শেষ রাত্রি
সুচন্দ্রা চক্রবর্তী
চোখের জল আর বাগ মানছিল না রনিতার।আনন্দ আর দুঃখ দুটোই বোধহয় মিশেছিল ওই নোনতা রংহীন জলে।কেন?দুঃখ না হয় বুঝলাম,আনন্দ আবার কিসের?ওমা!একি অর্থহীন প্রশ্ন!আনন্দ নয়?
হ্যাঁ আনন্দই তো।বাবা-মার ঋণশোধ করার অভাবনীয় আনন্দ।সত্যি তো,এই পৃথিবীতে কজন সন্তান সুযোগ পায় বাবা-মার ঋণশোধ করার?রনিতা কিন্তু এইদিক দিয়ে খুব ভাগ্যবতী।অবশ্য জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে কতটা ভাগ্যবতী সেই ব্যাপারে পরে আসছি।
রনিতা লিখতে গিয়ে দেখে,কাগজটা নোনতা জলে ভিজে গেছে।তবুও তার ওপরেই লিখতে শুরু করল রনিতা।আজ যে আর থামলে চলবে না।তাই ঝাপসা চোখে আর কাঁপা কাঁপা হাতে লিখতে লাগল সে।জলে ভিজে লেখাগুলো একটু অস্পষ্ট হয়ে গেল যদিও।তা যাক।তার জীবনের থেকে তো আর বেশি অস্পষ্ট নয়।
লিখতে গিয়ে জীবনের সব ঘটনা মনে পড়তে লাগল তার।সে অনেকদিন আগের কথা,আজ থেকে ১৬ বছর আগের।রনিতা তখন সবে হাইস্কুলে ক্লাস সিক্সে পড়ে।সে তার দিদি আর মায়ের সঙ্গে দূরসম্পর্কের এক মামার বাড়ি গিয়েছিল।না,তার বাবা যাননি,সে দেখেছে বাবা কোনোদিনই তার মামার বাড়ির সম্পর্কের মানুষদের পছন্দ করত না।তবে রনিতা কিন্তু ছিল বাবার চোখের মণি।দিদি যখনই তাকে বেশি মারধর আর শাসন করত রনিতা লুকিয়ে পড়ত বাবার পিছনে।কারণ ও জানত বাবাই ওর ত্রাতা।
তারপর সেই মামার বাড়িতে গিয়ে রনিতা জানতে পারে যে তার দিদি রুমকি প্রেম করে একজনের সাথে।একটু একটু সন্দেহ যে তার আগে হয়নি এমন নয়।ও আর রুমকি একসঙ্গে রাতে ঘুমোত।কখনো যদি হয়ত রনিতার মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেতো ও শুনতে পেত দিদি ওইপাশ ঘুরে কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলছে আস্তে আস্তে।রনিতা চুপচাপ,শান্তশিষ্ট কিন্তু বোকা নয়,তাই সে আন্দাজ করেছিল ব্যাপার টা,কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেনি।
নিশ্চিত হল যখন ও শুনল একদিন রুমকি তার মামার মেয়ে প্রিয়া কে বলছে,"ওই শোন,সুমিতকে আমি ভালবাসি।কিন্তু বাড়িতে মেনে নেবে কিনা আমি জানিনা।"
প্রিয়া বলল,"কেন?কি সমস্যা?"
- "আরে ওতো একটা সামান্য চাকরি করে।আর আমার বাবা কলকাতার একজন নামকরা ডাক্তার।বাবা কেন ওকে মেনে নেবে?"
- "হুম,সেটা ঠিক।"
- "হ্যাঁ,কিন্তু কি করি বল না,বাড়িতে কি করে ম্যানেজ করব?একটা কিছু বুদ্ধি তো দে।"
রনিতা আড়াল থেকে সব শুনেছিল।রুমকির সমবয়সী প্রিয়া যে রুমকি কে একদম সহ্য করতে পারে না সেটা রনিতা জানে খুব ভালভাবেই।কিন্তু দিদিকে বললে ও কিছুতেই বিশ্বাস করে না।বললে বলে,"তোর মতো একটা হিংসুটে বোন যে বাড়িতে থাকে,সেই বাড়ির সঙ্গে কেউই সম্পর্ক রাখবে না।আর প্রিয়ার বিচার তোকে করতে হবে না,তুই নিজের চরকায় তেল দে।"
রনিতাও আর বেশি কিছু বলেনি,আট বছরের বড় দিদিকে সে যে খুব ভয় পায়।রুমকি বড্ড রগচটা,কথায় কথায় রনিতার গায়ে হাত তোলে।কিন্তু তবুও রনিতা তার দিদি কে বড্ড ভালবাসে।তাই রুমকির প্রেমের কথা শুনে সে ভেবেছিল যদি এই ব্যাপারে সে দিদিকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারে।
কিন্তু হায়!অবুঝ আত্মকেন্দ্রিক মানুষেরা যে কিছুতেই বোঝেনা কে তাদের প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী।তাই রুমকিও বুঝল না।একদিন রনিতা শুধু ভয়ে ভয়ে দিদিকে বলেছিল,"দি,একটা কথা বলব?"
রুমকি তখন পড়ছিল।আসলে পড়ছিল না,পড়ার বইয়ে চোখ রেখে সুমিত আর তার কাটানো মিষ্টি মধুর মুহূর্তগুলোর কথা ভাবছিল।এমন সময় রনিতার ডাকে তার সম্বিৎ ফিরল।বিরক্ত হয়ে বলল,"কি বলবি তাড়াতাড়ি বল।"
- "সুমিতদার কথা আমি জানি।"
রনিতার মুখে হঠাৎ এই কথা সে আশা করেনি।হতভম্ব হয়ে পড়ল সে।কোনোরকমে সামলে নিয়ে থতমত খেয়ে বলল,"কে সুমিত?"
রনিতা ভয়ে মুখ নামিয়ে বলল,"তুই যাকে ভালবাসিস।"
মাথায় যেন বাজ পড়ল রুমকির।যে বোনকে সে এতকাল ভয় দেখিয়ে দাপিয়ে এসেছে শেষে তার মুখে এতবড়ো সত্যিটা শুনতে হল!তবে রুমকির মতো মানুষদের ছলের অভাব হয়না।সে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলল,"মা,বাবা,শুনে যাও তোমাদের আদরের ছোটমেয়ের কথা।"
- "দি,সবাইকে ডাকছিস কেন?এই ব্যাপারটা কেউ জানবে না রে,শুধু তুই আর আমি ছাড়া।আমি কাউকে কিছু বলবো না।"
ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাসে বাবা-মা শুধু শেষ কথাটাই শুনলেন।
মা বিমলা প্রশ্ন করলেন,"কি কাউকে বলবি না রনু?"
রনিতা চুপচাপ মাথানিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।আর রুমকি সেই সুযোগে বলে যেতে লাগল,"দেখ মা দেখ।তোমার রনু কার সাথে রাস্তঘাটে ঘুরে বেড়ায়,প্রেম করে।আর সেটা আমি জানতে পেরেছি বলে বলে কিনা দি তুই বেশি কথা বললে তোকেই ফাঁসিয়ে দেব!ভাবো!"
রনিতা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল।কিন্তু বাবা রীতেশের চরম ঘৃণাভরা চোখদুটো দেখে আর কিছু বলার প্রবৃত্তি হল না তার।কারণ যে দুটো চোখে সে তার জন্য শুধুই স্নেহ আর ভালবাসা দেখেছে আজ সেই দুটো চোখে ছিল শুধুই অবিশ্বাস।রনিতার চোখ ফেটে জল এল।আর বিমলা তার দুগালে দুটো চড় মেরে বললেন,"ছিঃ রনু!এত কম বয়সে এইসব!তোমাকে নিজের মেয়ে ভাবতে যে আমার লজ্জা করে!"
এরপর কি হল আর বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই।শুধু এটুকু বলাই বোধহয় যথেষ্ট যে তারপর একমাস বাড়ির কেউ তার সঙ্গে কথা বলেনি।মা শুধুই খাবারের সময় ঘরে খাবারটুকু দিয়ে যেতেন,তার মুখটাও দেখতেন না।দেখলে হয়ত জানতেন,কাজল না পরেও কোনো মানুষের চোখের নীচটা কতটা কালো হয়ে যেতে পারে।
তারপরে কেটেছে অনেকগুলো বছর।রীতেশ বা বিমলা কেউই সুমিতকে মানতে চাননি।শুধু রুমকির চাপে পড়ে বিয়েটা দিতে হয়েছে।কিন্তু মনে মনে দুজনেই অসন্তুষ্ট ছিলেন।আর এই অসন্তোষ এসে পড়ল রনিতার উপর।অসম্ভব সন্দেহবাতিক হয়ে পড়লেন তার বাবা-মা।রনিতা এখন কলেজে পড়ে।খুব মেধাবী ছাত্রী সে।দিদির মতো একদমই নয়।তবুও তাকে একটু বেশিক্ষণ মোবাইল ঘাটতে দেখলেই বিমলা বলেন,"এত মোবাইলে সারাক্ষণ কি করিস?কি আছে ওই মোবাইলে?"
- "উফফ মা,অনন্যার সাথে গল্প করছি।"
- "না না,আমার তোকে বিশ্বাস হয় না।রুমির মতো তুইও সুমিতের মতো কাউকে বিয়ে করবি তা হবে না,আমি কিন্তু আগে থাকতেই বলে দিলাম।"
- "মা প্লিজ!কুড়িটা বছর দেখেও চিনলে না আমি কেমন?"
- "ওসব আমি জানি না।তুমি অতক্ষণ মোবাইল ঘাটবে না।আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় কাউকে দেখে ভাল লাগবে,তা হবে না।বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি মোবাইল কেড়ে নেব কিন্তু।"
এবার রনিতা বিরক্ত হয়ে উঠল,"প্লিজ মা,আমায় যে তুমি ভালবাসো না আমি জানি।প্লিজ সেটা আর বোঝাতে হবে না।"
- "হ্যাঁ তাতো জানি।অন্য কেউ তোকে আমার থেকে বেশি ভালবাসে কিনা!প্রেম-ট্রেম করলে তো এই ভীমরতিই হবে!"
- "না গো,সেরকম কাউকে আমি পাইনি বিশ্বাস করো যে আমাকে সত্যি ভালবাসে।আর তুমি তো আমাকে ভালবাসোই না,কারণ যে ভালবাসায় বিশ্বাস নামক বস্তুটিই নেই সেই অন্তঃসারশূন্য সম্পর্কে আর যাই থাকুক ভালবাসা নেই।ঁহ্যা তুমি বাবা আমার যত্নের কোনো ত্রুটি করোনা,আমি জানি।সবচেয়ে দামি এসিটা বাবা আমার ঘরে বসিয়েছে,তুমিও আমায় সবচেয়ে দামি কেক-বিস্কুট টাই এনে দাও।কিন্তু আমি যে এসব চাই না মা।আমি তোমাদের কাছ থেকে বিশ্বাস ভরসা চাই যেটা তোমরা আমায় করো না।আমার চোখে জল এলে আশঙ্কিত হও,ভাবো বুঝি প্রেমিকের সাথে ঝগড়া করেছি।কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করেছ,আমি কেন কাঁদছি?করোনি।করেছ শুধু সন্দেহ।তোমাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কি শুধুই ভালো খাওয়া ভালো পরা আর দামি গাড়ি চড়াতেই সীমাবদ্ধ মা?কখনো সময় দাও তোমরা আমায়?বলো?"
- "থাক থাক,আর জ্ঞান দিতে হবে না।আর শোনো কলকাতার এক নামী ইউনিভারসিটি তে তুমি কাল ভর্তি হবে।ওখানে গিয়ে শুধু মন দিয়ে পড়াশোনাই করবে,ছেলেদের সাথে একদম কথা বলবে না,মিশবে না।জানোই তো ছেলেদের সাথে মেশা তোমার বাবা একদম পছন্দ করেন না,তাইতো গার্লস কলেজে পড়িয়েছেন তোমায়।একজনকে কোয়েড কলেজে পড়িয়ে যা হল তা তো দেখলামই।রুমিকে নিয়ে কত আশা ছিল,সব ভেঙে চুরমার করে দিল।যেখানে ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে পড়ে সেরকম কোনো জায়গায় তুমি পড়তে যাও আমার একদম ইচ্ছা ছিল না।নেহাত নামী ইউনিভারসিটিতে চান্স পেয়েছ তাই।যাই হোক,অনেক কথা হয়েছে,নীচে খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে,সময় করে এসে খেয়ে নিও।"বিমলা চলে গেলেন।
মায়ের মুখে রোজ এই কথাগুলো শুনতে শুনতে রনিতা যে ভেতরে ভেতরে কতটা শেষ হয়ে যাচ্ছিল তা বোধহয় বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব ছিল না।সে ছিল ইউনিভারসিটি টপার।গোল্ড মেডেলিস্ট।কিন্তু ক্লাসের লাস্ট স্টুডেন্টটাও বোধহয় তার থেকে সুখী ছিল।কারণ সবার মা-বাবাই সন্তানদের অন্তত বিশ্বাস টুকু করেন,যেটা রনিতার বাবা-মা করেন না।
তবে বেশিদিন আর এই কষ্ট থাকল না।এই প্রথম রনিতার জীবনে কোনো রাজকুমার এল।কিশোর তার নাম।এমডি স্টুডেন্ট।রীতেশের অন্যতম প্রিয় ছাত্র।একদিন রীতেশই তাকে তাঁদের বাড়িতে নিয়ে এলেন।বিমলা তখন বাড়িতে ছিলেন না।বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন।আগেই বলেছি,রীতেশ বিমলার বাপের বাড়ির কাউকেই পছন্দ করতেন না,তাই বিয়ের পর আর কোনোদিনও ওমুখো হননি,কাজের অজুহাত দিয়েছেন বারবার।সেদিন বিমলা বাড়ি না থাকায় রনিতাই কফি নিয়ে এল কিশোর আর রীতেশের জন্য।কিশোরের চোখের দিকে তাকিয়ে রনিতার যেন মনে হল মানুষটাকে বাইরে থেকে যতই প্রাণোচ্ছল হাসিখুশি লাগুক,ভেতরটা যেন অন্তঃসারশূন্য।আসলে ভুক্তভোগী,সকলের অবিশ্বাসের পাত্রী,ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া মেয়েটা ঠিকই বুঝেছিল।কিশোর ওই বাড়িতে যাতায়াত বাড়ল,রনিতার সঙ্গে বন্ধুত্বও বাড়ল,বন্ধুত্ব থেকেই ঘনিষ্ঠতা,ঘনিষ্ঠতা থেকে প্রেম।
রনিতার চব্বিশ বছরের জন্মদিনে কিশোর জিজ্ঞেস করেছিল,"কি চাই তোমার রনি?"
রনিতা কিশোরের বুকে মুখ গুঁজে বলেছিল,"কিছু নাগো,একটু ভালবাসা,বিশ্বাস,আর ভরসা।"
কিশোর রনিতার খোলা চুলের উপর হাত বুলিয়ে বলেছিল,"বাসবো পাগলী,তোমাকেই ভালবাসবো।তনুশ্রী আমায় যে কষ্ট দিয়েছে আর ওর কথা মনেও আনতে চাই না।"
রনিতা মুখ তুলে বলল,"কে তনুশ্রী?আর সে কি করেছে?"
- "ঠকিয়েছে রনি ঠকিয়েছে।কলেজে এমবিবিএস স্টুডেন্টদের মধ্যে আমি টপার ছিলাম,আর ও ছিল পিছিয়ে পড়া একজন স্টুডেন্ট।ওর জন্য কি করিনি আমি,নোটস দেওয়া,প্র্যাকটিক্যাল বুঝিয়ে দেওয়া, এমনকি প্রোজেক্টের খাতাটাও ওকে আমি বানিয়ে দিয়েছিলাম।"
- "হ্যাঁ,তারপর?"
- "যেই কলেজ শেষ হল,ওর জীবনে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল।কারণ তখন যে ও অন্য পাখি পেয়ে গেছে।একদিন হঠাৎ শুনলাম স্বর্ণব্যবসায়ী অখিলেশ দত্তের একমাত্র ছেলে রাজেশের সঙ্গে ওর বিয়ে।"
- "সেকী!তুমি ওকে বললে না কিছু?"
- "বলিনি আবার!ওর বাড়ি গিয়েছিলাম জানতে যে ও কেন আমায় এইভাবে ঠকাল।ও আমায় অপমান করে তাড়িয়ে দিল।বলল,"কি আছে তোমার?ওই ডাক্তারি করে কি দিতে পারবে আমায়?পারবে কি রাজেশ দত্তের মতো কোটি কোটি টাকা আয় করতে?"আমি বলেছিলাম,"না,তা হয়ত পারব না,কিন্তু বুকভরা ভালবাসা দিয়ে তোমায় আগলে রাখব।"ও বলল,"ওইসব মনভোলানো কথায় তনুশ্রী ভোলে না।তুমি চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও নয়তো লোকজন ডেকে তোমায় এমন ফাঁসিয়ে দেব যে ওই ডাক্তারি করা ঘুচে যাবে।বেরিয়ে যাও এক্ষুণি!"বিশ্বাস কর রনি,আমার বুকের ভেতরটা সেদিন ভাঙা আয়নার মতই ভেঙে টুকরোটুকরো হয়ে গেছিল।কাঁদার ক্ষমতাটুকুও ছিল না।চলে এসেছিলাম একবুক ঘৃণা নিয়ে।কিশোর এর চোখে জল এল।
চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে রনিতা বলল,"ও একটা বিশ্বাসঘাতক।ওকে ভুলে যাও।আমি আমার সবটুকু দিয়ে তোমায় ভালবাসবো দেখো।"
- "সেইজন্যই তো তোমার কাছে ছুটে আসি গো পাগলি।"
রনিতা ভাবল সে কিশোরকে এমনভাবে ভালবাসবে,আগলে রাখবে,যে কোনোদিন ওই স্বার্থপর তনুশ্রীর কথা তার মনে পড়বে না।
কেটে গেল আরো কয়েকটা বছর।না,কিশোরের সঙ্গে রনিতার বিয়ে দিতে কোনো আপত্তি করেননি রীতেশ-বিমলা।বিয়ের দিন বিমলা রনিতাকে বললেন,"বর পছন্দ করতে হয় তো এমনি।ভাগ্য করে বর পাচ্ছিস রনু,মন দিয়ে সংসার করিস।স্বামীকে যত্ন করিস।"
রনিতা হেসে বলল,"যাক,এতদিন পর আমায় বিশ্বাস করলে তাহলে।আর অবিশ্বাস করবে না তো মা?"
বিমলা বললেন,"আসলে রুমি আমাদের ঠকানোর পর তোকেও আর বিশ্বাস করতে পারতাম না রে মা।তাই কতসময় কত খারাপ কথা বলেছি।ক্ষমা করিস রে মা।"
বিয়ের পর কয়েকমাস কেটে গেছে।রনিতা একটা অফিসে চাকরি পেয়েছে।ভাল ডিগ্রীর জন্য উচ্চপদই পেয়েছে।এতদিন পর্যন্ত ঠিকই চলছিল।রনিতা আর কিশোরের সুখের সংসার।কিন্তু জীবনে নিরবচ্ছিন্ন সুখ বলে সত্যিই কিছু হয়না বোধহয়।নয়ত কি সুরেশ আর রনিতার বন্ধুত্বে এতটা ক্ষুণ্ণ হয় কিশোর?
- "কিশোর,সুরেশ শুধুই আমার বন্ধু,বিশ্বাস করো।একই অফিসে চাকরি করি,আর একই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি,সেইজন্য।"
- "জানি রনি,তোমাকে বিশ্বাস করতে চাই আমি।কিন্তু কি বলো তো ঘরপোড়া গরু তো,তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাই।"
চমকে উঠল রনিতা।এই একটা কথা তো ও আগেও শুনেছে।হ্যাঁ,দিদির বিয়ের পর এই কথাটা মা-বাবার মুখে অন্তত হাজার বার শুনেছে।ভেবেছিল বিয়ের পর আর জীবনে কোনোদিনও শুনতে হবে না।কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি এই কথা বলল?রনিতা হতভম্ব হয়ে প্রথমে কিছু বলতে পারল না।তারপর আস্তে আস্তে বলল,"কিশোর!এই কথাটা আজ এতদিন পর শুনতে হল!তাও তোমার মুখে!কেন কি করেছি আমি?"
- "কি করোনি তাই বল?কাল দেখলাম দোকানে একসঙ্গে কেনাকাটা করছিলে,আর কি হাসাহাসি।সুরেশ অবিবাহিত হ্যান্ডসাম তাই না?"
- "কিশোর,তাহলে তুমি কোনোদিনই ভালবাসইনি আমাকে।যদি বাসতে তাহলে অবিশ্বাস করতে না।আর সুরেশ শুধুই আমার বন্ধু।কাল একসঙ্গেই ফিরছিলাম তাই একটু শপিং করতে গিয়েছিলাম।কিন্তু আমার জীবনে তোমার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ নেই কিশোর।বিশ্বাস করো।"
- "সরি রনি,এক্সট্রিমলি সরি।হঠাৎ তনুশ্রীর কথা মনে পড়ল তাই এরকম বলে ফেললাম।প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।চলো আজ বাইরে ডিনার করে আসি।"
সেইদিনের মত ঝামেলাটা মিটল।কিন্তু মানুষের বিশ্বাসে একবার চিড় ধরলে তা দিনে দিনে বাড়তে থাকে।বাড়তে বাড়তে তা মানুষের মনকে একেবারে টুকরো টুকরো করে দেয়,মানুষ হয়ে যায় জীবন্ত লাশ।সেটাই হল শেষ পর্যন্ত কিশোর-রনিতার জীবনে।
সেদিন সারাদিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ছে।অফিসে একটু বেশি কাজ থাকায় রনিতার দেরি হয়ে গেছে অফিস থেকে বেরোতে।বেরিয়েই খুব অসুবিধায় পড়ল সে।এত বৃষ্টিতে কোথাও গাড়ি অটো কিচ্ছু নেই।আর বাসগুলো ভিড়ে ঠাসা।আর বৃষ্টি যেন বাগ মানছে না।এতো জোরে বৃষ্টি হচ্ছে যেন মনে হচ্ছে ছাতাটাই ফেটে যাবে।হঠাৎ সুরেশ এসে বলল," গাড়ি পাচ্ছেন না বুঝি?আসুন আমি আপনাকে ড্রপ করে দিই।"
- "না না ধন্যবাদ।আমি চলে যেতে পারব।"
- "না না কি বলছেন!সবাই চলে গেছে।এখন এই বৃষ্টিতে গাড়িও পাচ্ছেন না।আপনাকে একা রাস্তায় রেখে আমি চলে যাব?না না আসুন আমার গাড়িতে।"
- "কিন্তু আপনার তো দেরি হয়ে যাবে বাড়ি ফিরতে।"
- "না না কোনো অসুবিধা হবে না।আপনি আসুন না।"
সুরেশের গাড়ি কিশোরের বাড়ির সামনে এসে দাড়াল।এতক্ষণে বৃষ্টিতে কিছুটা লাগাম লেগেছে।রনিতা মুখ বাড়িয়ে দেখল কিশোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর জন্যই অপেক্ষা করছে।রনিতা গাড়ি থেকে নেমে কিশোরের কাছে গিয়ে হতবাক।সেই একই রকম ঘৃণা,হতাশা তার দুচোখে,যেমনটি দেখেছিল সে বাবার চোখে সেই ক্লাস সিক্সে,যেদিন তার দিদি নিজের দোষ চাপিয়েছিল রনিতার ঘাড়ে।তবুও রনিতা একবার শেষ চেষ্টা করতে গেল।কিন্তু কিশোর তাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিল,বলল," ছিঃ রনি ছিঃ!আমি তোমাকে বিশ্বাস করতাম।ভালবাসতাম।আর তুমি তার এই প্রতিদান দিলে?তুমি জানো আজ তোমার দেরি দেখে আমি কত চিন্তা করছিলাম,আর তুমি কিনা!"
সারাদিন পরিশ্রম,এই দুর্যোগ,তারমধ্যে কিশোরের এই ছোড়া তীরের মতো বলা কথা।রনিতা আর সইতে পারল না।চিৎকার করে বলল,"বলো!থামলে কেন!আমি এই ঝড়বৃষ্টির রাতে পরপুরুষের সাথে ঘুরছিলাম, এটাই বলবে তো?তো বলো না।আমার মা-বাবার কাছে আমি খারাপ মেয়ে ছিলাম,এতটাই খারাপ যে বিশ্বাসই করা চলে না,আর তোমার কাছেও আমি খারাপ স্ত্রী,যাকে বিশ্বাস করা যায় না,তাই না?অথচ দেখো কোনোক্ষেত্রেই কিন্তু আমার দোষ ছিল না,দোষ ছিল তোমাদের।আসলে তোমরাই মানুষ চিনতে ভুল করো।ভুল মানুষকে সবটুকু উজাড় করে ভালবাসো,তারপর যখন সে তোমাদের ঠকায় তখন যে প্রকৃত ভালবাসে তাকেই অবিশ্বাস করো।সেইজন্যই দেখ না,দিদি,তনুশ্রীরা আজ সুখী,কিন্তু অবিশ্বাসের আগুনে তোমরা পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছ আমায়।না কিশোর,আর না।দিদির বিয়ের পর সাতটা বছর মা- বাবার সন্দেহের আগুনে দগ্ধ হয়ে একটু একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম।তোমায় পেয়ে ভেবেছিলাম হয়ত এই জ্বালা থেকে মুক্তি পাব।ভেবেছিলাম আমার মনের দু:খের আগুনে তুমি জল ঢালবে,কিন্তু না,তুমি সেই আগুনে ঘি ঢেলেছ।যেদিন থেকে সুরেশের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে তুমি বারবার আমায় অবিশ্বাস করেছ,অসম্মান করেছ,আমার চরিত্রের দোষারোপ করেছ।অনেক সহ্য করেছি গো,কিন্তু আর নয়।আমি সবাইকে ভালবেসেছি,কিন্তু কি পেয়েছি বলতে পার?দিদি,বাবা,মা,তুমি তোমরা শুধু কষ্ট ছাড়া আর কি দিয়েছ?তোমরা বারবার দাবি করেছ,তোমরা আমায় ভালবাসো।কিসের ভালবাসা?যে ভালবাসায় কোনো বিশ্বাস নেই,ভরসা নেই?আমি মা-বাবার খারাপ মেয়ে ছিলাম,তাই আমাকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করে তারা ভাল আছে।আমি যার জীবন থেকেই সরে যাই সেই শান্তিতে থাকে।অনেক হয়েছে কিশোর,আর নয়।আমিও একটা মানুষ।আমারও সহ্যের সীমা আছে।তোমার সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।আমি চললাম।তুমি ভাল থেকো।"
- "হ্যাঁ যাও যাও!আমি তো তোমাকে ভালবাসি না,সুরেশই তো বেশি ভালবাসে তোমাকে।ওর কাছেই যাও।"
রনিতা চোখেমুখে ঘৃণা নিয়ে শেষবারের মত কিশোরকে ঘুরে দেখল।তারপরেই মুখ ঘুরিয়ে বেরিয়ে গেল।
কিশোর চিৎকার করে বলতে লাগল,"যাও যাও!তুমিও যাও।তনুশ্রী আর রনিতার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।কোনো পার্থক্য নেই।"
সেদিন রাতে রনিতা বাপের বাড়ি গিয়েছিল।সে জানত বাবা-মা তার পাশে দাড়াবে না।তবুও যা দিনকাল,রাতটুকুর আশ্রয়ের জন্যই বাবা-মার কাছে যাওয়া।সে যেতেই বিমলা বললেন,"ওমা,রনু যে!আয় আয়।জামাই কোথায় মা?"
- "ও আসেনি মা,আর আসবেও না কোনোদিন।"
- "কেন রে?কি হয়েছে?"স্তম্ভিত বিমলা জিজ্ঞেস করেন।
- "আমি যে তার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে এসেছি মা।"রনিতা সমস্ত ঘটনা খুলে বলে।
- "কি বলছিস রে?এতকিছু ঘটে গেছে আর আমরা কিছুই জানি না!যাই হোক,রাত হয়ে গেছে,রেস্ট নে,একটু পরে খাবার দিচ্ছি।"
রনিতা ঘরে গেল।বৃষ্টিটা আবার নেমেছে।জানালা দিয়ে বাইরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল।বৃষ্টি যে শুধু বাইরে নেমেছে তাই নয়,তার চোখেও নেমেছে।হঠাৎ পাশের ঘর থেকে কোলাহলের একটা অস্পষ্ট আওয়াজ শোনা গেল।পাশের ঘরটা বাবার।রাতে পড়াশোনা করার জন্য।রনিতা আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল পাশের ঘরের দরজা ভেজানো।ভেতরে মা আর বাবা কথা বলছেন।রনিতা কান পেতে শুনল কথাটা হচ্ছে তাকে নিয়েই।
বাবা ঘরে ঘন ঘন পায়চারি করছেন আর বলছেন,"সত্যি,ধন্যি মেয়ের জন্ম দিয়েছিলে তুমি।পৃথিবীর সবাই অবিশ্বাস করে!সত্যিই তোমার ছোটোমেয়ের চরিত্রের দোষ আছে,নয়ত কিশোর আমার অত ভাল ছেলে শুধু শুধু অমন বলে?ছেলেটাকে তো আজ দেখছি না,যেমন মেধাবী তেমনি শিষ্ট।রুমকি যখন সুমিতকে বিয়ে করেছিল,তখন আমরা কি বিরক্তটাই হয়েছিলাম।আজ দেখো ওরা কত সুখে আছে!ওদের বিয়ের সাত-সাতটা বছর হয়ে গেল,তুলি দিদিভাইও তো এবার চার বছরে পা দেবে,কই ওদের মধ্যে তো কোনো অশান্তি নেই?আর ইনি?সত্যি,বিয়ের আগে চিন্তা ছিল আর বিয়ের পরেও সেই চিন্তা!তোমার মেয়েকে সামলাও।"
- "এই শোনো,বারবার তোমার মেয়ে তোমার মেয়ে কোরো না তো!রনু কি শুধু আমার মেয়ে,তোমার নয়?"
- "হ্যাঁ,কিন্তু তোমার বাপের বাড়ির চরিত্রই তো পেয়েছে।
- "সব ব্যাপারে আমার বাপের বাড়ির দোষ দেওয়া তোমার স্বভাব।তুমি নিজে সাধুপুরুষ তাই না?আমার রুমি হয়েছে বাপের বাড়ির মতো,আর রনু তোমার মতো।তাইতো এত জেদি।"
- " রনু মোটেও আমার মতো হয়নি।রুমি আমার স্বভাব পেয়েছে।রুমি একদম আমাদের ফ্যামিলির মতো।আর রনু তোমাদের ফ্যামিলির মতো।যত্তসব।"
- "যাও যাও বোকো না।"
এরপরেও ঝগড়াটা আরও কিছুক্ষণ চলেছিল হয়ত।রনিতা আর শোনেনি।শোনার কোনো প্রয়োজন তো হয়নি তার,কারণ ওর যা বোঝার ছিল তা বুঝে নিয়েছে।না,ও রনিতা নয়,কারোর মেয়ে নয়,কারোর স্ত্রী নয়,কোনো অফিসের বস নয়।তাহলে কে ও?মানুষ?না,এই লোকহাসানো প্রশ্নটা আর না করাই ভালো।ওর একটাই পরিচয়,বিশ্বাসঘাতক।কারোর বিশ্বাসের যোগ্য নয়।হ্যাঁ হ্যাঁ,ওই তো বিশ্বাসঘাতক,বিশ্বাস ভাঙার কালিটা যে রুমকি আর তনুশ্রী ওরই মুখে লেপে দিয়ে নিজেরা শান্তিতে আছে,সুখে আছে।
পরেরদিন সকালে অন্যদিনের মতোই আকাশের পুবদিক লাল রঙে রাঙিয়ে সূর্যদেব উঠেছেন ঝলমলিয়ে।বিমলা চা এনে দরজা ধাক্কা দিয়ে বলছেন,"ওঠ রনু,আর কত বেলা পর্যন্ত ঘুমোবি?অফিস যাবি না?"
বাইরে সোফায় বসে রীতেশ আয়েশ করে চা খেতে খেতে বললেন,"মহারাণী কি চাকরি-বাকরি সব ছেড়ে চলে এলেন নাকি?তা এবার কি বাপের ঘাড় ভাঙিয়ে খাওয়া হবে?"
দরজার ওদিক থেকে কোনো উত্তর এল না।আসবেও না আর কোনদিন।কারণ দরজার ওপারে যে রনিতা অনন্তঘুমে ডুবে আছে।ওই ঘুম যে আর কোনদিনও ভাঙবার নয়।পাপী মেয়ে,পাপী স্ত্রী আজ সবচেয়ে বড়ো পাপটা যে করেছে।আর তার পাশে পড়ে আছে একটুকরো কাগজ,রনিতার শেষবারের মতো ফেলা চোখের জলে নোনতা যে কাগজ,আর তার উপর লেখা,"অনেককিছু লিখতে চেয়েছিলাম,কিন্তু এত ঘৃণা বুকে নিয়ে আর বেশি কিছু লিখতে পারলাম না।শুধু বলে গেলাম,সবাই ভালো থেকো,সুখে থেকো।
— ইতি তোমাদের বিশ্বাসঘাতক।"
রুমকি আর তনুশ্রীর বোধহয় সবচেয়ে খুশির দিন আজ।কারণ তাদের সমস্ত বিষ আকণ্ঠ পান করা নীলকণ্ঠ রনিতার যে জীবনের শেষ রাত্রি কেটে গেছে।
(সমাপ্ত)
আত্মহত্যাকে সমর্থন করে এই লেখাটি লিখিনি।কিন্তু সব মানুষের মনের জোর একই রকম হয়না,হতে পারে না।আমি নিজেই আত্মহত্যার বিরোধী অনেক লেখা লিখেছি।লেখাটির একটাই বক্তব্য, তা হল সমাজে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে লড়াই করার মতো অদম্য সাহসিকতার মানুষ যেমন আছে,তেমনই আছে রণিতার মতো দুর্বল চিত্তের মানুষও।তাই এইধরনের মানুষদের আগলে রাখুন,পাশে থাকুন।রণিতার মতো পরিণতি হতে দেবেন না কখনোই,এটুকুই বলার।

0 মন্তব্যসমূহ