খুনী
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চতুর্থ পর্ব
বৃদ্ধ বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাতে লাগল।বাড়ির দেওয়ালে শোভনবাবু,তাঁর স্ত্রী,তাঁদের দুই ছেলেমেয়ে সিদ্ধার্থ আর প্রমিতার ছবি টাঙানো রয়েছে।
— 'ইনি শোভনবাবু?কিন্তু আমি যেদিন এসেছিলাম সেদিন তো ইনি ছিলেন না,অন্য একজন ছিলেন,এমনকি সিদ্ধার্থ,প্রমিতার মা এঁরাও ছবির মানুষের মতো ছিলেন না।'
— 'আপনার কথা শুনে তো রীতিমতো অবাক হচ্ছি আর্যবাবু,তাহলে তো মনে হচ্ছে প্রমিতাদেবী আপনাকে মিথ্যে বলেছিলেন।'
— 'সেটাই তো তখন থেকে আমি আপনাদের বোঝাতে চেষ্টা করছি,'বৃদ্ধ বললেন,'আমায় যে মেয়েটির ছবি দেখালেন সে প্রমিতা দিদিমণি নয়,অন্য কেউ!'
— 'প্রমিতা আমায় মিথ্যে বলল!কিন্তু কেন?' আর্য হতভম্ব হয়ে বলল,'আর আমি যেদিন এসেছিলাম এই ছবিগুলোও ছিল না দেওয়ালে!'
— 'তার মানে প্রমিতাদেবী যে আপনাকে মিথ্যে বলেছেন এতে কোনও সন্দেহ নেই,'সৌরভ বলল,'কিন্তু মিথ্যে উনি কেন বললেন সেটাই তো বুঝতে পারছি না!'
— 'কেন আবার!কত্তাবাবু কত্তামা বেঁচে নেই,দুই ছেলেমেয়েও বিদেশে থাকে,এই সুযোগে রায়চৌধুরী বাড়ির এত সম্পত্তি হাতাতে চেয়েছিল বোধহয়!'
— 'প্রমিতা তাহলে একজন ফ্রড!' আর্য হতাশ হয়ে পড়ল।
— 'দেখুন,এখনও পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছে না যে আসল দোষী কে,হতেও পারে ওনাকে মিথ্যে বলতে বাধ্য করা হয়েছিল!'
— 'হুম তাও হতে পারে।' সুমন বলল।
— 'আচ্ছা আর্যবাবু,সেদিন প্রমিতার বাপের বাড়ির লোক ভেবে আপনি যাদের সাথে কথা বলেছিলেন,ওনাদের কোনো ছবি আছে আপনার কাছে?'
— 'না,তা তো নেই,তখন কি আর জানতাম যে এই সবটাই সাজানো!'
— 'আপনার কাছে না থাকলেও প্রমিতাদেবীর ফোনে নিশ্চয়ই থাকবে,চলুন ওনার ফোনটায় সার্চ করে দেখি আমরা।'
— 'একদম,ওর ফোনটার কথা তো মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল আমাদের!'
— 'হুম!'
এরপর ওরা আর্যদের ফ্ল্যাটে ফিরে গেল।প্রমিতার মোবাইলটা টেবিলের ওপর রাখা ছিল।এতদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকার কারণে মোবাইলটার চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল।তাড়াতাড়ি চার্জে বসানো হল,তবুও মোবাইলটা অন হল না।
— 'এতদিন ধরে সুইচ অফ হয়ে পড়েছিল,তাই হয়ত প্রবলেম করছে,এটা সারাতে দিতে হবে।'মোবাইলটা রিপেয়ারিং সেন্টারে দিয়ে এসে আবার থানায় গেল ওরা।
— 'দেখুন মোবাইলটা ঠিক হতে দু দিন লাগবে সেন্টারে বলল,ততদিন তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারিনা আমরা,'সৌরভ বলল,'আমাদের অন্য উপায় ভাবতে হবে।'
— 'ঠিকই বলেছেন।'আর্য বলল।
— 'সেদিন শোভনবাবু,তাঁর স্ত্রী আর সিদ্ধার্থবাবু সেজে যাঁরা আপনার সাথে কথা বলেছিলেন,তাঁদের চেহারা মনে আছে আপনার?'
— 'হ্যাঁ একদম মনে আছে,এই তো একমাস আগের ঘটনা।'
— 'গুড!আজ সন্ধ্যেবেলায় থানায় একজন আর্টিস্ট নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি,আপনি ওদের চেহারার ডেসক্রিপশন দেবেন তখন,ওকে?'
— 'ওকে।'
সন্ধ্যেবেলায় আর্যর বর্ণনা অনুযায়ী আর্টিস্ট নকল শোভনবাবু,তাঁর স্ত্রী ও সিদ্ধার্থবাবুর ছবি আঁকলেন।রায়চৌধুরী বাড়ির বৃদ্ধ কেয়ারটেকারকেও ডাকা হয়েছিল থানায়,তাকেও আঁকা তিনটে ছবি দেখানো হল।
— 'ও ও,এদের তো আমার মনে আছে,'বৃদ্ধ বললেন,'এরা একমাস আগে এসেছিল রায়চৌধুরী বাড়িতে শুটিংয়ের কাজে।'
— 'শুটিং?কিসের শুটিং?'
— 'ওই তো শটফিল্ম না কি যেন বলে...'
— 'ওহ,শর্টফিল্ম।'
— 'হ্যাঁ ওটাই ওটাই,আসলে রাজবাড়ি কিনা,তাই মাঝেমধ্যেই শুটিং করার জন্য অনেকেই রাজবাড়ি ভাড়া নেয়।কেউ দু একদিনের জন্য,বা কেউ এক মাসের জন্য।তবে এক মাসের বেশি কাউকেই ভাড়া দেওয়া হয়না।'
— 'ওও,তো এনারা শুটিংয়ের জন্য এসেছিলেন?'
— 'হ্যাঁ,ওরা একদিনের জন্য রাজবাড়ি ভাড়া নিয়েছিল,বলল শটফিল্ম বানাবে।'
— 'এই বার সবটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল,'আর্য বলল,'সবটাই সাজানো ছিল!প্রমিতা এতবড় মিথ্যেবাদী!ও এভাবে ঠকাল আমায়?ও তো রায়চৌধুরী বাড়ির মেয়েই নয় তাহলে!কে জানে আর কি কি মিথ্যে বলেছে আমায়!'
— 'সেটাই,'সৌরভ চিন্তিত মুখে বলল,'এতো দেখছি কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরোচ্ছে!'
— 'সবটাই তো বুঝলাম,কিন্তু সেদিন রায়চৌধুরী বাড়িতে গিয়ে আপনাকে দেখিনি কেন?'
— 'আমায় কি করে দেখবেন গো,শুটিংয়ের সময় আমি রাজবাড়ির ধারেকাছেও থাকিনা,শুধু যারা অভিনয় করে তারাই থাকে,আমি ওই সময় রাজবাড়ি থেকেই আর একটু দূরে একটা বাগানবাড়ি আছে,ওটায় থাকি!'
— 'আচ্ছা আচ্ছা!আমি তো এটাই ভাবতে পারছি না যে এতদিন একটা ভুল মানুষকে ভালোবাসলাম,ভরসা করলাম!'
— 'দাঁড়ান আর্যবাবু,এখনো অনেক অন্ধকারে হেঁটে যাওয়া বাকি আমাদের,প্রমিতাদেবীর আসল পরিচয়টাই তো জানা বাকি এখনো!'
— 'আচ্ছা,সেদিন প্রমিতার মৃত্যুসংবাদ দেওয়ার জন্য রায়চৌধুরী বাড়িতে ফোন করেছিলাম,কারণ তখন তো জানতাম ওটাই ওর বাপেরবাড়ি,তা আপনি ফোনটা তোলেননি কেন?'
— 'রাজবাড়িতে দুটো আলাদা নাম্বারের ল্যান্ডফোন আছে।একটা ফোনে শুধু বাড়ির মানুষেরাই ফোন করে,যেমন প্রমিতাদিদি,সিদ্ধার্থদাদা এরা।আর একটা ফোন আছে যেটাই শুধু বাইরের লোকেদের ফোন আসে রাজবাড়ি ভাড়া চাওয়ার জন্য।আর ওই যে ফোনটায় বাইরের লোকের ফোন আসে সেই ফোনটা সন্ধ্যেবেলার পর আর আমি ধরিনা।ওইদিন আপনি হয়ত এই ফোনে সন্ধ্যেবেলায় ফোন করেছিলেন,তাই বেজে বেজে কেটে গেছে।'
— 'হুম সেদিন তো আমি সন্ধ্যেবেলাতেই ফোন করেছিলাম মা বাবার কথায়,'আর্য বলল,'তবে ভাগ্যিস করেছিলাম ফোনটা,নইলে এত বড়ো সত্যিটা তো সামনেই আসত না!'
— 'এক্স্যাক্টলি!' সৌরভ বলল।
দু দিন পর রিপেয়ারিং সেন্টারে সৌরভ আর আর্য গেল প্রমিতার ফোনটা ফেরত আনতে।
কিন্তু সেন্টারের একটা লোক বলল,'ফোনটা তো আপনাদের পাঠিয়ে দিয়েছি!'
— 'মানে?কাকে দিয়েছেন ফোনটা?'
— 'ওই তো একটা মেয়ে এসে বলল,আমায় সৌরভবাবু পাঠিয়েছেন ফোনটা ফেরত নিতে,তাই তো আমি মেয়েটার হাতে ফোনটা দিলাম!'
— 'সে কি?আমি কাউকেই পাঠাইনি ফোনটা আনার জন্য!'
— 'এ তো আশ্চর্য কান্ড!মেয়েটা তো আপনার নাম করেই ফোনটা নিয়ে চলে গেল।'
— 'মেয়েটি কতক্ষণ আগে এসেছিল?'
— 'এই তো,আপনারা আসার আগেই,পাঁচ মিনিট হবে হয়ত!'
— 'তার মানে এখনও বেরোলে আমরা মেয়েটাকে ধরতে পারব,'সৌরভ বলল,'মেয়েটা কেমন দেখতে বলতে পারবেন?'
— 'দাঁড়ান,সিসিটিভি ফুটেজ আছে আমাদের সেন্টারে,দেখাচ্ছি।'
আগ্রহভরে ফুটেজ দেখতে লাগল আর্য আর সৌরভ।মেয়েটা মাথায় ওড়না ঢাকা দিয়ে এসেছিল,সেজন্য মুখটা সেভাবে দেখা যাচ্ছেনা।হঠাৎ অন্য একজন কাস্টমারের সাথে ধাক্কা লেগে ওড়না সরে গেল,মেয়েটার মুখ দেখা গেল।
— 'আরে!এ তো সুরভি!' আর্য চেঁচিয়ে উঠল।
— 'আর এক মুহূর্তও নষ্ট করা যাবে না আর্যবাবু,'সৌরভ বলল,'সুরভি এখনও এই অঞ্চল ছেড়ে বেশিদূর যেতে পারেনি!আচ্ছা,সুরভি কোন্ দিকে গেছে বলতে পারবেন আপনি?' রিপেয়ারিং সেন্টারের লোকটাকে জিজ্ঞেস করল সে।
— 'ওই তো ডানদিকের রাস্তাটা ধরল!'
— 'আচ্ছা,থ্যাংকস।'
সৌরভ আর আর্য ছুটল ডানদিকের রাস্তা ধরে।
— 'বুঝলেন আর্যবাবু,এদিকে দশ মিনিট হাঁটলে একটা গোডাউন আছে।যতরকম অসামাজিক কাজকর্ম হয় ওখানে!আমার যতদূর মনে হয় সুরভি ওই গোডাউনের দিকেই যাচ্ছে!'
এরপর সৌরভ আর আর্য ছুটতে লাগল।একটু পরেই সুরভির দেখা পেল ওরা।সুরভি ভাবতে পারেনি,যে আর্যরা এত তাড়াতাড়ি রিপেয়ারিং সেন্টারে আসবে আর ওর গতিবিধিও জেনে ফেলবে,তাই ও নিশ্চিন্ত মনে ধীর পায়ে হাঁটছিল।ওর কাছাকাছি এসেই আর্য আর সৌরভ ওকে ফলো করতে লাগল সাবধানে।সৌরভের সন্দেহই ঠিক প্রমাণিত হল,সুরভি গোডাউনের দিকেই গেল।তবে গোডাউনে ঢোকার আগে ও ভালো করে আশপাশ দেখে নিল,যে কেউ ওকে লক্ষ করছে কিনা!আর্য আর সৌরভকে ও দেখতে পেল না,কারণ ওরা একটা স্থির লরির পেছনে লুকিয়ে পড়েছিল।এরপর সুরভি গোডাউনে ঢুকতেই আর্য আর সৌরভ খুব সাবধানে ওর চোখ এড়িয়ে গোডাউনে ঢুকে পড়ল।সুরভি এরপর একটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল,পিছন পিছন গেল আর্য আর সৌরভও।ইতিমধ্যেই সৌরভ ফোনে নির্দেশ দিয়েছে,ফোর্স নিয়ে এসে যেন গোডাউনটা ঘিরে ফেলা হয়।এরপর দোতলায় উঠে ওরা দেখল,একটা চেয়ার আর টেবিল রয়েছে,আর চেয়ারে বসে রয়েছে এক যুবক।
— ' এ তো রাজেশ!প্রমিতার এক্স হাজব্যান্ড!' আর্য নিচু স্বরে সৌরভকে বলল।
— 'ওহ আই সি!'
সুরভি গিয়ে টেবিলটার সামনে দাঁড়াল।রাজেশ তখন কাচের গ্লাসে মাদক ঢালছিল বোতল থেকে।
— 'এই যে রাজেশদা,এই সেই মোবাইল!যেটা তুমি খুঁজছিলে।'
— 'মানে?এটা নেহার মোবাইল?'
— 'হুম!'
— 'উফ,তুই যে আমায় কি বাঁচান বাঁচালি জানিস না দোলা!এই মোবাইলটা ওই পুলিশরা যদি একবার হাতে পেত তাহলেই আর রক্ষে হত না!'
— 'সে আর বলতে গো!আমরা সবাই বেঁচে গেলাম,মরল খালি বেচারি নেহা!'
— 'তা না করে আর কি উপায় ছিল বল আমাদের?শোন এই চক্রবূহ্যে ঢোকার রাস্তা আছে,বেরোনোর রাস্তা নেই,'মদের গ্লাসটা হাতে নিয়ে রাজেশ বলল,'এখান থেকে বেরোনোর একটাই শাস্তি,মৃত্যু!'
এরপর দুজনেই হাসতে থাকে।
— 'আপনাদের সব হাসি এবার শেষ!'সৌরভ পিস্তল টা বের করেই তাক করল রাজেশের দিকে।
এমন ঘটনার জন্য রাজেশ প্রস্তুত ছিল না।হতভম্ব রাজেশের মাথায় পিস্তলের বাঁট দিয়ে মারল সৌরভ,আর তাতেই অজ্ঞান হয়ে গেল সে।আর সুরভি পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল।বাইরে ততক্ষণে ফোর্স এসে গেছে,তাই সহজেই ওদের গ্রেপ্তার করে গাড়িতে তোলা হল,আর প্রমিতার মোবাইলটাও উদ্ধার করা হল।
এরপর প্রমিতার মোবাইলের সমস্ত মেসেজ,ফোনকল চেক করা হল।
— 'আমি কোনোদিনও ভাবিনি যে প্রমিতার মোবাইল এভাবে আমাদের ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে,'মনমরা আর্য বলল,'জানেন আমি ওকে এতটাই বিশ্বাস করতাম যে কোনোদিনও জিজ্ঞেসও করিনি যে কখন কাকে ফোন করছে বা মেসেজ করছে,কারণ আমি বিশ্বাস করি সব মানুষেরই পার্সোনাল স্পেস থাকা উচিত,আর প্রমিতা কিনা....'
— 'দাঁড়ান আর্যবাবু,দাঁড়ান!আপনি যাকে প্রমিতা বলছেন সে তো প্রমিতা নয়,নেহা!'
— 'নেহা?'
— 'হুম,আপনার স্ত্রীর নাম প্রমিতা রায়চৌধুরী নয়,নেহা গুপ্ত!এই মোবাইলটা তো তেমনটাই বলছে!'
— 'সে কি?দাঁড়ান দাঁড়ান,নেহা নামটা যেন আগে কোথায় শুনেছি মনে হচ্ছে?'
— 'হুম,ওই যে সুরভি আর রাজেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার সময় নামটা বলাবলি করছিল,অবশ্য সুরভি কাকে বলছি,ওটা তো ওর ছদ্মনাম,ওর আসল নাম তো দোলা!'
— 'নেহা দোলা সুরভি আমার সবটা কেমন জট পাকিয়ে যাচ্ছে সৌরভবাবু,প্লিজ খুলে বলুন সবটা।'
— 'নিশ্চয়ই বলব আর্যবাবু,আফটার অল আপনারই এসব ঘটনা সবার আগে জানা প্রয়োজন।আপনার স্ত্রী,অর্থাৎ আপনি যাকে প্রমিতা রায়চৌধুরী বলে চিনতেন,তার আসল নাম নেহা গুপ্ত।আর ও কোনো বনেদী রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে নয়,বাপ মা মরা একটা গরিব মেয়ে।ও যখন কলেজে পড়ে তখনই ওর মা বাবা একটা বাস অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান।আর তখনই একেবারে জলে গিয়ে পড়ে নেহা,কারণ বাড়িতে একমাত্র আর্নিং মেম্বার ছিল ওর বাবা।এরপর একটা কাজের জন্য ও পাগলের মতো এদিক ওদিক ঘুরতে থাকে।এইসময়ই ও হঠাৎ পড়ে রাজেশের খপ্পরে।রাজেশ ওকে নিয়ে আসে এক অন্ধকার জগতে।'
— 'অন্ধকার জগতে?'
— 'হুম।নেহার কাজ ছিল অবস্থাপন্ন বড়ো ঘরের একমাত্র ছেলেদের প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে বিয়ে করা,তারপর তার সমস্ত সম্পত্তি মিথ্যে অভিনয় করে নিজের নামে লিখিয়ে নিয়ে ছেলেগুলোকে পথের ভিখিরি করে ছেড়ে দেওয়া!'
— 'কি ডেঞ্জারাস!এরকম একটা মেয়েকে আমি দিনের পর দিন আগলে রেখেছি!এ তো দুধকলা দিয়ে কালসাপ পোষা!'
— 'হ্যাঁ আর্যবাবু,তবে সম্পত্তিগুলো আসলে যেত রাজেশের নামে,কারণ নাটের গুরু তো ছিল রাজেশই,আর এই কাজ করার জন্য নেহা মাস গেলে মোটা টাকার মাইনে পেত রাজেশের কাছ থেকে।আপনার আগে ও তিন তিনটে ছেলেকে মিথ্যে প্রেমের অভিনয়ে ফাঁসিয়ে বিয়ে করে নিঃস্ব করে ছেড়েছে।যদিও রাজেশরা ধরা পড়ার পর আমি ওনাদের হারানো সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি।নেহা আর রাজেশের চতুর্থ টার্গেট ছিলেন আপনি,কারণ আপনিও বনেদী পরিবারের একমাত্র ছেলে,কিন্তু নেহা আপনার সাথে এই বিশ্বাসঘাতকতাটা করল না।'
— 'কেন?'
— 'আসলে একটা কথা জানেন তো,খুব অসৎ নির্দয় মানুষও প্রকৃত ভালোবাসার কাছে হার মানে,মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়।সেটাই হয়েছিল নেহার সাথে।মা বাপ মরা নেহা টাকার লোভে জড়িয়ে পড়েছিল এই অসৎ চক্রে।রাজেশ মাসের শেষে মোটা মাইনে দিত,আর নেহা তাতে খুশি হয়ে আরও আগ্রহ ভরে কাজটা করত।আগে যে তিনজন যুবককে ও ঠকিয়ে বিয়ে করেছিল,তারা ওকে হয়ত স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিল,কিন্তু আপনার মতো করে ওকে কেউ ভালোবাসেনি,বোঝেনি,আগলে রাখেনি।আপনি ছিলেন ওর চার নম্বর টার্গেট।আপনার সাথে প্রতি পদে মিথ্যে অভিনয় করেছিল,কপালে নকল আঘাতের চিহ্ন নিয়ে অফিসে আসত,তক্কে তক্কে ছিল আপনার সমস্ত সম্পত্তি হাতাবার,কিন্তু ওই যে বললাম সত্যিকারের ভালোবাসা বনের হিংস্র পশুরাও বোঝে।আর নেহা তো জন্মগত অপরাধী নয়,ওর দারিদ্র্যতার সুযোগ নিয়ে ওকে অন্ধকারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।আপনার ওর প্রতি অন্ধ ভালোবাসা,ভরসা,বিশ্বাস,স্নেহ নেহা গুপ্তকে আমূল বদলে দিল।নিজের আসল উদ্দেশ্য ভুলে নিঃসঙ্গ নেহাও প্রেমে পড়ে গেল আপনার,ভালোবেসে ফেলল আপনাকে,ঘরনী সাজার অভিনয় করতে করতে একদিন সত্যিকারের ঘরনী হয়ে উঠল আপনার!আর রায়চৌধুরী বাড়িতে মিথ্যে শোভনবাবুদের হাজির করা এটাও রাজেশের কাজ।একটা যাত্রাদলকে মোটা টাকা দিয়ে ও ভাড়া করেছিল একদিনের জন্য আপনার সাথে অভিনয় করার জন্য।'
— 'এসব আপনি কোত্থেকে জানলেন?'
— 'কিছুটা জেনেছি নেহার মেসেজ চেক করে,কিছুটা রাজেশের মুখ থেকে বের করা হয়েছে।নেহার এভাবে ভালোমানুষে পরিণত হওয়ায় প্রমাদ গুনল রাজেশ।ও বারবার নেহাকে বোঝাতে লাগল,যে জীবনে প্রেম ভালোবাসা এসব মিথ্যা,টাকাটাই সব,যার কাছে টাকা আছে সে ই সবচেয়ে সুখী।কিন্তু নেহা যে ততদিনে আসল সুখী জীবনের সন্ধান পেয়ে গেছে।রাজেশ ওকে যে মাস মাইনে দিত সেই সব টাকাটা ও ফিরিয়ে দিয়েছিল রাজেশকে।এই সবই নেহার পার্সোনাল মেসেজ চেক করে জানা গেছে,নেহার সাথে রাজেশের প্রায়ই এসব নিয়ে কথা হত।রাজেশ হাজার চেষ্টা করেও আর নেহাকে অন্ধকার জগতে ফেরাতে পারেনি।নেহা এও ঠিক করেছিল,যে ওর জীবনের সমস্ত সত্যিটা ও আপনাকে জানিয়ে দেবে,কারণ এভাবে আপনাকে দিনের পর দিন ঠকাতে ও পারবে না।এদিকে রাজেশ দেখল,নেহা সব সত্যি আপনাকে বলে দিলে ও বিপদে পড়বে।ও তখন ঠিক করে নিল,পথের কাঁটা নেহাকে সরিয়ে দিতে হবে,আর ওর খুনের জন্য এক অভিনব পরিকল্পনা আঁটল সে,যাতে কোনোভাবেই অভিযোগের তীরটা ওর দিকে না আসে।নেহা যখন সব সত্যি আপনাকে জানিয়ে দেবে ভেবেছিল,তখন রাজেশও ভালো হয়ে যাওয়ার মিথ্যে অভিনয় করল নেহার কাছে,আর নেহাও বিশ্বাস করল ওকে।রাজেশ ওকে বলল,এখনই নয়,আপনার আর ওর বিবাহবার্ষিকীর দিনে যেন নেহা আপনাকে সত্যিটা জানায়।'
— 'হ্যাঁ,এতকিছুর মধ্যে তো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম,ও যেদিন মারা গেল,তার তিনদিন পরেই আমাদের বিবাহবার্ষিকী ছিল।'
— 'হুম।আর এই যে নেহার ছেলেমানুষি,ওই মিথ্যে অসুস্থতার অভিনয় করাটা,ওটাও রাজেশের প্ল্যান ছিল।কারণ আগে থেকেই ও ঠিক করে রেখেছিল ওই বিষটাই নেহাকে খাওয়াবে,আর ওই বিষ খেলে কি কি লক্ষণ হয় ও তাও জানত।ওই লক্ষণগুলোই ও নেহাকে জানিয়েছিল এপ্রিল ফুলের দিন,আর নেহা তখন আপনার প্রতি ভালোবাসায় মগ্ন,আর রাজেশও ওর সামনে ভালো সাজার অ্যাক্টিং করছিল,তাই রাজেশের কথা শুনে নেহা এপ্রিল ফুলের দিন প্রথম ওই অসুস্থতার অভিনয় করে।'
— 'হুম,আপনি ঠিকই বলেছেন,প্রথম অভিনয়টা ও এপ্রিল ফুলের দিনই করেছিল।'
— 'এরপর ওইদিন ওই অভিনয়টা করার পর আপনার চিন্তাগ্রস্ত মুখটা ও দেখতে পায়।মা বাবা মারা যাওয়ার পর এই প্রথম ও ওকে নিয়ে কাউকে এত দুশ্চিন্তা করতে দেখে,আর আরও বেশি করে ভালোবাসতে শুরু করে আপনাকে।আপনার চোখে সেদিনের সেই যে দুশ্চিন্তাটা ও দেখেছিল ওকে নিয়ে,সে কথাটা রাজেশকেও একথা সেকথায় বলে ফেলে ও।রাজেশ ওকে এই অভিনয়টা আরও বেশ কয়েকবার করতে বলে,আর নেহাও তখন ছেলেমানুষিতে মত্ত হয়ে একান্ত আপন মানুষটির কাছে পাগলামো করতে থাকে।এইভাবেই প্ল্যানটা কষেছিল রাজেশ,আর বিবাহবার্ষিকীর এক সপ্তাহ আগেই ও আরতিদেবীকে ভয় দেখিয়ে দোলাকে সুরভি পরিচয়ে ও বাড়িতে পাঠায় নেহাকে খুন করার জন্য,এই দোলাও নেহার মতোই অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলেদের বিয়ে করে তাদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করত।ছয়জন যুবককে নিঃস্ব করে ছেড়েছে ও।'
— 'কিন্তু সেদিন কফিটা তো সুরভি বানায়নি,বানিয়েছিলাম আমি!'
— 'হুম,আপনার অলক্ষ্যে বিষটা দোলা কফিতে মিশিয়ে দিয়েছিল।আর যেহেতু কফিটা আপনি বানিয়েছিলেন,তাই আপনাকে ফাঁসানোর জন্য না ধুয়ে রান্নাঘরে রেখে দিয়েছিল।'
— 'সত্যি অফিসার,আমার আশেপাশে এতদিন ধরে এতকিছু ঘটে চলল,অথচ আমি কিছুই টের পেতাম না।যে রাজেশকে আমি ওর প্রাক্তন স্বামী ভাবতাম,সে কিনা ওকে চালনা করত!'
— 'হুম,ও রাজেশের দলের হয়ে কাজ করত।আর সেই যে আপনারা আরতিদেবীকে দেখার জন্য মালদা গিয়েছিলেন,সেইদিনই রাজেশ এসেছিল আপনাদের ফ্ল্যাটে।'
— 'কিন্তু ফ্ল্যাটে যে চাবি দেওয়া ছিল!'
ঈষৎ হেসে সৌরভ বলল,'এসব দোলার কাজ।সাবানে চাবির ছাপ নিয়ে নতুন চাবি বানানো ওর কাছে কি খুব কঠিন কিছু?সেদিন আপনাদের সম্পত্তির কাগজপত্র খুঁজতে এসেছিল রাজেশ নিজেই।যথারীতি আলমারির চাবিও একইভাবে ডুপ্লিকেট তৈরি করিয়েছিল দোলা।অনেকক্ষণ ধরে আলমারি খুঁজেই কোনো সম্পত্তির কাগজ ও পায়নি।'
— 'কিভাবে পাবে বলুন?সম্পত্তির যাবতীয় কাগজপত্র তো থাকে মা বাবার কাছে আমাদের বাড়িতে,ফ্ল্যাটে কিছুই নেই।'
— 'হুম,ওই খোঁজাখুঁজি করতে গিয়েই কখন যে আংটিটা ওর হাত থেকে খুলে গড়িয়ে আলমারির তলায় চলে গিয়েছিল খেয়ালই করেনি ও।পরেরদিন সকালে ওর এক চ্যালা খেয়াল করে যে আংটিটা ওর হাতে নেই।ঘটনাচক্রে সেদিন আপনারা কলকাতাতেই ছিলেন,আর আরতিদেবীর বাড়ি গিয়েছিলেন।তখন ও ওর একটা চ্যালাকেই পাঠিয়েছিল আংটিটা আনার জন্য,কিন্তু আলমারির কাছে যাওয়ার আগেই হঠাৎ জানালা দিয়ে রাস্তাটায় চোখ যায় ওর সেই চ্যালার,সে দেখে আপনারা আসছেন,তাই দেখেই খোঁজাখুঁজি ফেলে ও দ্রুত পালাতে যায়।তাড়তাড়ি আপনাদের ফ্ল্যাট থেকে বেরোবার সময় ওর সাথে ধাক্কা লেগে ফুলদানিটা পড়ে যায়।অন্যদিকে আংটিটা আপনাদের হাতে পড়ে গেলে মুশকিল,তাই শেষমেশ উপায় না পেয়ে দোলা মিথ্যে গল্প বলে নেহার কাছ থেকে আংটিটা ফেরত আনে।'
— 'এখানে আমার একটা প্রশ্ন আছে,নেহা আর দোলা দুজনেই রাজেশের আন্ডারে কাজ করত,তবু নেহা দোলাকে চিনতে পারেনি কেন?'
— 'হাসালেন আর্যবাবু,রাজেশের মতো অপরাধীদের আন্ডারে নেহার মতো অনেক মেয়ে কাজ করে,কজন আর একে অপরকে চেনে বলুন?'
— 'তাও ঠিক!'
সেদিন বাড়ি এসে দেওয়ালে নেহার ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল আর্য।স্ত্রীকে ভালোবেসে ডাইনিংয়ে একটা বড়ো বাঁধানো ছবি পরম যত্নে রেখেছিল ও।ছবিটায় আজ মালা পরানো রয়েছে।আর্য ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ছবিটার দিকে,শান্ত গলায় বলল,'শুধু রাজেশ আর দোলারাই খুনী?তুমি খুনী নও?দিনের পর দিন মানুষের বিশ্বাসকে খুন করে যে,সেও তো খুনী,তাই না প্রমিতা?ওহ,সরি,তুমি তো নেহা!তুমি যেই হও,তুমিও তো খুনী,বিশ্বাসের খুনী!'
আর্য কান্নায় ভেঙে পড়ল।
(সমাপ্ত)

0 মন্তব্যসমূহ