অপ্রেমিক
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
দিওতিমাদের বাড়িতে আজ বিশাল আয়োজন।চারিদিকে আলো ঝলমল করছে,বাচ্চা ছেলেমেয়েরা গোটা বাড়ির আঙিনা জুড়ে খেলছে,বাড়ির মেয়ে-মহিলারা আলমারি থেকে সবচেয়ে প্রিয় শাড়ি-গয়নাগুলো বের করেছে,সেসব ছড়িয়ে রয়েছে পালঙ্কের ওপর।বাড়ির পুরুষেরা কখনও মহিলাদের তাগাদা দিচ্ছে,তো কখনও রাঁধুনিদের।দিওতিমা কলেজ থেকে বাড়ি ফিরেই একেবারে হতবাক।
— 'এসব কি হচ্ছে বাবা বাড়িতে?মনে হচ্ছে যেন মহাযজ্ঞ হতে চলেছে!'
— 'হুম তা তুই ঠিকই বলেছিস,'দিওতিমার বাবা সজনীকান্তবাবু হেসে বললেন,'আজ যে মৈনাক আসছে!'
— 'মৈনাক?কে মৈনাক?'
— 'পাগলি,এত তাড়তাড়ি সব ভুলে গেলি?আমার বন্ধু বিনোদের ছেলে রে,ছোটবেলায় তোরা একসাথে খেলতিস,ভুলে গেছিস?'
— 'ও অপুদার কথা বলছ?অপুদা তো শুনেছিলাম কোন্ বিদেশে থাকে,তা ফিরল কবে?'
— 'এখনও ফেরেনি,তবে এই কয়েকঘন্টার মধ্যেই কলকাতায় ফেরার কথা,আর ও ফিরলেই বিনোদরা ওকে নিয়ে এবাড়িতে আসবে।'
— 'ও,সেইজন্য এত আয়োজন?'
— 'হুম,ঠিক ধরেছিস তুই!তা তুই কি এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি?যা মা,ঘরে যা,ভালো করে সেজেগুজে আয়,এমনভাবে সাজবি যেন মৈনাক তোর দিক থেকে চোখ ফেরাতে না পারে।'
— 'কেন?'
— 'উফ,এই মেয়ের খালি প্রশ্নের পর প্রশ্ন,'দিওতিমার মা সুদীপ্তা এসে বললেন,'তুই চল তো ভেতরে,আগে খাওয়াদাওয়া করে নে,ফ্রেস হ,তারপর আমরা মহিলারাই তোকে তৈরি করে দেব।'
সুদীপ্তা ওর হাত ধরে ওকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
ফ্রেস হওয়া,খাওয়াদাওয়ার পর সকল মেয়ে মহিলারা দিওতিমাকে সাজাতে বসলেন।
— 'কি ব্যাপার বলোতো তোমাদের?আমাকে এভাবে সাজাচ্ছ কেন সবাই মিলে?আমার কি বিয়ে হবে নাকি আজ?'
— 'উফ,আবার কথা!চুপ করে বোস তো!আর মৈনাকরা যখন আসবে,একদম বেশি কথা বলবি না,কারণ বেশি বকলেই আবোলতাবোল বকতে শুরু করিস তুই!'
— 'আচ্ছা,সে নয় বলব না,কিন্তু আমায় কেন সাজাচ্ছ সেটা তো বল বড়দি!'
— 'সেটা তুই ওরা এলেই জানতে পারবি!' মহিলামহলে হাসাহাসি করতে লাগল সকলে।
সকলের রেডি হতে হতে বিকেল গড়িয়ে গেল।সন্ধ্যে নামার একটু পরেই বিনোদবাবু হাজির হলেন তাঁর স্ত্রী রচনা আর ছেলে মৈনাককে নিয়ে।বিনোদ দাশগুপ্ত দিওতিমার বাবা সজনীকান্ত বসুর ছেলেবেলার বন্ধু,এখনও যথেষ্ট ভালোই সম্পর্ক দুই বন্ধুর। দুজনেই কলকাতার অন্যতম নামী ব্যবসায়ী।সজনীকান্তবাবু সহ দিওতিমার পরিবারের সকলেই চান,মৈনাকের সাথেই বিয়ে হোক দিওতিমার।মেয়েকে চেনা পরিবারেই পাঠানো হবে তাতে,কোনো অসুবিধা হবেনা দিওতিমার।
ওরা বোস বাড়িতে আসার পরেই আপ্যায়ন শুরু করলেন সজনীকান্ত বাবুরা।একটু পরেই নিয়ে আসা হল দিওতিমাকে।
— 'তুমি নিউইয়র্কে ছিলে,তাই না বাবা মৈনাক?' জিজ্ঞেস করলেন সজনীকান্ত বাবু।
— 'হুম আঙ্কেল।'
— 'শুনেছিলাম ওখানে বড়ো চাকরি করতে?তা বাবা,চাকরি ছেড়ে হঠাৎ দেশে ফিরে এলে?'
— 'আসলে সজনী,ছেলেটা আমার এদেশ বড়ো ভালোবাসে।যতই বিদেশ বিভূঁই যাক,শেকড়ের টান কি ছেঁড়া যায় এত সহজে?'
— 'তা তুই মন্দ বলিসনি অবশ্য,তাছাড়া ও ই তোর একমাত্র সন্তান,ও ছাড়া আর কেই বা এত বড়ো ব্যবসা সামলাবে?'
— 'হুম আঙ্কেল,ঠিকই বলেছেন আপনি।'
— 'তা বাড়ির সকলে কেমন আছেন রে?আর দিওতিমা মা কই?'
— 'এই তো আসছে বিনোদদা,' সজনীকান্ত বাবুর স্ত্রী নিয়ে এলেন দিওতিমাকে।
— 'ও মা,মাকে তো পুরো লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো লাগছে!'
দিওতিমা প্রণাম করল বিনোদবাবু আর রচনাদেবীকে।
— 'বাহ রে তিমা,খালি মা বাবাকে প্রণাম করলেই চলবে বুঝি?আমায় প্রণাম করবি না?'
— 'হুঁহ,শখ দেখো না,ছোটবেলায় যার সাথে খেলতাম তাকে নাকি এখন প্রণাম করতে হবে!বয়েই গেছে আমার প্রণাম করতে!'
— 'ও কেমন কথা দিওতিমা!'সুদীপ্তা বললেন,'যতই হোক,বয়সে তো তোর চেয়ে চার বছরের বড়ো,প্রণাম কর না বাপু!'
— 'না মা,আমি পারব না!সেদিনের সেই অপুদাকে আমায় নাকি প্রণাম করতে হবে!'
— 'আন্টি আমি তো মজা করছিলাম,তুমি সিরিয়াসলি নিচ্ছ কেন?' মৈনাক হেসে বলল।
— 'না বাবা,সে তুমি যাই বলো,ওরই বা তোমায় প্রণাম করতে কিসের আপত্তি শুনি?দুদিন পর তো তুমিই ওর...'
— 'কি?কি বলছ মা?অপুদাই আমার কি?শেষ করো কথাটা!'
— 'একি!দিওতিমা মাকে কথাটা জানাসনি এখনো সজনী?' অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলেন বিনোদ।
— 'না আসলে ভেবেছিলাম তোরা এলেই...'
— 'আচ্ছা বেশ বেশ,শোনো মা,আমরা তোমায় আমার অপুর বৌ করে ঘরে নিয়ে যেতে চাই।' স্নেহের সুরে বললেন রচনাদেবী।
— 'বৌ?আমি?অপুদার বৌ?ধুর,কিসব বলছ তোমরা কাকিমা?'
— 'কেন মা,আমার অপুকে তোমার পছন্দ নয় বুঝি?' বলেই মুচকি হাসতে শুরু করলেন বিনোদবাবু।
— 'না কাকু,তা নয় আসলে...'
— 'উফ,একটু চুপ কর না তিমা!তোর সবেতেই বড্ড বেশি কথা!'সজনীবাবুর বড়ো মেয়ে রণিতা ধমক দিল দিওতিমাকে।
— 'বেশ,আমি মুখে এই কুলুপ আঁটলাম!' দিওতিমা অভিমানের সুরে বলল।
সকলে হেসে উঠলেন।বিনোদবাবু বললেন,'মা দেখছি আমার সেই ছেলেমানুষই রয়ে গেল।'
দুই বাড়ির সকলেই রাজি বিয়েতে,মৈনাকও।শুধু দিওতিমাই এব্যাপারে কোনো মতামত জানায়নি নিজের।
— 'ধুর,ওর মতামতের কি আছে শুনি?' সুদীপ্তা মুখ বেঁকিয়ে বললেন,'ও শরীরেই বেড়েছে,ওর মনের বয়স কি আর বেড়েছে যে নিজের ভালোমন্দ ও নিজে বুঝবে!'
— 'না না আন্টি,যতই হোক,ওর বয়স একুশ,প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ও।ওর মতামত ছাড়া এই বিয়েটা কিভাবে হবে?'
— 'অপু একদম ঠিক কথা বলেছে,দিওতিমা মাকে একটু সময় দে তোরা সজনী।' বিনোদবাবু বললেন।
ডিনারের পর বিনোদবাবুরা চলে গেলেন সজনীবাবুদের বাড়ি থেকে।যাওয়ার আগে ওঁরা বলে গেলেন,যতদিন না দিওতিমা এ বিয়েতে হ্যাঁ বলছে,ততদিন বিয়ের ব্যাপারে কোনো কথাই এগোবে না।
এদিকে সজনীবাবুর পরিবারে সকলে রীতিমতো অসন্তুষ্ট হলেন দিওতিমার আচরণে।
— 'নিজের ভালো পাগলেও বোঝে,কিন্তু আমার মেয়েটা সেসব বুঝবে না!' রাগী সুরে বললেন সুদীপ্তা।
— 'যা বলেছ মা!সবাই এ বিয়েতে রাজি,মৈনাকও রাজি,আর উনি বেঁকে বসলেন!ওরে বোকা,ওর মতো ছেলে তুই দুটো পাবি!বিলেতফেরত একটা পাত্রকে উনি ফিরিয়ে দিলেন!অদ্ভুত!' দিওতিমার বড়দি রণিতা রাগ দেখায়।
দিওতিমারা দুই বোন,রণিতা,আর ও।রণিতার বিয়ে হয়েছে চার বছর আগে,একটা ফুটফুটে ছেলেও হয়েছে তার।অন্য এক ব্যবসায়ীর ছেলের সাথেই বিয়ে হয়েছে তার,বাড়ির সকলের পছন্দে।দিওতিমার কাকু কাকিমাও আছেন এবাড়িতে,ওঁদের একমাত্র ছেলে রাহুল,দিওতিমা তাকে মেজদা বলে।আর দিওতিমার জেঠু জেঠিমা কর্মসূত্রে মুম্বাইতে থাকেন,তাঁদের মেয়ে পূজা দিওতিমার চেয়ে একবছরের বড়ো,দিওতিমা তাকে ছোড়দি বলে।দিওতিমার বিয়ে উপলক্ষ্যেই সবাই এসেছে বোসবাড়িতে।
— 'শুধু বিলেতফেরত হলেই বুঝি যোগ্য পাত্র হয় বড়দি?পাত্রীর ইচ্ছা অনিচ্ছার বুঝি কোনো দাম নেই?'
— 'এই শোন,এসব বড়ো বড়ো ডায়লগ সিনেমায় ভালো লাগে,বাস্তবে নয়,'সুদীপ্তা হতাশ হয়ে পড়েন,'হ্যাঁ রে,তুই কি কোনোদিনও বড়ো হবি না?'
— 'হুম,তোমাদের কাছে বড়ো হওয়ার মানে নিজের ইচ্ছার গলা টিপে শেষ করে দেওয়া,তাই তো?তোমরাও শুনে রাখো,অমন বড়ো হয়ে আমার কাজ নেই!' দিওতিমা সেখান থেকে চলে গেল।
পরেরদিন সকলের চোখ এড়িয়ে দিওতিমা ফোন করল মৈনাককে।
— 'আরে,তিমা তুই?বল!'
— 'সব কথা তো ফোনে হয়না মৈনাকদা,আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই।সামনাসামনিই তোমায় যা বলার বলব।'
— 'আচ্ছা বেশ,তাই হবে।'
একটা কফিশপে দেখা করল ওরা।
— 'অপুদা,এই বিয়েটা আমার পক্ষে করা একেবারেই অসম্ভব।'
— 'হুম,সেদিন তোর হাবভাব দেখে কিছুটা হলেও আন্দাজ করেছিলাম।'
— 'অপুদা,আমি আসলে তপনকে ভালোবাসি।কলেজে আমাদের আলাপ হয়েছিল।একই ক্লাসে পড়ি আমরা।তিনবছর হল আমাদের এই সম্পর্ক।ভেবেছিলাম বাবাকে জানাব এই সম্পর্কের কথা,কিন্তু তার আগেই...'
— 'তার আগেই আমার সাথে সবাই তোর বিয়ে ঠিক করে ফেলল,তাই তো?'
— 'না মানে অপুদা,তুমি কিন্তু ভুল বুঝোনা আমায়।তুমি খুবই ভালো একজন মানুষ আমি জানি,কিন্তু...'
— 'কিন্তু আমায় তুই বিয়ে করতে পারবি না,এই তো?'
— 'হুম অপুদা,সরি!'
— 'দুর বোকা,এতে সরি বলার কি আছে?এই তোরা ইন্ডিয়ান মেয়েরাও না সত্যি!একজনকে ভালোবাসিস,তাই আমায় বিয়ে করবি না,ব্যস!এটা বলতে এত হেজিটেশন!দেখে আসিস তো একবার ওদেশের মেয়েদের,কত ফ্র্যাঙ্কলি এই কথা গুলো ওরা বলে তাহলেই বুঝবি!'
— 'তা বললে কি হয় অপুদা,ওদের আর আমাদের জীবনযাপন কি এক গো?'
— 'হুম,তা ঠিক।তুই চিন্তা করিস না,আমি মা বাবাকে ঠিক বুঝিয়ে বলে দেব যা বলার।তাছাড়া এমনিতেও আমার পক্ষেও এ বিয়ে করা সম্ভব হত না।'
— 'কেন অপুদা?'
— 'আসলে কি বল তো,আমিও আমেরিকার একটি মেয়েকে ভালোবাসি,তার নাম এমিলি ডিসুজা।কিন্তু জানিসই তো,মা বাবা তোকে কতটা ভালোবাসেন,ওনারা তোর জায়গায় অন্য কাউকে কিছুতেই মেনে নেবেন না।' দিওতিমার হাতদুটো ধরে মৈনাক বলল,'থ্যাংকস রে,তুই আমায় বাঁচালি।এবার আমি মা বাবাকে সবটা খুলে বলতে পারব।তুই যদি আমায় বিয়ে না করিস,তবে ওঁঁদেরও আশাকরি এমিলিকে পূত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে কোনো প্রবলেম হবে না!'
— 'আরিব্বাস,অপুদা,তোমারও প্রেমিকা আছে!তা কই ছবি দেখি তোমার প্রেমিকার!'
— 'ছবি দেখে কি করবি?শুধু এটুকু বলে রাখি,সে তোর চেয়ে অনেক বেশি সুন্দরী।' বলেই মৈনাক মুচকি হাসতে লাগল।
— 'আচ্ছা বেশ,তা দেখিই না সে কেমন সুন্দরী!'
— 'মোবাইলে ওর কোনো ছবি নেই রে,যদি কোনোভাবে মা বাবা জানতে পেরে যান ওর ব্যাপারে,সেই ভয়েই রাখিনা ছবি বলতে পারিস!তাছাড়া বিয়ের সময় ও তো ইন্ডিয়াতে আসবেই,তখনই না হয় দেখে নিস!'
— 'বেশ তাই হবে।কিন্তু অপুদা,তপনের কথাটা আমি বাবাকে কিভাবে বলব বলো তো?জানোই তো আমাদের পরিবার কলকাতার নামী ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর মধ্যে অন্যতম,আর তপন সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে,টিউশনি করে সংসার চলে।মেধাবী ছাত্র বলে স্কলারশিপ পায়,ওই টাকাতেই পড়াশোনা চালায়।ওকে যদি বাবা না মেনে নেয়?'
— 'আহা,অত টেনশন নিচ্ছিস কেন?তোর অপুদা তো আছে,সে ই যা ব্যবস্থা করার করবে,অত চাপ নিস না!'
— 'সত্যি বলছ অপুদা?'
— 'হুম,সত্যি বলছি আমি।ভরসা রাখ আমার ওপর।'
— 'এ তুমি কি বলছ বাবা?দিওতিমাকে তুমি বিয়ে করবে না?'
— 'আমায় ক্ষমা করবেন আঙ্কেল,যাকে কোনোদিন স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতেই পারব না তাকে কিভাবে বিয়ে করব বলুন?এতে ওর আমার দুজনের জীবনই নষ্ট হবে।'
— 'কিন্তু কেন ওকে স্ত্রী হিসেবে মানতে পারবে না?'
— 'আসলে আমি আমেরিকার একটি মেয়েকে ভালোবাসি,নাম এমিলি ডিসুজা।দেশে ফেরার আগে তাকে কথা দিয়ে এসেছিলাম,যে দেশ থেকে ফিরে তাকেই বিয়ে করব।আপনিই বলুন আঙ্কেল,আমি তিমাকে বিয়ে করলে ওর সাথে অন্যায় করা হবে না?'
— 'কিন্তু বাবা,সেদিন যখন বিনোদের সাথে তুমি এলে,তখন তো বললে যে তুমি আর ওদেশে ফিরবে না...'
— 'আসলে বাবা মাকে তখন এমিলির ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি তো,তাই বলেছিলাম আর কি!'
— 'ঠিক আছে বাবা,তুমি যখন অন্য মেয়েকেই ভালোবাসো,তখন আর কি করা যাবে!কিন্তু আমার তিমার জন্য তোমার মত ভালো পাত্র আর কোথায় পাব বাবা!'
— 'পাবেন আঙ্কেল,ঠিক পাবেন।আমার একটা চেনা পাত্র আছে,তিমার সাথে তাকে খুব মানাবে।বিয়ে দেবেন তার সাথে?'
— 'কে সেই পাত্র বাবা?'
— 'তপন,তপন মল্লিক।ছেলেটি আমার পরিচিত।দিওতিমার কলেজেই পড়ে,এক ক্লাসে।তিমা,চিনিস তপনকে?'
— 'হুম চিনি তো,আমার ক্লাসমেট।' মনে মনে মুচকি হাসে দিওতিমা,ভাবে অপুদা কি দারুণভাবে রিপ্রেজেন্ট করল তপনকে বাবার সামনে!
— 'হুম,তপন খুব মেধাবী ছাত্র।এখন যদিও ওদের সংসারে একটু অভাব অনটন আছে,কিন্তু একদিন তপন বড়ো চাকরি পাবে,আর সব অভাব দূর হয়ে যাবে।'
— 'আচ্ছা বেশ,তুমি যখন বলছ তখন নিশ্চয়ই ভালো ছেলেই হবে।ও তো তিমারই বয়সী,তাহলে এখনই বিয়েটা দেওয়া যাবে না।'
— 'হুম আঙ্কেল,এখন ও ছাত্র।তবে একদিন ও নিজের পায়ে দাঁড়াবেই,সেদিন বিয়ে দেবেন ওদের।'
— 'আচ্ছা,তাই হবে।তা তোমার পরিচিত ওই ছেলেটিকে তাহলে এনো একদিন আমাদের বাড়িতে।'
— 'নিশ্চয়ই আনব আঙ্কেল,এখন আপনারা দেখে রাখুন ছেলেটিকে,বিয়ে পাকা করে রাখুন,বিয়েটা না হয় পরেই হবে।'
— 'হুম বাবা,সেই ভালো।'
— 'উফ,তোমার কি বুদ্ধি গো অপুদা!বাবাকে এইভাবে রাজি করিয়ে নিলে!'
— 'হাহাহা,কি যে বলিস!'
— 'থ্যাংক ইউ সো মাচ অপুদা!তুমি যে আমার কত বড়ো উপকার করলে ভাবতে পারবে না!'
— 'দূর বোকা,এটা কি আমি শুধু তোর জন্য করলাম নাকি?আমার জন্যেও তো করলাম!আমিও যে এমিলি ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে পারব না!'
এরপর কেটে গেল বেশ কিছু বছর।তপন ব্যাঙ্কে চাকরি পেল।তার সংসারের অভাব ঘুচল।এবার তপনের পরিবার এবং দিওতিমার পরিবারের সকলে বিয়ের তোড়জোড় করতে লাগলেন।
অন্যদিকে মৈনাকও মাঝে মাঝে বিদেশ যায়,কিন্তু বছরের বেশি সময়টা ও এদেশেই কাটায়।দিওতিমা মাঝে মাঝেই এমিলির ছবি দেখতে চায়,কিন্তু মৈনাক কিছুতেই তার ছবি দেখাতে চায় না,বলে,'তুই দেখতে পারবি না ওর ছবি!'
— 'কেন?'
— 'ও এতটাই সুন্দরী যে ওর রূপে তোর চোখ ঝলসে যাবে।নীল চোখের মণি,গোল্ডেন হেয়ার,ফরসা ধবধবে গায়ের রঙ।'
— 'তাই?'
— 'হুম।জানিস তো ওর একটা রেড কালারের টপ আর মিনিস্কার্ট আছে,ওটা পরে যখন ও আমার সামনে আসে,আমি একেবারে মুগ্ধ হয়ে যাই।সত্যি,ওর রূপে শুধু ছেলেরাই না,মেয়েরাও মুগ্ধ হয়ে যাবে!'
— 'তা বেশ তো,ছবিটা দেখাও,আমিও মুগ্ধ হই।'
— 'না,ছবি নয়,যেদিন আমাদের বিয়ে হবে সেদিন সামনাসামনিই দেখবি!ছবিতে কি আর সৌন্দর্য সেভাবে বোঝা যায় রে?'
— 'হুম তাও ঠিক।তা তাকে বিয়ে করছ না কেন?কবে করবে?'
— 'করব করব।আগে তোর আর তপনের বিয়েটা হোক,তারপর করব।'
— 'বেশ,তাই হবে!'
এরপর চলে এল দিওতিমা আর তপনের আশীর্বাদের দিন।বোসবাড়িতে সেদিন বড্ড ব্যস্ততা।তপনের মা আর বাবা আশীর্বাদ করতে আসবেন দিওতিমাকে,অন্যদিকে তপনকেও আশীর্বাদ করবেন দিওতিমার মা বাবা।মৈনাকের মা বাবার মতো তপনের মা বাবাও যথেষ্ট ভালোবাসেন দিওতিমাকে।
দিওতিমাকে ভালো করে সাজিয়ে গুজিয়ে রেডি করার পর ওকে ওর ঘরে বসে থাকতে বললেন বাড়ির মহিলারা।একটু পরে দিওতিমাকে ডাকা হবে অনুষ্ঠান মহলে।এখন সেখানে তপন,তার মা-বাবা,আর দিওতিমার বাড়ির সকলে রয়েছেন।মৈনাক ও তার মা বাবাকেও আমন্ত্রণ করা হয়েছিল দিওতিমার আশীর্বাদের অনুষ্ঠানে,তাই তাঁরাও উপস্থিত ছিলেন।
একটু পরেই অনুষ্ঠান মহলে ডাক পড়ল দিওতিমার।দিওতিমার মা আর বড়দি ডাকতে এলেন ওকে,কিন্তু দিওতিমার ঘরে ওকে পাওয়া গেল না,এমনকি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও গোটা বাড়িতে কোথাও ওকে পাওয়া গেল না।দিওতিমার মা বাবার মাথায় হাত পড়ে গেল,'ঘর থেকে জলজ্যান্ত মেয়েটা উবে গেল নাকি!'
সকলে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন।একটু পরেই সকলকে অবাক করে দিয়ে দুজন মেয়ে প্রবেশ করল অনুষ্ঠান মহলে।একজন বিদেশিনী,পরনে লাল টপ,মিনিস্কার্ট,গোল্ডেন চুল,পায়ে স্টিলেটো,নীল চোখের মণি,মাথায় লাল রঙের হ্যাট,কিন্তু মুখটা বড্ড চেনা চেনা,আর অন্যজন দিওতিমার শাড়ি আর গয়না পরিহিত একটি লাজুক মুখের মেয়ে।
— 'একি,তোমরা কারা?'
— 'আই অ্যাম এমিলি ডিসুজা,'বিদেশিনী বলল,'আর ও হল পল্লবী।'
— 'সে তো বুঝলাম,কিন্তু পল্লবীর গায়ে তিমার সাজ কেন?আর তিমা কোথায়?' সকলে অবাক হলেন।
— 'যাস্ট অ্যা মিনিট,আমি সবটা এক্সপ্লেন করছি,ও হল পল্লবী,পল্লবী মন্ডল,তপন মল্লিকের স্ত্রী।আজ ওর সাথেই তপনের আশীর্বাদ হবে,দিওতিমার সাথে নয়।'
— 'মানেটা কি!তপনের স্ত্রী মানে!'
— 'হুম আঙ্কেল,আপনাদের এই সুপুত্রটি বহুদিন থেকেই এই মেয়েটিকে ভালোবাসত,দিওতিমাকে নয়।লুকিয়ে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করেছে ওকে,কিন্তু পৃথিবীর সামনে স্বীকার করার সৎসাহস বা মেরুদণ্ড কোনোটাই নেই,কারণ সত্যিটা জানলে যদি ওর মা বাবা আর দিওতিমা ওকে কঠোর শাস্তি দেয়!'
— 'এসব ওরা কি বলছে তপু?'তপনের মা বাবা হকচকিয়ে প্রশ্ন করলেন তাকে।
— 'হুম,আসলে ওরা ঠিকই বলছে!'তপন মাথা নিচু করে বলল।
— 'আর পল্লবী,তুমিও দেখ,দেখ কাকে বিয়ে করেছ তুমি!তোমাকে ভালোবেসে তো স্বীকার করতেই পারেনি,উপরন্তু তোমায় বিয়ে করার পরও অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করতে যাচ্ছিল,একসঙ্গে দুটো মেয়ের জীবন নষ্ট করত এই কাপুরুষ!'
— 'সত্যি বলেছ তুমি,আমার সাথে রোজ এত কথা হয় তপনের,অথচ কোনোদিন দিওতিমার নামটা পর্যন্ত বলেনি আমায়...'
— 'শুধু কি তাই!তোমার নামটাও বেমালুম চেপে গেছে সকলের কাছে!তুমি সবাইকে ঠকিয়েছ তপন!সবাইকে!এখন অন্তত সত্যিটা স্বীকার করো!' এমিলি উত্তেজিত হয়ে পড়ল।
— 'তুমি এতটা খারাপ মানুষ তপন!' মৈনাক রাগী গলায় বলল,'যে তিমা তোমায় এতটা ভালোবাসে,তাকে এভাবে ঠকালে তুমি!'
— 'না মানে আমি আসলে...'
— 'থাক তপন,অনেক বলেছ তুমি!এবার রেহাই দাও আমাদের!'সজনীবাবু বললেন,'আর তোমরা যখন এতকিছু জানো,তাহলে নিশ্চয়ই এটাও জানো যে আমার তিমা কোথায় আছে!'
— 'সে তো আমি জানি না,জানে মিস্টার মৈনাক দাশগুপ্ত!'
— 'মানে?আমি কিভাবে জানব দিওতিমা কোথায়?আর আপনিই বা কে বলুন তো এমিলি?কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে আপনাকে!'
— 'আচ্ছা বাবা মৈনাক,তুমি যে মেয়েটাকে ভালোবাসো তার নামও তো এমিলি ডিসুজা,আর ওর নামও...'
— 'হুম আঙ্কেল,আমিও ব্যাপারটা ধরেও যেন ধরতে পারছিনা!'মৈনাক অবাক গলায় বলল।
— 'ওসব মিথ্যে কথা,এমিলি ডিসুজা বলে কেউ নেই,যাস্ট কেউ নেই!ওটা একটা কাল্পনিক চরিত্র!'এমিলি বলল।
— 'মানে?'
— 'মৈনাক দাশগুপ্ত জীবনে একজনকেই ভালোবাসে,তার নাম দিওতিমা বোস।এমিলিকে সৃষ্টি করা হয়েছিল একারণেই যাতে দিওতিমা আর তপনের জীবনে মৈনাক বাধা না হন!'
— 'এসব কি বলছ তুমি!আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না!' সকলে অবাক হলেন,'আর যদি এমিলি বলে কেউ না ই থাকে তবে তুমি কে?'
— 'আমি সবটা বুঝেছি,'মৈনাক বলল,'একটু অপেক্ষা করুন,সবটাই বুঝেছি আমি।' বলেই এমিলির গোল্ডেন চুল ধরে টান দিল মৈনাক।খুলে গেল সোনালি পরচুলা,বেরিয়ে পড়ল একরাশ কালো চুল।
— 'চোখ থেকে লেন্সদুটোও খোল,অনেক এমিলি সাজা হয়েছে!' মৈনাক হেসে বলল।
চোখ থেকে নীল লেন্স খুলতেই সকলের কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে গেল।এমিলি আর কেউ নয়,দিওতিমা।পরচুলা,লেন্স আর পোশাক পালটে সে এমিলি সেজেছিল মাত্র!
— 'তিমা তুই!' সকলে আরও অবাক হলেন।
— 'কই,কেমন এমিলি সাজলাম বললে না তো!' ব্যঙ্গের সুরে মৈনাককে বলল দিওতিমা।
— 'তিমা,তুই কিভাবে জানলি সবটা?'
— 'বলব,সবটাই বলব আমি।'দিওতিমা বলতে শুরু করল,'একদিন যখন তপন এসেছিল এবাড়িতে,ওর ফোনটা ভুলবশত আমার হাতে পড়ে যায়।আর তখনই পল্লবীর ফোন আসে।আমি ফোনটা ধরতেই পল্লবী বলতে লাগল,'তপন,এক সপ্তাহ হয়ে গেল আমাদের বিয়েটা,এবার তো তোমার মা বাবার কাছে পরিচয় করিয়ে দাও আমায়!আর কতদিন আমি এভাবে লুকিয়ে থাকব?'এরপরই আমি পল্লবীর অ্যাড্রেস জোগাড় করে ওর বাড়িতে যাই তপনের ক্লাসমেট সেজে,আর পল্লবীও কিছু না জেনে আমায় সবটা খুলে বলে।পল্লবীর সাথে ওর পরিচয় কর্মস্থলে,তারপর সেখান থেকেই প্রেম,কিন্তু আমার এটা ভেবেই খারাপ লাগছে তপন, যে তুমি আমাকেও ঠকালে,পল্লবীকেও ঠকালে,নিজের মা বাবাকে ঠকালে,সবাইকে ঠকালে!ছি তপন,ছি!আর তুমি এতটাই কাপুরুষ যে আমি যদি সব সত্যিটা না জানতাম,তাহলে তুমি আমাকেও বিয়ে করতে!যে মানুষের সত্যিটা স্বীকার করার মেরুদণ্ড নেই,তাকে যে আমি মানুষই ভাবিনা!আমার লজ্জা লাগছে যে তোমার মত একটা মানুষের জন্য অপুদার মতো একটা মানুষকে না বলেছিলাম।'
— 'সত্যি তপন,আমি তিমার সুখের জন্যই সরে গিয়েছিলাম তোমাদের দুজনের মাঝখান থেকে,আর তুমি এত বড় অন্যায় করলে!'
— 'অন্যায় তো তপন একা করেনি অপুদা,তুমিও তো করেছ!'
— 'আমি!'
— 'হুম!তুমিও তো মিথ্যাচার করেছ আমার সাথে,আমায় ভালোবেসেও অস্বীকার করেছ!অথচ তোমার চোখ দেখে কিন্তু আমি প্রথমদিনই বুঝে নিয়েছিলাম যে তুমি আমাকেই ভালোবাসো,কোনো এমিলিকে নয়!'
— 'না তিমা তুই আমায় ভুল বুঝছিস!'
— 'থাক না অপুদা!এতদিন ধরে তো অপ্রেমিক হওয়ার অভিনয় করলে,এবার না হয় সত্যি সত্যি প্রেমিক হয়ে ওঠো!'
সেদিন মৈনাকের সাথে দিওতিমার আশীর্বাদটা ধুমধাম করে সম্পন্ন হল।
(সমাপ্ত)

0 মন্তব্যসমূহ