Advertisement

নামহীন অপরাধী

 


নামহীন অপরাধী 

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


সূর্যের সাথে অরুণিমার পরিচয় হয়েছিল কলেজে।প্রথম দেখাতেই বেশ ভালো লেগেছিল সূর্যের অরুণিমাকে।তারপর বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হতে শুরু করে।সূর্য মনে মনে অরুণিমাকে পছন্দ করলেও অরুণিমা তাকে একজন ভালো বন্ধুই মনে করত।

 একদিন বন্ধুদের চাপে পড়ে অরুণিমাকে প্রোপোজই করে ফেলে সূর্য।আচমকা প্রোপোজালে হকচকিয়ে গিয়েছিল অরুণিমা।তবুও শান্তভাবে সে জানিয়েছিল,তার বয়ফ্রেন্ড আছে।আর সূর্যকে সে একজন ভালো বন্ধুই ভাবে,তার বেশি কিছু নয়।

   বন্ধুদের সামনে এভাবে তাকে প্রত্যাখ্যান করায় যথেষ্ট অপমানিত বোধ করে সূর্য।তার ওপর বন্ধুরাও দেখা হলেই টিপ্পনি কেটে বলে,'কি রে বস!অরুণিমা তো তোর প্রেস্টিজের একশো আট করে দিল!'বলেই মুচকি হেসে চলে যায়।

 দিনে দিনে অরুণিমার প্রতি রাগ ক্রমশ বাড়তে থাকে তার।তার ধারণা হয়,আজ অরুণিমার জন্যই তার সব সম্মান ধুলোয় মিশে গেছে।সে মনে মনে ঠিক করে,অরুণিমাকে সে শাস্তি দেবে।

  তার এক বন্ধুর জামাইবাবু সোনার কারিগর।তার কাছ থেকেই বেশ কিছুটা টাকা দিয়ে অ্যাসিড জোগাড় করে সূর্য।ঠিক করে,অরুণিমার রূপ সে নষ্ট করে দেবে,যাতে তার বয়ফ্রেন্ড কেন,পৃথিবীর কোনো পুরুষ তার দিকে তাকিয়ে না দেখে।

   সূর্য তার এক বন্ধু মারফত খবর পায় যে পরশু সন্ধ্যেবেলা অরুণিমা একাই তার এক বান্ধবী রূম্পার বার্থডে পার্টিতে তার বাড়ি যাবে,আর যে রাস্তা দিয়ে যাবে সেটা বেশ নির্জন।ওইদিনের পার্টিতে সূর্যও আমন্ত্রিত,কারণ রূম্পা সূর্যরও বান্ধবী।সূর্য আরও জানতে পারে অরুণিমা ওইদিন একটা নীল গাউন পরবে,গাউনটা সূর্যের চেনা,কারণ ওই গাউন পরনে বেশ কিছু ছবি আপলোড করেছিল অরুণিমা সোশ্যাল মিডিয়ায়।

  কাঙ্ক্ষিত দিনটি আসতেই সূর্য ওই রাস্তাটার ধারে এক ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে রইল হাতে অ্যাসিডের বোতল নিয়ে।বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর সে দেখল,সেই চেনা নীল গাউনটা পরে কেউ একজন আসছে।মেয়েটি আরও কিছুটা এগিয়ে আসতেই ওর দিকে অ্যাসিড ছুড়ে মারল সে।তারপরই এক ছুটে পালিয়ে গেল সে।

  যাতে কেউ তাকে সন্দেহ না করে সেজন্য তাড়তাড়ি রুম্পার বার্থডে পার্টিতে এসে হাজির হল সে।কিন্তু এসেই সে হতবাক।এ কিভাবে সম্ভব?অরুণিমা তার আগেই পার্টিতে এসে উপস্থিত হয়েছে,আর পরনে সাদা গাউন।কোথাও সামান্য ক্ষতেরও চিহ্ন নেই,আর পাঁচটা সুস্থ মানুষের মতই হেসে হেসে কথা বলছে সবার সাথে।সেই সময়ই হঠাৎ রুম্পা এসে জিজ্ঞেস করল অরুণিমাকে,'কি রে,নীল গাউনটা পরে এলিনা যে?ওটাই তো তোর প্রিয়?'

— 'হ্যাঁ রে পরতাম,কিন্তু দেখ না সূর্যর বোন মুন এমন করে চাইল গাউনটা যে না করতে পারলাম না।ও আজ ওই গাউনটা পরেই এখানে আসবে।'

   সূর্য কথাটা শুনে মূর্তির মতো স্থির হয়ে যায়।তার বোন তার থেকে এক বছরের ছোট,আর তার,অরুণিমা আর মুনের কলেজও একই।মুন খুব অরুদি অরুদি করে তা ও জানত,আর আজ মুনও আমন্ত্রিত ছিল এখানে।সূর্য বলেছিল সে আর মুন একসাথেই আসবে এখানে,কিন্তু মুনের টিউশন থাকায় সে একটু দেরিতে আসবে বলে  জানায়।আর মুনের টিউশনের স্যারের বাড়ি থেকে রুম্পাদের বাড়ি আসতে ওই নির্জন রাস্তাটাই শর্টকাট হয়,কিন্তু তাই বলে.....'

   'ওহ মাই গড' বলে তাড়তাড়ি বাড়িতে ফোন করতে যায় সূর্য,কিন্তু তার আগেই তার মা তাকে ফোন করে।

— 'হ্যালো বাবা',সূর্যের মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন,'কোন অকালকুষ্মাণ্ড তোর বোনের গায়ে অ্যাসিড ছুড়েছে।তুই তাড়াতাড়ি আয় বাবা!'

 সূর্য আর স্থির থাকতে পারে না।শরীরের শিরা উপশিরা বেয়ে এক ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়,ধপ করে মাটিতে পড়ে যায় সে।কোনোরকমে বলে,'ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওনি তোমরা?'

— 'হ্যাঁ রে বাবা ও হাসপাতালেই আছে এখন।তবে যে অ্যাসিডটা ছুড়েছিল সে হয়ত অন্ধকারে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল,তাই ওর মুখে লাগেনি,কাঁধের কাছটা একটু পুড়ে গেছে।'

  সূর্য কথা বলার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে।বোন তার চোখের মণি,এ কি করে ফেলল সে?

   পরেরদিন সকালে সূর্যের ঘর থেকে তার মৃতদেহ পাওয়া গেল,বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেছে সে।পাশে একটি চিরকুটে লেখা,'নিজের বোনকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসি,তবু বুঝিনি অরুণিমাও কারোর বোন,কারোর চোখের মণি।আমি যে অন্যায় করেছি তার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু।যদি আইনের ওপর নির্ভর করি,তবে হয়ত মৃত্যুদণ্ড আমি পাব,কিন্তু অনেক দেরিতে।এমন অভিশপ্ত জীবন আর একদিনও রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব।তাই নিজেই নিজেকে শাস্তি দিলাম।আর অরুণিমা,মুন তোমাদের দুজনের কাছে ক্ষমা তো দূর,ঘৃণাও চাওয়ার যোগ্যতা নেই আমার।

                          — ইতি এক নামহীন অপরাধী,

কারণ অপরাধীর কোনো নাম হয়না।'

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ