Advertisement

শিউলি বৌ



শিউলি বৌ

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী 


সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা, কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই।বাদলা হাওয়ায় সোঁদা মাটির গন্ধ ভেসে আসছিল।আমি যে জায়গার কথা বলছি সেখানে আজও বর্ষাকালে ব্যাঙ ডাকে,বাদলা হাওয়ায় গায়ের লোম খাড়া হয়,দূরের বাঁশবাগান থেকে ভেসে আসে মচমচ শব্দ। মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙে,পাখিরা বাসা ছেড়ে বেরোয়,কাঠবেড়ালিরা লুকোচুরি খেলে।এদিকের পশ্চিমপাড়ায় বড়ো বড়ো দোতলা-তিনতলা দালান বাড়ি চোখে পড়লেও এপাড়া  ছেড়ে কিছুটা বেরিয়ে বড়োদীঘির পাশ দিয়ে লালমাটির রাস্তা বরাবর হাঁটলেই দেখা যায় অনেক খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘর।সে ঘরের পুরুষরা ভোরে উঠে কেউ কাঠ কাটতে,কেউ চাষ করতে,কেউ বা জাল দিয়ে মাছ ধরতে বেরোয়।ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা মাটির দাওয়ায়  রঙচঙে বইগুলো নিয়ে পড়তে বসে,আর মা যেই চোখের আড়াল হয়,অমনি বই ফেলে ছুট দেয় দক্ষিণের বড়ো মাঠটার দিকে।গ্রামের বারোয়ারি পুজো থেকে শুরু করে গাজন সমস্ত অনুষ্ঠান-পুজো-মেলা ওই মাঠেই হয়।গ্রামের নাম শিউলিতলা। এমন নামের পিছনেও হয়তো কোনো কারণ আছে।গ্রামের মানুষরা মনে করে,নীল আকাশের কোলে যখন পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ আঁকিবুঁকি কাটে,তখন লালরাস্তার দুপ্রান্তে বেড়ে ওঠা শিউলিগাছগুলো তাদের ফোটানো ফুলগুলো দিয়ে রাস্তার লাল রংকে একেবারে ঢেকে দেয়,তাই এমন নাম।গাছপালা-পশুপাখি-মানুষের সহাবস্থান এই গ্রামে আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও স্নেহ-ভালোবাসার কোনো অভাব ছিল না।আনন্দেই কাটছিল সকলের জীবন।

  হঠাৎ এই নির্বিঘ্ন জীবনযাত্রায় বড়োসড়ো বিঘ্ন ঘটল।একদিন হঠাৎ দেখা গেল,দক্ষিণের ওই বড়ো মাঠটায় বাঁশ-খুঁটি পোঁতা হচ্ছে।প্রথম প্রথম ব্যাপারটায় কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি।হঠাৎ একদিন কুমুদ যখন তার বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলে স্কুল থেকে ফিরছিল, মাঠের আলপথ ধরে,তখন হঠাৎ দেখে একটা বড়ো গাড়ি এসে থামল।গাড়ি থেকে নেমে এলেন কয়েকজন কোট-প্যান্ট পড়া শহুরে বাবু।দেখলেই বোঝা যায়, এঁরা থাকেন রাতকে দিন করা পথবাতির আলোয় সেই আকাশের নীচে,যেখানে গাঢ় অন্ধকারে তারার ঝিকিমিকি চোখে তেমন স্পষ্টভাবে পড়ে না,শুধু হালকা রক্তিম একটা  ধোঁয়াশায় নিমজ্জিত আকাশ দেখা যায়।কুমুদরা দেখে,তাঁরা হাতে কিসব কাগজপত্র এনেছেন,আর নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করেছেন।ছোটো থেকেই কুমুদের বড়ো বেশি কথা বলা স্বভাব, সে ছুটে গিয়ে তাঁদের জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কারা?এই গ্রামে তো দেখিনি কখনো? কি করছ তোমরা এখানে?'

 বাবুদের মধ্যে থেকেই একজন একটু কমবয়সী লোক এগিয়ে এসে বললেন,'খুকুমণি, এই মাঠে নতুন ফ্ল্যাট উঠবে।'কুমুদের মামার বাড়ি শহরে,তাই ফ্ল্যাট সে আগেও দেখেছে।বলল,'ও,সেই যে উঁচু উঁচু বাড়িগুলো, যাতে আকাশ ঢাকা পড়ে যায়?'

-'হ্যাঁ গো খুকু, তাই।'তিনি হেসে বললেন।

 কুমুদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে একমনে কি যেন ভাবল,তারপরেই ছুটে চলল বাড়ির দিকে। তার বন্ধুরাও কিছু বুঝতে না পেরে তাকেই অনুসরণ করল।পশ্চিমপাড়ায় ঢুকেই দুটো দোতলা বাড়ি আর কালীমন্দিরটা পেরিয়েই যে তিনতলা দালানবাড়িটা, ওটাই কুমুদের বাড়ি।গ্রামের সকলে চৌধুরী বাড়ি বলে চেনে।ওদের পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন।এই মন্দিরও ওদেরই প্রতিষ্ঠা।এখন আর জমিদারি নেই বটে,তবে গ্রামটাকে একসূত্রে গেঁথে রাখার পিছনে ওই পরিবারের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।জমিদারি না থাকলেও বড়ো ব্যবসা আছে এখন ওদের।

 ব্যাগটা খাটে ছুড়ে ফেলে কুমুদ চিৎকার করে ডাকতে লাগল,'মা!ও মা!'

 কঙ্কনা তখন রান্নাঘরে ছিল।বেরিয়ে এসে বলল,'কি হয়েছে?এমন করে ডাকছিস কেন?'

- 'মা জানো,ওই দক্ষিণের বড়ো মাঠটায় উঁচু উঁচু বাড়ি উঠবে।তাহলে আমরা খেলব কোথায় মা?'

- 'সেকি রে!কদিন আগে বাঁশ-খুঁটি পুঁততে দেখে সন্দেহটা হয়েছিল বটে।'

প্রকাশ পাশের ঘরে ছিল।মেয়ের চিৎকারে বেরিয়ে এল।বলল,'দেখলে কঙ্ক,শহরের মানুষগুলোর আসল উদ্দেশ্য? '

- 'হ্যাঁ দেখলাম, কিন্তু এতো হতে দেওয়া যায় না।ওই মাঠকে ঘিরেই তো সব এই গ্রামের।ওটাই থাকবে না?'

- 'ঠিক বলেছ কঙ্ক,কিছু একটা করতেই হবে।'

 প্রকাশের মা সান্ত্বনা পুজো দিতে গিয়েছিলেন।ফেরার পথে কুমুদের বন্ধুদের মুখে সব শুনেছেন।বললেন,'সত্যি,এ বড়ো অন্যায়। মাঠটা চলে গেলে গ্রামটাতো মরে বেঁচে থাকবে!'

- 'ঠিক বলেছ মা,আমি যাব ওদের সাথে কথা বলতে।'প্রকাশ বলল।

- 'শুধু তুমি না,আমিও যাব।'কঙ্কনা বলল।

- 'মা আমিও যাব।'আবদার করে বসল বড়ির নয়নের মণি কুমুদ।

- 'না মা,ওখানে ছোটোরা যায় না।'

- 'কেন মা,কি হয়েছে গেলে?'

- 'জেদ কোরো না কুমু।মায়ের কথাটা শোনো।'

মা-বাবার বারণে শেষ পর্যন্ত নিরস্ত হল কুমুদ।কঙ্কনা আর প্রকাশ বেরিয়ে পড়ল।তখন শিউলিতলায়  সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশ মেঘলা থাকায় ছাতা নিয়েই বেরিয়েছে।বৃষ্টি না হলেও বাদলা হাওয়ায় বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল। প্রকাশ কঙ্কনাকে বলল,'তোমার তো ঠাণ্ডার ধাত,ঠাণ্ডা হাওয়ায় মাথা ধরে।তুমি না এলেই পারতে।' 

কঙ্কনা হেসে বলল, 'আমায় নিয়ে ভাবতে হবে না আপনাকে প্রকাশবাবু।কিচ্ছু হবে না আমার।চলুন আপনি।'

- 'আচ্ছা বেশ,চলো।'

মাঠে পৌঁছে ওরা দেখল কোনো শহুরে বাবুটাবু নেই কোথাও।শুধু কয়েকটা লোক এসে জমিটাকে মাপজোক করছে।কঙ্কনা এগিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল,প্রকাশ ওর হাতটা ধরে বলল, 'না কঙ্ক,এদের বলে কোনো লাভ নেই।এরা অধস্তন কর্মচারী। এরা সবটাই উর্ধ্বতনের আদেশ মেনে করছে।ওদের উর্ধ্বতনকেই ধরতে হবে।'

- 'মানে ওই শহরের লোকগুলো, কুমুদ যাদের গাড়ি থেকে নামতে দেখেছিল?'

- 'হ্যাঁ,ওরা।তুমি একটু দাঁড়াও,আমি আসছি।'

- 'কোথায় যাচ্ছ?'

- 'ওদের সাথে কথা বলে জানতে যাচ্ছি কে ওদের ওপরওয়ালা।'

- 'আমিও যাব,আমায় একা রেখে যাওয়া হবে না তোমার।'

- 'ঠিক আছে বাবা,চলো।'প্রকাশ হেসে কঙ্কনার হাতট ধরে এগিয়ে গেল লোকগুলোর দিকে।

- ' বলছি দাদা,একটু শুনবেন?'প্রকাশ বলল।

লোকগুলোর মধ্যে থেকেই একজন বেরিয়ে এসে বলল,' আমাদের বলছেন?''

- 'হ্যাঁ হ্যাঁ,আপনাদেরই বলছি।'

- 'হ্যাঁ বলুন।'

- 'আচ্ছা এখানে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠবে তাই না?'

- ' হ্যাঁ দাদা,তবে আগেই বলে রাখি যদি বুকিং করতে চান তো আমাদের বলে কোনো লাভ নেই।স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।'

- 'কিন্তু আপনাদের স্যার কই?তাঁকে কোথায় পাব?'

- 'একটু দাঁড়ান,'লোকটা বুকপকেট থেকে একটা কার্ড বের করে বলল,'এই নিন স্যারের কার্ড।ওতেই ফোন নাম্বার আছে।'কার্ডটা প্রকাশের হাতে দিল লোকটা।

- 'ও আচ্ছা,অনেক ধন্যবাদ, চলি।'প্রকাশ আর কঙ্কনা চলে এল।

- 'কঙ্ক,আজ সন্ধ্যে হয়ে এসেছে।এই ঠাণ্ডা হাওয়ায় বেশিক্ষণ বাইরে থাকা তোমার জন্য ভালো নয়।আজ ফিরে যাই।কাল সকালে যাবো ওই স্যারের সঙ্গে কথা বলতে।'

- 'আমার কিচ্ছু হবে না প্রকাশ। দেখ এটা গোটা গ্রামের ভালোমন্দের ব্যাপার।একমুহূর্তও দেরি করা ঠিক নয়।আজই যাব আমরা।এখনই।চলো।'

- 'ঠিক তো,কোনো অসুবিধা হবে না তো?'

- 'না,চলো এক্ষুণি।'

- 'আচ্ছা,তবে আমি কার্ডে দেওয়া এই নম্বরটায় ফোন করে দেখি।'

- 'হ্যাঁ।'

 মোবাইলটা রেখে দিয়ে প্রকাশ বলল,'বুঝলে কঙ্ক,ওই স্যার ফোন ধরেছিলেন। দক্ষিণের মাঠটা থেকে আধকিলোমিটার হাঁটলে যে বড়ো রাস্তাটা পড়ে,জাতীয় সড়ক,ওই রাস্তার ওপারেই একটা হোটেল রেশমিতে ওঁরা উঠেছেন।'

- 'ও রেশমি? সেই বিয়ের পর আমাকে নিয়ে গিয়েছিলে, সেই হোটেল কাম রেস্তোরাঁটা?'

- 'হ্যাঁ গো,তোমার মনে আছে?সেতো আজ এগারো বছর আগের কথা।'

- 'মনে থাকবে না আবার?সেই দিনগুলোয় ভুল করেছিলাম,তাই.....'

- 'থাক না।সে ভুল তো অনেক আগেই শুধরে নিয়েছ। আর ভুল তো মানুষ মাত্রেই করে থাকে।আর তুমি তখন ছেলেমানুষ ছিলে।'

 কঙ্কনা কিছু বলতে পারে না।শুধু নীরবে ভেজামাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।প্রকাশ ওর গালে হাত দিয়ে মুখটা তুলতেই অবাক।

- 'কাঁদছ কেন কঙ্ক?সেদিনের কথা মনে করে?সত্যি তুমি এখনো ছেলেমানুষই রয়ে গেলে।'

- 'কত কষ্ট দিয়েছি আমি তোমাদের সবাইকে.....'

 প্রকাশ কঙ্ককে বুকে টেনে নিয়ে বলে, 'তাতে কি হয়েছে?তুমি তো ইচ্ছা করে কিছু করোনি,তোমার তো দোষ ছিল না।তোমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে তার জন্য তো তুমি দায়ী নও।আর তুমি যা করেছিলে তোমার জায়গায় যেকোনো মেয়ে থাকলে তাই করত।'

- 'কিন্তু.... '

- 'না,আর নয়।এই ঠাণ্ডা হাওয়ায় কান্নাকাটি করে আবার জ্বর বাধিয়ো না।তাহলে কিন্তু আর নিয়ে যাব না এখন রেশমিতে।'

- 'না না,আর কাঁদব না।চলো চলো। '

 ওরা রেশমিতে গেল।শহুরে বাবুদের মধ্যে কমবয়সী যে মানুষটি,তিনিই সকলের মধ্যে উচ্চপদস্থ। তাঁকেই সকলে স্যার বলে সম্বোধন করছিলেন।কঙ্কনারা হোটেলে যেতেই ওঁরা বললেন, 'আপনারাই দেখা করতে চান স্যারের সাথে?'

- 'হ্যাঁ।'

- 'ওকে থ্যাঙ্ক ইউ।চলো কঙ্ক।'

 দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল প্রকাশ আর কঙ্ক।মানুষটি তখন একমনে মুখ গুঁজে একটা ফাইল দেখছিলেন।প্রকাশ ডাকল,'মিস্টার সেন!'

মিস্টার সেন মুখ না তুলেই বললেন,'ফ্ল্যাট বুকিং করবেন তো?'

- 'না না,ফ্ল্যাট বুকিং নয়,অন্য দরকারে এসেছি আপনার কাছে।'

এবার মিস্টার সেন মুখ তুললেন।বললেন,'অন্য দরকার?আমার কাছে?কিন্তু আপনি তো ফোনে বললেন....'

আর বলতে পারলেন না মিস্টার সেন।মনে হল তাঁর পায়ের তলা থেকে বুঝি মাটি সরে গেল,আর তিনি তলিয়ে গেলেন ঘনগভীর অন্ধকারে।

কঙ্কনারও একই অবস্থা। একসময়ের অত্যন্ত প্রিয় চেনা মুখ দেখে সে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।বুকের মধ্যে এক তীব্র জ্বালা তাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিল।প্রকাশের প্রেম-যত্নে যে জ্বালা প্রশমিত হয়েছিল,নতুন আঘাতে তা যেন আবার রক্তাক্ত হল।কঙ্কনার মনে হল,হে মাটি,দ্বিধাবিভক্ত হও,আর আমাকে লুকোতে দাও তোমার ওই গভীর কালো কুয়াশাচ্ছন্ন বুকে।

 কারোর মুখে কথা সরে না।প্রকাশ বলতে লাগল,'হ্যাঁ ফোনে বলেছিলাম।কারণ তা না হলে আপনার কর্মচারীরা কি আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে দিতেন?'

 কঙ্কনা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।তার সংজ্ঞাহীন দেহটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।প্রকাশ ছুটে এসে কঙ্কনার মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে চিৎকার করতে লাগল,'কঙ্ক!কি হল!চোখ খোলো!কে কোথায় আছেন প্লিজ কেউ জল দিন না!'

 প্রকাশের চিৎকারে মিস্টার সেনের সম্বিৎ ফিরল।তিনিও ছুটে বাইরে গেলেন জলের ব্যবস্থা করতে।জল আনার পর প্রকাশ কঙ্কর চোখেমুখে জল ছিটিয়ে দিতে লাগল।

 মিস্টার সেন বললেন,'খুব ভালোবাসেন আপনার স্ত্রীকে,তাই না?'

- 'দেখুন না,এমনিতেই ঠান্ডা হাওয়া লাগলে ওর শরীর খারাপ হয়।এইজন্যই ওকে আনতে চাইনি।'

 মিস্টার সেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,'জানি,ওর মাইগ্রেনের প্রবলেম আছে।'

প্রকাশ অবাক হয়ে বলল,'হ্যাঁ,কিন্তু আপনি কি করে জানলেন? '

মিস্টার সেন বললেন,'আমি অনেকদিন আগে একজনকে চিনতাম,তারও মাইগ্রেন ছিল।তাই ওরোগের  লক্ষণ আমার জানা।'

- 'ও আচ্ছা।'

যদিও কঙ্কনার জ্ঞান হারানোর কারণটা মিস্টার সেনের থেকে ভালো কেউ জানে না।

অনেক কষ্টে কঙ্কনা যখন চোখ মেলে তাকালো,প্রকাশের সেই আশঙ্কিত মুখটা চোখে পড়ল।কঙ্কনার জ্ঞান ফেরায় প্রকাশ আশ্বস্ত হল,'কঙ্ক!কেমন লাগছে এখন শরীরটা?'

কঙ্কনার চোখে জল এল।প্রকাশের হাতদুটো চেপে বলল,'আমায় প্লিজ বাড়ি নিয়ে চলো না!'

- 'দেখলে কেমন শরীরটা খারাপ করল?এইজন্যই আনতে চাইনি।চলো,বাড়িতে গিয়ে কিন্তু কমপ্লিটলি রেস্ট নেবে।'

মিস্টার সেনের মুখে তখনো কোনো কথা নেই।ব্যাপারটা সামাল দেওয়ার জন্য কঙ্কনাই মুখ খুলল এবার,'কিন্তু প্রকাশ, ওনার কাছে যে দরকারে এসেছিলাম আমরা,সেটাই তো মিটল না!'

- 'হ্যাঁ,দেখেছ!আমি একদম ভুলে গেছিলাম। শুনুন মিস্টার সেন,এখন তো আর কথা বলা সম্ভব নয়,কিন্তু কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি প্লিজ কাল আসবেন  আমাদের বাড়ি?'

- 'কাল?কালকের দিনটা যদিও ফাঁকা নেই আমার,তবুও আপনারা বলছেন যখন.... '

- হ্যাঁ প্লিজ।আপনাকে কাল আমাদের বাড়িতে এসে লাঞ্চ করতেই হবে,তারপর যা কথা বলার বলব।'

- 'ওকে,এত করে বলছেন যখন, নিশ্চয়ই যাব।আপনাদের বাড়ির এড্রেসটা দিয়ে যান।'

কঙ্কনার হাঁটবার ক্ষমতা ছিল না,তাই প্রকাশ ওকে পাঁজাকোলা করে বাড়ির পথ ধরল।তাই দেখে মিস্টার সেন হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,কিন্তু নিঃশ্বাসের শব্দটা শুধু কঙ্কনার কানেই এল।

পরেরদিন লাঞ্চের একটু আগেই হাজির হলেন মিস্টার সেন।লাঞ্চের সময় কঙ্কনাকে ডাইনিং এ আসতে দেখে রেগে গেলেন সান্ত্বনা, 'একি,তোকে না বললাম ঘরেই খাবার দিয়ে আসব,বাইরে এলি কেন?কারোর একটা কথাও কি তুই শুনবি না?'

- 'মা,আমি একদম ঠিক আছি এখন। তুমি এত চিন্তা কোরো না।'

- 'যা ভালো বুঝিস করগে।'সান্ত্বনা চলে গেলেন।

ডাইনিংএ এখন পরম যত্নে অতিথিসেবা চলছে।খাওয়া শেষ হওয়ার পর শুরু হল আলোচনা। বাড়িতে ডাকার আসল উদ্দেশ্যটা শুনে মিস্টার সেন বললেন,'সে কি করে সম্ভব? এখন কাজ বন্ধ করে দিলে কত টাকা লস হবে আমার ভাবতে পারছেন?'

- 'ঠিক আছে,টাকা নিয়ে ভাবতে হবে না আপনাকে।যত টাকা লাগে আমরা দেব।'

- 'তাই বুঝি?বাস করেন তো ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে, আবার টাকার গরম দেখাচ্ছেন?'

- 'আমাদের টাকা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই আপনার,তাই বলছেন।বলেই দেখুন না কত টাকা চাই আপনার?এই গ্রামের ভালোর জন্য যত টাকা দরকার আমরা খরচ করব।'

- 'বেশ, পনেরো কোটি টাকা।দিতে পারবেন?'সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন।

- 'কি,টাকার পরিমাণটা শুনে মুখের তালু শুকিয়ে গেল তো?আগেই জানতাম। কি মনে করেন নিজেদের?রাজা-মহারাজা?হুঁ,মুরোদ নেই খালি বড়ো বড়ো কথা!যতসব ভিখিরি পার্টি! '

- 'শাট আপ!'কঙ্কনা চেঁচিয়ে উঠল।নিজের ঘরে গিয়েই আলমারি হাতড়ে বিয়ের সময় এবাড়ি থেকে পাওয়া হীরে বসানো সাতনরি হারটা বের করল ও।ডাইনিং এ এসেই হারটা ছুড়ে দিল মিস্টার সেনের মুখে,'এই নাও কাপুরুষ!এর দাম দেড় কোটি টাকা,এরকম আরো গোটা দশবারো গয়না আছে আমার -- নেবে?শুধু আমার কয়েকটা গয়না দিয়েই তোমার ওই পনেরো কোটি টাকা উঠে যাবে।আর কাউকে এক পয়সাও বের করতে হবে না!'

- 'একি করলি মা!ও হারটা এবাড়ির ঐতিহ্য, বংশানুক্রমে বাড়ির বৌয়েরা পায়।আমার শাশুড়িমা বিয়ের দিন হারটা আমার গলায় পরিয়েছিলেন, আর তোকে আমি,এমন হারটা ওকে দিচ্ছিস মা?'সান্ত্বনা অবাক স্বরে বললেন।

 প্রকাশ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,কঙ্কনা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,' তোমরা এখন যাও।আমি এই লোভী লোকটার সাথে একা কথা বলতে চাই।'

কিন্তু কিন্তু বলেও সবাই চলে গেল ডাইনিং হল থেকে।মিস্টার সেন বললেন, 'কঙ্ক,সারাজীবন কলকাতায় থেকে শেষে এক অজ পাড়াগাঁয়ে বিয়ে করলে?কেন শুনি?টাকার লোভে?'

- 'জাস্ট শাট আপ রাজীব। সবাইকে নিজের মতো কেন ভাবো?অন্যের দোষ না দেখে এবার নিজের দোষ দেখতে শেখো।'

- 'বুঝেছি,অনেক অভিমান জমে আছে না আমার ওপর?সেদিন রাগের মাথায় কি বলেছিলাম,তাই বলে আমায় ছেড়ে ওই প্রকাশকে বিয়ে করলে?কেন কঙ্ক?ওর মধ্যে এমন কি পেলে তুমি যেটা আমার মধ্যে নেই?'

- 'একদম চুপ!ওই মুখে তুমি প্রকাশের নাম নেবে না!ওর মতো হতে হলে তোমায় দশবার জন্মাতে হবে,ওর পায়ের ধুলোর যোগ্যও তুমি নও।আর অভিমান? না রাজীব,অভিমান নয়,ঘৃণা। আই যাস্ট হেট ইউ।রাজীব, সেই ক্লাস নাইন থেকে তুমি আর আমি একসাথে আঁকা শিখতাম,মনে পড়ে?আমরা দুজনেই দুজনকে ভালোবাসতাম,কিন্তু তোমার ছিল অত্যাধিক ইগো প্রবলেম।সেই নিয়ে অশান্তিও কিছু কম হয়নি আমাদের মধ্যে।কোনো প্রতিযোগিতায় আমার নাম তোমার আগে থাকলেই হল,ব্যস।কথা বলা বন্ধ,ফোন না ধরা,তারপর আমি তোমার বাড়ি গিয়ে তোমার অভিমান ভাঙাতাম। অনেক কষ্ট,যন্ত্রণা দিয়েছ তুমি আমায়।তবু কখনো তোমায় ছেড়ে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি।নয় বছরের সম্পর্ক ছিল আমাদের,কলেজ-ইউনিভার্সিটিও এক ছিল আমাদের।তারপর ঘটল সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা।সেদিন আমাদের বিয়ের দিন,সেদিনই সকালে রাজ্যস্তরের অঙ্কন প্রতিযোগিতার ফলাফল প্রকাশিত হল,আমি হলাম তৃতীয় আর তুমি প্রথম দশের মধ্যে ছিলেই না।তোমার অভিমান হয়েছে ভেবে আমি তোমায় ফোন করেছিলাম ফল প্রকাশের পরেই।তুমি ফোন ধরে স্বাভাবিকভাবেই কথা বললে আমার সাথে,আমি ভাবলাম যাক,ছেলেটা ম্যাচিওর হয়েছে তাহলে।তারপরেই শুরু হল গায়ে-হলুদ,স্নান আর বিকেলে কনে সাজানো। এতক্ষণ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু তুমি যে এতটা অমানুষ তাতো আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি,ভালোবাসায় অন্ধ ছিলাম,তাই তোমার আসল রূপটা আমার চোখে পড়েনি।সেদিন সন্ধ্যায় আমি যখন কনের সাজে ক্যামেরার সামনে,আর সমস্ত গেস্টরাও মোটামুটি এসে গেছেন,তখনই এল ফোনটা।তোমার বাবা আমার বাবাকে ফোনে বললেন,'রাজুকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না,তন্নতন্ন করে শুধু বাড়ি নয়,গোটা পাড়া, সমস্ত আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের বাড়িও খোঁজা হয়েছে রমেশবাবু।কিন্তু রাজু কোত্থাও নেই!'সেই শুনে আশঙ্কিত হয়ে আমি ফোন করলাম তোমার মোবাইলে,আর নির্লজ্জের মতো ফোনটা তুললেও তুমি।আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, 'রাজীব, প্লিজ ফিরে এস,তোমায় ছেড়ে আমি বাঁচব না!'তুমি বললে, 'দেখ কঙ্ক,তুমি মরলে কি বাঁচলে তাতে কিচ্ছু এসে যায় না আমার।বাট তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।'তুমি ফোন কেটে দিলে।আমি আবার ফোন করলাম,কিন্তু তুমি ততক্ষণে ফোন সুইচ অফ করে দিয়েছ।বাড়িভর্তি লোকজনের সামনে সেদিন যে কতটা মাথানীচু হয়েছিল আমাদের সে শুধু আমরাই জানি।তারপর কয়েকটা মাস জীবনটা আমার নরক হয়ে গিয়েছিল।ঘর ছেড়ে বেরোতাম না,খেতাম না,মা জোর করে খাইয়ে দিত,রাতে ঘুম হত না,কারোর সাথে কথা বলতাম না,এমনকি আঁকা,যেটা ছোটো থেকে আমার ভালবাসা, সেটাকেও বিদায় দিলাম। চোখের তলায় কালি পড়ে গিয়েছিল,নিজেই নিজেকে চিনতে পারতাম না,ঘরের আয়নাটাও হাসত আমার এই করুণ পরিণতি দেখে।শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলিং করাতে বাধ্য হলেন বাবা।ডাক্তার বললেন , 'যদি সত্যিকারের ভালোবাসার কোনো মানুষ আসে আমার জীবনে,আমি সুস্থ হয়ে যাব।বাবা-মা আমার আবার বিয়ের চেষ্টা করতে লাগলেন, শেষে খুঁজে পেলেন এই চৌধুরী বাড়ি। আমি বিয়েতে একদমই মত দিইনি,কিন্তু বাবার চোখ ভুল করেনি প্রকাশকে চিনতে।আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিয়েটা হয়ে গেল।তুমি জানো,তখনও আমার মনে ক্ষীণ আশা ছিল যে তুমি ফিরে আসবে আমার কাছে।শুধু তোমার জন্য এবাড়ির সবাইকে বিয়ের পর কত অপমান করেছি আমি,কত অসম্মান করেছি,ওই রেশমি হোটেলে আমাদের রিসেপশনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল,সকলের সামনে সেদিন আমি প্রকাশকে চড় মারতেও দ্বিধাবোধ করিনি।কিন্তু জানো,প্রকাশ আমার হাত ছেড়ে দেয়নি,ও বলেছিল,'বুঝতে পারছি তোমার মনের কষ্টটা।তুমি একটা রত্ন,সত্যিই সে বড় দুর্ভাগা, যে তোমার এই নিখাদ ভালোবাসার মূল্য দিতে পারেনি।তুমি আমাকে নাই ভালোবাসলে,আমি তো বাসি তোমায়,তোমায় আমি আগলে রাখব সবসময়, কিন্তু কখনো জোর খাটাব না।'প্রকাশের মা-বাবাও আমার সব অন্যায় মুখ বুজে মেনে নিয়েছেন,কারণ আমি তাদের মেয়ে,বৌমা নই।মাত্র কদিনের পরিচয়ে প্রকাশ আমার মনের কষ্টটা বুঝল,অথচ তুমি এতগুলো বছরেও বোঝোনি।তারপর একদিন আমিও সবটা বুঝলাম, প্রকাশকে ভালোবাসতে শুরু করলাম, আর তোমাকে ঘৃণা। তুমি জানো,কুমুদকে আমি জন্ম দিইনি। ডাক্তার যেদিন বললেন আমি কোনোদিনও মা হতে পারব না,আর সমস্যাটাও আমারই, সেদিনও ওই চৌধুরী পরিবার ছিল আমার পাশে,কারণ আমি যে ও বাড়ির সকলের প্রাণ।একদিন যখন প্রকাশ আর আমি শীতের সন্ধ্যায় হাঁটছিলাম মেঠো পথ ধরে,হঠাৎ এক বাচ্চার কান্নার শব্দ পাই ঝোপের মধ্যে,গিয়ে দেখি একটা তিনমাসের দুধের শিশু কাঁদছে।প্রকাশ সেদিন ওকে আমার কোলে দিয়ে বলেছিল, 'এই নাও,আমাদের সন্তান। ওর নাম হোক কুমুদ।'একদিন প্রকাশের মা কে ভুল করে শাশুড়িমা বলে ফেলেছিলাম,সেই শুনে ওঁর কি রাগ!ভগবানকে অশেষ ধন্যবাদ যে সেদিন সন্ধ্যেয় আমার বিয়েটা হয়নি তোমার সাথে।'

- 'বুঝেছি,আমি তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি,কিন্তু একটিবার কি ক্ষমা করা যায় না?'

- 'ক্ষমা?লজ্জা করে না তোমার?আজ আমার সমস্ত মনটা জুড়ে শুধু প্রকাশ আর প্রকাশ। তোমার জন্য শুধু একবুক ঘৃণা আর ধিক্কার ছাড়া আর কিছুই নেই গো,বিশ্বাস করো।'

- 'না না,তোমাকে যেতে হবে না আমার সাথে,নিজের জায়গা নিজের হাতেই নষ্ট করেছি আমি।কিন্তু তুমি শুধু একবার বলো যে তুমি আমায় ক্ষমা করেছ!না হলে যে মরেও শান্তি পাবোনা আমি।'

- 'বেশ,ক্ষমা করতে পারি,যদি আজই তোমার লোকজনদের নিয়ে শহরে ফিরে যাও,আর ওই মাঠটাকে মুক্তি দাও।'

- 'শুধু তাই নয়,আমার আরও একটা কাজ বাকি আছে।প্রকাশ প্লিজ এসো।'প্রকাশকে ডাকল রাজীব।প্রকাশ এলে কঙ্কনার ছুড়ে দেওয়া সাতনরি হারটা ওর হাতে দিয়ে বলল,'কোনো টাকা চাই না আমার।নিজের ভুল আমি বুঝতে পেরেছি।নাও,এটা পরিয়ে দাও তোমার স্ত্রীকে।তোমার হাতের ছোঁয়ায় পবিত্র হোক গয়নাটা,তবেই তো কঙ্কর গলায় দেবার যোগ্য হবে ওটা।'

পরেরদিন সকালে শোনা গেল,শহরের বাবুরা কোথায় যেন চলে গেছে,আর সমস্ত লোকজনও নিয়ে গেছে।রাজীব যে কঙ্ককে কথা দিয়েছে,এজীবনে কখনো তার চোখের সামনে আসবে না।

আজ কঙ্কর জন্মদিন।ভোরে উঠে ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ও।সাতনরি হার গলায়,খোলা ভিজে চুল পিঠে,বাতাসে ভেসে আসা শিউলিফুলগুলো গায়ে মাথায় পড়ে ঠিক যেন জলপরীটি লাগছিল।প্রকাশ অবাক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে আনমনে বলে উঠল,'শিউলি বৌ।'

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ