Advertisement

ভিলেন

 


ভিলেন

সুচন্দ্রা চক্রবর্তী


অনুশ্রীর আজ তিরিশ বছরের জন্মদিন।পারলে পৃথিবীর সবাইকে নেমন্তন্ন করে সুজয়।বাপের বাড়ি থেকেই ফিরেই অনুশ্রী অবাক।বড়ির গেট ফুল দিয়ে সাজানো,মাইকে গান বাজছে 'আমার পরান যাহা চায় তুমি তাই....'

-'এসব কি হচ্ছে?আজ কোনো অনুষ্ঠান আছে নাকি সুজয়?কই বলোনি তো আমায়?'

-'বাহ,ভুলে গেলে?আজ তোমার জন্মদিন অনু!হ্যাপি বার্থডে মাই ডিয়ার!'

-'তোমার মনে ছিল?সেইজন্য এতকিছু?'

-'বারে,দশটা নয় পাঁচটা নয় আমার একটা মাত্র বৌ,বছরে একটা দিন তার বার্থডে, আর আমি মনে রাখব না?'

-'ধ্যাত, সরো তো।কাজ আছে।'

-'আজ্ঞে না ম্যাডাম,আজ তুমি কুটোটিও নাড়বে না।আজ তোমার জন্মদিন, কিচ্ছু করতে দেব না।'

-'আরে তেষ্টা পেয়েছে,জলটাও খাব না?'

-'দাঁড়াও,আমি এনে দিচ্ছি।'

-'এমা,দেখো কান্ড,চাইলাম জল,দিল শরবত! '

-'হুম ম্যাডাম,মিষ্টিমুখ করুন!'

-'মরণ!শরবত দিয়ে মিষ্টিমুখ!বাপের জন্মে কেউ শুনেছে!'

-'আরে আমি যে ইউনিক সেটা কি আজ জানলে?'

-'না!প্রোপোজ করার দিন থেকেই জানতাম।লোকে গোলাপ দিয়ে করে,আর উনি.....'

-'হ্যাঁ,বেশ করেছিলাম রজনীগন্ধা দিয়ে প্রোপোজ করেছিলাম।তুমিই তো বলেছিলে একদিন যে গোলাপের চেয়ে রজনীগন্ধা তোমার বেশি প্রিয়, তাইতো....'

-'হ্যাঁ,আমার প্রিয় বলে নিয়মের ধার ধারবে না বুঝি?'

-'ইয়েস মেরি জান,তোমার জন্য আমি সব করতে পারি,সব নিয়ম ভাঙতে পারি।'

-'তাই বুঝি?তা প্রমাণ দাও দেখি।'

-'আদেশ করুন রানীমা,এ দাস কি করতে পারে আপনার জন্য।'

-'তোমার তো বেগুনে এলার্জি আছে না?শ্বাসকষ্ট হয় বেগুন খেলে।'

-'হ্যাঁ।'

-'আমি বললে ওখানে ওই পাত্রে যে বেগুনিগুলো ভেজে রাখা হয়েছে,একটা খেতে পারবে?'

-'এ আবার এমন কি?তুমি বললে আমি বিষও খেতে রাজি,আর এতো সামান্য বেগুনি!তুমি যদি খুশি হও আমি খেলে,আমি এখুনি খাব।'

-'এমা,সত্যি সত্যি খাচ্ছ নাকি?'

-'হ্যাঁ অনু,তোমায় খুশি করার জন্য একটা দিন নাহয় একটু হাঁপানি হলই,ইনহালার তো থাকেই আমার কাছে।তাছাড়া খেলে এখুনি তো কিছু হবে না,এখন খেলে এফেক্ট ধরবে সেই সন্ধেবেলায়।'

-'ও আচ্ছা,শর্তসাপেক্ষে খাচ্ছ!এই তোমার ভালোবাসা!'

-'আচ্ছা বাবা,বেশ!কোনো ওষুধ-টষুধ খাব না,যত কষ্টই হোক!এবার খুশি?'

-'ওমা,সত্যি সত্যি খেয়ে নিলে?'

-'অনু,আজ তোমার জন্মদিন।আজ সারাটা দিন তোমার মুখে আমি হাসি দেখতে চাই।তোমার মুড অফ হোক এমন কোনো কাজ আমি করব না।'

  

   বেগুনি মুখে পুরেই সুজয় চলে গেল।আজ তার অনেক ব্যস্ততা। দুপুরের লাঞ্চ,ডিনার,সন্ধেবেলার অনুষ্ঠান --- আয়োজনে যেন কোনো ত্রুটি না থাকে কোথাও।দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনু ভাবল,সত্যিই এমন জীবনসঙ্গী পাওয়া অনেক সৌভাগ্যের।বাবার পরেই  যদি অন্য কোনো পুরুষ প্রাণ দিয়ে অনুকে ভালোবাসে,সে হল সুজয়।

  ওদের বাড়ি থেকে একটু এগোলেই যে ওষুধের বড়ো দোকানটা চোখে পড়ে,বিজিত এন্ড সন্স ফার্মেসী, ওই দোকানের মালিক সুজয়।সুজয়ের বাবা বিজিত কর্মকার ছিলেন ডাক্তার। ডাক্তার না হতে পারলেও নানারকম ওষুধ ও তাদের কার্যকারিতা বাবার সান্নিধ্যে থেকে ভালোই শিখেছিল সুজয়।বিজিতই ওষুধের দোকানটা খুলে দিয়েছিলেন সুজয়ের জন্য।আজ তিনবছর হল হার্টের অসুখে বিজিত গত হয়েছেন।বিধবা মা রত্নাকে নিয়ে যেন অগাধ জলে পড়ল সুজয়।ওদিকে ওষুধের দোকানটাও তখন সদ্যপ্রতিষ্ঠিত।অনেক কষ্টে সুজয় সংসারের হাল ধরে অবস্থা ফিরিয়েছে সংসারটার।ইতিমধ্যে অনুশ্রী আসে সুজয়ের জীবনে।ওই সুজয়ের জীবনের প্রথম ভালোবাসা। অনুকে পাগলের মতো ভালোবাসে ও।শুধু তাই নয়,অনু রত্নারও চোখের মণি।অনুকে তিনি চোখে হারান।তাইতো বাপের বাড়ি গিয়ে বেশিদিন থাকা হয়না অনুর।এই দু'দিন বাপের বাড়ি গিয়েছিল অনু,সেটাও মা-ছেলের সহ্য হল না।রত্না ফোনে বললেন,'অনুমা,কবে আসবি?তোকে ছাড়া বাড়িটা বড্ড প্রাণহীন যে!'

-'ওকে মা,এখন তো রাত,কাল সকালেই যাব।'

-'কালকেই আসবি?'বৃদ্ধা মানুষটির খুশি দেখেও অনুও খুব আনন্দিত হয়, এত ছেলেমানুষি করেন রত্না,ওনার পাগলামির টানেই ফিরে আসে অনু।


  ওদিকে সুজয় যে কোথায় গেল কোনো পাত্তাই নেই।

-'কিরে,বরকে খুঁজছিস?আর এই বুড়ি শাশুড়িটাকে মনে পড়ল না বুঝি?'চমকে ফিরে তাকাল অনু।

-'না মা,ওকে কেন খুঁজব?ও তো এই বেরুল।'

-'আবার বেরুল?উফ এই ছেলেটা আর মানুষ হল না!বললাম আগেভাগে সব সেরে রাখিস,তা পারল না!সব একদম শেষমুহুর্তে করবে!'

-'উফ মা,তুমি ব্যস্ত হচ্ছ কেন?আর আমার জন্মদিন নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করারই বা কি ছিল তোমাদের শুনি?'

-'বা রে,মেয়ের জন্মদিন পালন করব না?দশবিশটা তো নয়,একটিমাত্র বৌমা আমার....'

-'হুম বুঝলাম।'

-'কি বুঝলি পাগলি?'

-'আমি ছাড়াও আরও বৌ আছে তোমার ছেলের না?'

-'কি?সত্যি নাকি?দাঁড়া,আসুক সে,মেরে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব।আমার অনুকে ছেড়ে কিনা....'

-'হেসো না তো,আমি কিন্তু সিরিয়াস। তোমার ছেলেও বলে দশটা নয় পাঁচটা নয়,আর তুমিও বলো।নিশ্চয়ই আছে,আর সেটা তুমিও জানো,তাই সবসময় খালি এসব বলো আমায় বোকা বানানোর জন্য।'

-'আরে নারে পাগলি।'

-'শোনো ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা কোরোনা বলছি!কোনো লাভ হবে না!আমি পুলিশের মেয়ে,আমার চোখ সাংঘাতিক! '

-'মিতা,ও মিতা!'

-'কি হল মিতাদিকে ডাকছ কেন আবার?'

-'তোকে খেতে দিতে বলছি।এসে তো কিছুই খাসনি,তাই খালিপেটে যত বোকা বোকা কথা বলছিস।নয়তো স্কুলমাস্টারের মেয়ে কিনা বলে সে পুলিশের মেয়ে!'

-'কি!তাই বললাম আমি?সত্যি আমার মাথাটা গেছে!'

-'হ্যাঁ সেটাই তো বোঝানোর চেষ্টা করছি তোকে আমি এতক্ষণ। আরে মিতা,তুমি আবার হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলে কেন?যাও নিয়ে এস ওই পেতলের বাটিটা!'

   মিতা বাটি নিয়ে এল।বাটি দেখেই রত্না অবাক,'ও মা গো,এ আমি কাদের কাজে রেখেছি!ওরে এটা নয়!ওই ডাইনিং টেবিলে ঢাকা দেওয়া বাটিটা নিয়ে এস।'

   এবার মিতা ঠিকঠাক বাটিই নিয়ে এল।রত্না নিজের হাতে পায়েস বানিয়ে রেখেছিলেন ওই বাটিতে,নিজের হাতে খাইয়ে দিলেন অনুকে।'

  অনু প্রণাম করল রত্নাকে,রত্না বললেন,'শুভ জন্মদিন মা,আমি আশীর্বাদ করি সুখী হ, আর তোর মনের সব ইচ্ছা ভগবান পূরণ করুন।'

-'মা,প্রার্থনা করো আমি যেন আমার জীবনের লক্ষ্যপূরণ করতে পারি।'

-'হ্যাঁ মা,সে তো আমি সবসময় চাই,তোর লক্ষ্যে তুই স্থির থাক,জয়ী হ।ওকি,তোর চোখে জল কেন?ছি ছি,এই শুভদিনে কেউ কাঁদে!'রত্না নিজের আঁচলে চোখ মুছিয়ে দেন অনুর।আর কান্না চাপতে পারল না অনু।রত্নাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল লাগল সে।মনে মনে বলল,'আমায় ক্ষমা কোরো মা,যদিও জানিনা এ অন্যায়ের ক্ষমা হয় কিনা...'রত্না সস্নেহে অনুর পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,'বুঝেছি।কাঁদার মতো নিশ্চয়ই কোনো কারণ ঘটেছে!ঠিক আছে,আমি আর তোকে  প্রশ্ন করব না,তুই কাঁদ।কাঁদলে মন শান্ত হয়।'

   বেশ কিছুক্ষণ কাঁদার পর হুঁশ ফিরল অনুর।ভাগ্যিস সুজয় ফেরেনি এখনো।নিজের বোকামিতে নিজের ওপরই রাগ হল তার,'একি করছিলাম আমি!কাঁদছিলাম?নিজের পরিকল্পনা দেখছি নিজের হাতেই ভাঙবো!'

-'যাক,এইতো,শান্ত হয়েছে মেয়ে!বাপের বাড়ি থেকে এত তাড়াতাড়ি আসার ইচ্ছা ছিল না সেটা ভালোই বুঝেছি।ঠিক আছে বাবা,আজ তোর জন্মদিন, তা না হলে এখনই সুজয়কে বলতাম বেহালায় তোকে পৌঁছে দিয়ে আসতে।আচ্ছা বেশ,আজকের দিনটা যাক,কাল না হয় সকালে আবার রওনা দিস।'

-'কাল সকালে আমাকে এমনিতেও রওনা দিতে হবে এখান থেকে,শুধু একটাই আফসোস, যদি তোমাকেও নিয়ে যেতে পারতাম আমার সাথে....'

-'দূর,পাগলি কোথাকার! ছেলের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বেশিদিন আমার থাকা কি ভাল দেখায়?'

-'আরও একটা ভুল!'নিজের গালে এবার একটা চড় মারতে ইচ্ছা হল অনুর।

-'কি রে,কি বিড়বিড় করছিস?চল তো,এখানে বসে না থেকে বসার ঘরে গিয়ে মা-মেয়েতে টিভি দেখি গিয়ে।'

-'হ্যাঁ চলো।'

টিভির চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ একটা নিউজ চ্যানেলে এসে অনুর চোখদুটো স্থির হয়ে গেল।আজ একজন শহিদ পুলিশ অফিসার অনিল শর্মার মৃত্যুবার্ষিকী, তাই সকলে তাঁর ছবিতে মালা দিচ্ছে,শ্রদ্ধা জানাচ্ছে, নেতানেত্রীরা ভাষণও দিচ্ছেন।আগের বছর ঠিক এইদিনেই তিনি শহিদ হয়েছিলেন।

-'সত্যি,কোন জানোয়াররা মেরে ফেলল এমন একজন সৎ মানুষকে?সত্যি,ভালো মানুষরা শেষ হয়ে যায়,আর যত পাপীতাপীরা খোলা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়!'

-'ভগবান আছেন মা,উনি শাস্তি দেবেনই খুনিকে।হয়তো নিজে আসবেন না,কিন্তু কাউকে না কাউকে পাঠাবেন ওই অমানুষটাকে শেষ করার জন্য।হয়তো পাঠিয়ে দিয়েওছেন।'

-'তাই যেন হয় অনু।হে ভগবান,ওই পাপিষ্ঠটা একবছর ধরে সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুলিশ  ওকে গ্রেপ্তারও করল না কেন?'

-'ওর অনেক ওপরমহল পর্যন্ত হাত বিস্তৃত।সবাই জেনেও প্রমাণের অভাবে কিচ্ছুটি করতে পারবে না।'

-'ও মাগো, কি সাংঘাতিক! বিশ্বাস কর অনু,ওই দুরাত্মাকে যদি কোনোদিন সামনে পেতাম না....'

-'কি করতে তাহলে?'

-'শেষ করে দিতাম,ওই নোংরা হাতদুটো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতাম যাতে ওই রক্তমাখা হাত দিয়ে কোনোদিন ভাত মুখে তুলতে না পারে!'

-'অন্যায় যেই করুক না কেন,অপরাধীর শাস্তি পাওয়াই উচিত তাই না মা?'

-'একদম তাই।অপরাধ অপরাধই।অপরাধীর একটাই পরিচয় সে অপরাধী। না জানি আগের জন্মে কত পাপ করেছিল ওর মা,তাই অমন একটা পশুকে পেটে ধরেছিল!'

-'কি জানি মা!'অনুর চোখে জল এল।

-'খুব অল্পে তোর চোখে জল আসে,থাক দেখতে হবে না এই খবরটা।আমি চ্যানেল চেঞ্জ করে দিচ্ছি।'

   রত্না চ্যানেল বদলানোর পরমুহূর্তেই সুজয়ের ঘরে প্রবেশ। অনু কিছু না বলে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

-'মা,কি হয়েছে ওর বলো তো?'

-'আরে কিছু না,বাপের বাড়ি থেকে এত তাড়াতাড়ি চলে আসতে হল কিনা,তাই মনটা খারাপ। তা অতিথিরা তো একটু পরেই আসতে শুরু করবেন।সবকিছু রেডি আছে তো বাবা?'

-হ্যাঁ মা,এদিকের কাজকর্ম শেষ।'

  দুপুরের কাজকর্ম-খাওয়াদাওয়া সব মিটল।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামতে লাগল।সুজয়ের ব্যস্ততার শেষ নেই।সমস্ত

কিছু একা হাতে করতে হচ্ছে তাকে।রত্না তেমন দৌড়াদৌড়ি করতে পারেন না,বসে বসেই চেঁচিয়ে হুকুম করছেন সকলকে --- 'ও মিতা,বলি বাসনপত্র গুলো একটু ভালো করে মাজো', 'আরে এ বিনয়,আলোগুলো ঠিকঠাক করে জায়গামতো লাগিয়েছিস তো?', 'আর এই যে তোমরা,রান্নাবান্না গুলো ভালো করে কর,বেশি ঝালে পোড়া না হয় যেন খাবারগুলো,অনু আমার একদম ঝাল খেতে পারে না।', 'আরে ওকি রামু,তুই হাঁ করে দেখছিস কি?ওদিকের মাইকটা একটু দেখ তো,কোনো সমস্যা হল কিনা!', 'উফ,এই বুঝি তোমাদের আসার সময় হল!সুজয় তো ক্যাটারার কে আরো আগে আসতে বলেছিল।', 'আরে তোরা দাঁড়িয়ে রইলি কেন আবার,শরবতগুলো রেডি রাখ,এক্ষুনি হয়তো গেস্টরা আসা শুরু করবেন।'

-'উফ মা,এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন বলোতো?'

-'ও মা,এতো দেখি যার বিয়ে তার হুঁশ নেই,পাড়াপড়শির ঘুম নেই!যা যা,রেডি হয়ে নে অনু,আর দেরি করিস না।এক্ষুনি সবার আসা শুরু হবে।'

  এরপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।সকল অতিথিরা হাজির।সুজয় কেকের সামনে দাঁড়িয়ে মোমবাতি জ্বেলে অপেক্ষারত। এখুনি অনুর আসার কথা।রত্না ডাক দিলেন,'অনু,অনুমা!'অনু ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামল।ওকে দেখে সুজয় অবাক।অনুর কাছে গিয়ে ও বলল,'একি অনু!এ কি শাড়ি পরলে?তোমার জন্য নিজে পছন্দ করে শাড়ি কিনে আনলাম,আর তুমি এই সাধারণ শাড়িটা পরে এলে?'

রত্না বললেন,'থাক না,জন্মদিনটা ওর,ওর  যা পছন্দ তাই পরতে দে না।'

-'বেশ মা,তা না হয় বুঝলাম।কিন্তু ওর জন্য যে ডায়মন্ড নেকলেসটা আনলাম,ওটাও তো পরেনি।'

-'হোয়াই সুজয়?তুমি তো  সবসময় বলো আমি খুশি হব এমন কাজই তুমি করতে চাও।আজ সকালেও তাই বললে।তাহলে আমি কি পরলাম না পরলাম তাই নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন তোমার?এটুকু স্বাধীনতাও কি নেই আমার?নাকি তোমার স্ত্রী বলে তোমার আদেশ মান্য করতে হবে সবসময়?'

  সুজয় এসব কথা একদমই আশা করেনি।অনুর হাতদুটো বুকে চেপে ধরল ও,'এসব কি কথা অনু?আমি কখনও কোনোদিন কিছু চাপিয়ে দিয়েছি তোমার উপর?আমি তো এমনিই জিজ্ঞেস করলাম।বেশ,আমার জন্য যদি তুমি কষ্ট পেয়ে থাকো,আই য়্যাম সরি।কিন্তু মুখটা এরকম গোমড়া করে রেখো না প্লিজ। ঠিক আছে,বুঝেছি আমার দেওয়া জিনিসগুলো তোমার পছন্দ হয়নি তাই এমন করছ তো?আচ্ছা বেশ,এস দেখ কেকটা পছন্দ হয় কিনা।তোমার স্ট্রবেরি পছন্দ, তাই স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানিয়ে এনেছি।'

  অনু কেক কাটতে যাবে,হঠাৎ সুজয় ভীষণভাবে কাশতে শুরু করল।রত্না তাড়াতাড়ি জল এনে দিলেন,জল খেয়ে কাশিটা কমল বটে,কিন্তু এমন শ্বাসকষ্ট শুরু হল যে,সুজয় মাটিতে লুটিয়ে পড়ল,মনে হল চোখদুটো যেন বেরিয়ে আসছে।'

-'কি হয়েছে বাবা!'রত্না ছুটে গেলেন ছেলের কাছে।যদিও কারণটা অনু আর সুজয়ের ভালোমতোই জানা ছিল,তবুও কেউ মুখ খুলল না।

-'মা,তুমি টেনশন কোরো না।আমি সুজয়কে ঘরে নিয়ে যাচ্ছি। ওষুধ দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।'

-'হ্যাঁ,তাই যা মা।রামু,মিতা ওদের ঘরে পৌঁছে দিয়ে আয়।'সকলে সুজয়কে দোতলায় নিয়ে গেল।

-'ইশ,শুভ অনুষ্ঠানে ছেলেটার কি হল হঠাৎ বলুন তো?'

-'নিশ্চয় এমন কিছু খেয়েছে যাতে ওর এলার্জি আছে।আপনারা চিন্তা করবেন না,ঘরে ওষুধ আছে,ঠিক হয়ে যাবে।'রত্না বললেন।

-'মা,বলছি মাইকের গান কি বন্ধ করে দেব?'বিনয় জিজ্ঞেস করল।

-'না না,একদম না,অনুষ্ঠান আগের মতোই চলবে যেমন এতক্ষণ চলছিল।এই তো,সুজয় সুস্থ হলেই অনুর বার্থডে সেলিব্রেশন শুরু হবে।'

  ওদিকে দোতলায় সুজয়কে নিয়ে নিজেদের ঘরে ঢুকেই অনু বলল,'রামুদা,মিতাদি,তোমরা যাও।এবার আমি সামলে নিতে পারব।'

-'ঠিক তো বৌদি? তুমি পারবে?'

-'বললাম তো পারব।তোমরা যাও না এখন!'অনু ঝাঁঝিয়ে ওঠে।

রামু আর মিতা চলে যেতেই অনু দরজাটা বন্ধ করে দিল সজোরে।

-'কি হয়েছে অনু?এনি প্রবলেম?'হাঁপাতে হাঁপাতে অতি কষ্টে সুজয় বলল।অনু মুখ ফিরিয়েও দেখল না সুজয়ের দিকে।ওদিকে সুজয় দাঁড়াতে না পেরে বিছানায় ঢলে পড়ল,'অনু,প্লিজ ইনহালারটা দাও না আমায়,বড্ড কষ্ট হচ্ছে!আমি আর পারছি না!'এবার অনু ফিরে তাকাল।অনুর এমন সুকঠিন নিষ্ঠুর দৃষ্টি সুজয় আগে কখনো দেখেনি।যেন দু'চোখে আগুন জ্বলছে তার।সুজয় চমকে গেল।কেমন যেন ভয়ভয় করতে লাগল তার।

-'কি অনু!এমন করে তাকাচ্ছ কেন?দেখো,আমি যদি সুস্থ না হই,এই সুন্দর অনুষ্ঠানটাই নষ্ট হয়ে যাবে।'

-'এই নাও!'ইনহালারটা সুজয়ের গায়ে ছুড়ে মারল অনু।ততক্ষণে একেবারে আধমরা সুজয়।অতিকষ্টে ইনহালারটা তুলে নিল সে।

-'একি অনু!এটা তো শেষ হয়ে গেছে।কিন্তু কালই যে আনলাম আমি নতুন একটা,নিজের দোকান থেকেই তো আনলাম!ওটা কোথায়?'

-'ওটা এখানে!'অনু কাপড়ের ভাঁজ থেকে বের করল নতুনটা।

-'প্লিজ দাও অনু,বড্ড কষ্ট হচ্ছে যে আমার!আমার হাঁটবার শক্তিটুকুও নেই,প্লিজ দিয়ে দাও।'

-'কেন দেব?কষ্টের সময় ওষুধ না পেলে কেমন লাগে তুমিও একটু বোঝো! ভাবো,রোগগ্রস্ত অসহায় মানুষগুলো যখন একটা ওষুধের জন্য পাগলের মত ছুটে বেড়ায়,আর তাদের হাতে তুমি ভেজাল ওষুধ তুলে দাও টাকার লোভে,তখন ওই রোগীগুলোর কেমন লাগে একটু দেখ!'

  একে তীব্র শারীরিক কষ্ট,তার উপর অনুর এই কথা!অবাক বিস্ময়ে সুজয় বলল,'তুমি কি করে জানলে?'

-'আচ্ছা ছাড়ো এইসব কথা।তুমি অসুস্থ, এখন মজা করাটা ঠিক নয়।ইনহালারটা তাহলে তোমায় দিয়েই দিই বল?'

-'হ্যাঁ প্লিজ! দেখ আমি যা করি তাতো তোমাদের ভালোর জন্যই,তোমার আর মায়ের সুখের জন্যই।'

-'আচ্ছা দেব,কিন্তু একটা শর্তে।চোখটা বন্ধ করো।'

-'কিন্তু কেন?'

-'উঁহু, কোনো প্রশ্ন নয়।প্রশ্ন করা অনুশ্রী শর্মা পছন্দ করে না!'

-'আচ্ছা ঠিক আছে করছি।'সুজয় চোখ বন্ধ করল।কিন্তু চোখ বন্ধ করার পরই হঠাৎ একটা খটকা লাগল ওর।অনুর সারনেম তো পাল,তাহলে অনুশ্রী শর্মা বলল কেন?সন্দেহে চোখটা খোলার আগেই সুজয়ের বুকে আমূল  বিঁধে গেল এক ধারালো ছোরা।বুকের বাঁদিকে,বুকটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে পিঠ ভেদ করে বেরিয়ে গেল ছোরাটা।আর ছোরার হাতলটা ধরা তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির হাতে।যন্ত্রণায় সুজয় চিৎকার করার চেষ্টা করল,কিন্তু অবাক-বিস্ময়ে আর অসম্ভব শারীরিক কষ্টে গোঙানির মতো একটু শব্দ বেরুল।

-'চেঁচাও সুজয়,যত পারো চেঁচাও!কিন্তু কেউ তো শুনতে পাবে না!নীচে মাইকে গান বাজছে,কারোর কানে তোমার চিৎকার পৌঁছবে না।'

মুমুর্ষু,আহত সুজয়ের চোখদুটোয় অনেক প্রশ্ন ছিল,কিন্তু মুখে কিছু বলার ক্ষমতা ছিল না।অত্যন্ত কষ্টে সে বলল,'কেন অনু?'

-'হ্যাঁ সবই বলব।মরে যাওয়ার আগে তোমায় সমস্ত বিষয়ে অবগত করব।মনে পড়ে মিস্টার সুজয় কর্মকার, আজ এই দিনেই আইসিইউ তে পুলিশ অফিসার অনিল শর্মাকে ভুল ওষুধ খাইয়ে তুমি খুন করেছিলে?আমি আর কেউ নই,তাঁর একমাত্র মেয়ে অনুশ্রী শর্মা। '

-'কি!কিন্তু.... '

-'হ্যাঁ,বিয়ের আগে বেহালার যে বাড়িতে তোমাদের নিয়ে গিয়েছিলাম, ওটা আমার এক বন্ধু নীলিমা  পালের বাড়ি।সত্যি,ওর উপকার ভোলার নয়।আমার বাবা অন্যান্য পুলিশ অফিসারদের মতো ছিলেন না।উনি ছিলেন একজন সৎ দায়িত্ববান মানুষ। উনি যখন তোমার এই জাল ওষুধের গোপন কারবারটা ধরে ফেলেছিলেন, তুমি ওনাকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলে,বাবা নেননি, নেতাদের বলে উচ্চপদে বহাল করার লোভও দেখিয়েছিলে, তাও তিনি শোনেননি। আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিলে,তাতেও যখন কাজ হল না,তখন হুমকিটাকেই কাজে পরিণত করলে।সেদিন যখন বাবা বাইক চালিয়ে ফিরছিলেন তখন বাবার একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল,কিন্তু তুমি জানতে ওটা এক্সিডেন্ট নয়,বাবাকে খুনের চেষ্টা করেছিলে তুমি।তারপর বাবা যখন আইসিইউ তে,তখন ডাক্তার-নার্সদের হাত করে তুমি ভেতরে ঢুকেছিলে, তারপর বাবার অক্সিজেন মাস্কটা খুলে দিয়ে তোমার নিজের গোপন ডেরা থেকে আনা ভেজাল ওষুধ খাইয়ে শেষ করে দিলে মানুষটাকে,তাও আমার জন্মদিনের দিন!'অনুর গলা বুজে এল,হাতের মুঠো শক্ত হল আরও,'তুমি ভেবেছিলে কেউ দেখেনি ঘটনাটা,কিন্তু দুজন দেখেছিল,একজন ভগবান আর একজন সিসিটিভি।কিন্তু বড়ো বড়ো নেতাদের সঙ্গে তোমার চেনাজানা, তাই ফুটেজটা আদালতে পেশ করার আগেই হারিয়ে গেল,আর প্রমাণের অভাবে তুমি বেরিয়ে এলে জেল থেকে।কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি,বাবার মৃতদেহ ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমার মায়ের বৈধব্যের কারণ যে,আমি তার মৃত্যুর কারণ হব।তারপর থেকেই তোমাদের ওষুধের দোকানে আমার যাওয়া-আসা,বাড়ির যাবতীয় ওষুধপত্র তোমার দোকান থেকেই কেনা শুরু করলাম। নিজেকে অনুশ্রী পাল বলে পরিচয় দিলাম,আমি এমন ভাব দেখাতাম যেন তোমার প্রেমে পড়েছি,দেখলাম ভালোই ওষুধ ধরল।এরপর এবাড়িতে আসা-যাওয়া,তোমার মায়ের স্নেহ, প্রোপোজ আর তারপর বিয়ে।বিয়ের কথাবার্তা বলার জন্য নীলিমার বাড়িতে তোমাদের নিয়ে গেলাম,আর আঙ্কল-আন্টিকে নিজের বাবা-মা বলে পরিচয় দিলাম।তুমি তখন আমার প্রেমে এতটাই অন্ধ,একবার যাচাইও করলে না,বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেলে।কিন্তু আমি ঠিক করেছিলাম, আমার বাবার মৃত্যুদিনেই তোমাকে শেষ করে দেব।এই পৃথিবীতে বাঁচার অধিকার তুমি হারিয়েছ সুজয়!'

ছোরাটা বের করে নিল অনু সুজয়ের শরীর থেকে,তারপর আবার বিদ্ধ করল সেই একই জায়গায় 'দেখ সুজয় দেখ!মরার সময় একজন মানুষ কতটা কষ্ট পায় দেখ!'

কাটা মুরগীর মতো সুজয়ের শরীরটা কেঁপে উঠল।শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে ও বলতে লাগল,'ঠিক করেছ  অনু,তুমি একদম ঠিক করেছ।অনু আমি জানিনা তুমি আমায় আজ বিশ্বাস করবে কিনা,কিন্তু আমি বলছি হ্যাঁ আমি ভেজাল ওষুধের কারবার করি গোপনে,আমি খুনি, লোভী, কিন্তু একটা জিনিস খাঁটি তা হল তোমার প্রতি ভালোবাসা।তোমাকে আমি সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছিলাম অনু,বিশ্বাস করো সে ভালোবাসায় কোনো খাদ ছিল না,কোনো মিথ্যা ছিল না।আজও এখনও আমি তোমাকেই ভালোবাসি। তাই তোমার করা এই আঘাতে আমার  কষ্ট হচ্ছে না,তুমি খুশি হয়েছ  আঘাত করে,তাই আমিও খুশি অনু।কিন্তু যদি আমার মৃত্যুই তোমার সুখের কারণ,তাহলে তা আমায় আগে কেন বলোনি অনু?তোমার এককথায় আমি ওই সব ভেজাল ওষুধগুলো একসাথে গলায় ঢেলে নিতে পারি,শুধু শুধু এই পাপীর রক্ত নিজের হাতে লাগিয়ে কেন হাতটা অপবিত্র করলে?একবছর ধরে নিজে গুমরে কষ্ট পেয়েছ,কেন অনু?আমি তোমার হাসিমুখ দেখতে চাই,এখনও,তোমার এককথায় আমি কবে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিতে পারতাম,কারণ তুমি হয়ত অভিনয় করেছ,কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি অনু।আমি যে পাপ করেছি,এর যোগ্য শাস্তি তো এটাই ছিল।কি হল থামলে কেন অনু?মারো,আরো কয়েকটা কোপ মারো,মৃত্যু নিশ্চিত করো,আমি কিন্তু শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত বলে যাব,অনু,আই লাভ ইউ!তোমায় খুশি দেখতে চাই আমি সবসময়, মারো,আরো মারো,তোমার বাবার মৃত্যুর শোধ নাও!ভেজাল ওষুধ সাপ্লাই করেছি,তারও শোধ নাও,ছিন্নভিন্ন করে দাও আমার শরীরটা,যেন কেউ শনাক্ত করতে না পারে,তবু আমি কিন্তু বলব ভালোবাসি তোমায়!'

অনু হঠাৎ ছোরাটা দূরে ছুড়ে ফেলে দিল,কাঁদতে কাঁদতে বলল,'তোমায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে হয়ত এখনও তোমায় বাঁচানো যেতে পারে!'

-'না অনু না!আমার মতো অপরাধীকে তোমার পাশে মানায় না,আর হাসপাতালে নিয়ে গেলেও আমি বাঁচব না,আমার শেষ সময় আগত।কিন্তু অনু,তুমি চলে যাও এখুনি,পালিয়ে যাও কেউ চলে আসার আগেই।ওই টিস্যু পেপারটা দিয়ে রক্তমাখা হাতটা মুছে নাও,আর হ্যাঁ,মাকে সবটা খুলে বোলো।ভয় নেই,আমার মাকে আমি চিনি,তিনি গান্ধারী নন,তাই তোমার পাশেই থাকবেন।চলে যাও অনু,নতুন জীবন শুরু করো।ওকি কাঁদছ কেন?হাসো অনু,তোমার বাবার খুনি আজ মৃত্যুপথযাত্রী,এটাই তো তুমি চেয়েছিলে। তুমি আমার প্রিয়তমা, কিন্তু আমি তো সবচেয়ে বড়ো শত্রু তোমার,তোমার উচিত কর্তব্যই তো পালন করেছ।আজ স্বর্গে তোমার বাবা কতটা গর্বিত বলোতো তোমার জন্য?আমার মতো পাপীর হয়তো নরকেও ঠাঁই হবে না....'

-'কেন করলে সুজয়?কেন করলে?নিজের মৃত্যু কেন ডেকে আনলে?তোমার বিধবা মা কি অন্যায় করেছিলেন?'চোখের জল বাগ মানল না অনুর।

-'জানি অনু,মা-বাবার কুলাঙ্গার সন্তান আমি।ওনারা সর্বদা সৎ হতে শিখিয়েছিলেন, কিন্তু টাকার লোভে সেই শিক্ষা বিসর্জন দিয়েছিলাম অনু!কি হল,দাঁড়িয়ে রইলে যে?আমার জন্য তোমার জেল হোক আমি চাই না।তুমি উচিত শিক্ষাই দিয়েছ আমায়,কিন্তু সেকথা তুমি আমি বুঝলেও আইন তো বুঝবে না!প্লিজ পালিয়ে যাও,ওই জানালাটা দিয়ে।'

পাশে একটা খালি ওষুধের প্যাকেট পড়ে ছিল।সাদা কাগজের প্যাকেটটার উপর অত্যন্ত কষ্টে কাঁপা কাঁপা  হাতে রক্তে লিখল সুজয়,'অফিসার অনিল শর্মার মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী। নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজের হাতে আজ নিজেকে শেষ করলাম।আমার মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী, একমাত্র আমি,আর কেউ নয়।'লেখাটা শেষ করে সুজয় তাকাল অনুর দিকে শেষবারের মতো,'এজন্মে তো তোমাকে পেলাম না,পরের জন্মে যেন সৎ মানুষ হয়ে আমার জন্ম হয়,আর তোমাকেই স্ত্রী রূপে পাই।'সুজয় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করল।

  কাটল আরো একটা বছর।অনুদের বাড়িতে এখন তিন বিধবার বাস,অনু,অনুর মা শুক্লা,অনুর শাশুড়ি রত্না।অনু ও শুক্লার মুখে সব শুনেছেন রত্না,অনুর পাশেই তিনি দাঁড়িয়েছেন,তাই সুজয়ের মৃত্যুর পর বাড়িটা বেচে দিয়ে প্রাপ্ত টাকাটা অনাথ আশ্রমে দান করে চলে এসেছেন অনুদের বাড়ি।দুই মা মিলে বহু চেষ্টা করেছেন অনুর আবার বিয়ে দিতে,কিন্তু তার ওই এক কথা,'না!একদমই না!জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আমি সুজয়ের স্ত্রী পরিচয়েই বাঁচব।সুজয় আমার বাবার জীবনে সবচেয়ে বড়ো ভিলেন হয়ে এসেছিল,তাই আমিও ওর জীবনে সবচেয়ে বড়ো ভিলেনের দায়িত্ব পালন করেছি।সুজয় আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো শত্রু ছিল,কিন্তু এ পৃথিবীতে ওর থেকে বেশি ভালোও যে কেউ বাসতে পারবে না আমায় মা,কেউ কি পারবে ওর মতো আমার এককথায় নিজের জীবন শেষ করে দিতে?'

  সুজয় আর অনিলের মালা দেওয়া ছবিদুটোর সামনে তিন অসহায়ার মর্মান্তিক কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। সে কান্নার আওয়াজে আজ যে অনুর জন্মদিন  সেই শুভ সত্যিটাও নিমজ্জিত হয়ে গেল চিরতরে।

(সমাপ্ত)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ