চিঠি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
প্রিয় অ্যানি,
জানি এ চিঠি তোমার কাছে ঠিকই পৌঁছবে।কেমন আছ তুমি?নিশ্চয়ই ভালোই আছো।আজও বুঝি কলমের শেষ কালিটুকু তোমার প্রতিভা নিংড়ে নেয়,সাদা পাতাগুলোয় মহীরুহর মতো বেড়ে ওঠে কবিতার চারাগাছ?আজও বুঝি বাংলাভাষার প্রতি অবহেলা দেখলে একইভাবে চোখ-কান লাল হয়ে যায়?হয়তো আজও সবই হয়,শুধু সেসব আমার দেখার পরিধি থেকে বহু মাইল দূরে।এ চিঠিও তো লেখা তোমার কাছেই শেখা।তুমি আজও আগেই মতই শাড়ির সাথে কাজল পরে তোমার বাড়ির ব্যালকনিতে বিকেলবেলায় দাঁড়াও আমায় দেখবে বলে?আজও কি সবার অলক্ষ্যে তর্জনীতে এক চিলতে সিঁদুর নিয়ে আয়নার সামনে রাঙামুখে দাঁড়াও?এই দেখলে,বড় ভুল করে ফেললাম।সিঁদুর যে অভিশাপ তোমার জীবনের!আমি কথা দিলাম,আর কোনোদিন সিঁদুরের নাম নেব না।
আচ্ছা অ্যানি,তোমার আমাদের দেখা হওয়ার প্রথম দিনটার কথা মনে পড়ে?সেই যে কলেজে ভর্তি হওয়ার দিনটা?তোমার সেই কাজল পরা চোখদুটো সেদিন আমায় পাগল করে তুলেছিল,কালোমেঘে ঢাকা সেই বৃষ্টিদিনে একরাশ ভিজে কালো চুল পিঠে মেলে যেদিন কলেজের গেট পেরোতে,সেদিন আমি বিশ্বাস করেছিলাম,ছোটবেলায় মম-ড্যাডির বলা ফেয়ারি টেলগুলো মিথ্যা নয়,ফেয়ারি সত্যিই আছে।অনিন্দিতা, তুমিও বুঝেছিলে আমার মনের কথা।তারপর কতদিন-মাস-বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল।
আমি তোমায় গির্জায় নিয়ে গেছি,তুমি আমায় নিয়ে গেছ মন্দিরে।আমার ড্যাড ব্রিটেন অধিবাসী হলেও মম ছিলেন ইন্ডিয়ান,তাই তোমায় দেখে বড্ড খুশি হয়েছিলেন।যদিও উনি ছিলেন অবাঙালি।আমাকে বাংলা শেখানোর জন্য সে কি প্রচেষ্টা তোমার!সময় পেলেই চলে আসতে আমাদের পার্ক স্ট্রিটের বাড়ি বাংলা শেখাতে।মাঝে মাঝে পড়াও ধরতে,আর পড়া ভুল হলেই,'জন,ঠিক করে পড়ো না কেন!' বলে একরাশ অভিমান নিয়ে মুখ ফেরাতে।আমি তোমার জন্য ওয়ালনাট ব্রাউনি বানিয়ে আনতাম তখন,আর অমনি সব রাগ তোমার ফানুসের মতই উড়ে যেত।তুমিও কতবার ঘুগনি খাইয়েছ আমায়,মনে পড়ে?কিন্তু আফসোস তোমার বাড়ি আমার কখনো যাওয়া হয়নি, রক্ষণশীল পরিবারে মেয়েদের ছেলেবন্ধুরা অ্যালাওড ছিল না।
কিন্তু এতকিছুতেও শেষরক্ষা হল না।তোমার এক আত্মীয় আমাদের একদিন এসপ্ল্যানেডে হাত ধরে ঘুরতে দেখে ফেললেন।সেদিনই কলেজ আসা বন্ধ হল তোমার।
তারপর তোমারই এক বান্ধবী জানাল,তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে তোমায় অন্য এক বনেদী পরিবারে।একদিন অনেক কষ্টে দেখাও করতে গিয়েছিলাম।তুমিও ছদ্মবেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলে,বলেছিলে,'কেউ জোর করেনি আমার ওপর।স্ব ইচ্ছায় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।'
কিন্তু অনিন্দিতা, যতটা বোকা তুমি আমায় ভাবো,ততটা হয়ত আমি নই।তোমার চোখের তলার কালি চোখ এড়ায়নি আমার,এড়ায়নি ওই কালো চোখে কাজলের অনুপস্থিতিও।কিন্তু হাজার অনুরোধেও তুমি স্বীকার করলে না সত্যিটা।আমায় চলে যেতে বললে,বললে আমি গেলেই তুমি সুখি হবে।এটাও বললে,'তেলে জলে মিশ খায় না।'
কতটা প্রেশার তোমার ওপর ক্রিয়েট করা হয়েছিল বুঝতে আমার বাকি ছিল না।তোমার সেই বান্ধবীর মারফতই খবর পাই যে তোমার বাড়ি থেকে বলা হয়েছিল এ বিয়ে তুমি না করলে আমায় খুন করে লাশ গুম করে দেওয়া হবে।আর সেটা যে খুব একটা অসম্ভব নয় ওরকম একটা প্রভাবশালী পরিবারের পক্ষে,তা তুমি জানতে।
তারপর পাঁচছয় মাস কেটে গেল তোমার বিয়ের পর।হঠাৎ এক অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এল,'জন আমায় বাঁচাও!ওরা আমায় মেরে ফেলবে!'
তোমার একান্তে লেখা ডায়েরিটা হঠাৎ তোমার স্বামীর হাতে পড়ে গেল,ব্যস তারপরেই শুরু হল তোমার ওপর অকথ্য অত্যাচার।বাপেরবাড়িতে কাউকে কিছু জানাওনি তুমি অভিমানে,হয়ত ভরসা পাওনি।
মেসেজের সাথে যে ছবিটা আমায় পাঠিয়েছিলে তাতে তোমার নাক মুখ বেয়ে কালচে রক্ত পড়ছিল, কপালের এক চিলতে সিঁদুর অজান্তেই চাপা পড়ে গেছিল কালসিটের আড়ালে।ওরা ভেবেছিল গোপনে বুঝি আজও যোগাযোগ আছে তোমার আমার সাথে।
পুলিশ নিয়ে তোমার শ্বশুরবাড়ি যেতে আমি এক মুহূর্তও দেরি করিনি,কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।বাড়িতে কেউ নেই,গোটা বাড়ি ফাঁকা,খালি তোমার বাপের বাড়ি থেকে আনা কাকাতুয়াটা রয়েছে,আর তুমি পরম শান্তিতে পালঙ্কে ঘুমিয়ে আছো,যে ঘুম পৃথিবীর কোনো ডাক্তারও ভাঙাতে পারবে না,আর তোমার সাধের কাকাতুয়াটা সমানে বলে যাচ্ছে,মেরো না!মেরো না!
কিন্তু তুমি আজও আছো,আমি জানি।আমার কাছে সারাজীবন তুমি জীবনঝর্ণার উৎস হয়ে থেকে যাবে,যার জল কখনো ফুরোয় না,ফুরোতে নেই অনিন্দিতা,অ্যানি।
— ইতি তোমার
জন
0 মন্তব্যসমূহ