Advertisement

চরিত্রহীন

 


চরিত্রহীন

সুচন্দ্রা_চক্রবর্তী


কে বলেছে ভালো শুধু একজনকেই বাসা যায়?একাধিক মানুষকে বুকে আগলে রাখলেই বুঝি সে চরিত্রহীন বদনামে কলঙ্কিত হয়!

১) মানুষটি অকৃতদার, চাকরির চেষ্টা করেছেন বহু,কিন্তু প্রতিবারই বিফল মনোরথ হয়েছেন।চল্লিশের থেকে একটু কমই বয়স হবে,টিউশনের ছাত্রছাত্রীরাই তাঁর সংসার,বাবা গত হয়েছেন কবে,আর সৎমাও বেকার বোঝা সৎ ছেলেকে সংসারে রাখতে নারাজ।কলেজ জীবনের প্রেমিকাও টাটা বাই বাই করে অফিসার পাত্রকে বিয়ে করেছে দিব্যি,ভুলে গেছে এই মানুষটিই একদিন রক্ত দিয়ে তাকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন।বিবাহিত মেয়েটিকে আজও তিনি একইরকম ভালোবাসেন,কিন্তু ঘৃণাও করেন সমপরিমাণে।তাই ঝড়ের শেষে পাতাঝড়া রাতে বকুলফুল কুড়ানো আলুথালু সোঁদাগন্ধ ভালোবাসা কল্পনায় জন্ম নেওয়া মেয়েটির মধ্যে আর তাকে খোঁজেন না,খোঁজেন ভুলোমনা এলোমেলো ছাত্রীটিকে,যে তাঁর কাছে বাংলা পড়তে আসার সময় ভুলে ভূগোল খাতা নিয়ে চলে আসে,চার বছর বয়সে হারানো মাকে খুঁজে পান ওই মেয়েটার মধ্যে,যে হাত পুড়িয়ে রান্না করে নিয়ে আসে তাঁর জন্য,তিনি রেগেও যান মাঝেমধ্যে, তবুও তার কি শিক্ষা হয়!কবিতা লিখতে ভালোবাসা মেয়েটা,যে নোট লেখার সময় লুকিয়ে কবিতা লেখে,কতবার কানমলাও খেয়েছে,অজান্তেই তার মধ্যে 'লাবণ্য'কে খুঁজে পান হয়তো,বারবার ফেল করেও হাল না ছাড়া মেয়েটির মধ্যেও বিজয়িনীকে খুঁজে পান,স্বভাবে শান্ত মেয়েটাও যখন ইভটিজারের গালে সপাটে চড় মারে,মহালয়া শুনলে হয়তো  ওই শান্ত কিন্তু দৃঢ় মেয়েটার মুখ মনে ভেসে ওঠে।

না,ভুল ভাবছেন,কাউকেই প্রোপোজ করার প্রয়োজন হয়নি,বা ভ্যালেন্টাইনস ডের দিন একগুচ্ছ গোলাপের,কিন্তু সকলেই তাঁর সেই হারানো নারীদের অভাব পূরণ করেছে উপচে।কিন্তু তিনি কি চরিত্রহীন? কালই ওদের বিয়েতে তিনি হয়তো আশীর্বাদ করবেন প্রাণভরে,চোখের কোণে জল নিয়ে।

হয়তো তাঁর শেষদিনেও ওরা সকলে ছুটে আসবে,কেউ কাঁদবে,কেউ বুকে পাথর চাপা দেবে।কেউ হয়তো সেদিন রাগী বদমেজাজি শাশুড়ি, কেউ বৃদ্ধাশ্রমের এককোণে বাস করা বিধবা,কেউ হয়তো সেদিনও আইবুড়ো,কারণটা হয়তো তার চোখের প্রতিটি উষ্ণ শিশিরবিন্দু জানে।তাদের মাস্টারমশাই শেষবারের মতো চোখ বোজার আগে সফল প্রেমিকাকে দেখে যাবেন।হ্যাঁ,একজন প্রেমিকার সবকটা গুণ বুকে বেঁধে নেবেন শেষবারের মত। কবিতার প্রিয়তমার সব স্বভাব যে তারা সকলে মিলে পূরণ করেছে,বিন্দু দিয়ে সমুদ্রের মত মনটাকে সিন্ধুর মত ভরেছে।তিনি প্রেমিক নন?নাকি তারা প্রেমিকা নয়?কে চরিত্রহীন বা চরিত্রহীনা?

২) ডিভোর্সি মেয়েটা,নাম আর নাই বা জানলেন,সোশ্যাল ওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার অপরাধে স্বামীর অত্যাচার চরমে ওঠে,তাই ডিভোর্স। যদিও সমাজ অবশ্য.....থাক না ওসব।ওই যে প্রতিবন্ধীদের থাকার জন্য হোস্টেলটা,প্রতি সপ্তাহে যায়,বাবা-মা রাও বোঝাগুলোকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান না,পোশাক-খাবার খরচ তো সবই ওই 'ডিভোর্সি' মেয়েটাই দেয়,জন্মদিনে নিজের হাতে কেক-পায়েস বানিয়ে আনে কে?কে আবার,ওদের প্রেমিকা।বেশিরভাগই জন্মগত প্রতিবন্ধী নয়,মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার, একসময় রোজ ট্যাগ করা প্রেমিকারা আজ ঠেলে দিয়েছে ব্লক লিস্টে।মেয়েটা,যে আজ সবার চোখে চরিত্রহীন, কিন্তু গ্লুকোমায় অন্ধ হওয়া ছেলেটা ওর নূপুরের আওয়াজে হেসে ওঠে,জন্ম কালা মধ্যচল্লিশের মানুষটা বোবা মনে গাল দেয় মেয়েটার অত্যাচারী অকালকুষ্মাণ্ড স্বামীকে,খোঁড়া যুবক সন্ধ্যের শাঁখের শব্দের পর ফুচকা আনতে ভোলে না মেয়েটির জন্য,ওর হারানো দিদিকে খুঁজে পেয়েছে যে মেয়েটার মধ্যে।কি?ওরা সবাই চরিত্রহীন? না মেয়েটা কলঙ্কিনী?

না,ওদের সকলের মধ্যে মেয়েটা ওর স্বপ্নে দেখা রাজপুত্রকে খুঁজে পেয়েছে,এটাই ওর পরম পাওয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ