Advertisement

সপ্তমী

 


সপ্তমী

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


আজ সপ্তমী।শুভমিতার তাড়াতাড়ি ঘুমটা ভেঙে গেল সকালে,আজ অরিত্রর সাথে বেরোনোর কথা যে!অরিত্র নীল রঙ ভালোবাসে,তাই নীল জামদানীটা বের করল সে আলমারি থেকে।অরিত্রই আসবে শুভমিতার বাড়ি,তারপর ওরা দুজন বেরোবে ঠাকুর দেখতে।

   অরিত্র আর শুভমিতার সম্বন্ধ করেই বিয়ে ঠিক হয়েছে।দুজন দুজনকে চেনার জন্য কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছিল ওরা বিয়ের আগে,ওদের মা-বাবাও আপত্তি করেননি এতে।

  নীল জামদানী আর নীল টিপে বেশ লাগছিল শুভমিতাকে।শুভমিতার মা মুচকি হেসে বললেন,'ওরে বাবা,আমিই মুখ ফেরাতে পারছি না,অরিত্রর না জানি কি হবে আজ!'

— 'উফ মা,কি যে বলো না তুমি!'

হঠাৎ কলিংবেলের শব্দ।'আর লজ্জা পেতে হবে না'হেসে বললেন শুভমিতার মা,'তোর মজনু এসে গেছে বোধহয়!'

মা শুভমিতাকেই ঠেলে পাঠালেন দরজাটা খোলার জন্য।শুভমিতা খুলে দেখে অরিত্র দাঁড়িয়ে আছে,কিন্তু এ কোন্ অরিত্র!অরিত্রকে সবসময় কোর্ট প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখেছে সে,কিন্তু আজ হলুদ পাঞ্জাবিতে এক্কেবারে যেন বাঙালিবাবু লাগছে।

  নীল শাড়ি আর হলুদ পাঞ্জাবি পরা দুটো লাজুক ছেলেমেয়ে যখন কলকাতার ফুটপাত ধরে হাঁটছিল,তাদের দেখতে লাগছিল ঠিক যেন দুটো রঙিন প্রজাপতির মতো।

  খোশগল্প করতে করতে অনেক প্যান্ডেলই ঘুরে ফেলল ওরা।সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে এল।

 —'চলুন এবার একটু লাঞ্চ করা যাক।সকাল থেকে হেঁটে হেঁটে খিদে পেয়ে গেল।'

— 'একদমই তাই।চলুন কোনো রেস্টুরেন্টে যাওয়া যাক।'

ওরা রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাবার অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।অরিত্রই নীরবতা ভাঙল,'আপনি চাইনিজ বেশি ভালোবাসেন,না?'

— 'হুম্মম,তা বাসি,তবে মায়ের হাতের রান্নাটাই বেস্ট।'

— 'হ্যাঁ,তা যা বলেছেন।তবে নীল শাড়িতে আপনাকে অসাধারণ লাগছে,চোখ ফেরানোই যাচ্ছে না।'

— 'হা হা,থ্যাঙ্কিউ থ্যাঙ্কিউ।আপনাকেও হলুদ পাঞ্জাবিতে দারুণ মানিয়েছে।'

ইতিমধ্যে খাবার চলে এসেছে।শুভমিতার চাউমিন,আর অরিত্রর বিরিয়ানি।

বিরিয়ানি মুখে দিয়ে অরিত্র বলল,'আমার আপনাকে একটা কথা জানানোর ছিল,কিন্তু কিভাবে বলব বুঝতে পারছি না....'

— 'কি বলবেন,বলুন না।'

— 'না আসলে আজকের আনন্দের দিনে আপনার মুড খারাপ করতে চাইছিলাম না...'

— 'অত ইতস্তত না করে যা বলতে চাইছেন বলুন তো।'

— 'আচ্ছা বলছি,' থমথমে মুখে অরিত্র বলল,'আসলে আমার চাকরিটা চলে গেছে,আমার এখন একটাই পরিচয় বেকার....'

— 'সেকি!কি বলছেন!'চমকে উঠল শুভমিতা।

— 'হুম্ম,ঠিকই বলছি,আপনি আর আমাকে....'

— 'কিভাবে হল এসব?'

— 'সে অনেক গল্প,কিন্তু আপনি....'

— 'হ্যাঁ আমি কি?'

— 'নিশ্চয় এই বিয়েটা ভেঙে দেবেন,তাই না?'

— 'দেখুন অরিত্র,'গম্ভীর গলায় বলল শুভমিতা,'আপনার সাথে বেশ কিছুদিন মিশেছি,কথা বলেছি,যেটা বুঝেছি তা হল আপনি এক্কেবারে আমার মনের মতো,আর সেটুকুই যথেষ্ট কারণ আমার পক্ষে আপনাকে বিয়ে করার জন্য।আপনার চাকরি নাই বা থাকল,আমার চাকরিটা তো আছে।ওই দিয়ে দিব্যি চলে যাবে আমাদের।আর আপনার এই চাকরিটা গেছে তো কি হয়েছে,অন্য চাকরির চেষ্টা করুন,নিশ্চয়ই পাবেন,তবে সে চাকরি যে বিয়ের আগেই পেতে হবে এমনটা নয়,' শুভমিতা অরিত্রর হাতদুটো শক্ত করে ধরে বলল,'আর চাকরি না থাকুক,আমি আপনার হাতদুটো কোনোদিনই ছাড়ব না।'

— 'আপনি সত্যি বলছেন শুভমিতা?'

— ' তা নয়তো কি ভরদুপুরে আষাঢ়ে গল্প শোনাচ্ছি আপনাকে?'

— 'না তা নয়,আসলে আমিও একটা কথা ভাবছিলাম,জানেন?'

— 'কি?'

— 'আমি সত্যিই লাকি যে আপনার মতো মানুষকে জীবনে পেতে চলেছি।'

— 'হ্যাঁ আমিও লাকি,আপনাকে পেয়ে।'

— 'আপনি কিন্তু আমার পুরো কথাটা শুনলেন না।'

— 'আচ্ছা বলুন।'

— 'আসলে আমার চাকরিটা যায়নি শুভমিতা।'

— 'কি?মানে এতক্ষণ আপনি....'

— 'হুম,আপনি সত্যিই আমাকে ভালোবাসেন শুভমিতা,আই অ্যাম রিয়েলি লাকি।'

— 'হুম বুঝলাম।কিন্তু আপনিও আমার ব্যাপারে একটা জিনিস জানেন না।'

— 'কি জানিনা?'

— 'আমি নেশাখোর একজন মানুষ।'

— 'তাই?তা কিসের নেশা আছে আপনার?'

— 'চায়ের।জানেন মশাই,দিনে অন্তত তিনবার চা না খেলে আমার মুড অফ হয়ে যায়।'

— 'আচ্ছা বুঝলাম।'

— 'কাঁচকলা বুঝেছেন।খাওয়া তো হয়ে গেল,চলুন চা খাওয়া যাক।'

— 'এখন চা?'

— 'হ্যাঁ এখন।শুনুন মশাই অরিত্র,বিয়ের পর যদি আমার তিনবেলা চা খাওয়ার রুটিনে বিঘ্ন ঘটে,আমি আপনাকে ডিভোর্স দিয়ে দেব।'

— 'আচ্ছা,তা দেবেন খন,এখন চলুন চা খেয়ে আসা যাক।আর কলকাতার রাস্তার ধারের চা,উফফ,ফাটাফাটি যাকে বলে!'


— 'কি ম্যাডাম,আপনার মুড অন তো?'

— 'হ্যাঁ,চা খেলেই আমার বেশ ফ্রেশ লাগে।'

— 'বলছিলাম কি শুভমিতা আপনাকে.....'

— 'উঁহু,আপনি নয়,তুমি।শুভমিতা নয়,শুভ,ওকে।'

— 'আচ্ছা বাবা ওকে।'

দুজনের মৃদু লাজুক হাসিতে সপ্তমীর দিনটা যেন আরও ঝলমলিয়ে উঠল।

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ