বড়ো শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
সেদিন অফিস যাওয়ার পথে অয়নদের বাড়িতে গোলমালের শব্দ পেলাম। বাড়ি থেকে সাইকেলে স্টেশন, আর স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে কলকাতা, তারপর পায়ে হাঁটা রাস্তা আমার অফিস, সব মিলিয়ে দেড়-দু'ঘন্টার ডেলি প্যাসেঞ্জারি। বাড়ি থেকে সাইকেলে স্টেশন যেতে হলে অয়নদের বাড়ির সামনে দিয়েই যেতে হয়। সেদিনও যথারীতি যাচ্ছিলাম,হঠাৎ বাড়ির ভেতর থেকে ঝগড়া-চেঁচামেচির আওয়াজ পেলাম। বিরক্ত হয়ে সাইকেল থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সত্যি! মা কিছু ভুল বলে না আমায়, এমন এক ছেলেকে জুটিয়েছি আমি! উফ,মরণ!
অয়নদের বাড়িতে আমার হামেশাই যাতায়াত ছিল,আর অয়নেরও আমাদের বাড়িতে। আমাদের সম্পর্কটা কারোরই অজানা নয়। সেই ক্লাস ইলেভেন থেকে সম্পর্ক আমাদের। তারপর অয়ন চলে গেল ইংরেজিতে অনার্স পড়তে,আর আমিও বিবিএ ভর্তি হলাম। তারপর আমি এমবিএ পাশ করলাম, আর অয়ন ইংরেজিতে এম.এ। ভাগ্যক্রমে চাকরিও জুটে গেল দুজনের, আমার বেসরকারি এক কোম্পানিতে চাকরি হল, অফিস কলকাতায়,আর অয়ন এই মফঃস্বলেরই একটা বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেয়ে গেল। তারপর সম্পর্কটা দু'বাড়িতে জানানো হল,অয়নদের তরফ থেকে কোনো আপত্তি ছিল না, আমাদের বাড়ি থেকেও ছিল না অবশ্য, শুধু মা একটু খুঁত খুঁত করছিলেন,' ছেলেটাকে কেমন যেন লাগে আমার!' আমার বাবা অবশ্য বুঝিয়েছিলেন, 'আজকের যুগের ছেলেমেয়েরা একটু অমন হয়।' যাইহোক, সব পাকা কথাও সারা হয়ে গিয়েছিল, শুধু অয়নের বোন রিমার বিয়েটা হয়ে গেলেই আমাদের বিয়ের সানাই বাজবে। রিমার সম্বন্ধ দেখা চলছিল, এক জায়গায় পাত্র পছন্দও হয়ে গেল। তাদের দাবিটাবি নেই কিছুই,তার ওপর ছেলেও ব্যাঙ্কে চাকরি করে, তাই পাকা কথাও সারব সারব করছে দু'তরফ থেকে,এখন আবার বাড়িতে কি নিয়ে অশান্তি লাগল?
সাইকেলটা রেখে ছুটে গেলাম বাড়ির ভেতর। শাড়িওয়ালা এসেছে বাড়ির ভিতর, কতরকমের শাড়ি, তসর, জামদানি, কাঞ্জিভরম, জারদৌসী, পিওর সিল্ক, আবার তাঁত। রিমার একটা কাঞ্জিভরম পছন্দ হয়েছে, কিন্তু তার মহামান্য কিপটে দাদাটি কিছুতেই দামী শাড়ি কিনে দেবেন না বোনকে! অয়নের বাবা অসীমকাকু সামান্য মাইনের চাকরি করতেন, অবসরের পর এখন যে পেনসন পান তাও যৎসামান্য,মেয়ের গয়নাগাটি-বেনারসি কেনার পর হাতে আর কিছুই নেই তেমন, অন্যদিকে বাপের বাড়ি থেকে যে শাড়ি কনেকে দেওয়ার কথা, তা কেনার জন্যই শাড়িওয়ালাকে বাড়িতে ডাকা। সে চেনাশুনা লোক,তাই যথেষ্ট কমদামেই শাড়ি বেচে ওদের কাছে। কিন্তু অয়নটা এত হাড়কিপটে যে তবুও একমাত্র বোনটার বিয়ের আগে শেষ চাওয়াটুকু মেটাবে না! মাথা গরম হয়ে গেল আমার, ঢুকেই বললাম, 'এই অয়ন! ছ্যাঁচড়ামো করছিস কেন? ক্লাস নাইন থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত টিউশন পড়াস,স্কুলে যে চাকরি করিস তার মাইনেও নেহাত কম নয়, তবু নিজের বোনটাকে একটা শাড়ি কিনে দিতে এত হাত কামড়াচ্ছিস! ছিঃ! দেখ, তুই যদি না দিস তো আমি কিনে দেব ওকে।'
বিয়ের আগে আমি কেউ নই ওবাড়ির, তাই আমার কাছ থেকে টাকা নেওয়া মোটেও ভালো দেখায় না, আর অশান্তির চোটে পাড়াপড়শিরাও ঢুকে পড়েছে বাড়িতে, কানাঘুষো চলছে রীতিমতো অয়নকে নিয়ে, তাই শেষমেশ বাধ্য হয়েই 'বেচারা' অয়ন অতিকষ্টে বোনকে কিনেই দিল কাঞ্জিভরম, কিন্তু মনে মনে সে যে যথেষ্ট অসন্তুষ্ট হল তা আর বুঝতে বাকি রইল না আমার।
সেদিন যথারীতি অফিস যাওয়া আর হল না আমার, সবাই চলে গেলে অয়নের সাথে একচোট ঝগড়া হয়ে গেল আমার। কথা-কাটাকাটি এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে শেষ পর্যন্ত রাগের মাথায় বলেই দিলাম, 'যাঃ!তবে এখানেই সব সম্পর্ক শেষ আমাদের! আর কোনোদিনও যোগাযোগ করার চেষ্টা করবি না!' বাড়ি চলে এসেই ব্লক করে দিলাম ওকে। ধুর, এমন টাকা ভালোবাসা মানুষ অন্তত আমার জন্য নয়!
কিছুদিন কেটে গেল। মুখে যতই ওকে ভোলার চেষ্টা করি, বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল, মনে পড়ে গেল ক্লাস ইলেভেনে গোলাপ দিয়ে আমাকে প্রোপোজ করার কথা, এত কিপটে যে পিৎজা-বার্গার তো দূর, আইসক্রিমও খাওয়াননি কোনোদিন মহারাজ! ফুচকা খাওয়াত, তাও বড়োজোর কুড়িটা,তার বেশি না। এতকিছুর পরও তো ওকে ভালোবেসেছি, কারণ ভালোবাসলে যে তার দোষগুলোকেও সমানভাবেই ভালোবাসতে হয়। কিন্তু মা আমায় বোঝালেন, 'একটু প্র্যাকটিক্যাল হ মা, যে নিজের বোনকে শাড়ি কিনে দিতে এতবার ভাবে, সে কি তোকে সুখী রাখতে পারবে?' মায়ের কথাগুলোও ফেলতে পারিনি সেদিন।
সাত-আটমাস কেটে গেল অয়নকে ছাড়াই। ভেতরে গুমরেছি, আর মায়ের কথাগুলোও নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি আপ্রাণ। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ নেমে এল বিপর্যয়, বাইরে ভীষণ ঝড়বৃষ্টি, তেমনি পাল্লা দিয়ে বজ্রপাত। মনে হচ্ছে এই বুঝি আমাদের বাড়িতেই বাজ পড়ল! লোডশেডিং, হঠাৎ অসীমকাকু টর্চ হাতে আমাদের বাড়ি এসে হাজির। বললাম, 'শুনুন আঙ্কল, আপনি এত কষ্ট করে কেন আমাদের বাড়ি এলেন জানিনা, তবে অয়নের সঙ্গে সম্পর্কটা আমি একেবারেই শেষ করে দিয়েছি, তাই আপনি যাই বলুন, ভাঙা কাচ আর জোড়া লাগবে না কোনোদিন।'
- 'না রে মা, সেকথা নয়। বড়ো বিপদে পড়েছি আমরা।'
- 'কেন কাকু? কার কি হয়েছে? রিমা.....' উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলাম।
- 'না রে, রিমার তো বিয়ে হল ছ'মাস হয়েছে। খুব ভালো পাত্র, রিমাটাকে খুব ভালো রেখেছে, কিন্তু অয়ন.....'
- 'কি হয়েছে ওর?' আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
- 'তুই তো জানিস মা ছেলেটা কেমন টাকা ভালোবাসে! খালি বলত, 'বড়ো শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে, এই মফঃস্বলে আর কতদিন পচব, সু্যোগ পেলেই ঠিক কলকাতা চলে যাব দেখো।' আমরা কত বোঝালাম,ও কারোর কথা শুনল না। এখানকার স্কুলের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে কলকাতা চলে গেল। অবশ্য ওখানে গিয়ে কোনো স্কুলে চাকরি পায়নি, তবে টিউশনি পেয়ে গেল প্রচুর, ফোনে বলত, এখানকার ডবল টিউশন ফি নাকি ওখানে! একটা ঘরও ভাড়া নিয়েছিল কলকাতায়। আমরাও খুশি হলাম,যাক, ছেলেটা যা চেয়েছিল তাই পেয়েছে! তবে কি বল তো মা, ওর লোভটা ছিল বড্ড বেশি, তাই যেসব গরীব স্টুডেন্টরা ফি দিতে পারত না,তাদের ও মুখের ওপর 'না' বলে দিত, কি নিষ্ঠুর বলতো মা! তারপর আর কি, অতিলোভে তাঁতি নষ্ট হল, কোন এক বেসরকারি সংস্থায় নাকি টাকা রাখলে মাসে ২০% সুদ দেবে শোনা গেল। আমরা পইপই করে বারণ করেছিলাম,কিন্তু...... 'অসীমকাকু কান্নায় ভেঙে পড়লেন, 'কলকাতায় গিয়ে যা টাকা ইনকাম করেছিল সবটা হাতিয়ে নিল ওরা!'
আমি এতটাই শকড হলাম যে কথা বলার শক্তিটুকুও ছিল না, মাটিতে বসে পড়লাম,অসীমকাকু বলে যেতে লাগলেন, 'আমি বললাম, 'ফিরে আয় বাবা, বাড়ি ফিরে আয়!' কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তরই এল না,খালি একটাই কথা, 'বড়ো শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে, আমার টাকাগুলো ঠিক খুঁজে পাবো হাওয়ায়!' আর ফেরেনি ছেলেটা ঘরে, 'অসীমকাকু কাঁদতে লাগলেন, 'থানাপুলিশ করলাম, কেউ খুঁজে পায়নি ওকে রে,কেউ না.....'
দু'বছর কেটে গেছে। অনেক কাউন্সিলিং করার পর আমি অয়নের শোকটা অনেকটা ভুলতে পেরেছি।সামনে পুজো,ভাবলাম এবার শপিং করতে ধর্মতলায় যাব বন্ধুদের সাথে।
যেমন ভাবা তেমন কাজ। শপিং করে খেয়েদেয়ে ফিরছিলাম, হঠাৎ ঝড় এল ভীষণ তান্ডবে। কালো মেঘে ছেয়ে গেল চারিদিক, বিকেলে অন্ধকার নেমে এল। এত ঝড়ে রাস্তায় চলাই মুশকিল হল। অনেক কষ্টে হাত ধরাধরি করে চলছিলাম, হঠাৎ পিছন থেকে একটা কাঁপা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, 'বড়ো শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে।' বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল, চমকে পিছনে ফিরে তাকালাম। একটা পাগল, দাড়িগোঁফের জঙ্গলে মুখ ঢাকা, একটা ছেঁড়া ময়লা আলখাল্লার মতো পোশাক, একগোছা টুকরো কাগজ হাওয়ায় ওড়াচ্ছে আর বলছে, 'বড়ো শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে' আর হাসছে। আমি আস্তে আস্তে তার সামনে গিয়ে বসলাম হাঁটু গেড়ে, আট বছরের চেনা চোখদুটো চিনে নিতে একমুহূর্তও দেরি হল না আমার,ওর কাঁধ ঝাঁকিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, 'অয়ন!'
তার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই আমার দিকে। ছেঁড়া কাগজের টুকরোগুলো খালি হাওয়ায় ওড়াচ্ছে আর বলছে, 'বড়ো শহরে হাওয়ায় টাকা ওড়ে।'
চারিদিক অসম্ভব নিস্তব্ধ কুয়াশাচ্ছন্ন লাগছিল। জ্ঞান হারালাম আমি।
মা একদমই মেনে নেননি, তবুও অয়নের সাথে বিয়েটা হয়েই গেল আমার। ওকে সুস্থ করে তুলবই,এই বিশ্বাসটুকু বুকে নিয়ে নিজের ঘর ছাড়লাম আমি।
(সমাপ্ত)

0 মন্তব্যসমূহ