম-আত্রেয়ীর চোখে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ