Advertisement

কে ওখানে?

                       

কে ওখানে?
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 

রশ্নি নির্জন রাস্তাটা দিয়ে একা একা হাঁটছিল।হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখে রাত দেড়টা।এত রাতে রাস্তা দিয়ে একা হেঁটে যেতে বেশ ভয় ভয় করছিল রশ্নির।বাঁদিকের কপাল থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল,আজ খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছে সে।গাড়িটার মাতাল ড্রাইভার এমন উন্মত্তের মতো গাড়ি চালাচ্ছিল যে আরেকটু হলেই রশ্নিকে চাপা দিচ্ছিল আর কি!খুব সামলে নিয়েছে যাই হোক।গাড়ির ধাক্কায় রশ্নি ছিটকে পড়েছিল,আর রাস্তার পাশে থাকা পোলটায় আঘাত লেগে কপাল ফেটে গেছিল তার।অনেকক্ষণ হুঁশ ছিল না,তারপর কিছুক্ষণ পর হঠাৎ জ্ঞান ফিরে রশ্নি তাকিয়ে দেখে কেউ কোথাও নেই,ফাঁকা রাস্তায় সে একা পড়ে আছে।ভয়ে গা ছমছম করে ওঠে তার।ঝেড়েমেরে উঠে দাঁড়িয়েই দ্রুত পা চালাতে থাকে সে।কোনোরকমে নির্জন রাস্তাটা পার করে বড়ো রাস্তায় ওঠে সে।

বড়ো রাস্তায় এসে তার হঠাৎ মনে পড়ে বাবার সুগারের ওষুধগুলো ফুরিয়ে গেছে।ওষুধ কিনতেই তো সে বেরিয়েছিল।বাবার তো নিজের শরীরের দিকে কোনো হুঁশই থাকে না,সব খেয়াল রশ্নি আর তার মা রাখে।আজ রাতে খাবার পর ওষুধ খেতে গিয়ে রশ্নির বাবা কমলেশবাবু দেখেন,ওষুধ শেষ।তখন রাত এগারোটা।রশ্নি খুব রেগে যায়,'ওষুধ যে ফুরিয়ে গেছে,সেটা বলতে হয় না?'

— 'না রে মা,তুই ছাড় না,একদিন ওষুধ না খেলে কিচ্ছু হবে না।কাল সকালে বরং তুই ওষুধ নিয়ে আসিস।'

— 'তুমি চুপ করো বাবা,ডাক্তারকাকু কি বলেছে মনে নেই তোমার?একদিনও যেন ওষুধ মিস না হয়!'

— 'আরে ডাক্তাররা ওরকম বলেই থাকে,ছাড় তো!'

রশ্নির মাথায় আগুন ছুটে গেছিল তখন।একে মায়ের পায়ে বাত,হাঁটাহাঁটি তেমন করতে পারেন না,তার ওপর যদি বাবাও বিছানায় পড়ে তাহলে সংসারটা দেখবে কে?রশ্নির দাদা ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করে,বৌ-ছেলে নিয়ে ওখানেই থাকে।তারও তো বললেই আসা সম্ভব হয় না!তবুও বাবা নিজের যত্ন নেয় না!রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক।তাই ওষুধ ফুরিয়ে গেছে শুনে রশ্নি নিজেই মানিব্যাগটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।যেখানেই যায় রিস্ট ওয়াচটা সবসময় পরে নেয়,তখনও তার অন্যথা হল না।রশ্নির মা মিনুদেবী আর কমলেশবাবু বারবার বললেন,'এত রাতে বেরোস না মা,রাস্তাঘাট ভালো নয়।' কিন্তু রশ্নি সেসবে কান দেয়নি,বেরিয়ে পড়েছিল।কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে ও আরও হতাশ হয়ে পড়ে।এত রাত,একটাও ওষুধের দোকান খোলা নেই।তবে ও শুনেছে স্টেশনের কাছে যে হসপিটালটা আছে,তার কাছাকাছি একটা ওষুধের দোকান আছে,ওটা নাকি অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকে।কিন্তু স্টেশনও তো বেশ দূরে,বাসে দশ-পনেরো মিনিট মতো লাগবে।আর দেরি না করে রশ্নি বাসে উঠে পড়ল,আজ ওষুধ নিয়েই ও বাড়ি ফিরবে,তাতে যত রাত হয় হোক।

 একটু পরেই স্টেশন এসে গেল,রশ্নি বাস থেকে নেমে পড়ল।কিন্তু ওষুধের দোকানেও বড্ড ভিড়।যাই হোক, ভিড় এড়িয়ে ওষুধ কিনে বেরোতে পৌনে বারোটা বাজল।বেরিয়ে সে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতে লাগল বাস আসার।

 বাসস্ট্যান্ডে সে একাই অপেক্ষা করছিল।ঘড়ির কাঁটাও প্রায় ১২ ছুঁইছুঁই।একটু ভয়ও করছিল তার।হঠাৎই একটা বাইক তার প্রায় গা ঘেঁষে যাওয়ার সময় আচমকাই বাইকের পিছনে বসা ছেলেটা তার হাত থেকে মোবাইলটা এক ঝটকায় ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল।ঘটনার আকস্মিকতায় রশ্নি কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে পড়ল,তার পরেই 'চোর চোর' বলে চিৎকার করে বাইকের পিছনে ছুটতে শুরু করল।কিন্তু দৌড়ে আর কতদূর সে যাবে?একটু পরেই বাইকটা একটা গলিমতো রাস্তায় ঢুকে পড়ল।রশ্নির তখন কোনো খেয়াল নেই,সে পাগলের মতো গলিটায় ঢুকে ছুটতে লাগল।কিন্তু বাইকটা যে কোন্ দিকে মিলিয়ে গেল আর দেখতেই পেল না রশ্নি।সে তখনও রাস্তা দিয়ে ছুটছে আর 'চোর চোর' বলে চেঁচাচ্ছে,কোনোদিকে তার খেয়াল নেই।হঠাৎই এক উন্মত্ত গাড়ির সাথে তার ধাক্কা লাগে,গাড়ির চালক ড্রিঙ্ক করেছিল,তাই ব্রেকটাও মারতে পারেনি ঠিকমতো। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়েছে রশ্নি,নয়তো গাড়ির তলায় একটু হলেই চাপা পড়ত,তবু শেষরক্ষা হল না।ধাক্কা খেয়ে রশ্নি ছিটকে পড়ল,আর রাস্তার ধারে থাকা পোলটায় মাথায় আঘাত লাগে তার,জ্ঞান হারায় সে।তারপর কতক্ষণ ওভাবে পড়েছিল খেয়াল নেই,হঠাৎ নিজে থেকেই হুঁশ ফেরে তার।ধাক্কায় হাতে থাকা ওষুধগুলো না জানি কোথায় ছিটকে পড়েছে,কিন্তু ওই ওষুধগুলো তো আর বাবাকে দেওয়া যায় না,তাই ও আর খোঁজার চেষ্টাও করেনি,পা বাড়াল বাড়ির পথে।

  সে বাড়ি ফিরতেই দেখে,মা বাবা তার জন্য অপেক্ষা করতে করতে দরজার কাছেই ঘুমিয়ে পড়েছে।টেনশন করে করে শরীর খারাপ হলো না তো মানুষদুটোর!রশ্নি মা-বাবাকে জাগিয়ে বলে,'মা-বাবা,আমি এসেছি,আর তোমরা চিন্তা কোরো না।'

 মিনুদেবী ধড়ফড় করে উঠেই রশ্নিকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন,'এই বুঝি তোর আসার সময় হল!আর আমরা যে এদিকে তোর চিন্তায় মরছিলাম!'

তারপর হঠাৎই মিনুদেবী রশ্নির কপালের চোটটা খেয়াল করলেন, 'একি রে!এত রক্ত কেন?কি হয়েছে?'

 গায়ে হাত দিতেই মিনু শক খাওয়ার মতো চমকে উঠলেন,'একি রে,তোর গা তো একেবারে বরফের মতো ঠান্ডা!অবশ্য হবে নাই বা কেন,অতক্ষণ ধরে রাস্তায় পড়ে ছিলি,গোটা হিমটা গায়ে লাগিয়েছিস!বললাম নভেম্বরের রাতে গায়ে একটা চাদর দে!মেয়ে কথা শুনলে তো!তারপর জ্বর বাধালে সেই তো আমাকেই ভুগতে হবে!'

'আরে বাবা,আমার কিচ্ছু হবে না,ঘটনাটা শোনো আগে,'রশ্নি সব ঘটনা খুলে বলে।মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিতে দিতে মিনুদেবী বলেন,'তোর বাবা বলল কাল সকালে যা,কিন্তু তুই সেই আজই যেতে গেলি।মোবাইলটা গেছে যাক,তোর যদি কিছু হয়ে যেত!'

 পরের দিন সকালে রশ্নির একটু তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙে গেল।কি আশ্চর্য! কাল যে ওরকম ভাবে চোট লাগল,কোনো ব্যথাই অনুভব করতে পারছিল না রশ্নি,শরীরটা এতই ফুরফুরে লাগছিল,মনে হচ্ছিল যেন ওজন অনেকটা কমে গেছে।হাওয়ায় যেন ও ভেসে ভেসে চলছে।তখনও ভালো করে সকাল হয়নি,একটু অন্ধকার ভাব তখনও রয়েছে,রশ্নি ভাবল মা-বাবা তো এখনও ওঠেনি,ওদের উঠতে উঠতে এখনও এক-দেড় ঘন্টা।ততক্ষণে নিজেই একটু চা বানিয়ে খেয়ে নিই,এই ভেবে রশ্নি রান্নাঘরের দিকে গেল।রান্নাঘরটা একটু ভেতরের দিকে,আর জানালাও একটাই,তাই বেশ অন্ধকার ভাব ছিল রান্নাঘরে।রশ্নি আলো জ্বালাতে গেল,কিন্তু সুইচ দেওয়া সত্ত্বেও আলো জ্বলল না।অথচ লোডশেডিং হয়নি,তাহলে ফ্রিজ চলত না।লাইটটা ফিউজ হয়ে গেছে ভেবে অন্ধকারেই কোনো রকমে গ্যাসওভেনটার দিকে গেল ও।কিন্তু ওদিকে যেতেই আবছা আলোয় দেখে আপাদমস্তক কালো চাদরে ঢেকে কে যেন দাঁড়িয়ে আছে।'মা,এত তাড়াতাড়ি উঠে পড়েছ?'রশ্নি প্রশ্ন করে।

কিন্তু রহস্যময় মানুষটি কোনো উত্তরই দিলেন না।

'বুঝেছি,ম্যাডামের অভিমান হয়েছে,'বলেই কালো চাদর পরিহিত ব্যক্তিটিকে জড়িয়ে ধরল রশ্নি,'কি করব বলো,কাল তোমার কথা না শুনেই বেরিয়ে গেছি,আসলে...'

রশ্নির হাতদুটো ছাড়িয়ে পিছনে তাকায় এবার সে,গায়ের চাদরটাও খুলে ফেলে।চোখদুটো তার সম্পূর্ণ কালো,কোথাও সাদাভাব নেই এতটুকু,মুখের ভেতর থেকে ভয়ানক দাঁত দেখা যাচ্ছে,যেন ছুরির ফলা।ওই দাঁত যেখানে বসাবে খুবলে মাংস তুলে নেবে অনেকটা।সারা গায়ে এতটুকুও মাংস নেই,হাড়ের ওপর চামড়া।দুটো হাতেই অসম্ভব বড়ো নখ,আর ডানহাতে একটা নোঙরের মতো অস্ত্র।সে অস্ত্রের ফলায় কবেকার শুকনো রক্ত শুকিয়ে কাঠ হয়েছে কে জানে!

এমন বীভৎস রূপ দেখে রশ্নি চিৎকার করতে গেল,কিন্তু শুধু গোঙানির মতো শব্দ বেরোল।বীভৎস মূর্তিটা হঠাৎই বাঁ হাত দিয়ে রশ্নির হাতটা সজোরে চেপে ধরল।

তারপর ভয়ঙ্কর গলায় বলল,'তোকে তো আমি নিয়ে যাবোই,কোথায় পালাবি আমার চোখ এড়িয়ে?'

বলে লোকটা তার ওই হাড় বের করা বজ্রমুষ্ঠিতে রশ্নির হাতটা ধরে টানতে লাগল,তার লম্বা নখের খোঁচায় হাত কেটে রক্ত পড়তে লাগল রশ্নির।প্রাণপণে চিৎকার করতে লাগল রশ্নি,'বাঁচাও!'

ডাক্তারবাবু রশ্নির পালস চেক করতে করতে বললেন,'এমনিতে তো কোনো প্রবলেম ওর নেই দেখছি।কিন্তু পালসটা...,যাই হোক ছাড়, হয়তো আমারই ভুল।'

—'মেয়েটা আমার ঠিক আছে তো?' চিন্তিত কমলেশবাবু বললেন।

ডাক্তারবাবু অয়ন সেন কমলেশবাবুর বন্ধু,এবাড়িতে হামেশাই যাতায়াত তাঁর।রশ্নির নাড়িনক্ষত্র তাঁর জানা।কিন্তু আগে তিনি যে রশ্নিকে চিনতেন এই রশ্নির সাথে যেন কোনো মিলই নেই,শারীরিক মানসিক কোনোদিক থেকেই।

'মনে হচ্ছে কালকের ট্রমাটা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি,তাই হ্যালুসিনেসন হচ্ছে,আর জ্ঞান হারাচ্ছে।তবে তোরা ওকে একা ছাড়বি না একদম, বিপদ ঘটে যেতে পারে।'

কয়েকটা ওষুধ লিখে দিয়ে এরপর বেরিয়ে এলেন অয়নবাবু।

এদিকে ভোরের ঘটনাটা যে হ্যালুসিনেসন ছিল,সেটা কিছুতেই মানতে ইচ্ছা করছে না রশ্নির,কারণ তার হাতে নখের সেই গভীর আঁচড়ের দাগটা এখনও স্পষ্ট।কিন্তু মা-বাবা ওকে বলেছেন,ওর হাতের কাছেই নাকি একটা ছুরি পড়ে ছিল,ওতেই নাকি হাত কেটে গেছে বেকায়দায়।বিশ্বাস করতে ইচ্ছা না করলেও সবার কথায় হ্যালুসিনেশন বলেই বিশ্বাস করে শেষ পর্যন্ত রশ্নি।

পরেরদিন বিকেলে চমকানোর আর এক দফা রশ্নির।দাদা-বৌদি হঠাৎই বিকেলে হাজির হয় ব্যাঙ্গালোর থেকে ছেলেকে নিয়ে,আগাম খবর না দিয়েই।সবার সাথে গল্প-আড্ডা দিয়ে মনটা বেশ শান্ত হল রশ্নির।দাদার ছেলে অভীককে কোলে নিয়ে রশ্নি বলল,'আজ ও আমার সাথেই শোবে,কতদিন দেখিনি আমার বাবুটাকে।'অভীকের গাল টিপে বলল রশ্নি।

 রাতে অভীককে বুকে আগলে শুয়ে ছিল রশ্নি।হঠাৎ গালে কিরকম ব্যথা লাগল রশ্নির,ঘুম ভেঙে গেল।ঘুম ভেঙেই দেখে তার গাল কামড়ে ধরেছে অভীক,আর প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। 'ছাড় ছাড়',বলে অভীককে ঠেলে সরিয়ে দিতে গেল রশ্নি,কিন্তু সে সরল না,উলটে তার হাতটা কামড়ে ধরল সে।'উফ লাগছে বাবু,এমন করে না,'বলে রশ্নি একটু ধাক্কা দিল তাকে।আর সেই ধাক্কাতেই অভীক মাটিতে ছিটকে পড়ল,আর পড়েই কাঁদতে শুরু করল সে।তাড়াতাড়ি টর্চটা খোঁজার চেষ্টা করল সে,কিন্তু গোটা বিছানা হাতড়েও টর্চটা পাওয়া গেল না কোত্থাও। হঠাৎই অভীকের কান্নাটা কেমন যেন মানুষের কান্না বলে মনে হল না তার,কেমন জান্তব একটা চিৎকার করছে অভীক।

অন্ধকারে কোথাও কিছু না পেয়ে অসহায় রশ্নি এবার চিন্তিত হয়ে পড়ল,'বাবু ওরকম আওয়াজ করছিস কেন?লেগেছে?আসলে আমি তোকে ধাক্কা দিতে চাইনি,আসলে গালে আর হাতে এমন লাগছিল...'

হঠাৎই অভীক মেঝে থেকে কেমন যেন উড়ে আসার মতো বিছানায় এক লাফে চলে এল,আর এসেই সেই জান্তব শব্দটা করে ঝাঁপিয়ে পড়ল রশ্নির ওপর।ভয়ানক গলায় বলল'আমায় ঠেলে দিলি কেন?কোথায় ব্যথা লাগছিল তোর?'

রশ্নি অবাক হয়ে দেখে সত্যিই ওর গালে আর হাতে কোনো ব্যথা নেই।

রশ্নি কিছু একটা বলতে যাবে,হঠাৎই অভীক তার হাতটা রশ্নির কপালে বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,'ঘুমো পিপি,তুই ঘুমো।'

কিন্তু হঠাৎই কেমন সন্দেহ হয় রশ্নির।কপালে যে হাতটা স্পর্শ করে আছে,সেটা কোনো শিশুর হাত বলে কোনোভাবেই মনে হল না রশ্নির,মনে হল প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাত।সেদিন ছিল জ্যোৎস্না মায়াবী রাত।হঠাৎ চাঁদের ওপর থেকে মেঘের আবরণ সরে গেল,আলো এসে পড়ল অভীকের মুখে।কিন্তু এ তো অভীকের মুখ নয়!এ তো সেদিন ভোরে রান্নাঘরে যাকে দেখেছিল,সেই বীভৎস মুখ!চিৎকার করে অভীককে ঠেলে দিল সজোরে,আর কিছুক্ষণ পরেই রশ্নির ঘরের আলো জ্বলে উঠল,রশ্নির মা-বাবা-দাদা-বৌদি ছুটে এলেন ঘরে।সকলে এসে দেখেন মেঝেতে পড়ে গিয়ে অভীকের বাঁ হাতের কনুইটা বেশ কিছুটা ছড়ে গেছে,আর সে কেঁদে কেঁদে বলছে,'পিপি খুব পচা।আমায় খালি খাট থেকে ফেলে দেয়।'

রশ্নির বৌদি এসে অভীককে কোলে নিয়ে বলে ওঠে,'এসব কি শুনছি রশ্নি?মাথাটাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি তোমার?'

হঠাৎ রশ্নির মাথার বালিশের পাশে কি যেন একটা চকচকে জিনিস নজরে পড়ে রশ্নির দাদা সুজনের।কাছে যেতেই চমকে উঠে সে বলে,'মা-বাবা দেখ রশ্নির কান্ড!বিছানায় ছোরা নিয়ে শুয়েছে!'

এতক্ষণে রশ্নির রক্তাক্ত গাল আর হাতের দিকে নজর পড়ে সকলের।

পরেরদিন সকালে ডাক্তারবাবু আবার আসেন রশ্নিকে দেখতে।বেশ কিছুক্ষণ চেকাপের পর রশ্নির মা-বাবা-দাদা-বৌদি সকলকে বাইরে আসতে বলেন ডাক্তারবাবু। তারপর অনেকক্ষণ ধরে কি যেন আলোচনা হয় বাড়ির বৈঠকখানায়। কিন্তু রশ্নির কানে কিছুই পৌঁছয় না,সে গভীর ঘুমে অচেতন। স্বপ্নে দেখে খুব সুন্দর এক দেশে পাড়ি দিয়েছে সে,যেখানে কোনো ব্যথা নেই,কষ্ট নেই,খিদে নেই,ঘুম নেই,আছে শুধু হাসিখুশি ভরা কয়েকটা তৃপ্ত মুখ,যারা অবিরত খোশগল্পে মগ্ন। সে আড্ডার কোনো শুরু নেই,কোনো শেষ নেই।রশ্নি যেতেই তার হাত ধরে টেনে নিল এক অনন্যসুন্দরী মেয়ে।আহা এত রূপে চোখ ঝলসায় যে!এদেরই বুঝি ঠাকুমার ঝুলিতে পরী বলে?হবেওবা।

হঠাৎই মায়ের ডাকে রশ্নির ঘুম ভাঙে।'ডাক্তারবাবু অতক্ষণ কি বলছিলেন গো তোমাদের?'ঘুমজড়ানো গলায় রশ্নি বলল।'

'অয়ন বলল তোর তেমন কিছুই হয়নি,শুধু ক্লান্তির জন্য একটু মানসিকভাবে অসুস্থ তুই।তোকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে গেলেই তুই সেরে উঠবি।'

— 'সত্যি তো বাবা?এই গত কয়েকদিন ধরে যা হচ্ছে আমার সাথে,আর নিতে পারছি না।'

— 'কোনো চিন্তা নেই তোর বোন।কালই তোকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব,দেখবি আর ফিরতেই মন চাইবে না।'

—'তাই?তা কোথায় যাচ্ছি আমরা কাল?'

— 'অবনীন্দ্রগড়।'

কলকাতা থেকে খুব একটা দূর নয় গ্রামটা।বাড়ির গাড়িতে চড়ে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেল ওরা।'কলকাতার এত কাছে,অথচ জায়গাটার নাম সেভাবে শুনিনি।'গাড়ি থেকে নামতে নামতে রশ্নি জিজ্ঞেস করল।

— 'শুনবি কিকরে মা,এমন জায়গায় তো আর লোকে শখ করে আসেনা।'মিনুদেবী বলে উঠলেন।

— 'মানে?'রশ্নির কেমন খটকা লাগল মনে।

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল রশ্নি,হঠাৎ গাঢ় কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল,দমকা ঝড়ে চোখমুখে ধুলো ঢুকে দমবন্ধ হবার জোগাড়।হঠাৎ কোথা থেকে একটা সুন্দর পারফিউমের গন্ধ ভেসে এল।আরে,এটা তো রশ্নির প্রিয় পারফিউম!কেমন নেশা লেগে গেল রশ্নির।ঝড়ের তীব্র ধুলোর তান্ডবে চোখ খোলার তো উপায় নেই,চোখ বন্ধ করেই কোন্ এক অজানা নেশার টানে এগিয়ে চলল রশ্নি।সে পথ অনেক লম্বা।চলতে চলতে কখন যে হুঁশ হারিয়েছে সে,খেয়ালই নেই।

হঠাৎ একমুঠো ঠান্ডা জলের ছিটেয় হুঁশ ফেরে রশ্নির।

— 'পাগলি,কবে বুঝবি তুই আর ওদের মতো নোস?তোর ব্যথা লাগে না,কষ্ট হয়না,ভয় করেনা,হুঁশ হারায় না!'গলাটা কেমন চেনা চেনা ঠেকে রশ্নির।

চোখ খুলেই দেখে কোন্ এক পুরনো রাজমহলের পালঙ্কে সে শুয়ে আছে,আর সামনে দাঁড়িয়ে সেই বীভৎস লোকটা,যাকে সে রান্নাঘরে আর গতকাল অভীকের মুখে দেখেছিল।এবার কেঁদে ফেলে রশ্নি,'কে তুমি!কেন এভাবে আমার পেছনে পড়ে আছো।একটু শান্তি দাও না আমায়!'

ভয়ানক দাঁত বের করে হেসে ওঠে লোকটা।বলে,'তুই যাতে শান্তি পাস,সেই ব্যবস্থাই তো করার চেষ্টা করছি,কিন্তু তুই সেটা কিছুতেই বুঝতে চাইছিস না!'

— 'মানে?'

— 'ওরে পাগলি,তুই মরে গেছিস।এই ইহলোক আর তোর জন্য নয়।এবার যে তোকে মায়া কাটাতে হবে!দুঃখ-আনন্দ-মায়া-যন্ত্রণা-ভয় এসব যে সেই রাতেই তোর শরীরটার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেছে,একটা মৃত শরীর নিয়ে তুই ঘুরে বেড়াচ্ছিস!'

— 'মানেটা কি?আমায় যা বলবে আমি তাই বিশ্বাস করব?এত বোকা মনে হয় আমাকে?তোমার উদ্দেশ্যটা কি বলোতো?কোনো ভালো উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই নয়!'

— 'বুঝেছি,মুখের কথায় তোর বিশ্বাস হবে না,বেশ,তাহলে চোখ বন্ধ কর,করে বল আমি সবকিছু দেখতে চাই।'

রশ্নি চোখ বন্ধ করল,আর বলল,'আমি সবকিছু দেখতে চাই।'

আস্তে আস্তে চোখের সামনে থেকে অন্ধকার মিলিয়ে গেল,আর ফুটে উঠল সেই রাতের ঘটনা,যে রাতে বাবার জন্য ওষুধ কিনতে গিয়েছিল সে।তারপর মোবাইল চুরি যাওয়ার পর সে যখন বাইকের পিছনে ধাওয়া করছিল,হঠাৎই একটা বড়ো গাড়ি এসে ওকে ধাক্কা মারল,ধাক্কায় ছিটকে পড়ে রশ্নি,আর সে স্পট ডেড হয়।একটু পড়ে যখন তার জ্ঞান ফেরে,সেটা অজ্ঞান থেকে জ্ঞান ফেরা নয়,সেটা ছিল অতৃপ্ত আত্মার মৃত্যুর কথা ভুলে গিয়ে নিজের মৃত শরীরেই পুনঃপ্রবেশ করা।'

— 'নাঃ,আমি মরিনি,'চিৎকার করে কেঁদে উঠল রশ্নি,'আমি মরিনি!'বলে চিৎকার করে ঘরের সব জিনিস ছুড়ে ছুড়ে ফেলতে লাগল,তারপর রাগের মাথায় নিজের মাথা ঠুকতে লাগল পালঙ্কে সজোরে।

'কিরে খুব ব্যথা করছে?' লোকটা হেসে বলল।

রশ্নি অবাক হয়ে দেখল তার একটুও ব্যথা লাগছে না শরীরে,কপাল ফেটে রক্ত পড়ছে তবুও।

— 'বলেছিলাম না,তোর ব্যথা যন্ত্রণা লাগে না!তবুও মানুষজীবনের অভ্যাস সহজে ভুলিস নি,তাই সেদিন রান্নাঘরে যখন হাত ছড়ে গেল,অভ্যাসবশত চিৎকার করলি,ব্যথার কারণে নয়।আর তুই যদি মৃত সত্যিই না হতিস তাহলে কি পুরনো দিনের স্মৃতি এভাবে দেখতে পারতিস?'

এতক্ষণে রশ্নি নিজের মৃত্যুটাকে একটু হলেও মেনে নিয়েছে,বলল,'কিন্তু আমি মরে গেলেও আমার বাড়ির লোক ঠিক আমায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।ওরা আমায় ছেড়ে থাকতেই পারবে না!'

— 'বোকা মেয়ে,'লোকটা একগাল হেসে বলল,'ওরাই তো তোকে রেখে গেছে এখানে পাগলি,যাতে তুই আর ওবাড়ি ফিরতে না পারিস।'

— 'মানে?'

— 'মানে আবার কি?তোর ওই দাদা কি শখ করে বাড়ি এসেছে ভেবেছিস নাকি!তোকে ওই ডাক্তার দেখার পরই বুঝতে পেরেছিল,কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে,তোর পালস পাওয়া যায়নি।তারপরই তোর দাদাকে ফোন করে ডাকে ওই অয়নবাবু।তোর দাদা প্যারানর্মাল এক্সপার্ট এসব ব্যাপারের ওপর প্রচুর রিসার্চ করেছে,তাই সে শুনেই বুঝে গেছে কেসটা কি।তাই পরেরদিন বিকেলেই এসে হাজির হয়,যদিও তোর মা-বাবা-বৌদিকে কিছুই জানায়নি।তারপর যেরাতে অভীককে সঙ্গে নিয়ে শুলি,সেই রাতের পর তোর দাদা শিওর হয়ে গেল,যে তুই মৃত। পরেরদিন ডাক্তারবাবু এলেন,আর এবার চেকাপের পর তাঁরও আর বুঝতে বাকি রইল না ব্যাপারটা। বাড়ির সবাইকে জানানো হল ব্যাপারটা।তোর মা-বাবা প্রথমে খুব ভেঙে পড়েছিলেন জানিস,ওরাও তোর মতো বিশ্বাসই করতে চাইছিলেন না।'

— 'হ্যাঁ আমি জানি,'রশ্নি ব্যস্ত হয়ে বলল 'মা বাবা আমায় ঠিক রাখবে বাড়িতে,আমি যতই মরে যাই না কেন...'

— 'দাঁড়া পাগলি,দাঁড়া।পুরোটা শোন।ওঁরা প্রথমে কাঁদলেও পরে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন,মৃত মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করতে কার না ভয় করে বল?তাই তো ঘুরতে আসার নাম করে সকলে তোকে এই অবনীন্দ্রগড়ের প্রেতাত্মাগৃহে তোকে পৌঁছে দিয়ে গেছে।এই বাড়িতে কোনো জীবিত মানুষ প্রবেশ করতে পারে না,কারণ এই বাড়িতে কোনো পার্থিব পথ দিয়ে আসা যায় না,এক অপার্থিব রাস্তা দিয়েই আসতে হয়,যা দেখতে অনেকটা তোদের ভাষায় ঘূর্ণিঝড়ের মতো।আর তোর দাদা এই অবনীন্দ্রগড়ের ব্যাপারে অবগত।কোনো ম্যাপে এ জায়গার নাম পাবিনা,কারণ এ জায়গা অপার্থিব,ওদের কাজ ছিল তোকে এই প্রেতাত্মাগৃহের রাস্তা দেখানো।অনেক পাগলামো করেছিস পাগলি,এবার আমার সাথে চল,তোকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েই আমার ছুটি।'

— 'কিন্তু বাড়ির সবাইকে ছেড়ে আমি...'

— 'ওরে,তুই আর ওদের মেয়ে নস,ওরা আজ তোকে স্নেহ করে না,ভয় করে।তোর উপস্থিতি আজ ওদের কাছে আনন্দ নয়,আতঙ্কের কারণ।এবার তো চল,কতদিন ধরে কত খাটতেই না হল আমায় তোকে বোঝাতে যে তুই মৃত।'

— 'কিন্তু তুমি কে?কি তোমার পরিচয়?'

— 'আমি মৃত্যুদূত।মৃত শরীর থেকে নির্গত আত্মাকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোই আমার একমাত্র দায়িত্ব।'

— 'কিন্তু আমি কোথায় যাব?'

— 'কেন,আজ ভোরে যে মিষ্টি স্বপ্নটা দেখছিলি,সেই জায়গায়,যেখানে খোশগল্পেরা শেষ হয়না...'

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ