Advertisement

কন্যারূপেণ সংস্থিতা

 


কন্যারূপেণ সংস্থিতা

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


— 'তুই এবার পুজোতেও আসতে পারবি না মামণি?'

— 'ওহ,প্লিজ বাবা।ডোন্ট বি ইমোশনাল, বি প্র‍্যাকটিক্যাল।পুজোর টাইমে অশোকের এক কলিগের বার্থডে,বারবার করে আসতে বলে গেছে...'

— 'সে তুই যাই বলিস,এসব আসলে তোর অজুহাত। বছরে একবার পুজো,ইচ্ছা থাকলেই আসা যায়।'

— 'না যায়না।বাবা কেন বোঝো না সোসাইটিতে আমাদের একটা স্ট্যাটাস আছে....'

— 'হ্যাঁ রে মা,সবই বুঝি।ওইজন্যই তো কলকাতায় আসিস না তুই,বুড়ো বাবা-মার মুখের ওপর না বলে দিস....'

— 'বাবা প্লিজ,ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড,এবার যাওয়া ইমপসিবল....'

— 'থাক আর কিচ্ছু বোঝাতে হবে না মামণি।ছ বছর আগে বিয়ে করে সেই যে জার্মানি চলে গেছিস,তারপর ওই একবারই পুজোয় এসেছিলি,তারপর থেকেই কোনো না কোনো অজুহাত দিয়ে ঠিক.....'

— 'দেখো আমি কোনো অজুহাত দিইনি।'

— 'তোর এদেশ আর ভালো লাগে না,তাই নারে মা?'

— 'হ্যাঁ তাই।ইন্ডিয়া আমার ভালো লাগে না,যত ভিড়ভাট্টা,আর বোকা বোকা অকেশন,অসহ্য!আর শোনো,দ্বিতীয়বার আর ইন্ডিয়া যাওয়ার জন্য কল করবে না আমায়,ওকে?বাই!'

— 'হ্যালো,হ্যালো...মামণি...হ্যালো...'রিসিভারটা নামিয়ে রেখে দীপঙ্করবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,'কেটে দিয়েছে ফোনটা।'


— 'কি বলল বোন?এবারও আসতে পারবে না,তাই তো?'দীপঙ্করবাবুর বড় মেয়ে ঐশী কটাক্ষের সুরে বলল,'জানতাম আমি।ছোট থেকে ছোটমেয়ে ছোটমেয়ে করে মাথায় তুলেছ,এবার বোঝো।এমন হাবভাব করতে যেন আমি তোমাদের মেয়েই নই,খালি কাহুই তোমাদের মেয়ে।বোঝো ঠেলা এবার!'

— 'চুপ কর ঐশী,চুপ কর মা,মানুষটার কাটা ঘায়ে আর নুনের ছিটে দিস না।'দীপঙ্করবাবুর স্ত্রী আশাদেবী এসে বললেন।

— 'হুম,কিছু বললেই তো আমি খারাপ।শখ করে ছোটমেয়ের বিদেশে বিয়ে দিয়েছ,দাম তো দিতেই হবে তাই না?'

 'দীপঙ্করবাবুর দুই মেয়ে,ঐশী আর কাহিনী।বড় মেয়ে বরাবরই একটু ঠোঁটকাটা স্বভাবের,কিন্তু ছোট মেয়ে ছিল শান্ত স্বভাবের,সেই সাথে বেশ রুগ্নও ছিল,তাই হয়ত মা বাবার স্নেহের ভাগ কিছুটা হলেও ছোটমেয়ের ক্ষেত্রে বেশি ছিল।

দীপঙ্করবাবু তাই মাঝেমাঝেই বলে থাকেন 'মামণি আমার এমন ছিল না,বিয়ে হওয়ার পরই কেমন যেন পালটে গেল!'

— 'কি জানি গো,বিদেশের কি এমন হাওয়া লাগল যে সে এমন হয়ে গেল,পুজোতে পর্যন্ত আসা বন্ধ করে দিল!'আশাদেবী একবুক হতাশা নিয়ে বলেন।

 দেখতে দেখতে দেবীপক্ষ এসে পড়ল।মাঠঘাট ছেয়ে গেল কাশফুলে।প্যান্ডেলে-ঢাকিতে ঢেকে গেল কলকাতা।দূরদ্বিপবাসী বঙ্গসন্তানরা কলকাতায় ফিরে এল শরতের গন্ধ মেখে,ঘরে ঘরে আনন্দের আলো জ্বলে উঠল,শুধু ফাঁকা রয়ে গেল কাহিনীর ঘরটা।ঘরটা কাহিনীর বিভিন্ন বয়সের ছবি দিয়ে সাজানো।দীপঙ্করবাবুদের বাড়িতে পুজো হয়,দীপঙ্করবাবুর ভাইবোন থেকে শুরু করে সমস্ত আত্মীয়স্বজন আসেন এই সময় বাড়িতে।

 পঞ্চমীর সন্ধ্যেবেলা।আশাদেবী একবুক শূন্যতা নিয়ে বসে আছেন কাহিনীর শূন্য ঘরটায়।কাহিনীর ছবিটা বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,'কতকাল তোকে এভাবে আদর করিনি মা,তোর কি আমাদের কথা একেবারেই মনে পড়ে না?'

    হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ।তাড়াতাড়ি চোখ মুছে আশাদেবী চললেন দরজা খুলতে।কিন্তু দরজা খুলেই তিনি অবাক।এ কি সত্যি?নাকি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছেন তিনি?

   কাহিনী দাঁড়িয়ে দরজায়।পরনে শাড়ি,কপালে লাল টিপ,এক্কেবারে যেন দুর্গাপ্রতিমাটির মতো লাগছে তাকে।এতক্ষণে দীপঙ্করবাবুও এসে দাঁড়িয়েছেন।তিনিও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না নিজের চোখকে।ঐশীও হতবাক।

 — 'কি আশ্চর্য! তোমরা কি বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবে আমায়?'

 — 'আমি জানতাম মামণি,একদিন  তুই ঠিক নিজের ভুল বুঝতে পারবি,আমি যে চিনি আমার ছোট মেয়েটাকে।'

— 'হ্যাঁ গো,আমিও জানতাম,শিকড়ের টান কি ছেঁড়া যায় এত সহজে?কিন্তু তুই যে বললি পুজোয় আসতে পারবি না?'

— 'সারপ্রাইজ দিলাম মা।কেমন ছিল বলো সারপ্রাইজটা?'

— 'আর জামাই এলোনা?'

— ' না মা,ও আসলে ছুটি পেলোনা,তাই আমিই চলে এলাম বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে।'

— 'খুব ভালো করেছিস মা,এই তো আমার আগের মামণি।'

মিত্রবাড়ি আবার সেই আগের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।কিছুদিন আগে যে কাহিনীর সাথে ফোনে কথা বললেন দীপঙ্কর বাবু,এ যেন একেবারে অন্য কাহিনী,সেই বিয়ের আগের শান্ত মেয়েটা।

  ষষ্ঠী থেকে নবমী খুব ধুমধাম,পেটপুজো করে কাটল সবার।এল দশমী,বিদায়বেলা।সকলের থমথমে মুখ,কারো কারো চোখে জল।

 — 'এই তো সেদিনই এলি মা,এত তাড়াতাড়ি ফিরবি?'

— 'কি আর করি বলো মা,এবার যে শ্বশুরঘরে ফেরার পালা আমার,আমার স্বামী যে অপেক্ষা করছে আমার জন্য।কিন্তু কথা দিলাম মা,এবার থেকে প্রতিবার পুজোয় আমি বাড়ি আসব।'

—'তুই শাড়ি পরেই ফিরবি নাকি বোন?'আশ্চর্যের সুরে বলল ঐশী।

— 'হ্যাঁ দিদি।কেন?শাড়ি পরে বুঝি ফিরতে নেই?'

— 'না মানে জার্মানি যাওয়ার পর তো আর শাড়ি আলতা সিঁদুর এসব পরিস না তুই,তাই আরকি...'

— 'এবার থেকে পরব।আসি তাহলে?'

— 'এয়ারপোর্টে পৌঁছে ফোন করিস মামণি।'

— 'আচ্ছা বাবা করব।'

 সকলকে কাঁদিয়ে দশমীর সন্ধ্যেয়  ঘর ছাড়ল কাহিনী।

 তাঁদের বাড়ি থেকে এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে বড়জোর চল্লিশ মিনিট লাগে,কিন্তু দু ঘন্টা পরও কোনো ফোন এল না দেখে খুব চিন্তান্বিত হয়ে দীপঙ্করবাবু নিজেই ফোন করলেন কাহিনীকে।

 — 'হ্যালো বাবা বলো।'

— 'হ্যাঁরে মামণি তুই এয়ারপোর্টে ঠিকঠাকভাবে পৌঁছে গেছিস তো?এতক্ষণ হয়ে গেল তবু ফোন করলি না,বুড়ো মা বাবার কি টেনশন হয় না?'

— 'এয়ারপোর্ট?আমি?আমি এয়ারপোর্ট কেন যেতে যাব!প্লিজ যা বলছ ভেবে বলো,আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!'

— 'সে কি রে মা,এয়ারপোর্ট না গেলে তুই জার্মানি ফিরবি কিভাবে?'

— 'ফিরব মানে?আমি তো জার্মানিতেই আছি,আবার জার্মানি তে ফেরার প্রশ্ন উঠছে কেন?'

— 'সে কি মামণি!তোর কথা তো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!'

— 'আমিও তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।আমি তো জার্মানিতেই আছি,তাহলে এয়ারপোর্ট যাওয়া,ফেরার কথা এসব কি ভুলভাল বলছ?'

— 'মানে?তুই তো পঞ্চমীর দিন সন্ধ্যেবেলা কলকাতা এলি,তারপর আজ রওনা দিলি....'

— 'মানে?কি উল্টোপাল্টা বকছ তুমি বাবা?আমি তো এখানেই আছি,জার্মানি।ইন্ডিয়া আবার কবে গেলাম?'

  চমকে উঠলেন দীপঙ্করবাবু।হাত থেকে অজান্তেই টেলিফোনের রিসিভারটা পড়ে গেল।তবে এতদিন যে এবাড়িতে ছিল কাহিনীর পরিচয়ে,সে কে?শিরায় শিরায় একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল তাঁর,ছুটে গেলেন কাহিনীর ঘরে।

   শূন্য ঘরের বিছানায় একগুচ্ছ শিউলি ফুল পড়ে আছে,আর মৃদু ধুনোর গন্ধ ভেসে আসছে,দীপঙ্করবাবু অস্ফুট স্বরে বলে উঠলেন,'মা.....'

-- সমাপ্ত --

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ