নেশা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
- 'আচ্ছা,সবার জীবনে তো কিছু হবার ইচ্ছে থাকে।তোমার কি ইচ্ছে?'
- 'সত্যি বলব?'
- 'হ্যাঁ,সত্যিটাই তো জানতে চাইলাম।'
- 'না এমন ইচ্ছে বললে আবার আপনাদের মতো ভদ্র মানুষদের কান দিয়ে তাজা রক্ত গড়াতে পারে কিনা,তাই বললাম।'
- 'না না,আমি ভদ্র নই,আমার কাছে নিঃসন্দেহে বলতে পারো।কথা দিচ্ছি কানটা ঠিকই থাকবে,এবার বলে ফেলো।'
- 'তাহলে শুনুন।আমি ভালো মেয়ে হতে চাই না,খারাপ মেয়ে হতে চাই,খুব খারাপ মেয়ে,এতটাই যে রাস্তায় কেউ মুখ ঘুরিয়েও না দেখে যেন আমায়।'
- 'কি রকম?'
- 'হ্যাঁ,আমি খারাপ মেয়ে হব,খারাপ,দুশ্চরিত্রা, মাতাল,নেশাখোর।রোজ সন্ধ্যেয় পার্টি তে যাব,আকন্ঠ গিলব,এতটাই গিলব যে,গলা-বুক সবটা জুড়ে শুধু অ্যালকোহল থাকবে,কোনো দুঃখ কষ্ট আশা ভালোবাসা কিচ্ছু স্থান পাবে না সেখানে।চোখে এতটাই ঝাপসা দেখব যে প্রেমিক তো বহুদূর,কোনো অপ্রেমিকও চোখে পড়বে না।সিগারেটের ধোঁয়ায় চারিদিক কুয়াশাচ্ছন্ন হবে,ভয় নেই,আমি পাবলিক প্লেসে স্মোক করিনা,অন্যদের ক্ষতি কেন করব বলুন?তারা ভালো ছেলে মেয়ে,তাদের জন্য সকলে অপেক্ষা করে।কিন্তু আমি তো খারাপ মেয়ে হব,কারণ তাদের জন্য কেউ অপেক্ষা করে না,কেউ তাদের কাছে কিছু আশা করেনা।আর বাকি রইল নিন্দা?সে তো সবাই এমনিও করবে।আসলে কি জানেন তো মানুষের উপকার করার পর যখন তারাই আমায় পিছন থেকে ছুরি মারে,তখন বড্ড মাতাল হতে ইচ্ছে করে। যখন কাছের মানুষ গুলোর আমায় বিরক্তিকর মনে হয়,আমার সাথে থাকা যায় না বলে মনে হয়,বিশ্বাস করুন,তখন নিজের এই শান্ত ভালো রূপটাকে কেটে কুচিকুচি করতে ইচ্ছা করে,ইচ্ছে করে খারাপ চরিত্রহীনা হতে।আর এই সমাজে চরিত্রহীনা হবার জন্য বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই,শুধু ছোটবেলার কিছু পুরনো ছেলেবন্ধুর সাথে রাস্তার মাঝে একটু হেসে গল্প করতে হয়,বা কোনো একদিন মরা নদীর চরে বসে একটা সিগারেট ধরালেই আমার চরিত্র নিয়ে কাটাছেঁড়া হবে।হ্যাঁ,তাই হোক,আমি তাই হব।বলুক,সবাই আরো বলুক,কিন্তু আমার আর সেসব কানে পৌঁছবে না,সেই অবস্থাই আর থাকবে না।হ্যাঁ,আমি মাতাল হতে চাই,নেশাখোর হতে চাই।'
- 'সবই শুনলাম, বুঝলাম,রক্ত বেরোল,কিন্তু কান দিয়ে নয়।বুকটা কেমন ফাটল মনে হচ্ছে,নিজের সাথে মিল পাচ্ছি অনেকটা।আচ্ছা আমার একটা প্রস্তাব ছিল,বলব?'
- 'স্বচ্ছন্দে।'
- 'আচ্ছা আমার বোন হবে তুমি?হ্যাঁ,তোমাকে ভালো লাগে আমার,খুব ভালোবাসি,ছোটবোনের মতো।বলো না,হবে আমার বোন?ডাকবে আমায় দাদা বলে?প্রতিবছর ভাইফোঁটা দেবে,কথা দিচ্ছি বুকভরা ভালোবাসা উপহার দেব।'
সেই থেকে ওরা ভাইবোন।দুটো ছেলেমেয়েরই জীবনে অনেক দুঃখ ছিল,তাই ওদের মাতাল নেশাখোর হওয়া কেউ আটকাতে পারল না।দুজনেই রোজগার করে,আর সেই টাকায় গরীব-দুঃস্থ মানুষদের সেবা করে সাধ্যমতো। দুঃখীদের সেবার নেশায় ওরা মাতাল,তবে ওদের চরিত্র নিয়ে আজও কাটাছেঁড়া হয়,কাদা ছেটানো হয় ওদের সম্পর্ক নিয়েও।কিন্তু ওরা যে গরীর মানুষগুলোর আশীর্বাদ গিলেছে আকণ্ঠ, তাই সেসব নিন্দা ওদের চোখ কান পর্যন্ত পৌঁছায় না,কারণ অন্যকে সাহায্য করার মতো গাঢ় তীব্র অ্যালকোহল আজও কোনো কোম্পানি বানাতে পারেনি।
0 মন্তব্যসমূহ