অজানা
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
১) রোজ সকাল সন্ধ্যে বর্ণিতা চিৎকার চেঁচামেচি করে,কাচের গ্লাস,চিনেমাটির ফুলদানি দুমদাম ছুড়ে মারে।তার চিৎকারে পাড়ায় টেকা দায়।মাঝেমধ্যে তার পরিচারিকা বাধ্য হয়ে তাকে একটি ঘরে বন্ধ করে রাখে,তখন ঘরের দরজায় দুমদাম লাথি মারার শব্দ শোনা যায়।
পাড়ার লোকেরা বর্ণিতার স্বামী অসীমের জন্য খুবই দুঃখ করে,'আহা অমন শান্ত নিরীহ গোবেচারা ছেলেটার কপালে কেমন দজ্জাল বৌ জুটেছে দেখ!বেচারার দুদণ্ড শান্তি নেই বাড়িতে।'
কেউ কেউ আবার বলে,'অসীম নেহাত অমন লক্ষ্মী ছেলে বলে তাই,আমাদের স্বামী হলে অমন বৌকে কবেই বাপের বাড়ি বসিয়ে দিয়ে আসত।'
অসীম সবসময় স্মিত হেসে ভদ্রতা মেশানো গলায় সকলের সাথে মেশে,তাই সমাজে সে সকলের চোখে প্রিয়পাত্র।বর্ণিতা ভালোবেসে বিয়ে করেছিল অসীমকে।বিয়ের প্রথমদিকে বর্ণিতা এমন ছিল না।অসীমকে সে চোখে হারাত,সে না খাওয়া পর্যন্ত বর্ণিতা কোনোদিন জলটুকুও খেত না।হঠাৎ এক ভয়ঙ্কর ঝড়বাদলের রাতে বর্ণিতার মাথায় ভেঙে পড়ে দুর্ভাগ্যের আকাশ।ও জানতে পারে সকলের সামনে নিরীহের মুখোশ পরা অসীম আসলে একজন চরিত্রহীন ছেলে,একাধিক মেয়ের সাথে ওর সম্পর্ক আছে।স্বামীর নাম বলতে অজ্ঞান মেয়ে এই সত্যিটা সইতে পারেনি,মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে সে।অসীমও চিকিৎসা করায়নি তার,উলটে তাকে দজ্জাল প্রমাণ করেছে সমাজের চোখে,আর সকলের সহানুভূতি কুড়িয়েছে শান্ত নম্রতার মুখোশে।তাড়িয়েও দেয়নি সে বর্ণিতাকে,কারণ মা মরা মেয়ে বর্ণিতার বাবা মরার আগে তাঁর অগাধ সম্পত্তির একমাত্র মালকিন করে গিয়েছিলেন বর্ণিতাকে।
২) অনুশ্রী একবছরের বাচ্চা কুট্টুকে কোলে নিয়ে কাজের খোঁজে বেরিয়েছিল সকালে।অনুশ্রী অবিবাহিত,তাই তার কোলে বাচ্চা দেখে পাড়ায় নানারকম কানাকানি গুঞ্জন শোনা যেতে লাগল।চায়ের দোকানে বসে থাকা কিছু লোক বলতে লাগল,'সিঙ্গেল মাদার,বুঝলেন?'
অন্য আর একজন বলল,'এই ছেলেমেয়েগুলোর জন্যই দেশটা গোল্লায় গেল বুঝলেন!আধুনিক হয়েছে সব!আধুনিক!'বলেই মুখ থেকে পানের পিকটা রাস্তায় ফেলল সে।
অনুশ্রী এপাড়ার মেয়ে নয়।কিছুদিন হল সে এ পাড়ায় এসেছে তার এক বান্ধবীর বাড়ি।যতদিন না একটা কাজ খুঁজে পাচ্ছে,ততদিন ওর বাড়িতেই থাকবে সে।কাজ খুঁজে পেলে একটা ভাড়াবাড়ি ঠিক খুঁজে নিতে পারবে সে,কুট্টুকে নিয়ে ওখানেই চলে যাবে।
স্বাগতবাবুর বড় বাড়িটার ওপর বহুদিন থেকেই শকুনের নজর ছিল স্থানীয় প্রোমোটার দেবর্ষির।বারবার প্রলোভন দেখানো সত্ত্বেও বাড়ি বিক্রি করতে রাজি করানো যায়নি স্বাগতবাবুকে।শেষে এক ফন্দি আঁটে দেবর্ষি।এক গভীর অমাবস্যার রাতে আগুন লাগিয়ে দেয় স্বাগতবাবুর বাড়িতে।স্বাগতবাবু,তাঁর স্ত্রী,তাঁর ছেলে ও পুত্রবধূ পুড়ে মারা যায় সে আগুনে,শুধু স্বাগতবাবুর মেয়ে অনুশ্রী আর স্বাগতবাবুর ছেলের একমাত্র সন্তান শিশুকন্যা কুট্টু বেঁচে যায় কোনোরকমে।
— 'ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছিস,খুব ভালো কথা,কিন্তু আর কোনোদিনও যেন এপাড়ার ত্রিসীমানাতেও তোদের না দেখি,দেখলে....'
দেবর্ষির সে লাল চোখ দেখে ভয়ে হিম হয়ে গিয়েছিল অনুশ্রী।ভাইঝিকে বুকে নিয়ে পালিয়ে এসেছিল অন্যপাড়ার এক বান্ধবীর বাড়ি।
আশেপাশে কত ঘটনাই আমাদের অজানা,তবুও না জেনে না বুঝে না শুনে কত সহজেই শুধু উপরটুকু দেখে মানুষের চরিত্রের কি চুলচেরা বিশ্লেষণটাই আমরা করতে বসি,তাই না?
0 মন্তব্যসমূহ