দুঃস্বপ্ন
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
— 'অপু,কেমন আছিস?'
— 'আমি অর্পিতা সেন।অপু বলে কাউকে চিনি না তো!'
— 'আজও সোজা কথার জবাব সোজাভাবে দিতে শিখলি না বল্?'
— 'যে মানুষের শিরদাঁড়াই সোজা হয়নি,তাকে সোজাসাপ্টা জবাব দিলেও সে কতটা বুঝবে বলা মুশকিল,নয় কি?'
— 'অপু,আজও অভিমান করে আছিস আমার ওপর না?'
— 'হাউ ডেয়ার ইউ?আমার পারমিশন ছাড়া আমার হাত ধরার সাহস কিভাবে হয় তোমার?'
— 'আমার প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তোর হাত আমি ছাড়ব না কিছুতেই!'
— 'যাস্ট শাট আপ!যে আমার ইচ্ছেকে সম্মান করতেই শেখেনি কোনোদিন,তার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।তুমি আমার হাত ছাড়বে,নাকি আমি চিৎকার করব!'
— 'ছাড়ছি ছাড়ছি,অযথা ন্যাকামি করিস না।এককালে তো আমার হাত ধরেই ময়দান ঘুরেছিস,এখন সন্ন্যাসী সাজছিস!'
— 'তখন বোকা ছিলাম,সবটাই সোজাভাবে দেখতাম,আসল মানুষ আর মুখোশের মধ্যে ফারাকটা চিনতে শিখিনি,কিন্তু আজ আমি সবটাই জানি,মানুষ চিনতে শিখেছি আজ!'
— 'কে শেখাল?তোর প্রেজেন্ট বয়ফ্রেন্ড?'
— 'হ্যাঁ তাই।আসলে মানুষ আর মুখোশের মধ্যে ফারাকটা চেনাতে পারে সেই মানুষটাই,যে নিজে একজন আদ্যোপান্ত খাঁটি মানুষ।যার নিজের মধ্যে হাজারটা ভেজাল আছে,সে ভেজাল চেনানোর দুঃসাহস দেখাবে কি করে?নিজেই ধরা পড়ে যাবে যে!'
— 'বড়ো বড়ো ডায়ালগ দেওয়ার স্বভাবটা আজও যায়নি না রে তোর?'
— 'না গো।আরও একটা ডায়ালগ জানি,শুনবে?চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী!'
— 'বড়ো বড়ো লেকচার মারিস না বুঝলি তো!নিজে মানিস তো?'
— 'হ্যাঁ খুব মানি,কারণ আমার মেরুদন্ডে স্পঞ্জ বসানো নেই অন্তত! অন্যায়কে অন্যায় বলার সৎসাহস আমার আছে যথেষ্ট! '
— 'বাব্বা,অভ্রনীল যে কি করে তোকে সহ্য করে তাই ভাবি!পারবে না,পারবে না,একদিন ওই ছেলেটাও বুঝবে,যে কোন্ সর্বনাশীর খপ্পরে পড়েছে ও!'
— 'তোমার ওই বিষাক্ত মুখে নীলের নাম নেবে না,ওই পবিত্র নাম তোমার মুখে শোভা পায় না!'
— ' বাব্বা এত্ত প্রেম!এর ছিটেফোঁটাও যদি আমার উপর দেখাতিস,তাহলে আমাদের সম্পর্কটা ভাঙত না!'
— 'হাহাহা,সম্পর্ক,প্রেম,ভালোবাসা, এগুলোর মানে জানো তুমি?শোনো ভালোবাসা এমনি এমনি পাওয়া যায় না,শ্রদ্ধা জোর করে আদায় করা যায় না।তোমার সাথে সম্পর্কে থাকাকালীন দিনের পর দিন আমি অসম্ভব মানসিক অশান্তিতে ভুগতাম,রাতে ঘুমোতে পারতাম না,তুমি আমার অসুস্থতার সময় আমার খোঁজ তো নিতেই না উলটে বিরক্ত হতে,বলতে, 'বাব্বা,পারিসও এত ভুগতে!' আমার ইচ্ছেকে বিন্দুমাত্র সম্মান তো করোইনি কোনোদিন,বরং নিজের সব মতামত,সিদ্ধান্ত জোর করে চাপিয়ে দিয়েছ দিনের পর দিন।আর সামান্য প্রতিবাদ করলেই জুটেছে অপমান! সামান্যতম রেসপেক্ট করেছ কোনোদিন আমায়?এই আজকেই দেখো না,আমার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই তোমার আজ,তবুও আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই হাতটা ধরলে তুমি!ছিঃ!'
— 'হয়েছে অপু হয়েছে!থাম এইবার,অনেক জ্ঞান দিয়েছিস!তা নতুন বিএফ কি প্রাক্তন হাত ধরেছে শুনলে রাগ করবে তোর ওপর!'
— 'যাস্ট শাট আপ ওকে!ও তোমার মতো নীচু মানসিকতার নয়।ও এখানে নেই বলে আজ বেঁচে গেলে তুমি,থাকলে....'
— 'কি করত থাকলে?আমায় মার্ডার করত দিনেদুপুরে?অবশ্য করতেও পারে,তুই ওর কানে যা বিষ ঢেলেছিস আমার সম্পর্কে,সবই বুঝতে পারছি!'
— 'তোমার মতো মানুষের সাথে কথা বাড়াতে চাই না আমি।রাস্তাটা ছাড়ো।'
— 'না ছাড়ব না!যতই অভ্র টভ্র যেই আসুক,আমিই তোর প্রথম প্রেম,সেই অধিকারে তোর কিছু সময়ে আমি ভাগ বসাতেই পারি!'
— 'হাহাহা,এই হল তোমার আর নীলের মধ্যে তফাত জানো তাপসদা,ও কোনোদিন সামান্যতম ব্যাপারেও আমার ওপর জোর খাটায় নি,আমার ইচ্ছেকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে,আজ দেয়,ভবিষ্যতেও দেবে জানি।আর তুমি আমাকে দিনের পর দিন এত অপমান করে,আমার ওপর এত জোর খাটিয়েও শান্তি পাওনি,এখনও এসেছ নিজের অধিকার আদায় করতে!'
— 'হ্যাঁ তাই তাই,আমি অধিকার আদায় করতেই এসেছি,কারণ আজও তোর ওপর আমার অধিকার আছে!'
— 'আচ্ছা তাই নাকি!তা কে দিল সেই অধিকার?আমি তো দিইনি?'
— 'তোর দেওয়ার পরোয়া কে করে?নিজেকে এত ভ্যালুয়েবল ভাবাটা বন্ধ কর,বুঝলি?তুই সেরকম কিছুই না।আমি প্রতিটা পরীক্ষায় কত বেশি মার্কস পেয়েছি তোর থেকে,ওরকম মার্কস পাওয়ার অওকাত আছে তোর?বড় বড় লেকচার দিচ্ছিস যে!'
— 'দরকার নেই গো আমার মার্কসে,দিনশেষে আমি মানুষ হতে পারলাম কতটা সেটাই আমার কাছে ইম্পরট্যান্ট,আর সেটা তুমি ১% ও হতে পারোনি।তুমি থাকো তোমার আত্মঅহংকার নিয়ে,আমি চললাম।বাই।'
— 'অপু তুই যাবি না কিন্তু, আমার প্রশ্নের উত্তর তোকে দিতেই হবে!আর অধিকার বলছিলি তো,তাহলে শোন,আমি তোর প্রাক্তন, আর সেই অধিকারেই.....'
— 'আরে দাঁড়াও দাঁড়াও,আগে হেসে নিই আমি।কি বললে?প্রাক্তন?প্রাক্তন হতে হলেও একটা যোগ্যতা লাগে বুঝলে তাপসদা,সামান্য গুণ লাগে...'
— 'তাই?তা আমার কোন্ গুণটা নেই শুনি?'
— 'সেটা আমি আর কি বলব,আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ো,সেই তোমায় যা উত্তর দেবার দিয়ে দেবে।দেখো আয়নার অবয়বটাও হাসবে তোমায় দেখে,বলবে,তাপস,তোমার যে মানুষ হওয়ার কোনো গুণই নেই!আর তুমি আমার প্রাক্তন নও,তুমি আমার জীবনে একটা ঝড়ের মতো,যে এসে আমার জীবনটা তছনছ করে দিয়েছিল,নীল আবার পরম যত্নে সে তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনটা গুছিয়ে দিয়েছে।'
— 'বেশ বেশ,আমি চলে যাচ্ছি।তবে তোর কোনোদিনও ভালো হবে না আমি বলে দিচ্ছি,দেখে নিস!'
— 'তুমি প্রতিটা কথায় আত্মপরিচয়টা কি সুন্দরভাবে দিচ্ছ! আসলে তোমার সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল একটা দুঃস্বপ্ন,তখন জেগে ঘুমোতাম,এখন ঘুমটা ভেঙেছে।তবে তুমি আমায় শাপ শাপান্ত দিলেও আমি দেব না,তাহলে যে তোমার সাথে আর কোনো তফাতই থাকে না আমার।ভালো থেকো।বাই।'
0 মন্তব্যসমূহ