Advertisement

বন্ধু



বন্ধু

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


আজ আমার বন্ধু কৌশিকের  বিয়ে,আমার অফিস কলিগ ও।নিজের পছন্দের মেয়ের সাথেই বিয়ে হচ্ছে।আমি যেহেতু অফিসে ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু তাই আমাকেই সবার আগে ওদের রিলেশনের কথা জানিয়েছিল।প্রায় সাত বছরের বন্ধুত্ব আমাদের,ওর জীবনের প্রায় সবকিছু ও শেয়ার করত আমার সাথে।আগে যাকে ভালোবাসত কৌশিক,সে এমনিতে ভালোই ছিল,কিন্তু সমস্যা একটাই ছিল,সে বাবা-মার মুখের ওপর কোনোদিন কথা বলতে পারত না,একেবারে মা-বাবার বাধ্য মেয়ের মতো।এরকম মানুষেরা যে প্রেম করতে কেন আসে সেটাই বোধগম্য হয়নি আমার আজ অবধি।কোনো মানুষকে ভালোবেসে শেষে বাড়ির কথায় দুমড়ে মুচড়ে পিষে আধমরা করে যারা,সেইসব মেরুদণ্ডহীন জীবদের মানুষ বলতে লজ্জা হয় আমার।মেয়েটার নাম করুণা।মেয়ের নাম দেওয়ার ক্ষেত্রে ওর বাড়ির লোক সত্যিই বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে বলতে হয়,বা এমনও হতে পারে নামটার সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন ওঁরা।মেয়েটা এতটাই ভীরু যে বাড়ির লোক সম্বন্ধ পাকা করে ফেলল,তবুও ভয়ের চোটে কৌশিকের 'ক'ও উচ্চারণ করতে পারেনি বাড়িতে।ওরা উত্তর কলকাতার বনেদী পরিবার,ওদের পরিবারে কারোর নাকি সাতজন্মে লাভ ম্যারেজ হয়নি,এটা ঐতিহ্যবিরোধী। তাই অমন দালান বাড়ির কড়িকাঠের করুণায় মানুষ হওয়া করুণা বেচারা বাড়ির পছন্দে অন্য এক বনেদী বাড়ির ছেলেকে বিয়ে করে ফেলল,আর কৌশিক বেচারা তখন প্রথম প্রেমের হতাশায় অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল,হঠাৎ একটা হাত নাকি ওকে মাঝনদী থেকে একেবারে হ্যাঁচকা টানে নদীর পাড়ে এনে তুলেছিল,সেই হাতটা নাকি আর কারোর নয়,স্বয়ং আমার!এটাই মনে করে কৌশিক। প্রথম যেদিন আমায় এসব বলেছিল,আমি তো হেসে গড়াগড়ি। নিজেই সাঁতার জানি না,আবার অন্যকে তুলব!তখন ও বলেছিল,এই বিপদ থেকে উদ্ধার কোনো ডুবুরি করতে পারে না,পারে একজন বন্ধু,সত্যিকারের বন্ধু, আর ওর জীবনে সেই বন্ধুটা আমি।ও হ্যাঁ যেটা বলছিলাম,ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে কখন যে বর্তমানটাকে গুলে খেয়েছি খেয়ালই নেই।আজ ওর বিয়ে।এবার ও যাকে পছন্দ করেছে সে একেবারে করুণার উল্টো।মণিদীপা।স্মার্ট মেয়ে,কথার পিঠে কথা,আর কোনোকিছু পছন্দ না হলেই স্থান-কাল-পাত্র ভুলে মুখের ওপর তর্ক করা।আসলে করুণার কাছ থেকে ধাক্কাটা খেয়ে ও পণ করেছিল,বিয়ে করলে একেবারে ওর বিপরীত চরিত্রের মেয়েকেই করবে।মণিদীপার কথা জানতে যখন পেরেছিলাম,কি লেগপুলটাই না করেছিলাম বেচারাকে।হয়তো কাজের পর কোনো রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে গেছি,কৌশিকের ফোনটা বেজে উঠেছে,আমি সবার মাঝেই জোরগলায় বলে উঠলাম,মণির ফোন নাকি রে?ও বাবা,বাবুর কি রাগ!সে কথাই বলল না রাগে আমার সাথে দু-তিনদিন।পরে অবশ্য নিজেই আবার সরি বলে কথা বলতে এল।দরটা একটু বাড়ালাম নিজের,'হুঁঃ,আমি ছাড়া আর তো পাত্তা পাস না কারোর কাছে,তাই আমার কাছে ফিরে না এসে তোর আর গতি কি?'আবার মিটমাট হয়ে গেল,ও আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে গেছে এখন।আজ ওর বিয়ে,আর আমি ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু,তাই বিয়ের দুদিন আগে থেকে ওর বাড়ি গিয়ে হাজির হয়েছি,বাবাকে ছোটবেলায় হারিয়েছে,বিধবা মা একা আর কতদিক সামলাবেন,তাই আমি এসেছি,আর সেই সঙ্গে কৌশিককে জ্বালাতেও।বেচারাকে এসে থেকে এত ডিস্টার্ব করছি যে একটু শান্তিতে মণির সাথে ফোনে কথাও বলতে পারছে না।

- 'এই শয়তান,কেন এলি রে তুই?এরকম করলে কিন্তু....'

- 'কি করবি তুই,কি করবি বল?হুঁঃ,তোর মুরোদ কত জানা আছে আমার!'

- 'বাড়ি থেকে বের করে দেব কিন্তু বলে রাখলাম!'

- 'তাই নাকি!তুই কে রে আমায় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার?এটা আন্টির বাড়ি।বেশি বকলে আন্টিকে বলে তোকেই বের করে দেব,তখন বুঝবি মজা!'

- 'সত্যি,কোথা থেকে একটা শাঁকচুন্নী জুটেছে আমার ঘাড়ে,একমুহূর্তও শান্তি দেবে না!'

- 'না,দেব নাই তো।কেন দেব?উফ্,তোকে বিরক্ত করার মজাই আলাদা!'

- 'সত্যি,কি করে যে মুক্তি পাই তোর  কাছ থেকে!'

- 'অত সোজা নয় বস।'

দেখতে দেখতে বিয়ে হয়ে গেল।বাসররাত।কৌশিকের একপাশে মণি,আর অন্যপাশে আমি বসেছি ওকে লেগপুল করার জন্য।উফ্,বাসররাতে লেগপুলিং এর মজাই আলাদা!সেই কবে থেকে অপেক্ষা করছি এই সময়টার জন্য!

হাসিমজা করে সে রাতও কাটল।এরপর সকাল হল,কনের শ্বশুরবাড়ি যাবার পালা।মণি খুব কাঁদছিল,আমি ওর হাতদুটো ধরে বললাম,'কেঁদো না মণি,তোমার আগে থেকে আমি ওকে চিনি।খুব ভালো ছেলে ও।খুব সুখী রাখবে তোমায়।'এই কথা শুনে মণির কান্না থেমে গেল,আর আমায় যা বলল তা আমার কল্পনার অতীত ছিল,

'দেখ তুমি ওর কেমন বন্ধু তা আমি জানি না,জানার আগ্রহও নেই,কিন্তু একটাই কথা জানি যে আমি ওর স্ত্রী, আজ থেকে আমি ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু,তাই আর কোনো দ্বিতীয় বন্ধুর প্রয়োজন নেই ওর,সো প্লিজ ডিস্ট্যান্স মেনটেন করো ওর থেকে,ইউ আর নট মোর ইম্পরট্যান্ট টু হিম দ্যান মি!'

সত্যিই হতভম্ব হলাম আমি।ও মুখরা আমি জানতাম,তাই বলে!আর কথা বাড়ালাম না আমি,চুপচাপ বেরিয়ে এলাম আমি,কৌশিক কত ডাকাডাকি করল আমায়,কানেই তুললাম না।এতবড় একটা আঘাতের জন্য সত্যিই তৈরি ছিলাম না যে!আর কৌশিকের বাড়ির দিকে গেলাম না,সোজা নিজের বাড়ি ফিরে এলাম।কৌশিক কতবার ফোন করল আমায়,রিসিভ করিনি।পরেরদিন সকালে সোজা কৌশিক আমার বাড়ি এসে হাজির।বলল,'দেখ,তোকে তো বলেইছিলাম মণি একটু ওরকমই।কিন্তু ও কাল যেটা করেছে সেটা খুব অন্যায়।তাই ওর হয়ে আমি এসেছি তোকে সরি বলতে,প্লিজ চল তুই।'

আমি কিছুতেই যাব না,আর কৌশিকও ছাড়বে না।শেষে বলে বসল,'তুই যদি না যাস আমিও ফিরব না আর।এখানেই বসে রইলাম,তোকে না নিয়ে যাব না।'

- 'পাগলামো করিস না কৌশিক।আজ তোর বাড়িতে ভাত-কাপড়ের অনুষ্ঠান, আমার জন্য ফিরবি না এটা কি বলছিস!মণি তো আরও ভুল বুঝবে আমায়!'

- 'বুঝুক,ওর যা ইচ্ছা হয় তাই ভাবুক।কিন্তু তুই যাবি এটাই শেষ কথা,চল।'কৌশিক একরকম জোর করে টানতে টানতে নিয়ে গেল আমায়।'

অথচ গিয়ে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম আমি।এ যেন একদম অন্য মণি।কত ভালোভাবে কথা বলল আমার সাথে,আগের দিনের ব্যবহারের জন্য সরিও বলল।আর আমিও সবটা ভুলে গেলাম।কৌশিক এসে বলল,'কি রে,বলেছিলাম তো।'

আমি মাথা নাড়লাম,কৌশিক আমার বন্ধু,ও সুখী হোক এটাই চেয়েছি সবসময়। 

সকাল থেকে দুপুর,দুপুর থেকে সন্ধ্যে,সন্ধ্যে থেকে রাত্রি।হাসিমজা আর পেটপুজো করে বাড়ি ফেরার তাল করছি,হঠাৎ মণি পিছু ডাকল আমায়,দাঁড়িয়ে গেলাম,শুধু আমি আর মণি ছিলাম সেখানে,আর কেউ ছিল না।

- 'বলো।'

- 'আচ্ছা বলছি তোমার বোধহয় লজ্জা-সম্ভ্রম ব্যাপারটা একটু কম তাই না?'

অবাক হয়ে কিছু বলার আগেই ও বলল,'না না আজ তুমি কিছু বলবে না,শুধু আমি বলব আর তুমি শুনবে।যেদিন থেকে আমার সম্পর্ক কৌশিকের সাথে,সবসময় খালি তোমার কথা,ও তোমার ব্যাপারে এত কথা জানে বোধহয় আমার ব্যাপারেও জানে না!এত নির্লজ্জ কেন তুমি?ও বিবাহিত, আর আমি ওর স্ত্রী, আর আমি চাইনা ওর জীবনে তোমার ছায়া পড়ুক,প্লিজ দূরে থাকো ওর থেকে।নেহাত ও বকাবকি করল তাই তোমায় লোকদেখানো সরি বললাম।কিন্তু তুমি সরে যাও একবার,দেখবে ঠিক ও ভুলে যাবে তোমায়।'

আর হাসি বাগ মানল না আমার।'যাকে ভালোবাসো বলে দাবি করো তার ওপর এত অবিশ্বাস! আমার কাছ থেকে ভিক্ষা চাইছ নিজের স্বামীকে,আর আমাকেই নির্লজ্জ বলছ!ঠিক আছে,আমি আর কোন যোগাযোগ রাখব না তোমার বরের সাথে,প্রমিস।তুমি তাকে বেঁধে রেখো আঁচলে। আসি।'

আমার প্রমিস রেখেছিলাম আমি।ওকে ব্লক করে দিয়েছিলাম। ওকে এভয়েড করব বলে অন্য চাকরি জয়েন করলাম।বাড়িও এসেছিল,তাড়িয়ে দিয়েছি বুকে পাথর চাপা দিয়ে। বারবার জিজ্ঞেস করেছিল,কি হয়েছে?মণি কিছু বলেছে?

আমি কিচ্ছু বলিনি,চেয়েছি ও সুখী হোক,তাই মণির ব্যাপারে কিছুই বলিনি।শুধু এটাই বলেছিলাম,তুই চলে যা।আমি তোকে চিনি না।

কৌশিক খুব কষ্ট পেয়েছিল এত ভালো বন্ধুটার কাছ থেকে এমন ব্যবহার পেয়ে।কিন্তু মণিকে দেওয়া কথাও যে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আমি,তাই ওকে তাড়িয়ে দিলাম,সে রাতে না খেয়ে শুতে চলে গেলাম আমি,ঘুম আসছিল না।চিন্তায় ছিলাম,ভালোবাসি বলে যাকে বিয়ে করেছে কৌশিক, সে আদৌ ভালো রাখতে পারবে তো কৌশিককে?নানা উদ্ভট চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমের রাজ্যে চলে গেছি খেয়ালই নেই।

এত অপমানের পরও কৌশিক হাল ছাড়েনি,রাস্তায় দেখা হলেই আমার পথ আটকে জানতে চাইত,কি হয়েছে?প্রকৃত বন্ধু হয়তো এমনই হয়। দাঁতে দাঁত  চেপে চোখের জল আটকেছি,কিছু না বলে চলে এসেছি পাশ কাটিয়ে।

সপ্তাহখানেক পরের ঘটনা।অফিসে গিয়েই আমি হতবাক।কৌশিকও পুরোনো অফিস ছেড়ে এই নতুন অফিসে জয়েন করেছে।মুখোমুখি হলাম আমরা আবার।ও বলল,'কি রে একদিন যে বলেছিলি আমি তাড়িয়ে দিলেও তুই আমার ঘাড়ে চেপে থাকবি আর আমায় জ্বালাবি।আমি নাকি কোনোদিন তোর থেকে মুক্তি পাব না!এত তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে পড়লি?'

চোখের জল বোধহয় আর ধরে রাখতে পারব না,তাও মুখ ঘুরিয়ে শেষ চেষ্টা করলাম,কিন্তু কৌশিকের চোখ এড়াল না ব্যাপারটা।বলল,'আমি খুব ভালো করেই জানতাম এসব তুই নিজের ইচ্ছায় করছিস না।কমদিন তো চিনি না তোকে।আর যে তোর কষ্টের কারণ, তাকে সারাজীবনের মতো ছেড়ে এসেছি, এই দেখ',একটা কাগজ বের করে দিল আমার হাতে।

- 'এ তো ডিভোর্স পেপার। তুই মণিকে...'  

- 'হ্যাঁ রে।যে বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে পারে না,সারাক্ষণ অবিশ্বাস করে,সে আর যাই হোক,আমার স্ত্রী হতে পারে না।তাই ছেড়ে এসেছি ওকে।হ্যাঁ জানি সবাই বলবে আমি চরিত্রহীন,তোর জন্য নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে দিলাম।কিন্তু সমাজ এটা কিছুতেই বিশ্বাস করবে না যে আমরা বন্ধু,আমরা সত্যিই ভালোবাসি একে অপরকে, কিন্তু ভালো বন্ধু হিসেবে,কারণ আমরা যে বিপরীত জেন্ডারের,তাই আমাদের বন্ধুত্ব কেউ সোজা চোখে দেখে না।সে নাই দেখুক,আমরা তো জানি একে অপরের জীবনে আমরা কতখানি ইম্পরট্যান্ট। মণি স্মার্ট, আধুনিক,কিন্তু সত্যিই আধুনিক?সত্যিই স্মার্ট? আমার তো মনে হয় না।আজ যদি তুই ছেলে হতিস তাহলে তো এত কথা উঠত না।তুই মেয়ে,তাই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হতে পারিস না?কেন?করুণার বিয়ের পর যখন আমার বাঁচার ইচ্ছে চলে গিয়েছিল,সেদিন তুই আমার পাশে ছিলি,কোথায় ছিল সেদিন মণি?আমার জ্বর হলে কেউ যায়নি আমার বাড়ি খোঁজ নিতে,কিন্তু তুই যেতিস,সেদিন মণি কোথায় ছিল?আমি যখন প্রোপোজ করি ওকে,প্রথমে ও রাজি হয়নি,তুই বুঝিয়েছিলি ওকে,অকৃতজ্ঞটা সব ভুলে গেছে।তোকে ও অপমান করেছে,অসম্মান করেছে,তাই আমার জীবনে ওর কোনো জায়গা নেই।'

- 'কিন্ত কৌশিক..... '

- 'কোনো কিন্তু নয়।আচ্ছা আমরা এভাবেই বাঁচতে পারি না সারাজীবন?ভালো বন্ধু হিসেবে?দেখ আমরা একে অপরকে যতটা ভালো করে চিনি,জানি তেমনটা আর কেউ পারবে না।থাকি না এভাবে আমরা সারাজীবন বন্ধু হিসেবে,এভাবে লেগপুল করে হেসেখেলে,সমাজকে তোয়াক্কা না করে।থাকতে পারিনা বল?'

কিছু বললাম না আমি।মৃদু হেসে ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম।

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ