Advertisement

হাত ছাড়ব না


হাত ছাড়ব না
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী

মেয়েটির আজ তিরিশ বছর পূর্ণ হল।তাই ছেলেটি তাকে ডিনারে নিয়ে যাচ্ছে।ওদের নাম?নাম আর জেনে আমার আপনার কি হবে বলুন?অচিন পাখিটার মতো অচেনাই থাক না ওরা,অচেনা-অজানার মধ্যে যে আলাদা কৌতূহল, অন্যরকম আকর্ষণ থাকে সেটা কি অস্বীকার করতে পারব আমি আপনি?তো নাম না জানা ছেলেমেয়েদুটোর সব ব্যাপারেই মতের অমিল হয়,জানেন?কেবল অমিল হয়না ওদের সম্পর্কে, বিশ্বাসে।সেই কলেজ লাইফ থেকে একে অপরের সেই যে হাত ধরেছে,আজও ছাড়েনি।হাত ধরেই হেঁটে যাচ্ছে ডিনার করতে,ওদের সেই চেনা পুরনো রেস্টুরেন্টে।বৈশাখের শেষবেলার রাত্রে ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছিল বেশ,যদিও সে হাওয়া শুধুই মেয়েটির চুলগুলো কপালে-মুখে ফেলছিল,আর ছেলেটি হাত দিয়ে সে চুল সরিয়ে দিচ্ছিল,ওদের ঘাম মোছানোর ক্ষমতা নেই ওই হাওয়ার।এই কিছুদিন আগেই ভোটপর্ব শেষ হল,জানেন দুজন দুটো আলাদা রাজনৈতিক দলকে ভোট দিয়েছে,মতামতও সম্পূর্ণ ভিন্ন দুজনের,তবু কোনোদিন সেই নিয়ে মারামারি কাটাকাটি তো দূর,গলা চড়িয়ে কথাও বলেনি একে অপরকে।তবে যেটা করেছে সেটা হল খিল্লি।একজন অন্যের দলের সমর্থন নিয়ে,আর অন্যজন অন্যের মতামত নিয়ে,কিন্তু সেটা খিল্লির পর্যায়েই থাকে,কখনও ঝগড়ার পর্যায়ে যায়নি,কারণ দুজনেই জানে,অসুস্থতার সময় কোনো নেতা এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে না,যত্নে খাইয়ে দেবে না,বা সুখের দিনে মাথা হেলানোর জন্য কাঁধটাও কোনো মন্ত্রীর হবে না,হবে কাছের মানুষটারই।ভোটের ফলাফল যেদিন প্রকাশিত হয়,সেদিন যার সমর্থিত দল জেতে,সে অন্যজনকে ট্রিট দেয়,আর অন্যজনও হাসিমুখে তা গ্রহণ করে,কোনোদিন ঝগড়ায় রূপ নেয়না তা। এই তো কিছুদিন আগেই ভোটপর্ব মিটল,তখন লাইনে দাঁড়ানোর সময়ও একে অপরকে নিয়ে খিল্লি করতে করতে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল, কে বলবে দুজন দুই আলাদা দলকে ভোট দেবে?ভোট দিয়ে ফেরার সময় মেয়েটার এটা ভেবেই আফসোস হচ্ছিল যে আইসক্রিমের দোকানগুলো সব বন্ধ আজ।ছেলেটা ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,'তাতে কি?বাড়িতে আমি আজ দারুণ করে আমপোড়া সরবত বানাব।'
চলুন না, আমি আপনিও ওদেরই মতো হই। রাজনীতির চক্করে ঘূর্ণির মতো ঘুরতে ঘুরতে আমরা অজান্তেই সরে যাই নিজেদের কাছের মানুষগুলোর কাছ থেকে,ছোটোবেলায় যে বন্ধু স্কুল না এলে আপনার মনটাই খারাপ হয়ে যেত, স্রেফ মতের অমিল হওয়ার কারণে আজ আপনি তাকে পছন্দই করেন না। কেন? আপনার দুঃখের সময় কি নেতামন্ত্রীরা আপনাকে সাহস জোগাবে? নাকি তাদের বুকে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে পারবেন? তাহলে কেন এই মারামারি কাটাকাটি খুনোখুনি? চলুন না, আমরাও ওই নাম না জানা ছেলেমেয়েদুটোর মত হয়ে যাই। দেখবেন সেদিন ভোট আর ভয় আতঙ্কের কারণ হবেনা, একটা সাধারণ দিনের মতোই হবে ভোটপর্বের দিন। চলুন না, ওদের মতো বলি, কিছুতেই হাত ছাড়ব না একে অপরের!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ